1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন

৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

মোট আক্রান্ত

২৪২,০৪৯

সুস্থ

১৩৭,৯০৭

মৃত্যু

৩,১৮৪

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৫২,২২৪
  • চট্টগ্রাম ১৪,৪৮৯
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৮৮০
  • কুমিল্লা ৫,৫৭৬
  • বগুড়া ৪,৮৭৬
  • ফরিদপুর ৪,৮৬২
  • খুলনা ৪,৩৬৭
  • গাজীপুর ৪,২৩৬
  • সিলেট ৩,৭৮৭
  • কক্সবাজার ৩,৩৯১
  • নোয়াখালী ৩,১৮৬
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,০২১
  • ময়মনসিংহ ২,৭২৩
  • কিশোরগঞ্জ ১,৯৯৫
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১,৯৪৭
  • নরসিংদী ১,৯২৬
  • যশোর ১,৮৯৯
  • চাঁদপুর ১,৮৫৩
  • টাঙ্গাইল ১,৬৯০
  • বরিশাল ১,৬৮৬
  • কুষ্টিয়া ১,৫৯৪
  • রংপুর ১,৫৩৯
  • লক্ষ্মীপুর ১,৪৫৩
  • সিরাজগঞ্জ ১,৪৪০
  • দিনাজপুর ১,৩০৮
  • ফেনী ১,৩০৮
  • সুনামগঞ্জ ১,২৭৮
  • রাজবাড়ী ১,২৭৭
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • হবিগঞ্জ ১,০৫৫
  • পটুয়াখালী ১,০২৫
  • ঝিনাইদহ ৯৮৩
  • নওগাঁ ৯৩১
  • জামালপুর ৯১৬
  • পাবনা ৮৪৩
  • মানিকগঞ্জ ৮৪০
  • মৌলভীবাজার ৮৩৯
  • মাদারীপুর ৮৩২
  • গোপালগঞ্জ ৭৯৯
  • নড়াইল ৭৬২
  • সাতক্ষীরা ৭৪৮
  • জয়পুরহাট ৭১৪
  • শরীয়তপুর ৬৬৮
  • রাঙ্গামাটি ৬৫৭
  • চুয়াডাঙ্গা ৬৪৩
  • নেত্রকোণা ৬৩৮
  • বাগেরহাট ৬০৮
  • নীলফামারী ৬০০
  • গাইবান্ধা ৫৭৮
  • বান্দরবান ৫৫৪
  • খাগড়াছড়ি ৫৩২
  • ভোলা ৫২৮
  • বরগুনা ৫১১
  • নাটোর ৪৯২
  • মাগুরা ৪৬০
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৪৪৮
  • কুড়িগ্রাম ৩৭৭
  • শেরপুর ৩১৫
  • ঠাকুরগাঁও ৩০১
  • লালমনিরহাট ২৯৪
  • ঝালকাঠি ২৪২
  • পঞ্চগড় ২৩৩
  • পিরোজপুর ২১৮
  • মেহেরপুর ১৮৭
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতা

ইকবাল খোরশেদ
  • বাংলাদেশ সময় রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০
  • ২০৩ বার ভিউ করা হয়েছে

ভারতের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতার সুলুকসন্ধান করতে গেলে বিশাল ভারতের ভূ-প্রাকৃতিক ভূগোল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তাই মূল আলোচনায় যাবার আগে এ-বিষয়ে কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ আবশ্যক।

 

পর্ব -০১

ঋগ্বৈদিকযুগ

ভারত ভূখণ্ডের প্রকৃতি ও ভূগোল

বিচিত্র প্রাকৃতিক পরিবেশের এক বিশাল দেশ ভারত। এদেশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, অরণ্য, মরুভূমি, সুজলা-সুফলা সমতল অঞ্চল। এর উত্তরে রয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়, ২৫৭৪ কিলোমিটারব্যাপী বিশাল এই পর্বতমালা, উত্তর-পশ্চিমের হিন্দুকুশ ও সুলেমান পর্বতমালা [বর্তমান আফগানিস্তান সীমান্তে] উত্তর-পূর্বে আরাকান পর্বতমালা দেশটিকে এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আড়াল করে রেখেছে। আরেকদিকে ভারতের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূল ঘিরে রয়েছে বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর। বাংলাদেশ-কে যেমন ব-দ্বীপ বলা যায় তেমনি ভারতকে বলা যায় একটি উপদ্বীপ। উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে কুমারিকা অন্ত্যরীপ পর্যন্ত ভারতের ভূভাগ প্রায় ৩২১৮ কিলোমিটার আর ভারতের উপকূল রেখা ৪৮২৭ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত। এ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে রয়েছে অন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এই দ্বীপপুঞ্জে নিগ্রোয়েড ও মঙ্গোলীয় জাতির মানুষেরা বাস করছে।

বিশাল দেশ হওয়ায় এবং পাহাড় ও সমুদ্রবেষ্টনীর কারণে ভারতের এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য খুব স্পষ্ট। ভারতকে তাই পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ (Epitome of the world) বলা হয়ে থাকে। ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ভারতকে প্রধান চারটি অঞ্চলে ভাগ করা যায় :

১. উত্তর ও উত্তর-পূর্বের পার্বত্য অঞ্চল : তরাইয়ের জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল থেকে হিমালয়ের শীর্ষদেশ পর্যন্ত ক্রম-উচ্চতাবিশিষ্ট ভূ-ভাগ এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন কালে কাশ্মীর, নেপাল, সিকিম, কাংগ্রা, তেহরি, কুমাউন, ভুটানসহ ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় হিমালয় অঞ্চলের সমুদয় দেশই এর অন্তর্গত ছিল।

২. উত্তরের সমভূমি : উত্তর-ভারত অনেকটা চারকোণাকৃতির। উত্তরের পর্বতমালা থেকে সিন্ধু ও গঙ্গা নামে দুটো বড়ো নদী এই ভূভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সিন্ধু অববাহিকাকে গঙ্গা থেকে পৃথক করে রেখেছে থর বা রাজস্থানের মরুভূমি এবং ছোট ছোট কয়েকটি পাহাড়। উত্তরের সমভূমি বলতে দোয়াব অঞ্চলসহ দিল্লি থেকে পাটনা পর্যন্ত বিস্তৃত গাঙ্গেয় সমভূমিকে বোঝায়। সুজলা-সুফলা বলে এই অঞ্চল ‘ভারতের হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ‘আর্যাবর্ত’ [আর্যদের আবাসভূমি] নামে পরিচিত ছিল। তিব্বত থেকে উৎসারিত আসাম উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে গঙ্গা মিলিত হয়ে বাংলার দক্ষিণ পর্যন্ত যে সমভূমির বিস্তার ঘটিয়েছে তা পৃথিবীর একটি সেরা পলিময় সমভূমি। এই অঞ্চলেরই পশ্চিম অংশে রয়েছে ‘আরাবল্লি’ নামে পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি পর্বত। এরই একটি শৃঙ্গ ‘আবু’ পর্বত নামে পরিচিত। এই বিশাল ভূখণ্ডের উর্বরতা ও প্রাকৃতিক সম্পদ প্রাচীনকালে যেমন ‘আর্য’জাতিকে আকৃষ্ট করেছিল, আর্যপরবর্তীকালেও তেমনি আরো অনেক বিদেশি জাতিকে ভারত অভিযানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উর্বর সমতল ভূমি, নদীর প্রাচুর্যের কারণে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলে অনেক সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল প্রাচীনকাল থেকেই।

৩. মধ্যভারত ও দাক্ষিণাত্যের মালভূমি : উত্তর-ভারতের দক্ষিণ থেকে শুরু করে ভারতের দক্ষিণ সীমানায় কন্যাকুমারি বা কুমরিকা অন্ত্যরীপ পর্যন্ত রয়েছে এক বিশাল মালভূমির অবস্থান। এই সম্পূর্ণ অঞ্চলটিকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি মধ্যভারতের মালভূমি  ও অন্যটি দাক্ষিণাত্যের মালভূমি। দণ্ডকারণ্যের গহীন বন রয়েছে মধ্যভারতের মালভূমিতে। বিন্ধ্য ও কাইমুর পর্বত ভারতের মধ্য অংশ দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে দাঁড়িয়ে আছে। বিন্ধ্য পর্বত অঞ্চলের দক্ষিণে অবস্থিত দাক্ষিণাত্যের মালভূমি। তিনপাশের তিনটি পর্বতশ্রেণি এই মালভূমিকে ত্রিভূজের আকৃতি দিয়েছে এবং দক্ষিণ দিক ঘিরে রেখেছে তিনটি সমুদ্র। তাই এই অঞ্চলটিকে উপদ্বীপ বলা যায়। এই উপদ্বীপই দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণ-ভারত নামে পরিচিত।

৪. সুদূর দক্ষিণ এবং দ্বীপাঞ্চল : পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সংকীর্ণ ভূখণ্ড সুদূর দক্ষিণ নামে পরিচিত। দ্রাবিড় সভ্যতা বিকাশের স্বাক্ষর রয়েছে এখানে। পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে, দক্ষিণ দিকে এবং বাংলার দক্ষিণে রয়েছে বেশ কয়েকটি দ্বীপ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আরব সাগরের লাক্ষা, মিনিকয়, মাল ও আমিনদিভি দ্বীপের সারি আর বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ অংশে রয়েছে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।

…………………………………

 

যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন জাতির মিশ্রণ ঘটেছে ভারতে। তাই বৈশিষ্ট্যগত দিক বিবেচনায় আধুনিক গবেষকগণ ভারতে বসবাসকারী প্রাচীন জাতিগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। এই চার জাতি হলো আদিম উপজাতিগুলো, মঙ্গোলীয়, দ্রাবিড় ও আর্য।

 

