Home বিশেষ রচনা রাজ্জাক

রাজ্জাক

1222
0
SHARE

২০ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগরের জনস্রোতের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল গুলশানের একটি হাসপাতালে। আর এই জনস্রোত উত্তাল হয়ে উঠেছিলে প্রিয় অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাককে ঘিরে। সন্ধ্যা ৬.১৩ মিনিটে পরপারে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের সম্রাট নায়করাজ রাজ্জাক। বিকেল পাঁচটার দিকে অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৬.১৩ মিনিটে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়েস ছিল ৭৬ বছর। তাঁর মৃত্যুতে শুধু চলচ্চিত্র অঙ্গনই নয় পুরোদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।
চলচ্চিত্রকে যারা ভালোবেসে এই অঙ্গনটিকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বল এক নাম রাজ্জাক। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের হৃদয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে ছুটে আসেন অভিনয়শিল্পী সুচরিতা, শাকিব খান, ফেরদৌস, সাইমন সাদিক, জায়েদ খান, অরুণা বিশ্বাস, ওমর সানী, মৌসুমী, আইরিন, রোশান, পরিচালক মুশফিকুর রহমান গুলজার, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, নৃত্যপরিচালক মাসুম বাবুলসহ এই অঙ্গনের অনেক শিল্পী ও কলাকুশলী।
নায়করাজের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি। অবিভক্ত ভারতের কলকাতার কালীগঞ্জের নাকতলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আট বছর বয়সে বাবা আকবর হোসেন ও মা নিসারুন্নেসা দুজনই মারা যান। ৩ ভাই, ৩ বোনের সংসারে বড়োরা রাজ্জাককে বুঝতেই দেননি বাবা-মায়ের শূন্যতা। ছেলেবেলায় পড়তেন খানপুর হাইস্কুলে। একথা এখন অনেকেই জানেন যে, কৈশোরে রাজ্জাকের ইচ্ছে ছিল ফুটবলার হওয়ার। গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন ভালো। বিভিন্ন পাড়ায় হায়ার করেও নিয়ে যাওয়া হতো তাঁকে।
রাজ্জাক যেখানে থাকতেন, সে-এলাকায় থাকতেন ছবি বিশ্বাস [কাঞ্চনজঙ্ঘা, জলসাঘরসহ অসংখ্য বাংলা ছবির শক্তিমান অভিনেতা], সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনয়শিল্পীরা। ছবি বিশ্বাস বিপুল উৎসাহ নিয়ে আবৃত্তি শেখাতেন পাড়ার শিশু-কিশোরদের। রাজ্জাকও তাঁর কাছে আবৃত্তি শিখেছেন।
শিক্ষক রথীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্কুলেই একটি নারীবর্জিত নাটক করতে চাইলেন, নাম ‘বিদ্রোহী’। স্কুলের মেয়েরাও রাজ্জাকের অভিনয়ের প্রশংসা করলেন। তাতে অভিনয়ের প্রতি মনোযোগী হন রাজ্জাক। এলাকার শক্তি সংঘ ক্লাবে অভিনয় করলেন নতুন ইহুদি নাটকে। এরপর তরুণতীর্থ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে নিয়মিত অভিনয় করতে শুরু করেন তিনি। এই ক্লাবের সভাপতি ছিলেন ছবি বিশ্বাস। নাট্যপরিচালক ছিলেন পীযূষ বোস।
উত্তমকুমার ছিলেন রাজ্জাকের আইডল। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর রাজ্জাক ঠিক করলেন তিনি বোম্বে [মুম্বাই] চলে যাবেন। পীযূষ বোস পরামর্শ দিলেন, ‘ক্যারিয়ার গড়তে হলে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাও।’ মাইগ্রেশন করে খুলনা বর্ডার দিয়ে শিমুলিয়া হয়ে ঢাকায় চলে এলেন রাজ্জাক। ততদিনে তিনি বিয়ে করেছেন [১৯৬২], স্ত্রী রাজলক্ষ্মী ও আট মাসের সন্তান বাপ্পারাজকে সঙ্গে করে ঢাকায় এলেন। শুরু হলো সংগ্রামী জীবন।
ঢাকার কমলাপুরে ছোট্ট একটি বাড়িতে বাস শুরু করলেন। আয়-রোজগার নেই। যে টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাও শেষ হয়ে গেছে।
অভিনয়ের সুযোগ সেভাবে হয়নি, পরিচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ‘কাগজের নৌকা’, ‘কাগজের বৌ’, ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’ ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেন। ভালো চরিত্রের জন্য কেউ তখনো তাঁকে ডাকেনি।
এরই মধ্যে যোগাযোগ হলো জহির রায়হানের সঙ্গে। জহির রায়হান তাঁকে তাঁর পরবর্তী ছবি ‘হাজার বছর ধরে’-এর নায়ক হিসেবে নেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে সে-ছবিটি আর করা হয়নি।
১৯৬৬ সালে পাকিস্তান টেলিভিশন চালু হলে খবর পাঠক হিসেবে তিনি ইন্টারভিউ দেন এবং টিকেও যান। কিন্তু অভিনেত্রী রেশমার স্বামী জামান আলী খান তাঁকে অভিনয়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পরামর্শ দেন। এরই মধ্যে অভিনয়শিল্পী মোহাম্মদ জাকারিয়া তাঁকে জানালেন, জহির রায়হান তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। ‘বেহুলা’ ছবির নায়কের চরিত্রে জহির রায়হান নিলেন রাজ্জাককে। রাজ্জাক পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছিলেন ছবিটি করে। এরপর জহির রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবি করে পেলেন সাত হাজার টাকা। রাজ্জাক পায়ের নিচে দাঁড়ানোর মতো মাটি পেলেন।
রাজ্জাক অভিনীত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটি মাইলফলক। তিনি এরই মধ্যে অভিনয় করেছেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘আবির্ভাব’, এতটুকু আশা, ‘কাচ কাটা হীরা’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ইত্যাদি ছবিতে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরও রাজ্জাক ছিলেন খ্যাতির শিখরে। ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ-এর মতো ছবি করেছেন। নারায়ণ ঘোষ পরিচালিত আলোর মিছিল ছবিটি ছিল ব্যতিক্রমী। অনন্ত প্রেম ছবিটির কথাও মানুষ অনেক দিন মনে রাখবে। এ ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে আছে ‘অগ্নিশিখা’, ‘অশিক্ষিত’ ও ‘ছুটির ঘণ্টা’।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি সুচন্দা, কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনার সঙ্গে একের পর এক সফল জুটি হয়ে অনেক ছবি উপহার দিয়েছেন। ২০১৪ সালে তাঁর অভিনীত ‘কার্তুজ’ ছিল তাঁর অভিনীত শেষ ছবি। বাংলা-উর্দু মিলিয়ে তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক [২০১৫], পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার [সেরা অভিনেতা], মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা [২০১৪]। রাজ্জাক বেশ কিছু ছবি করেছেন। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘অনন্ত প্রেম’।

