Home অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিদেশী বন্ধুরা

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিদেশী বন্ধুরা

351
0
SHARE

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিদেশি বন্ধুরা

ফকির আলমগীর

আমি আমার ধারাবাহিক লেখায় ইতোপূর্বে আমার ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও যশোর রোড’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র’ দুটি নিবন্ধে স্মৃতিকাব্যে আমার মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এবার আমার নিবন্ধে তুলে ধরতে চাই বিদেশিদের চোখে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিশেষ করে তাদের অবদানের কথা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনিঃশেষ যাত্রাপথে জড়িয়ে আছে কত ইতিহাস, কতজনের আত্মদান। মুক্তিযুদ্ধ কোনো খÐিত ইতিহাস নয়। এ এক বিশাল অধ্যায়, সুবিশাল ক্যানভাস। এই ক্যানভাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অনেক ত্যাগ, বিসর্জন আর অন্তর্ভেদী বেদনার অনুক্ত উপাখ্যান। দেশমাতৃকার জন্য লাখো তরুণ যুবকের সঙ্গে আত্মোৎসর্গের মহান ব্রত নিয়ে সেদিন রণাঙ্গনে ছুটে গিয়েছিলেন অনেকেই। আর আমাদের স্বাধীনতা কারো দয়ার দান নয়। দাম দিয়ে কিনেছি এই স্বাধীনতা। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দলিল বুকে নিয়ে ৬০ দশকের আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে, ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে অবিচার নির্যাতন নিúিড়নের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের সুদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের। তারই পথ ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১-এর মার্চে পুরো জাতি একটি বিন্দুতে মেলেÑ যার নাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধÑ যার নাম আমাদের স্বাধীনতা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহŸানে সেদিন দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেইসাথে বিদেশি বন্ধুরা দেশের সেই ক্রান্তিলগ্নে, অক্লান্ত সংগ্রামের সময়ে বন্ধুত্বে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল অপার মমতায়।

তাদের কেউ লড়েছেন শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কেউ বা কূটনৈতিকভাবে, কেউবা সাংবাদিকতার মাধ্যমে, কেউবা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে, আবার কেউ কনসার্ট ফর বাংলাদেশÑ এর আয়োজন করে। একদিকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অসীম ত্যাগ আর সাহস আর অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অপরিসীম অবদানের ফসল আমাদের মহান স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়, আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের মহান জনগণের কথা। তবে এ নিবন্ধে আমি কেবল অন্যদেশের বন্ধুদের কথা তুলে ধরতে চাই। ভারতও মহান জনগণের কথা আমি আমার পরবর্তী লেখায় তুলে ধরবো।

স্বাধীনতার পাঁচ দশক সময়ে যখন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম একাত্তরের রক্তাক মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি জানার উদগ্র বাসনায় সোচ্চার হবে সেই মুহূর্তে আমার এ প্রচেষ্টা ভারতের বাইরেও বিশ্ববরেণ্য শিল্পীসমাজ, রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ কীভাবে আমাদের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন সে সম্পর্কেও একটা ধারণা পাওয়া যাবে। আমাদের জীবনের সবচেয়ে সঙ্কটময় মুহূর্তে আমাদের মুক্তিসংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন আর্জেন্টিনার লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাস্পো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, আন্দ্রেই আন্দ্রেভিচ গ্রোমিকো, সাইমন ড্রিং, লিয়ার লেভিন, মার্কটালি, উইলিয়াম এ. এস. ওল্ডারল্যান্ড, সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, ফাদার রিগন, জোয়ানবায়েজ [ঔড়ধহ ইধবু]সহ আরো অনেকে। যাদের অবদানের কথা জাতি কোনোদিন ভুলবে না। যেমন ভোলা যাবে না সেই সব রাষ্ট্রনায়কদের কথা যারা দুর্দিনে, দুঃসময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ; যেমন ব্রেজনেভ, কোসিগিন, পদগর্নি, রাসবরন মাধব, দর্জিওয়াংচুক, জোসেফটিকে, জর্জহিথ, হ্যারল্ড উইলসন, কৈরালা, ফিদেলক্যাস্ট্রো, উইলিব্রান্ট, আগস্ট জালেক্সি, ওলফপাসে, ব্রæনোক্রিয়েস্কি, পিয়ারে ট্রুডো, গুজরাল, গিরিজাপ্রসাদ কৈরালাসহ মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বখ্যাত ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ অংশগ্রহণকারী বিশ্ববরেণ্য শিল্পীরা।

আমি আমার নিবন্ধে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা সেই সব বিদেশি বন্ধুদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরছিÑ

 

উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড

[জন্ম : ৬ ডিসেম্বর, ১৯১৭, মৃত্যু : ১৮ মে, ২০০১]

বাংলাদেশের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবদান রাখা বিদেশিদের মধ্যে অন্যতম ব্যতিক্রমী ব্যক্তি হলেন উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড। সামনা-সামনি যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য তাকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীর প্রতীক প্রদান করেন। তিনি এই খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বাটা সু কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে তার ছিল অবাধ যাতায়াত। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সুলতানের সাথে প্রথমে এবং এরপর একে একে সেনাবাহিনীর আরো কয়েকজনের সাথে সখ্য জমিয়ে ফেলেন তিনি।