আদিম জঙ্গলবাসী উপজাতি

ভারতের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে আদিমকাল থেকে এক শ্রেণির মানুষ বসবাস করত। এই উপজাতি গোষ্ঠী কোল, ভীল, গোল্ড ও সাঁওতাল নামে পরিচিত। আকৃতিতে এরা বেঁটে, খাটো, নাক থ্যাবড়া, ঘন চুল ও গায়ের রং কালো। ছোট নাগপুর ও উড়িষ্যাতে এখনো কোল ও সাঁওতালদের অস্তিত্ব রয়েছে। ভীলদের অস্তিত্ব রয়েছে রাজস্থান, বিন্ধ্য পর্বত ও মধ্যপ্রদেশের উত্তরাংশে। মধ্যপ্রদেশের দক্ষিণাংশে গোল্ডদের বসবাস। প্রাচীন ভারতে পাঞ্জাব থেকে তামিলনাড়– পর্যন্ত বিস্তীর্ণ  অঞ্চলে এই জাতিগুলো বিচরণ করত। এদের ভাষা পলেনেশিয়া, মেলানেশিয়া ও মাদাগাস্কা [মালগাছি প্রজাতন্ত্র]-এর ভাষার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এরা কখনো সভ্যজাতির মর্যাদা পায়নি। এই উপজাতিগুলোকেই ভারতের আদিমতম মানবগোষ্ঠীর সদস্য মনে করা হয়।

 

মঙ্গোলীয়

মঙ্গোলীয় গোত্রের মানুষ আকারে বেঁটে, দেহ সুগঠিত, শক্ত চিবুক, দাঁড়িগোঁফ নেই বললেই চলে, মুখাকৃতি গোলাকার এবং গায়ের রং হলদেটে। তিব্বতীয়, চীনা, জাপানি এবং বর্মীদের সমগোত্রীয় এরা। তিব্বত এবং মঙ্গোলিয়া হচ্ছে মঙ্গোলীয়দের আদিভূমি। এরা উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি পথ ধরে ভারতে প্রবেশ করেছে। এক সময় এদের একটা বড়ো অংশ আর্যদের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। বর্তমানে এই গোষ্ঠীর লোকেরা হিমালয়ের পাদদেশে সিকিম, আলমোরা, গারহওয়াল, ভুটান এবং আসামের পাহাড়ে বসবাস করছে। ভারতে মঙ্গোলীয় জাতির উত্তরাধিকার হিসাবে গুর্খা, ভুটিয়া এবং খাসিয়াদের চিহ্নিত করা হয়।

 

দ্রাবিড়

ভারতে আর্য-পূর্ব জাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জাতি হচ্ছে দ্রাবিড়। এদের আদিভূমি কোথায় ছিল সে ব্যপারে গবেষকগণ নিশ্চিত হতে পারেন নি। ভারতে এদের আগমন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদও আছে। কোনো কোনো গবেষকের মতে দ্রাবিড়রা কোল ও ভীলদের মতো পুরোপলীয় যুগে ভারতীয় আদিবাসীদের গোত্রভুক্ত ছিল। তবে কোল ও ভীলদের চেয়ে দ্রাবিড়রা ছিল অনেক বেশি বুদ্ধিসম্পন্ন ও প্রাগ্রসর জাতি। আরেক দল গবেষক মনে করেন, এরা মেকরান সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল থেকে অথবা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি পথ ধরে ভারত-খণ্ডে এসেছিল। এই ধারণার সমর্থক গবেষকদের মতে, দক্ষিণ বেলুচিস্তানের কিরথার পর্বতমালার আদিবাসী ব্রাহইসদের (Brahuis) ভাষার সঙ্গে দ্রাবিড় ভাষার অনেক মিল রয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেই ভারতে দ্রাবিড়দের অবস্থান ছিল বলে অনুমান করা হয়। অন্য একদল আধুনিক গবেষক মনে করেন, এই জাতিগোষ্ঠী দক্ষিণে ইন্দো-আফ্রিকার পথ ধরে ভারতে এসেছিল। গবেষকদের মতে এরা ছিল আফ্রিকার নিগ্রোদের গোত্রভুক্ত। তবে অন্য এক শ্রেণির গবেষক এই মতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোতে যে মানবগোষ্ঠীর কথা সিন্ধু-সভ্যতা আবিষ্কারের ফলে জানা গিয়েছে, তারাই দ্রাবিড় জাতি। এই মতটিকেই সর্বাপেক্ষা গ্রহণীয় বলে মনে করা হয়।

এক সময় দ্রাবিড় জাতি সমগ্র উত্তর-ভারতব্যাপী নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমান দক্ষিণ-ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে এদের সন্ধান পাওয়া যায়। মনে করা হয়, আর্যদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হতে হতে ক্রমে এরা দক্ষিণ-ভারতের দিকে সরে গেছে। ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বাংলাদেশের কোনো কোনো উপজাতীয় গোষ্ঠীর দেহবিন্যাসে দ্রাবিড় রক্তের চিহ্ন রয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।

গবেষণা থেকে যতটা জানা যায়, দ্রাবিড়রা ছিল শান্তিপ্রিয় জাতি। তাদের মূল পেশা ছিল কৃষিকাজ, সেচের প্রয়োজনে তারা বাঁধ দেওয়ার পদ্ধতি শিখেছিল। দ্রাবিড়রা অস্ত্র, মৃৎপাত্র এবং অলঙ্কার তৈরিতে পারদর্শী ছিল। আদিম অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে তারা ভারতে নগর পত্তন করেছিল এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলেছিল। তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল প্রাচীন মিশর, প্যালেস্টাইন, পারস্য, মেসোপটেমিয়া, ব্যাবিলোনিয়া ও এশিয়া মাইনরের সঙ্গে। দ্রাবিড়রা এসব দেশে হাতির দাঁত, স্বর্ণ, মূল্যবান পাথর, ধান, কাঠ, বানর ও ময়ূর রপ্তানি করত। ভাষা বিজ্ঞানিরা মনে করেন, দ্রাবিড়দের ভাষা ছিল উন্নত এবং তা সংস্কৃত বা আর্য ভাষা থেকে অনেকটাই ছিল আলাদা। দ্রাবিড় ভাষার সঙ্গে এখনও তামিল, তেলেগু, কানাড়ীয়, মালয়ালাম প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষার মিল পাওয়া যায়।

দ্রাবিড়দের সমাজব্যবস্থা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা গ্রামে বাস করত। দ্রাবিড় সমাজে আদিম ধর্মীয় ধারণা টোটেমবাদের প্রচলন ছিল বলে মনে করা হয়। তারা প্রাকৃতিক শক্তিকে ভয় পেত। দ্রাবিড়রা মাতৃকাদেবীসহ বিভিন্ন দেবীর এবং বৃক্ষ ও বিভিন্ন পশুর পূজা করত বলে ধারণা করা হয়।

শান্তিপ্রিয় দ্রাবিড়রা অস্ত্রধারী আর্যদের প্রতিরোধ করতে পারেনি। ক্রমে তারা পেছনে হটেছিল। এভাবে তারা দাক্ষিণাত্য ও ভারতের সর্ব দক্ষিণে সরে গিয়েছিল। এই অঞ্চলগুলোতে দ্রাবিড় সংস্কৃতি অনেককাল পর্যন্ত টিকে ছিল। কালের পরিক্রমায় আর্য সংস্কৃতির সঙ্গে মিশ্রণ ঘটেছিল দ্রাবিড় সংস্কৃতির। তবে প্রাচীন সমাজে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই দুই সংস্কৃতির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যও ছিল। যেমন আর্যসমাজ বহুবর্ণে বিভক্ত ছিল (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) কিন্তু দ্রাবিড়সমাজে বর্ণভেদের কোনো অস্তিত্বের প্রমাণ মেলেনি। দ্রাবিড়সমাজে যে আইনের প্রচলন ছিল তাও ছিল আর্যদের চেয়ে আলাদা। দ্রাবিড়সমাজে বিয়ে হতো একই রক্তসম্পর্কের ছেলেমেয়ের মধ্যে। আর্যদের মধ্যে এমন কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। দ্রাবিড়সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক অন্যদিকে আর্যসমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক। উভয় জাতির জীবনব্যবস্থা, সামাজিক প্রথা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম ও ভাষা সবকিছুর মধ্যেই মৌলিক অনেক পার্থক্য ছিল। তাই বলা যায় দ্রাবিড় ও আর্য দুই সমাজের মূল ধারাই ছিল বিপরীতমুখি।

 

দুই

চার হাজার বছরেরও অধিক কাল আগে হিন্দুকুশ পর্বতমালার [বর্তমান আফগানিস্তান সীমান্তে অবস্থিত] গিরিপথ ধরে ঘোড়সওয়ারী এক যোদ্ধাজাতি ভারতভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১২শ’বছর ধরে ফর্সা রঙের নাক উঁচু ঘোড়সওয়ারী এই জাতি ভারতব্যাপী যে সভ্যতা গড়ে তুলেছিল তাকে আর্য-সভ্যতা নামে অভিহিত করা হয়। কেননা ওই জাতির নাম ছিল আর্য-জাতি। আর্যদের আগমনের আগে ভারত ভূ-খণ্ডে যে জাতি বাস করত তাদের দ্রাবিড় জাতি বলে গবেষকগণ চিহ্নিত করেছেন। আর্যরা যে সভ্যতা গড়ে তুলেছিল তার প্রধান অবলম্বন ছিল তাদের রচিত প্রধান ধর্মগ্রন্থ ‘বেদ’ [বেদ চারটি : ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ]। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘বেদ’র মধ্য দিয়েই আর্য সভ্যতা বিশাল ভারত উপমহাদেশে ছাড়িয়ে পড়েছিল বিধায় আর্য সভ্যতাকে বৈদিক-সভ্যতা নামেও অভিহিত করা হয়। বেশিরভাগ প্রতœতাত্তি¡ক, ঐতিহাসিক ও নৃতত্ত¡বিদগণ মনে করেন, আর্যরা ইউরোপ থেকে মধ্যএশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সমভূমি অঞ্চল থেকে বর্তমান আফগানিস্তান পাড়ি দিয়ে সে-কালে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল। আর্যদের সৃষ্ট বৈদিক ভাষা বা প্রাচীন সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষার আশ্চর্য মিল রয়েছে। এই জন্য এই ভাষাকে ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। আর্যদের আগমনের আগে বর্তমান ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল আরো প্রাচীন সভ্যতা। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো নামে দুটি সভ্যতার প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। ধারণা করা হয়Ñ এই সিন্ধু সভ্যতাই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা।

