Home রঙ্গশালা/আবৃত্তি মঞ্চের আলোয় সৈয়দ শামসুল হকের ‘বাল্যপ্রেম’

মঞ্চের আলোয় সৈয়দ শামসুল হকের ‘বাল্যপ্রেম’

1139
0
SHARE

৩ অক্টোবর ২০১৭ শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে ‘মুক্তবাক’ পরিবেশন করে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কবিতাগ্রন্থ ‘বাল্যপ্রেম’-এর প্রযোজনা। কবির প্রথম প্রয়াণদিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক এবং কবিপতœী আনোয়ারা সৈয়দ হক, অধ্যাপক আহমেদ রেজা, আবৃত্তিশিল্পী বেলায়েত হোসেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, আবৃত্তিশিল্পী আশরাফুল আলম। আলোচনা পর্বের সভাপতি ছিলেন মুক্তবাকের নির্বাহী প্রধান, আবৃত্তিশিল্পী ইকবাল খোরশেদ। তাঁর নির্দেশনায় ‘বাল্যপ্রেম’-এর আবৃত্তি পরিবেশন করেন মুক্তবাকের আবৃত্তিকর্মী আশরাফ আলী সরকার, অদিতি অমৃতারাজ, তৃষ্ণা পাল, রায়হান হায়দার রঞ্জন, ইরাম মাহফুজা, মো. আসাদুজ্জামান। আলোক পরিকল্পনা করেন অম্লান বিশ্বাস এবং আবহসংগীতে ছিলেন অনিন্দ্য মাহাদী, প্রযোজনার নান্দনিক মঞ্চসজ্জা করেন সজীব কুমার ও অঞ্জয় কুমার।

কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর কবির প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন আলোচকবৃন্দসহ মিলনায়তনে উপস্থিত আবৃত্তিপ্রেমী দর্শক-শ্রোতাবৃন্দ। আলোচনা পর্বে আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, ‘কবির সঙ্গে দীর্ঘদিন জীবন কাটিয়েছি, তাঁকে কখনও কোনো বিষয়ে হৈচৈ করতে দেখি নি। তিনি নিজের মতো করে নিজের কাজ করতেন। কবে কবে এত কবিতা এত গল্প-উপন্যাস লিখেছেন টের পাইনি। সব পড়াও হয়ে ওঠেনি।’ আশরাফুল আলম বলেন, ‘কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও থেকে যানÑ সৈয়দ শামসুল হক তেমনই একজন।’ অধ্যাপক আহমেদ রেজা বলেন,  ‘সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন কালজয়ী এক সাহিত্যিক। সাহিত্যের সব শাখায় ছিল তাঁর অবাধ ও সহজ বিচরণ।’ বেলায়েত হোসেন সৈয়দ হকের সাহিত্যচর্চার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করে তাঁর কবিতা থেকে আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সভাপতির বক্তব্যে ইকবাল খোরশেদ বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হকের নাম বাংলা সাহিত্য থেকে কোনোদিন মুছে যাবে না।’ আলোচনাপর্ব সঞ্চালনা করেন সৈয়দা তাসনিম আরা।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা পর্ব শেষে আলো-আঁধারিতে মঞ্চে এসে উপবেসন করেন মুক্তবাকের ছয়জন আবৃত্তিকর্মী। সে-সময় মঞ্চের পর্দায় ভেসে ওঠেÑ দিঘির জলে ভাসছে দুটি রাজহাঁস আর তার পেছনে আকাশে লাল চাঁদ। দু’জন দুজন করে জুটিবেঁধে মুক্তবাকের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘বাল্যপ্রেম’ কাব্যগ্রন্থের নাতিদীর্ঘ কুড়িটি কবিতা।

‘বাল্যপ্রেম’ সৈয়দ শামসুল হকের গ্রামীণ বালক-বালিকার প্রেমের চিরায়ত এক জলছবি। বাল্যপ্রেমের ফল কোনোদিনই সুখকর হয় না, তবুও বাল্যপ্রেম বাঙালি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঐতিহ্যও বটে। আর এই চিরচেনা ঘটনা চিরজানা কথারই শিল্পিত রূপ ‘বাল্যপ্রেম’। এ-কাব্যাখ্যানের পটভূমিও সৈয়দ শামসুল হকের ছেলেবেলার বাংলদেশের চিরায়ত গ্রাম ও গ্রামীণ সমাজ।

জন্মসূত্রেই আমাদের সমাজ বালক-বালিকাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। আর সে-কথা দিয়েই সৈয়দ হক শুরু করেছেন ‘বাল্যপ্রেম’ : ‘বালকেরা জন্ম নেয়, বালিকারা জন্ম পেয়ে থাকে।/ বালিকারা জন্ম নেয় বেতুল বেভুল এক বনে।/ বালকেরা জন্ম নেয়, জন্ম নেয়া বলা হয় যাকে।/ জন্মনাড়ি ছিঁড়ে যায় বালিকার নারীর জীবনে।’

বালিকা অতি তাড়াতাড়ি বালকের আগেই যৌবনবতী হয়। ঋতুমতী হতেই শুরু হয়ে যায় কানাঘুষাÑ পরের বাড়ি পাঠাতে হবে মেয়েকে। কিন্তু বালিকার এই জন্মবাড়ি ছেড়ে যেতে যেন ছিঁড়ে যায় জন্মনাড়ি। কারণ, একজন বালিকার কাছে জন্মবাড়ি আর জন্মনাড়ি একইসূত্রে গাঁথা।

অবশেষে কবি এই বাল্যপ্রেমকে রূপ দেন চিরন্তন বাল্যপ্রেমে। মিলিয়ে দেন রূপকথার অনন্য কথনের সঙ্গেÑ যা গ্রামবাংলার চিরায়ত এক শিল্প ও জীবনরূপ। ‘বাল্যপ্রেম’র শেষভাষ্যে কবি বলেন : ‘সেই সারী ! সেই শুক !Ñ বাঙালির যে-রূপকথার !/ কথা কয়ে উঠতো যে বৃক্ষডালে মানুষের স্বরে !  দেখে নিও আজ তার ভাষা কষ্ট কী অক্ষমতার !/ বাল্যপ্রেমে অভিশাপ ? আজও তাই ধূপে অগ্নি ধরে !’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here