সৈয়দ হাসান ইমাম, অভিনেতা
‘রাজ্জাকের বিনয়ের প্রেমে পড়েনি, এমন মানুষ বোধ হয় নেই। এত জনপ্রিয় হয়েও সে তাঁর অতীতকে ভোলেনি। সিনিয়রদের সম্মান করা ছিল তাঁর স্বভাবগত ব্যাপার। সে সব শ্রেণির মানুষকে শ্রদ্ধা করত।’

ববিতা, অভিনেত্রী
‘হঠাৎ এই খবরটা শোনার পর কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাঁর সঙ্গে অনেকগুলো ছবিতে জুটি হয়েছিলাম। একে একে সেই স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে। কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না যে নায়করাজ আর নেই।’

ওমর সানি, অভিনেতা
খবরটা শোনার পর ভীষণ একটা ধাক্কা খেলাম। উনি আমার অভিভাবক ছিলেন। তাঁকে এভাবে হারাবো ভাবতে পারিনি। তার শূন্যতা কিছুতেই পূরণ হবে না। উনি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য সম্পদ ছিলেন। মাথার উপর থেকে ছায়া হারালাম।

শাকিব খান, অভিনেতা
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক স্যার আর নেই [ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন]।

অপু বিশ্বাস
প্রিয় আংকেল, আপনার চলে যাওয়া আমাদের অভিভাবক শুন্য করে দিয়েছে। আপনার দোয়া আপনার ভালোবাসা, আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে। যেখানে থাকুন ভালো থাকুন…

বাপ্পা রাজ, অভিনেতা
নায়ক রাজের ববড়ো ছেলে বাপ্পারাজ বলেন, ‘আমার আব্বা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। সবাই তাঁর জন্য দোয়া করবেন। তাঁর আত্মা যেন শান্তিতে থাকে। আমার আব্বার ব্যবহারে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে মাফ করে দেবেন।’

সম্রাট, অভিনেতা
বাবার মৃত্যুতে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন সম্রাট। বাবার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হলে নায়করাজ তাঁকে ফোন করে বকা দিতেন। ধমক দিয়ে বলতেন, কোথায় ? জলদি এসো, খাব। আমি বলতাম, বাবা তুমি খেয়ে নাও। আমি আসার পরে আবার একসঙ্গে বসে খাব। তখন বাবা বলতেন, তুমি এখনি আসো। তুমি আসার পরে খাব। বাবার এই স্মৃতিগুলো বারবার মনে পড়ছিল ছোট ছেলে সম্রাটের। বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকবার্তা
নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে শোকাহত শোবিজ অঙ্গন। শোকাহত ভক্তকুল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ছেয়ে গেছে রাজ্জাকের স্মৃতিচারণে। তার মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শোক প্রকাশ করেছেন পর্দার তারকারা। জানিয়েছেন বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা চলচ্চিত্রের নায়করাজ রাজ্জাকের জন্ম আর বেড়ে ওঠা কলকাতার টালিগঞ্জে। অভিনয় ক্যারিয়ারের শেষদিকে তিনি সেখানকার অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন কলকাতার অনেক তারকা। কলকাতার অভিনেতা প্রসেনজিৎ ও ঋতুপর্ণা তাদের ফেসবুকে রাজ্জাকের ছবি পোস্ট করে শোক প্রকাশ করেন এবং শ্রদ্ধা জানান।

প্রসেনজিৎ, অভিনেতা
তিনি আমার কাছে বাবার মতো ছিলেন এবং থাকবেন। তার সঙ্গে অসংখ্য ছবিতে কাজ করেছি। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে শুধু বাংলা চলচ্চিত্রই নয়, আমার হৃদয়েও সৃষ্টি হয়েছে বিশাল শূন্যতার। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানাই। শান্তিতে থাকুন রাজ্জাক সাহেব।

ঋতুপর্ণা, অভিনেত্রী
আব্দুর রাজ্জাক স্যারের মৃত্যুর খবরটি শুনে প্রচণ্ড বিমর্ষ হয়ে পড়েছি। অনেক কিছুই লিখতে ইচ্ছে করছে এই প্রিয় নায়ককে নিয়ে। আমরা একসঙ্গে ‘বাবা কেন চাকর’সহ আরও অনেক ছবিতে কাজ করেছিলাম। শান্তিতে থাকুন স্যার, এই প্রার্থনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here