১৯২২-২৩ সাল নাগাদ ভারতীয় প্রতœতাত্তি¡ক রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় অধুনা পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলার মহেঞ্জোদারো এলাকায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতাটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। তার কিছুদিন আগে মহেঞ্জোদারোর কয়েক শ’ মাইল উত্তরে আধুনিক পাঞ্জাবের মন্টেগোমারি জেলার হরপ্পায় একটি প্রাচীন শহরের চার-পাঁচটি স্তরবিশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা হয়েছে। এরপর অধুনা ভারতের রাজস্থানের কালিবঙ্গান, চণ্ডিগড়ের কাছে রূপারে, গুজরাটের আমেদাবাদের কাছে লোথালে, গুজরাটেরই কচ্ছ জেলার ধোলাবীরায়, হরিয়ানার হিসার জেলায় বনোয়ালিতে, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের কোটদিজি ও চানহুদারো-তে এবং পাকিস্তান-ইরান সীমান্তের কাছে বালুচিস্তান প্রদেশের সুতকাজেনদোরেও একইরকম শহরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্তি¡কেরা মনে করেন, সুদূর অতীতে এইসব শহর একটি স্বতন্ত্র সভ্যতার অন্তর্গত ছিল। এই সভ্যতাই ‘সিন্ধু-সভ্যতা’ নামে অভিহিত। মেসোপটেমিয়ান সাহিত্যে যার নাম সম্ভবত ‘মেলুুহা’। ঐতিহাসিকেরা একে ‘সিন্ধু-সরস্বতী’ সভ্যতাও বলে থাকেন। এই সভ্যতা ছিল তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা। কারণ, লোহার ব্যবহার এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অজ্ঞাতই ছিল। এই সভ্যতার সময়কাল ধরা হয় ৫৫০০-১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে সিন্ধু-সভ্যতা ছিল প্রাচীন পৃথিবীর বৃহত্তম সভ্যতা। এখন একথা প্রমাণিত যে, সিন্ধু-সভ্যতা কেবল সিন্ধু উপত্যকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঐতিহাসিকেরা হরপ্পা-ঘগ্গর-কালিবঙ্গান-মহেঞ্জোদারো অঞ্চলটিকেই এই সভ্যতার কেন্দ্রস্থল বলে মনে করেন। কারণ, হরপ্পার প্রধান বসতিগুলো এই অঞ্চলেই পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল গোটা সিন্ধুপ্রদেশ, বালুচিস্তান, প্রায় সমগ্র পাঞ্জাব অঞ্চল, উত্তর রাজস্থান, জম্বু ও কাশ্মীর এবং গুজরাটের কাঠিয়াওয়ার ও সৌরাষ্ট্র অঞ্চল জুড়ে।

মনে রাখতে হবে, সেইসময় সিন্ধুপ্রদেশ ও রাজস্থান আজকের মতো মরুময় ছিল না ; উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহাওয়াও ছিল যথেষ্ট আর্দ্র। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত সিন্ধু-সভ্যতার পশ্চিমসীমা ছিল বালুচিস্তানের সুতকাজেনদোর, পূর্বসীমা ছিল উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর, দক্ষিণসীমা ছিল মহারাষ্ট্রের আমেদনগর জেলার দাইমাবাদ এবং উত্তরসীমা ছিল জম্বু ও কাশ্মীরের আখনুর জেলার মান্দা পর্যন্ত। সিন্ধু ও সরস্বতী* নদীর উপত্যকায় সিন্ধু-সভ্যতার বসতি অঞ্চলগুলো প্রায় ১২,৫০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ভৌগোলিক আয়তনের বিচারে এই সভ্যতা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা থেকে ২০ গুণ এবং প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মিলিত এলাকার তুলনায় ১২ গুণ বড়ো ছিল।

তিন

সিন্ধু-সভ্যতার পতনের পর অত্যন্ত ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বৈদিক বা আর্য সভ্যতা। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১৫০০ অব্দ থেকে যে জাতিটি ভারতের ইতিহাসে প্রবেশ করে এরাই আর্য** [Arya] জাতি নামে পরিচিত। আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বা সংস্কৃতির ধারক হলো ‘বেদ’। ‘বেদ’র মধ্যদিয়েই আর্যদের সংস্কৃতি ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে ‘বেদ’র নামানুসারে এই সভ্যতাকে বৈদিক-সভ্যতাও বলা হয়।

ভারতভূমিতে আর্যদের আগমনকাল এবং তাদের আদিনিবাস সম্পর্কে ঐতিহাসিক, ভাষাবিদ ও প্রতœতাত্তি¡কদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, আর্যরা বহিরাগত নয়, তারা ভারতের অধিবাসী। কিন্তু চূড়ান্ত বিবেচনায় এই মত ধোপে টেকে না। বেশির ভাগ গবেষক মনে করেন, প্রাচীন ভারতে আর্যদের আগমন ঘটেছিল ইউরোপ থেকে মধ্যএশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সমভূমি অঞ্চল থেকে। ভারতে আর্যদের আগমন ও অভিযান চলতে থাকে ধীরে ধীরেÑ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। প্রথম দিকে আর্যবসতি গড়ে উঠেছিল পূর্ব-পাঞ্জাব এবং শতদ্রæ ও যমুনা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে। এই অঞ্চলই ইতিহাসে ‘আর্যাবর্ত’ নামে পরিচিত।

আর্যদের আদি বাসস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক গবেষক ও ইতিহাসবিদেরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, আর্যরা আদি ভারতীয় নয়Ñ বহিরাগত, আর্যরা কবে ভারতে প্রবশ করেছিল তা নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন জার্মান পণ্ডিত ফ্রেড্রিক ম্যাক্স মুলার [Friedrich Max Muller (১৮২৩-১৯০৯) A.D.] এ প্রসঙ্গে আমরা এ কে এম শাহনাওয়াজ-এর ‘ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ’ গ্রন্থ থেকে অংশবিশেষ উদ্ধৃত করতে পারি :

তিনি [ম্যাক্স মুলার] একটি গণনা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন যাকে বলা হয় Date reckon backward বা পেছন দিকে গণনার পদ্ধতি। এর মূল কথা হচ্ছে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে শুরু করে পেছনের দিকে গুনে যাওয়া এবং এভাবে প্রাচীন কোনো ঘটনার সময় নির্ধারণ করা। ‘ম্যাক্স মুলার’ এ পদ্ধতির গবেষণা করতে গিয়ে বৈদিক সাহিত্যসমূহকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি এ-সব সাহিত্যের ভাষাগত, ভাবগত ক্রমবিবর্তনের দিকে লক্ষ দেন। এভাবে তিনি বৈদিক সাহিত্যকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেন। প্রথম পর্যায়ে রচিত হয় ঋগ্বেদ এবং তার পরে সাম, যজু ও অথর্ববেদ। দ্বিতীয় পর্যায়ে রচিত হয় ‘ব্রাহ্মণ’। আর শেষ পর্যায়ের রচনা ছিল ‘উপনিষদ’। ম্যাক্স মুলার উপনিষদের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের আদি রূপের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। এ কারণে তিনি মন্তব্য করতে পেরেছেন যে, উপনিষদের বিন্যাস ঘটানো হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। ১০৮টি উপনিষদ তৈরিতে সময় লেগেছিল কমপক্ষে দু’শো বছর। সে-কারণে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে শুরু হয় উপনিষদের গঠন এবং তা শেষ হয় খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে।

এই গণনা পদ্ধতির পথ ধরে ম্যাক্স মুলারের পক্ষে মন্তব্য করা সম্ভব হয়েছে যে, ঋগ্বেদের গঠনকাল ছিল ১৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। ম্যাক্স মুলারের এ সিদ্ধান্ত বিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তুরস্কের বোঘাজকুই [Boghajkay] অঞ্চলে পাওয়া যায় একটি শিলালিপি। এটি ছিল দুই রাজার সন্ধিচুক্তি। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। চুক্তির সাক্ষী হিসাবে চার জন দেবতার নাম লেখা হয়েছে। এঁদের দু’জন হচ্ছেন ইন্দ্র ও বরুণ। ঋগ্বেদ থেকে জানা যায় ইন্দ্র ও বরুণ বৈদিক আর্যদের দেবতা। ম্যাক্স মুলারের বক্তব্যের সমর্থনে এই শিলালিপি ভাষ্য থেকেও মনে করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের দিকে ঋগ্বেদের বিন্যাস ঘটানো হয়েছিল। ফলে আর্যদের ভারতে আগমন এরও শতাধিক বৎসর পূর্বে ঘটে থাকবে।

কোনো কোনো গবেষক মনে করেন ভারতে আর্যদের আগমন ঘটেছিল ইরান থেকে। ভারতে আর্যদের আগমন ও অভিযান চলতে থাকে ধীরে ধীরেÑশতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এই গোত্রের গবেষকগণ মনে করেন ভারতে আর্যদের আগমনের সূচনা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে।

 

আর্যদের আদি নিবাস সম্পর্কেও এ কে এম শাহনাওয়াজ-এর মন্তব্য স্মরণযোগ্য :

পোল্যান্ড থেকে মধ্য-এশিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ শুষ্ক ও তৃণময় প্রান্তরে আধা যাযাবর এক গোষ্ঠী বসবাস করত। এই জাতির গড়ন ছিল লম্বা, নাক ছিল উন্নত, গায়ের রঙ ফর্সা আর মাথা লম্বাটে। তারা ঘোড়াকে বশ মানায় এবং চাকাওয়ালা রথ ব্যবহার করত। তারা প্রধানত মেষ পালন করত। সামান্য কৃষিকাজেও অভ্যস্ত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দের প্রথম দিকে জনসংখ্যা প্রচুর বৃদ্ধি পায় আর খরায় গোচারণভূমির ঘাস পুড়ে যায়। ফলে বাঁচার তাগিদে এসমস্ত অঞ্চলের লোকেরা স্থান ত্যাগ করতে থাকে। দলবদ্ধভাবে তারা সরে যেতে থাকে পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে। তারা যে সমস্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে সেখানে শুরু হয় পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থা। তাদের উপাসনায় স্থান পায় আকাশের দেবতা, ঘোড়া ও রথ। এই গোষ্ঠীর একটি শাখা চলে যায় ইউরোপে ; এরাই হলো গ্রিক, ল্যাটিন কেলট এবং টিউটন জনগোষ্ঠীর পূর্ব-পুরুষ। অন্য একটি অংশ চলে যায় আনাতোলিয়া [Anatolia] অঞ্চলে। স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে মিলে এরা গড়ে তোলে হিট্টাইটদের বিশাল সাম্রাজ্য। এদেরই একটি শাখা পুরনো বাসস্থানেই রয়ে যায়। এরাই পরবর্তীকালে বাল্টিক [Baltic] ও ¯øাভোনিক [Slavonic] জাতিগোষ্ঠীর পূর্ব-পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হয়। একটি শাখা চলে যায় দক্ষিণ দিকে ককেশাস এবং ইরানের সমতল মালভূমির দিকে। যে ক্যাসাইটস [Kassites] বংশ ব্যাবিলন দখল করেছিল এরা এই শাখারই লোক। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে উত্তর-পূর্ব সিরিয়াতে মিতান্নি [Mitanni] নামের একটি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এদের দেবতাদের সঙ্গে বৈদিক দেবতাদের মিল রয়েছে। যেমন : ইন্দর [Indra] অর্থাৎ ইন্দ্র, উরুভন [Uruvna] অর্থাৎ বৈদিক দেবতা বরুণ। [ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ]