এ সুযোগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব ধরনের নিরাপত্তা পাস পেয়ে যান। অবাধ মেলামেশার সুযোগে সব ধরনের তথ্য, সেনাবাহিনীর তৎপরতা ও পরিকল্পনা গোপনে পাঠাতে থাকেন ২ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে। একইসঙ্গে টঙ্গীর বাটা সু কোম্পানির কারখানা প্রাঙ্গণে স্থাপন করেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপন ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধারা তার কারখানায় আশ্রয় নিয়ে আশেপাশে গেরিলা অপারেশন চালাতে থাকে এবং অস্ত্র সংগ্রহ, চিকিৎসা সামগ্রী, আর্থিক ও প্রশিক্ষণ সাহায্য দিয়েও সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান যোদ্ধা।

 

ভিকটোরিয়া ওকাম্পো

[জন্ম : ৭ এপ্রিল, ১৮৯০, মৃত্যু : ২৭ জানুয়ারি, ১৯৭৯]

আর্জেন্টিনার একজন বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী, লেখিকা এবং সাহিত্য সমালোচক। তিনি ল্যাটিন আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী, স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সাহিত্য-পত্রিকা ‘সুর’-এর প্রতিষ্ঠাতা। একাত্তরে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের সংহতি আন্দোলনের সামনে ছিলেন লেখক, শিল্পী ও ধর্মীয় নেতারা। একাত্তরের ১১ জুন তাদের একটি প্রতিনিধিদল আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য সাহায্য পাঠানোর দাবি জানিয়েছিলেন। এই দাবিনামায় যারা স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের মধ্যে প্রথমেই ছিলেন আশি-ঊর্ধ্ব ভিকটোরিয়া ওকাম্পোর নাম। তার সঙ্গে ছিলেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক হোসেলুইস বোর্হেসসহ আর্জেন্টিনার সেরা লেখক ও শিল্পীদের অনেকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিজয়া’ ভিকটোরিয়ার নামের এই বাংলা প্রতিশব্দ করেছিলেন কবি নিজেÑ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বাংলাদেশের সমর্থনে রাজধানী বুয়েনস্ এইরেসের একটি মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি আমার সমর্থন অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের ভাষা বাংলা। বাংলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ভাষা। আর তিনি [রবীন্দ্রনাথ] বহু সময় কাটিয়েছেন বাংলার ওই অংশে। সে জন্য এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ আমার কর্তব্য বলে মনে করেছি।’

 

আরউইন অ্যালেন গিন্সবার্গ

[জন্ম : ৩ জুন, ১৯২৬, মৃত্যু : ৫ এপ্রিল, ১৯৯৭]

‘কাদামাটি মাখা মানুষের দল, / গাদাগাদি করে আকাশটা দ্যাখে, / আকাশে বসত মরা ঈশ্বর / নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে।’  -[কণ্ঠশিল্পী মৌসুমি ভৌমিকের বঙ্গানুবাদকৃত গান থেকে] মার্কিন এই বিখ্যাত কবি ও গীতিকার ১৯৭১-এর ভয়াবহতা দেখেন ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখার সময়। বন্ধুত্বের খাতিরে সদ্যপ্রয়াত পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলকাতার বাসায় ওঠেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিককার সময়ে।

আরো অনেকের মতোই শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে যাবার পরিকল্পনা করেন তারাÑ তবে, সড়কপথে না গিয়ে, বেছে নেন পানিপথ। নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে পৌঁছে যান। ব্রিটিশ রাজ্যের সময় পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগকারী সড়ক ছিল এটি। আশে পাশের শরণার্থী শিবিরগুলোর সীমাহীন দুর্দশা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন সেই অসাধারণ কবিতাটি -‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। আমেরিকা ফিরে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহায়তার জন্য তার বন্ধু বব ডিলানের সাথে কবিতাটিকে গানে রূপ দেন। এভাবেই বাংলাদেশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন তিনি।

 

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস

[জন্ম : ৬ ডিসেম্বর, ১৯২৮, মৃত্যু : ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৬]

১৩ জুন, ১৯৭১। লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকাতে পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা নিয়ে প্রকাশিত একটি বিশদ সংবাদ হৈচৈ ফেলে দেয়। আন্তর্জাতিক বোদ্ধারা, নড়েচড়ে বসেন। কারণ, রিপোর্টার যে একজন গোয়ানিজ পশ্চিম-পাকিস্তানি। রিপোর্টার অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের পরিবারকে লুকাতে হয় এই ইতিহাস বদলকারী ঘটনার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াতে। পুরো বিশ্ব এরপর বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে দ্বিধা করেনি। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমস-এর সম্পাদক হ্যারল্ড ইভানসকে জানান, আর্টিকেলটি তাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি স্বউদ্যোগে ইউরোপ ও মস্কোকে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিতে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। মায়ের নির্দেশমতো অ্যান্থনি সর্বদা সত্যকে কাঁধ দিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সংঘাত, গণতহ্যা ও অন্যান্য ঘটনা নিয়ে বই লিখে [The rape of bangladesh-1972, Bangladesh: A Legacy of blood-1986] তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। [চলবে]

লেখক গণসংগীতশিল্পী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here