বৈদিকসাহিত্য ও প্রতœতত্ত¡ বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, আর্যদের ভারতে আগমনের একাধিক কারণ ছিলÑ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আর্যরা নিজেদের আদি বাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। ঋগ্বেদের বর্ণনায় আর্যদের বসতি স্থাপনকারী অঞ্চলের কয়েকটি নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি কাবুলের কাছে ‘কুভা’ নদী, একটি র্করম অঞ্চলে ‘ক্রুমু’ নদী এবং আরেকটি গোমাল অঞ্চলে ‘গোমতী’ নদী। এ থেকে গবেষকগণ ধারণা করেন, আর্যরা প্রথমে প্রাচীন কালের উত্তর-পশ্চিম ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল আফগানিস্তানে বসতি গড়ে তুলেছিল। এ অঞ্চল থেকেই পরে তারা সিন্ধু উপত্যকায় বসবাস করতে শুরু করেছিল। ঋগ্বেদে তাদের বসতি স্থাপনকারী অঞ্চলকে সপ্তসিন্ধু বা সাত নদীর দেশ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর এই সূত্র থেকে বোঝা যায় যে, আর্যরা দ্বিতীয় পর্যায়ে আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবের মধ্যবর্তী ভূ-ভাগে বাস করত। কেননা এ অঞ্চলে যে সাতটি নদীর অস্তিত্বের কথা জানা যায় সেগুলো হচ্ছে Ñ বিপাশা, রাভি, বিতস্তা [ঝিলাম], চিনাব শতদ্রæ, সরস্বতী ও দৃশদ্বতী। অনেক গবেষক মনে করেন, আর্যরা মূলত পশুপালন করত। পশুচারণভূমির সন্ধানে তারা ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল। এই যাযাবরবৃত্তির কারণে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে অবস্থানকালে তাদের জীবনব্যবস্থার কোনো প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন পাওয়া যায় নি। পাঞ্জাবের সমভূমিতেও আর্যজাতি ছড়িয়ে পড়েছিল প্রধানত পশুচারণভূমির আকর্ষণেই। বৈদিকসাহিত্য বিশ্লেষণে বোঝা যায়, ভারত ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য আর্যরা ধীরে ধীরে ‘অনার্য’ অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধের নানাবর্ণনা ঋগ্বেদে রয়েছে, যেখানে স্থানীয়দের ‘দাস’ বা ‘দস্যু’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রাহুল সাংকৃত্যায়ন মনে করেন, খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকে আর্যরা ভারতে আসতে শুরু করেছিল এবং তিনপর্যায়ের অভিযাত্রার তৃতীয় পর্যায়ে তারা গঙ্গা-যমুনার সমভূমিতে আবাস গড়ে তুলেছিল। এ-প্রসঙ্গে আমরা রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতামত স্মরণ করতে পারি :

‘ঋগ্বেদের রচনাক্ষেত্র ছিল প্রধানত কুরু, উত্তর-দক্ষিণ পাঞ্চাল দেশ অর্থাৎ বর্তমানের পশ্চিম যুক্তপ্রদেশ যা ছিল আর্যগণের ভারত আগমনের পর তৃতীয় আবাসভূমি। আর্যগণের প্রথম আবাসভূমি ছিল কাবুল ও স্বাত নদীর উপত্যকা [আফগানিস্তান]। দ্বিতীয় অস্থায়ী আবাস তারা নির্বাচন করেন সপ্তসিন্ধুতে [পাঞ্জাব], এবং তৃতীয় স্থান হলো গঙ্গা-যমুনা অধ্যুষিত উর্বর উপত্যকায়। এই আলোচনা থেকেই বোঝা যায় যে, কেন এই গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী পূতভূমি তীর্থক্ষেত্রকে আর্যাবর্ত বলা হয়।’Ñ [দর্শন-দিগদর্শন]

আর্যরা বরাবরই যোদ্ধা জাতি হিসেবে পরিচিত। ঘোড়সওয়ার আর্যদের মাধ্যমেই ভারতবাসী [আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়] প্রথম ঘোড়ার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। প্রতœতাত্তি¡ক অনুসন্ধানে পাওয়া আর্যদের ব্যবহৃত লোহা ও ব্রোঞ্জের নির্মিত কুঠার, তলোয়ার, তীর-ধনুক প্রভৃতি নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, তারা লোহার ব্যবহার শিখেছিল। আর্য-পূর্ব স্থানীয় অধিবাসীদের পরাজিত করার পর নিজেদের ভেতর অন্তর্কলহ শুরু হয়ে যায় বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নৈরাজ্য চলতে থাকে। এ প্রসঙ্গে এ কে এম শাহনাওয়াজ-এর মন্তব্য স্মরণযোগ্য :

বৈদিক সাহিত্যসূত্র থেকে জানা যায় শুরুর দিকে ভারতে প্রবেশকারী আর্যরা পাঁচটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত লেগেই থাকত। এ সময় কোনো কোনো গোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ দ্ব›েদ্ব অনার্যদের সহায়তা নিত। এই পাঁচ গোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান গোষ্ঠীর নাম ছিল ‘ভরত’। অনেকের মতে এ নাম থেকেই ‘ভারতবর্ষ’ নামটির সৃষ্টি হয়েছে। ভরত গোষ্ঠীর প্রধানের নাম ছিল ‘দিবোদাস’। তাঁর পুত্র সুদাস ‘পুরু’ নামে অন্য এক আর্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এ যুদ্ধে তাঁদের সাহায্য করেছিলেন স্থানীয় অধিবাসীরা। ‘দশরাজার যুদ্ধে’ জয়লাভের খ্যাতি ছিল সুদাসের, পুরাণে উলি­খিত ‘কুরু’ জাতির সৃষ্টি হয়েছিল ভরত ও পুরু গোষ্ঠীর একত্রিত রূপ থেকে। মূলত আর্যরা সপ্তসিন্ধু অঞ্চল থেকে তৃতীয় পর্যায়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। পরবর্তী বৈদিক যুগে এরা গঙ্গা ও যমুনার উপত্যকায় বসতি বিস্তার করে। এর পর তারা এগিয়ে যায় অযোধ্যার দিকে। সরযু নদীর তীরে বসতি স্থাপন করে। ‘মধ্যদেশ’ বলে চিহ্নিত একটি অঞ্চলেও আর্যবসতি গড়ে উঠেছিল। এর অবস্থান পূর্ব পাঞ্জাবের সরস্বতী নদী থেকে এলাহাবাদের মধ্যবর্তী অঞ্চলের মধ্যে ছিল বলে মনে করা হয়।Ñ [ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ]

ধীরে ধীরে আর্যরা মধ্যাঞ্চল ত্যাগ করে আরো পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। ক্রমান্বয়ে তারা বারাণসী, বিহার, বাংলা প্রভৃতি অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। বৈদিকযুগে এ অঞ্চলগুলোকে বলা হতো ‘প্রাচী’ দেশ। এসব অঞ্চলের স্থানীয় শক্তিশালী দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন আর্যদের প্রবেশ ঠেকাতে পেরেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ও উন্নত অস্ত্রের ধারক আর্যদের হাতে তাদের পরাজয় ঘটেছিল। তবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত আর্যরা ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বে অবস্থিত আসাম রাজ্য অধিকার করতে পারেনি বলে গবেষকগণ মনে করেন।

আর্যদের আরেকটি ধারা মধ্য প্রদেশের পশ্চিমে অবস্থিত মালব, সৌরাষ্ট্র, গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। ফলে পর্যায়ক্রমে আর্য-পূর্ব মানবগোষ্ঠী আর্যদের সৃষ্ট সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। সে-যুগে এ অঞ্চলকে বলা হতো ‘প্রতীচ্য’ বা ‘পাশ্চাত্য’ দেশ। কয়েক শতাব্দীর নিরলস যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পরিশ্রমের পর আর্যরা উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত এবং পূর্বে বঙ্গোপসাগর থেকে পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। আর আর্য-অধ্যুষিত ভূখণ্ডের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘আর্যাবত’ অর্থাৎ আর্যদের বাসস্থান।

শুরুর দিকে উত্তর ভারতে যুদ্ধজয়ের মধ্যদিয়ে আর্যরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হলেও দক্ষিণ-ভারতে কিন্তু আর্য-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক পরে। এ কে এম শাহনাওয়াজ-এর মতে :

দুটো কারণে দক্ষিণ ভারতে আর্যরা বিলম্বে প্রবেশ করেছে। প্রথমত, ছোটনাগপুর ও মধ্য প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ের বাধা অতিক্রম করা সহজ ছিল না, দ্বিতীয়ত, দ্রাবিড় জাতির কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করাটাও খুব সুবিধাজনক হবে বলে আর্যরা বিবেচনা করেনি। রামায়ণ ও মহাভারতের সূত্র থেকে জানা যায়, পববর্তী  বৈদিক যুগে আর্য ঋষিদের প্রভাবে দক্ষিণ ভারতে আর্য আগমন সহজ হয়েছিল। এই ঋষিরাই দক্ষিণ ভারতে আর্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেন। মহাকাব্যের বর্ণনা অনুযায়ী রামচন্দ্র দক্ষিণ ভারতের বনে অর্থাৎ বিন্ধ্য পর্বতে বনবাসী হয়েছিলেন। সেখানে তাঁর দেখা হয়েছিল আর্য মুনি ‘অগস্ত্যর’ সঙ্গে। এভাবেই ধীরে ধীরে দক্ষিণ ভারতে আর্য প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। [ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ]

আর্যদের জীবনধারা কেমন ছিল সে-সম্পর্কে বৈদিকসাহিত্যে অনেক তথ্য রয়েছে। ঋগ্বেদের শ্লোকগুলো যখন রচিত হয় [খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দের মধ্যে] তখন আর্য সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল যমুনা ও শতদ্রæ নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল, আধুনিক আম্বালার দক্ষিণে এবং প্রাচীন সরস্বতী নদীর উচ্চপ্রবাহ অঞ্চলে। বৈদিক মুনিগণ হিমালয় পর্বতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কিন্তু যমুনা নদীর [আধুনিক দিল্লি-আগ্রায় যমুনা] দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না। এমন কি ভারত ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী বিন্ধ্য পর্বতের উল্লেখও তাদের রচনায় পাওয়া যায় না। এ থেকে মনে করা হয়, ঋগ্বেদের যুগে আর্যরা ভারতের আর্য-পূর্ব অধিবাসীদের [দ্রাবিড়] সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করতে পারেনি। ঋগ্বেদের বহু শ্লোকে বিভিন্ন আর্যগোষ্ঠীর মধ্যে দ্ব›েদ্বর উল্লেখ পাওয়া যায়। তা সত্তে¡ও তারা ভারতের আদি অধিবাসীদের বিরুদ্ধে একত্রে লড়াই করেছে। এই আদি অধিবাসীদের বলা হতো ‘দাস’ বা ‘দস্যু’। বৈদিকসাহিত্যে ‘অনার্যদের’ কালো বর্ণের মানুষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই ‘অনার্য’ বা দ্রাবিড়গোষ্ঠী মাতৃকাপূজা করত এবং তাদের পুরুষ দেবতা ছিল ‘শিব’।

প্রাচীনকালে উত্তর-ভারতে বসবাসকারী এই আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়রাই পূর্ববর্তী সিন্ধু-সভ্যতা গড়ে তুলেছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন। তাদের সিদ্ধান্ত : ‘দ্রাবিড়ভাষা জাতিই সিন্ধু-সভ্যতার প্রকৃত স্রষ্টা। আর্য-পূর্ব যুগে উপমহাদেশে দ্রাবিড়দেরই আধিপত্য ছিল। সিন্ধু-সভ্যতার মুখ্য অঞ্চল উত্তর-পশ্চিম ভারতও তাদের অধিকারভুক্ত ছিল।’ এ-বক্তব্যের জীবন্ত সাক্ষ্য বর্তমানেও রয়েছে। বেলুচিস্তানের পাহাড়ি ব্রাহইস (ইৎধযঁরং) উপজাতিরা এখনও দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে এবং দ্রাবিড়দের আদিভূমি দক্ষিণ-ভারতের মানুষদের দেহগত নৃ-তাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সিন্ধু-সভ্যতার আদিবাসীদের মিল খুঁজে পাওয়া-গেছে। সিন্ধুবাসীদের ধর্মীয় আচরণের সঙ্গে দক্ষিণ-ভারতীয় দ্রাবিড় সংস্কৃতির মিল পাওয়া গেছে। উভয় সংস্কৃতির মানুষ শৈব ও শাক্ত ধর্মের অনুরাগী ছিল। উভয়ের মধ্যেই ছিল লিঙ্গ পূজার প্রচলন। সিন্ধু-সভ্যতার মানুষের ভাষার সঙ্গে দ্রাবিড় ভাষারও মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। আর্যরা ‘অনার্য’দের পরাজিত করেছিল বলে ঋগ্বেদে উল্লেখ আছে। এই ‘অনার্যরা’ই হচ্ছে দ্রাবিড়। আর্য-পূর্ব ভারত ভূখণ্ডের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুণ্ডা ও দ্রাবিড়দের অবস্থানের কথা নিশ্চিত করেছেন ইতিহাসবিদগণ। পূর্বোক্ত কারণসমূহ একত্র করলে একথা প্রতীয়মান হয় যে, দ্রাবিড়রাই সিন্ধু-সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। আর্য আগমনের আগে ভারতীয় সমাজে বর্ণভেদ বা শ্রেণিবৈষম্য ছিল না বলে ধারণা করা হয়। দ্রাবিড়দের সমাজ ছিল কৃষিভিত্তিক সাম্যসমাজ। তারা ছিল নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দ্রাবিড়রা ছোট ছোট গোত্রে বিভক্ত হয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সে-সমাজে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত ছিল অত্যন্ত মজবুত।

এক ধরনের জাতিবিভাজন নিয়েই আর্যজাতি ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল। ঋগ্বেদের প্রথম দিকের শ্লোকে ‘ক্ষত্র’ বা অভিজাত এবং ‘বিশ’ বা সাধারণ মানুষ এই দুই শ্রেণির অস্তিত্বের কথা পাওয়া যায়। আর্যরা ছিল গৌড় বর্ণ। ভারতে অনুপ্রবেশ করে স্থানীয় কালো মানুষদের পাশাপাশি বসবাস করতে গিয়ে সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার ব্যাপারে। ফলে তারা খুব সচেতনভাবে সতর্কতার সঙ্গে সামাজিক শ্রেণিবিভাজন সৃষ্টি করতে থাকে। বিজেতা আর্যরা পরাজিত ‘অনার্য’দের স্থান দিয়েছিল সমাজের প্রান্তিক সীমানায়। যে-সব আর্য ‘অনার্য’ নারীকে বিয়ে করে তাদের জীবনপ্রণালি গ্রহণ করেছিল তাদেরও নেমে যেতে হয়েছিল সমাজের নিম্নস্তরে। অন্যদিকে ধর্মীয় যাগযজ্ঞের পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল পুরহিতগণ। সমাজের উচ্চতম স্থান দখল করে তারাই হয়ে উঠেছিল সমাজপতি ও ধর্মগুরু। পরবর্তীকালে এরাই ব্রাহ্মণ হয়ে সমাজ নিয়ন্ত্রণের অধিকার ভোগ করেছিল।

 

চার

আর্যসমাজ ও রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি ছিল পরিবার। পরিবারগুলো ছিল পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি হতেন পরিবার প্রধান। আর্যরা পরিবারকে বলত ‘কুল’। আর পরিবার প্রধানকে বলত ‘কুলপা’। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হতো বৈদিক গ্রাম। ঋগ্বৈদিক যুগে ঘর-বাড়িগুলো ছিল মাটি বাঁশ ও কাঠের তৈরি, চালা ছিল শন বা খড়ের। যতটা নিদর্শন পাওয়া গেছে, তাতে বোঝা যায়, প্রতিবাড়িতে ছিল রান্নাঘর, বৈঠকখানা ও মেয়েদের জন্য আলাদা কক্ষ। সংসার পরিচালনার নেতৃত্ব ছিল মেয়েদের হাতে। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলে তাদের স্বামীর অধীনেই থাকতে হয়েছিল। একজন পুরুষের একজন স্ত্রীÑ এটাই ছিল ঋগ্বৈদিক যুগের রীতি। সমাজে পণপ্রথা ও কন্যাপণপ্রথা উভয়ই প্রচলিত ছিল। সাধারণত স্বামীর মৃত্যুর পর তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বিধবা নারীর বিয়ে হতো।

‘সোম’ [একপ্রকার লতাগাছের রস] ও ‘সুরা’ ছিল আর্যদের প্রিয় পানীয়। যাগযজ্ঞের সময় ‘সোমরস’ পান করার রীতির প্রচলন ছিল। গান নাচ ও জুয়া খেলা ছিল আর্যদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। ধারণা করা হয়, আর্যসমাজে পেশাদার নর্তকীও ছিল। ঋগ্বৈদিক যুগে আর্য-নারী ও পুরুষ প্রায় একইরকম পোশাক পরত। সাধারণত পোশাকের দুটি অংশ ছিল। ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশকের নাম ছিল ‘অধিবাস’ এবং নিম্নাঙ্গেরটির নাম ছিল ‘বাস’। পরবর্তী ‘বেদ’***গুলোতে ভেতরে পরার আরেকটি পোশাকের উল্লেখ পাওয়া যায়। যার নাম ‘নীবি’। এছাড়াও ‘দ্রাপী’ নামে এক ধরনের আলখেল্লার কথা জানা যায়Ñ যেটি পরতে হতো মাথায় আচ্ছাদনসহ। সুতি ও পশমিÑ দু’ধরনের কাপড় দিয়েই পোশাক তৈরি করা হতো। পোশাকগুলো কারুকাজ খচিত থাকত। পুরুষেরা কানে এক ধরনের গয়না পরত যাকে বলা হতো ‘কর্ণশোভন’। গলার মালায় মণিপাথর ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। গলায় পরা অলঙ্কারকে বলা হতো ‘নিষ্ক’। নারীরা মাথায় যে অলঙ্কার পরত তার নাম ছিল ‘কুরীর’।

আর্যরা মূলত পশুপালনকারী জাতি হলেও ভারতে অনুপ্রবেশের পর তারা ধীরে ধীরে কৃষিকাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কৃষির প্রয়োজনে কৃষকেরা গরুর সংখ্যা বাড়াতে চাইত। প্রাচীনকালে ‘গো-ধন’ বলে একটি কথা প্রচলিত ছিল। ‘ধন’ মানে অর্থ-কড়ি বা টাকা-পয়সা হিসেবে গরুকে বিবেচনা করা হতো। অর্থাৎ মুদ্রা প্রচলনের আগে গরুই ছিল আর্যদের বিনিময়ের মাধ্যম। পুরোহিতগণ পূজা-অর্চনা করে নাজরানা হিসেবেও গরুই পেতেন। যোদ্ধাদের কাছে সবচেয়ে লোভনীয় ছিল পরাজিতদের গরু লুঠ করা। প্রথম দিকে আর্যরা গরুকে পবিত্র বা দেবতা জ্ঞান করত না। তারা খাদ্যের প্রয়োজনে ষাঁড় ও গাভী হত্যা করত। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান বা উপলক্ষ ঘটলেই কেবল মাংস খাওয়ার রীতি ছিল। গো-নিধন নিষিদ্ধ না থাকলেও ভেড়া ও ছাগলের মাংস তাদের বেশি প্রিয় ছিল। ঋগ্বেদের তথ্যানুসারে দুধ ও দুধ থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্য বিশেষ করে ঘি ও মাখন আর্যদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে-যুগে প্রথম দিকে যব এবং পরে ধান ও গম প্রভৃতি শস্যের চাষাবাদ হতো বলে ধারণা করা হয়। ময়দার সঙ্গে দুধ অথবা মাখন মিশিয়ে তৈরি পিঠা আর্যদের প্রিয় খাবার ছিল। তরিতরকারি ও নানারকম ফলমূলও থাকত তাদের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায়। দিনে দিনে গরুর অর্থমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একপর্যায়ে আর্যসমাজে গরু নিধন নিষিদ্ধ হলো। গরুর প্রতি ভক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকল। এভাবেই ঋগ্বৈদিক যুগের পরবর্তী বৈদিক সমাজে গরুকে পবিত্র জ্ঞান করে পূজা করার রীতি শুরু হয়ে গেল।

জাতিভেদ প্রথার প্রচলন ঘটেছিল আর্যসমাজে। এ-প্রসঙ্গে ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত ‘পুরুষ’ সুক্তের কথাও উল্লেখ করা যায়। এই অধ্যায়ে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চার জাতির উৎপত্তির কাহিনি বলা হয়েছেÑ ‘আদি পুরুষ ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য এবং পদযুগল থেকে সৃষ্টি হয়েছে শূদ্র।’ ‘পুরুষ’ সুক্তের এ বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়, এই চারজাতির মধ্যদিয়ে ঋগ্বৈদিকযুগেই আর্যসমাজে জাতিভেদ প্রথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের ধর্মীয় প্রভাবে ঋগ্বৈদিকযুগে আর্যরাও ধীরে ধীরে ধর্মের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। ধর্মীয় অনুুষ্ঠানে আর্যরা দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে বলিদান করত। আর্যরা মূর্তিপূজা আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের কাছেই শিখেছিল। দেবতার উদ্দেশ্যে তারা নৈবেদ্য হিসেবে নিবেদন করত দুধ, শস্য ও ঘি। তারা পূজা অর্চনা বা যাগযজ্ঞ করত জাগতিক জীবনের সুখের আশাতেই। তাদের প্রার্থনা ছিল সন্তান লাভ, গো-ধন লাভ অথবা শত্রæ নিধন। প্রথম দিকে মৃতদেহ কবর দেওয়ার প্রথা ছিল। পরে কবর ও দাহ দুটোই করা হতো। আগুনকে পবিত্র ও শক্তিধর মনে করা হতো বলেই মৃতদেহ পোড়ানোর রীতি চালু হয়েছিল। আর এভাবেই এক সময় হিন্দু ধর্মে মৃতদেহ পোড়ানোর প্রথা চালু হলো।

 

পাঁচ

সিন্ধু-সভ্যতার পতনের ফলে ভারতে নগর-সভ্যতায় সাময়িক ছেদ পড়েছিল। ঋগ্বৈদিকযুগে উদ্ভব ঘটেছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির। ঋগ্বেদের বিভিন্ন সূত্র থেকে সে-যুগের সমাজ ধর্ম ও অর্থনীতির অনেক তথ্য ও ছবি পাওয়া যায়। সে-যুগে কৃষি-অর্থনীতি পরিপূর্ণ রূপে বিকশিত না-হলেও আর্যদের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর।

ঋগ্বৈদিকযুগে জমির মালিকানা প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একদল মনে করেন সে-যুগে জমির মালিকানা ছিল না। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে এর মালিকানা বণ্টনেরও প্রয়োজন ছিল না। অন্যদল মনে করেন, চাষযোগ্য বা বসতি স্থাপনযোগ্য উভয় জমিতেই ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত ছিল। পশু চারণের জমিগুলো সর্বসাধারণের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। কোনো কোনো গবেষক আবার মনে করেন, জমি ছিল ব্যক্তি এবং পরিবারের সম্পত্তি। আবার কারো মতে ঋগ্বৈদিকযুগের প্রথম দিকে জমির মালিকানা ছিল গ্রামের নিয়ন্ত্রণে। পরবর্তীসময়ে তা পরিবারগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল। আর এইভাবেই সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটেছিল।

ঋগ্বেদে জমি চাষ সম্বন্ধে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। চাষ করা জমিকে বলা হতো ‘ক্ষেত্র’ বা ‘উর্বরা’। অকর্ষিত ভূমি ‘অকৃষিবল’ নামে পরিচিত ছিল। ঋগ্বেদে জমিচাষে লাঙ্গলের ব্যবহারের কথা উল্লিখিত আছে। ষাঁড় বা বলদ দিয়ে লাঙ্গল টানা হতো।

ঋগ্বৈদিক যুগে তামার ব্যবহার ছিল। কিন্তু লোহার ব্যবহারের তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না। সম্ভবত লাঙ্গলের ফলায় কাঠ ব্যবহার করা হতো। লাঙলের কাঠের ফলার সাহায্যে সোজা ও সমান্তরালভাবে চাষ করা সম্ভব ছিল। এভাবে কর্ষণের ফলে জমিতে যে দাগ সৃষ্টি হতো তার নাম ছিল ‘সীতা’। সে যুগে উৎপাদিত শষ্যের মধ্যে যবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদে কৃষি উপকরণ হিসেবে ‘দাত্র’ শব্দটির উল্লেখ আছে। দাত্রের সাহায্যে ফসল কাটা হতো বলে গবেষকগণ একে ‘কাস্তে’ বলে শনাক্ত করেছেন। কৃষি উপকরণ হিসেবে ‘খনিত্র’ নামে এক প্রকার যন্ত্রের উল্লেখ আছে। এটি দিয়ে মাটি খোঁড়া হতো। চাষের কাজে নিয়োজিত কৃষককে বলা হতো ‘কৃষ্টি’। ঋগ্বেদ থেকে জমিতে জলসেচ ও সার প্রয়োগের কথাও জানা যায়। যদিও ঋগ্বেদে ধান বা গমচাষ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ নেই তবু গবেষকগণ মনে করেন, ঋগ্বৈদিকযুগের শেষ দিকে হয়ত ধান ও গম চাষ শিখেছিল তারা।

যদিও অনেকে ঋগ্বৈদিকযুগের অর্থনীতিতে কৃষির পরে পশুপালনের স্থান নির্দিষ্ট করে থাকেন কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে দেখা যায় বৈদিকযুগ ছিল প্রধানত পশুপালনভিত্তিক অর্থনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘ÔAncient India’ গ্রন্থে ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার [Romila Thapar] বলেছেন, ‘আর্য জাতির ভারতে প্রবেশের সূচনাপর্যায়ে পশুপালনই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। পরে তারা দৃষ্টি ফেরায় কৃষিকাজের দিকে।’ গরু কীভাবে পূজনীয় হয়ে উঠেছিল সে প্রসঙ্গে আগেই বলা হয়েছে। সে-যুগে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে গরু সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। গরু যেন হারিয়ে না-যায় সে-জন্য গরুর গায়ে নানারকম চিহ্ন এঁকে দেওয়া হতো। গরুর আর্থিক মূল্য ছিল বলেই সে-যুগে বিভিন্ন আর্যগোষ্ঠী বল প্রয়োগ করে একে অন্যের গরু লুঠ করত, ব্যক্তি মানুষের আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করা হতো কার কত গরু আছে তার ওপর ভিত্তি করে। গরুর মূল্যকে সুনির্দিষ্ট একক ধরে কোনো দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। গরু ছাড়াও আর্যসমাজে ঘোড়া, ভেড়া প্রভৃতি পশু পালন করা হতো। গরুর পরে ঘোড়াই ছিল মূল্যবান পশু। কারণ রথ টানা ও যুদ্ধের জন্য ঘোড়ার ব্যবহার ছিল অনিবার্য।

রথ টানার কাজে যেহেতু ঘোড়া ব্যবহার করা হতো সেহেতু এটা অনুমান করা যায় যে, আর্যসমাজে কাঠের ব্যবহার ছিল। অর্থাৎ তারা কাঠ কেটে নানারকম জিনিস তৈরি করতে শিখেছিল। বৈদিক আর্যরা সেলাইয়ের কাজ, মাটির পাত্র তৈরি ও চামড়ার ব্যবহার শিখেছিল। আর্য-শিল্পীরা স্বর্ণ দিয়ে সুন্দর সুন্দর অলঙ্কার গড়তে সিদ্ধহস্ত ছিল।

 

ছয়

ঋগ্বৈদিকযুগে আর্যদের ধর্মবিশ্বাস ছিল অত্যন্ত প্রগাঢ়। ভারতভূমিতে এসেই তাদের মধ্যে ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছিল। এবং তারা ধর্মগ্রন্থ রচনায় মনোযোগী হয়েছিল। আর্য ঋষিগণ ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পুলকিত ও আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। প্রকৃতির সঙ্গেই মিশেছিল তাদের দেব-দেবীগণ। প্রথম দিকে আর্যদের দেবতা ছিল আকাশ এবং আকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন উপাদান। আকাশদেবতা পুরুষ সত্তা। আর্যদের প্রধান দেবতা হিসেবে পুরুষ দেবতার অবস্থানই জানা যায়। তবে পৃথ্বী, অদিতি, ঊষা রাত্রি, অরণ্যানী প্রভৃতি দেবীর কথাও রয়েছে ঋগ্বেদে। অনেক গবেষক মনে করেন, দেবীর ধারণা আর্যরা আর্য-পূর্ব দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর কাছ থেকেই পেয়েছিল। মূর্তিপূজাও তারা শিখেছিল দ্রাবিড়দের কাছ থেকেই। কেননা সামাজিক বিকাশের ক্রমধারায় ধীরে ধীরে আর্য-অনার্য মিশ্রণ তো অবিসম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। সে-কারণেই বুঝি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : ‘হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য/হেথায় দ্রাবিড় চীন-/শক-হুন-দল পাঠান মোগল/এক দেহে হলো লীন/…দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে/যাবে না ফিরে/এই ভারতের মহামানবের/সাগরতীরে।’

মনে করা হয়, পশুপালক গোষ্ঠীর ভেতর থেকে আর্যসমাজ বেরিয়ে এসেছিল বলে তাদের ধর্মে দেবতারা প্রাধান্য পেয়েছিল। ঋগ্বেদে তিন স্তরের দেবতার কথা বলা হয়েছে। এদের এক দলের অবস্থান ছিল স্বর্গলোকে। এ-দলের প্রধান দেবতারা হলেন : মিত্র, পূষা, বিষ্ণু, আদিত্যগণ, অশ্বিদ্বয় প্রমুখ। বৈদিক-পরবর্তীযুগে আমরা লক্ষ্য করি ভারতীয় ধর্মে [হিন্দু ধর্মে] বিষ্ণু প্রধান দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। এ ধারা আজও অব্যাহত আছে। আর্যদের দ্বিতীয় স্তরের দেবতারা ছিলেন আকাশচারী। এঁদের মধ্যে প্রধান দেবতারা হলেন : ইন্দ্র, বরুণ, ত্রিত, আপ্তÍ্য, মাতারিশ্বা, রুদ্র, মরুদগণ, বায়ু, পর্জন্য প্রমুখ। তৃতীয় স্তরের দেবতারা পৃথিবীতে অবস্থান করতেন। এদের মধ্যে অগ্নি, পৃথিবী এবং সোম ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন ইন্দ্র। তার পরেই ছিল বরুণের অবস্থান। পাশাপাশি বিষ্ণুর উপাসনাও করা হতো। প্রত্যেক দেবতারই বিশেষ ভক্ত ও পুরোহিত ছিল। অগ্নি দেবতার উপাসনা হতো বেশি। কেননা আর্যরা আগুনকে খুব শাক্তিশালী মনে করত। বিয়ে অনুষ্ঠানে সাক্ষী রাখা হতো অগ্নি দেবতাকে। এখনও হিন্দু সমাজে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আগুন সাক্ষী রেখে। ঋগ্বেদে মনু’র উল্লেখও পাওয়া যায়। মনুকে বলা হয়েছে আর্যদের আদিপিতা। উপনিষদ পরবর্তীকালে [গধহঁ ংসৎরঃর] বা মনুসংহিতা [গধহঁ ংধসযরঃধ] নামের গ্রন্থটিই ‘বেদ’র যথাযথ ব্যাখ্যা হিসেবে হিন্দু ধর্মের যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান এবং নিয়ম পদ্ধতির আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

ঋগ্বৈদিকযুগে ধর্মাচারে দু’ধরনের যজ্ঞের কথা জানা যায়। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত। ব্যক্তিগত যজ্ঞসমূহকে বলা হতো ‘গৃহকর্মান’। এ-যজ্ঞে গৃৃহকর্তা পরিবার পরিজনসহ বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে দেবতার সন্তুষ্টির জন্য আগুনে আহুতি দিতেন নানা ধরনের সামগ্রী। এ-সময় মন্ত্র উচ্চারণ করা হতো। সমষ্টিগত যজ্ঞ আয়োজতি হতো বিশাল পরিধিতে। পেশাদার পুরোহিতগণ দক্ষিণা নিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতেন। অনেক মানুষের জন্য ভোজের ব্যবস্থা করা হতো। এই উদ্দেশ্যে পশু বলি দেওয়া হতো। বিতরণ করা হতো সোমরস ও সুরা। এই যজ্ঞের ব্যয় সমাজের সকলে মিলে নির্বাহ করত।

ঋগ্বৈদিকযুগে আর্যদের যজ্ঞ অনুষ্ঠানসমূহের আচরণ পদ্ধতি পরীক্ষা করলে দেখা যাবে এর সঙ্গে প্রাচীন জাদু বিশ্বাসের একটা মিল পাওয়া যায়। খাদ্য সংগ্রহকারী প্রাগৈতিহাসিকযুগের মানুষের ধর্মবোধের সঙ্গে জাদু বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পশুপালক আর্যদের ধর্ম পালনেও জাদুবিশ্বাসের ভূমিকা অস্পষ্ট। ঋগ্বেদে এর প্রমাণও রয়েছে। আদিম শিকারী মানুষদের জীবনে খাদ্য হিসেবে পশুর বিশেষ ভূমিকা ছিল। তারা আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পশুর মাংস খেত। নিহত পশুগুলোর ওপর এক ধরনের পবিত্রতা আরোপ করা হতো। নিহত পশুটির চারদিকে ঘুুরে ঘুুরে নাচ-গান পরিবেশনের সঙ্গে তার মাংস খাওয়া হতো। ঋগ্বেদে অশ্বমেধযজ্ঞের যে বর্ণনা রয়েছে তার সঙ্গে শিকারী মানুষদের আচরণের মিল পাওয়া যায়। যজ্ঞের অশ্বটিকে কীভাবে নিহত করা হবে তা বলে দেওয়া আছে ঋগ্বেদে। বলা হয়েছে, অশ্বটি আদিত্য ত্রিত ও যমের উদ্দেশে বলি দেওয়ার পর সেটি স্বর্গে যাবে। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান করে নিহত পশুটিকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে হবে। ‘উখা’ নামের একটি পাত্রে নিহত পশুর মাংস রান্না করতে হবে এর এক টুকরা আগুনে আহুতি দেওয়া হবে। পরে সকলে মিলে বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি উচ্চারণ করে মাংস খেতে শুরু করবে।

ঋগ্বৈদিকযুগের ধর্মে আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়া একটি অন্যতম যজ্ঞ ছিল। আর্যরা দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই ঘৃতাহুতির আয়োজন করত। পারিবারিক দেবতাদের উদ্দেশেও ঘৃতাহুতি দেওয়ার নিয়ম ছিল। কখনো কখনো উপাজাতীয় রাজারা বড়ো বড়ো যজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন পুরোহিতেরা। পুরহিত মন্ত্র উচ্চারণ করে আগুনে ঘি ঢেলে দিতেন। এ-সব যজ্ঞের আয়োজন করা হতো দেবতাদের সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, বৃষ্টি, যুদ্ধজয়, সম্পদ ও দীর্ঘজীবন লাভের আকাক্সক্ষায়।

 

সাত

ঋগ্বেদে উল্লেখিত যুদ্ধ-বিগ্রহের নানা কাহিনি থেকে আর্যদের রাষ্ট্রচিন্তা বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে অল্পবিস্তর ধারণা লাভ করা যায়। তাদের জীবন ছিল মূলত উপজাতিকেন্দ্রিক। সে-যুগের বেশ কয়েকটি উপজাতি গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়। যেমন : ভরত, যদু, সঞ্জয়, অনু, পুরু, দ্রæহুত, তুর্বস প্রমুখ। ধারণা করা যায়, বৈদিকযুগে ‘পরিবার’ থেকে রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা হয়েছিল। রক্তের সম্পর্কযুক্ত কতগুলো পরিবারের সমন্বয়ে গঠিত হতো উপজাতি। এই উপজাতি গোষ্ঠীর সার্বিক পরিচালনা পদ্ধতির মধ্যদিয়েই বিকশিত হয়েছিল আর্যদের রাষ্ট্রব্যবস্থা। ভারতে প্রবেশের পর পশুপালনকারী আর্যরা আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের সঙ্গে মিশে ধীরে ধীরে কৃষি-নির্ভর হয়ে পড়েছিল। কৃষির জন্য জমির প্রয়োজন হতো, সেই ভূমির অধিকার লাভ করার জন্য তারা পরিবারকেন্দ্রিক উপজাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ভূমি দখলের জন্য তাদের আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের সঙ্গেও যুদ্ধে করতে হয়েছিল। বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হওয়া প্রতিটি গোষ্ঠী পরিচালনার জন্য একজন নেতা ছিল। এই নেতা ‘রাজা’ উপাধি ধারণ করে তার অঞ্চল শাসন করতেন।

ঋগ্বেদসূত্রে ‘সুদাস’ বলে একজন রাজার কথা জানা যায়। তাঁর পিতার নাম ছিল দিবোদাস। আর্যদের অন্যতম গোষ্ঠী ভরতগোষ্ঠীর রাজা ছিলেন তিনি। বৈদিক সরস্বতী নদীর তীরে এই গোষ্ঠীর রাজ্যপাট ছিল। ঋগ্বেদ থেকে জানা যায়, সুদাস পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোকে পরাজিত করেছিলেন। এ ধরনের ক্রমাগত যুদ্ধ ঋগ্বৈদিক আর্যদের রাষ্ট্র গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক দিকে মনোযোগী হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছিল। ঋগ্বেদে ‘দশরাজা’র যুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। এই ‘দশরাজা’র অন্যতম রাজা ছিলেন সুদাস। সুদাস সম্পর্কে ঋগ্বেদ যে তথ্য দেয় তাতে জানা যায়, প্রথম দিকে বিশ্বামিত্র ছিলেন সুদাসের প্রধান পুরোহিত। তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সুদাস প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব দিয়েছিলেন বশিষ্ঠ মুনিকে। অপমানিত বিশ্বামিত্র অন্য আর্য-উপজাতীয় গোষ্ঠীর রাজাদের একত্র করে সুদাসের বিরুদ্ধে জোট গঠন করেছিলেন। তারা সম্মিলিতভাবে সুদাসের ওপর আক্রমণ করেছিল। যুদ্ধে সুদাসেরই জয় হয়েছিল। ধারণা করা হয়, এটিই ঋগ্বেদে উল্লেখিতÑ ‘দশরাজা’র যুদ্ধ। এ থেকে এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, আর্যযুগে উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো পরস্পর দ্ব›দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থাকত। আর এভাবে শক্তিমান গোষ্ঠীগুলোর অন্যরাজ্য দখল করার মধ্যদিয়ে গড়ে উঠেছিল বড়ো বড়ো সাম্রাজ্য। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই দীর্ঘ-কাল-পরিসরে সে-কালের সমাজ ব্যবস্থায় রাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছিল। যা পরবর্তীকালে ভারতব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। পুরোহিত বিশ্বামিত্রের ক্ষুব্ধতার পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সে-যুগে ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন তো বটেই রাজনৈতিক জীবনেও পুরোহিতদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। গবেষকদের ধারণা, ভরত-উপ-জাতিদের গোষ্ঠী-নাম থেকেই পরবর্তীকালে এই বিশাল ভূখণ্ডটির নাম হয়েছিল ভারতÑ এ-কথা আগেও বলা হয়েছে। ‘দশরাজা’র যুদ্ধে সুদাসের সাফল্য প্রমাণ করে যে, ভরতগোষ্ঠীই ছিল আর্য-সভ্যতার প্রধান স্থপতি। তবে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, এই কৃতিত্ব কেবলই আর্যদের নয় ; সভ্যতা নির্মাণে আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দেরও ভূমিকা ছিল। এই দলের একজন গণিতবিদ, ইতিহাসবিদ ও পলিম্যাথ ডি ডি কোশাম্বী তাঁর ‘অহ ষধঃৎড়ফহপঃরড়হ ঃড় ঃযব ংঃধফু ড়ভ ওহফরধহ ঐরংঃড়ৎু’ গ্রন্থে এ-বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে, আর্য-সভ্যতা গড়ে তোলায় আর্যদের পাশাপাশি আর্য-পূর্ব স্থানীয়দেরও ভূমিকা ছিল। এই সভ্যতার স্থপতি সুদাস ও তার পিতা দিবোদাসের ‘দাস’ পদবি থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। কোশাম্বী মনে করেন, আর্য-আর্য-পূর্বের মিশ্রণ ঘটেছিল বলেই ‘দাস’ পদবিটি যুক্ত হয়েছিল। সে-যুগে ‘দাস’ পদবিটি সম্মানের ছিল। সুদাসের রাজ্য জয়ের মধ্য দিয়ে আর্যরা ধীরে ধীরে রাজতান্ত্রিকতায় প্রবেশ করেছিল। অবশ্য সেটিও ঘটেছিল ক্রমরূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে। এই বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা যয় এভাবে : পূর্বোক্ত দশটি গোষ্ঠীর মধ্যে ‘পুরু’ ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী। পুরুর রাজার নাম ছিল পুরুকুতসা। পরবর্তীকালে ‘পুরু’ এবং ‘ভরত’ গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘পুরু’ উপজাতি এবং তুরবশ ও ক্রিবি উপজাতি একত্র হয়ে পাঞ্চাল উপজাতি সৃষ্টি করেছিল। আবার ‘কুরু’ ‘পাঞ্চাল’ উপজাতির মিলনের ফলে এক সময় ‘কুরু-পাঞ্চাল’ উপজাতির সৃষ্টি হয়েছিল। আর এভাবে পরবর্তী বৈদিকযুগে ভারতে বড়ো রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ধারা সৃষ্টি হয়েছিল। যার ফলে উদ্ভব ঘটেছিল কাশী, বৎস, বিদেহ প্রভৃতি প্রাচীন রাজ্যের।

আর্য গোষ্ঠীগুলোর শাসনব্যবস্থায় রাজাই ছিলেন প্রধান। তবে তাঁর প্রধান মন্ত্রণাদাতা হিসেবে ছিলেন ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ। রাজার পুত্রই রাজা হতেন। এভাবে বংশানুক্রমিক ধারায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং যুগের পর যুগ বহু শতাব্দী ধরে এই নিয়ম অব্যাহত ছিল। রাজা ছিলেন সাধারণের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। প্রজাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তিনি কঠোর আইন প্রণয়ন করতেন। চুরি, ডাকাতি এবং গরু অপহরণের কারণে অপরাধীকে কঠোর সাজা দিতেন রাজা। প্রজাদের যেকোনো সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করা নিজের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করতেন তিনি। ঋগ্বেদে বহু জায়গায় ‘বলি’ শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। এ থেকে ধারণা করা হয়, রাজা প্রজাদের কাছ থেকে ‘বলি’ নামে এক ধরনের ‘দান’ বা ‘কর’ নিতেন। গবেষকদের বিচারে পণ্যের মাধ্যমে ‘বলি’ সংগ্রহ করা হতো। যুদ্ধে পরাজিত উপজাতি গোষ্ঠী বিজয়ী গোষ্ঠীর রাজাকে ‘বলি’ দিতে বাধ্য ছিল।

আমরা আগে বিলেছি, ঋগ্বৈদিকযুগে আর্যরা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে এবং আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল। এর সমর্থনে ঋগ্বেদে অনেক সমরাস্ত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়। সে-যুগের প্রধান যুদ্ধাস্ত্র ছিল তীর ধনুক। এর পাশাপাশি বর্শা, কুঠার এবং তলোয়ারও ব্যবহার করা হতো। রাজা ও সেনাপতিরা কাঠের তৈরি রথে চড়ে যুদ্ধ করতেন। সেনাপতির পদবি ছিল ‘সেনানী’। সাধারণ যোদ্ধারা ছিল পদাতিক। যদিও ঋগ্বেদে ঘোড়ার উল্লেখ আছে তবু যুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অংশগ্রহণের কোনো তথ্য এ-সূত্র থেকে পাওয়া যায় না।

 

আট

ঋগ্বৈদিকযুগে রাষ্ট্র গড়ে তোলার পর আর্যরা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কিছু নিয়মনীতিও তৈরি করেছিল। কেননা প্রশাসন ছাড়া তো রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে পারে না। ঋগ্বেদে ‘পঞ্চজনা’ বলে একটি শব্দের পুনঃপৌনিক ব্যবহার পাওয়া গেছে। সুনির্দিষ্টভাবে শব্দটির অর্থ বের করা না গেলেও ধারণা করা হয় ‘পঞ্চজনা’ প্রশাসনিক পদ। সে-কালে প্রশাসনের ক্ষুদ্রতম কাঠামো ভাবা হতো পরিবারকে। আগেই বলা হয়েছে, এগুলোকে বলা হতো ‘কুল’ এবং কুলের প্রধানকে বলা হতো ‘কুলপা’। সম্ভবত এই ‘কুল’ [উচ্চবংশ অর্থে বাংলায় ব্যবহৃত ‘কুল’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ] শব্দটিই পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে উচ্চবংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কয়েকটি কুলের সমন্বয়ে সৃষ্টি হতো উপজাতীয় গোষ্ঠী। প্রশাসনের ক্ষুদ্রতম সংগঠন যেমন ছিল ‘কুল’ তেমনি বৃহৎ সংগঠন ছিল যথাক্রমে ‘গ্রাম’, ‘বিশ’ এবং ‘জন’। সে-যুগে গ্রামগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে প্রশাসনের প্রধানতম এককের মর্যাদা পেত গ্রাম। ‘গ্রামণী’ ছিলেন গ্রামের প্রধান শাসনকর্তা। গ্রামগুলোর সামরিক ও বেসামরিক সমস্ত কিছুর দায়িত্বই ছিল ‘গ্রামণী’র ওপর। ভারতের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক এই গণতান্ত্রিক যুগেও গ্রামপ্রধান বা ‘পঞ্চায়েত’প্রধানের অস্তিত্ব টিকে আছে। গ্রাম-ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থায় গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক একক-কে বলা হতো ‘বিশ ; বিশের শাসনকর্তাকে বলা হতো ‘বিশপতি’। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একক ‘জন’-এর শাসনকর্তাকে বলা হতো ‘গোপ’। রাজারাই বেশিরভাগ সময় ‘গোপ’ পদটি গ্রহণ করতেন। ঋগ্বেদের সূত্রানুসারে সুদাস ‘একুশজন’-এর উচ্ছেদ করেছিলেন।

শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন পুরোহিতগণ। যদিও পুরোহিতদের প্রধান কাজ ছিল যজ্ঞসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করা কিন্তু তাঁরা রাজার প্রধান পরামর্শক হিসেবেও কাজ করতেন। ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রাম পঞ্চায়েতের সভায় এখনও ‘পঞ্চায়েত’প্রধানের পাশের আসনে পুরোহিতেরাই বসে থাকেন এবং বিচারকাজে পরামর্শ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তও প্রদান করে থাকেন। সে-যুগে যুদ্ধক্ষেত্রেও পুরোহিতদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। ঋগ্বৈদিকযুগে গড়ে ওঠা প্রশাসন ব্যবস্থায় ‘গুপ্তচর’ ও ‘দূত’ বলে দুটি পদের অস্তিত্বের কথাও জানা যায়। এরা রাজাকে গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য সরবরাহ করত এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত।

ঋগ্বৈদিকযুগে রাজার ক্ষমতা একচ্ছত্র ছিল না বলে অনুমান করেন গবেষকগণ। কেননা সে-যুগের প্রশাসন ব্যবস্থায় ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ নামে দুটি সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল। সংগঠন দুটি ছিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ‘সভা’ শব্দটির বহুল ব্যবহার দেখা যায় ঋগ্বেদের ষষ্ঠ ও অষ্টম মণ্ডলে আর ‘সমিতি’ শব্দটির বিশেষ ব্যবহার দেখা যায় প্রথম ও নবম মণ্ডলে। কোথাও কোথাও ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ শব্দ দুটির প্রয়োগ পাশাপাশি পাওয়া যায়। গবেষকবৃন্দ মনে করেন এগুলো উপজাতীয় পরিষদের নাম। তাঁরা মনে করেন, ‘সভা’র চেয়ে ‘সমিতি’র মূল্য বেশি ছিল। গ্রামের অভিজাত ধনী প্রবীণ ব্যক্তিগণ সভার সদস্য হতেন আর ‘সমিতি’র সদস্য হতেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। ‘সমিতি’র অধিবেশনগুলোতে রাজা স্বয়ং উপস্থিত থাকতেন। রাজার ক্ষমতা গ্রহণকে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করত ‘সভা’ ও ‘সমিতি’। রাজার ওপর এ-পরিষদ দুটোর প্রভাব ছিল। ঋগ্বেদে জনসাধারণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘সমিতি’র সদস্যরা যেন ঐক্যবদ্ধ থাকে। কোনো বিষয়ে যেন তাদের মধ্যে মতবিরোধ না হয়।’ ঐক্যের এই ধারণা দিয়ে ঋগ্বেদ রচনাকারী ঋষিগণ বোঝাতে চেয়েছেন, ‘জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে রাজার পক্ষে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।’ এ থেকে কোনো কোনো গবেষক এমন ধারণা করেন যে, ঋগ্বৈদিকযুগে রাজতন্ত্রের পাশাপাশি কোনো কোনো অঞ্চলে প্রজাতন্ত্রের ধারণাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

 

নয়

আর্যরা বহু শতাব্দী ধরে ‘বেদ’ রচনা করেছেন। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানাপর্যায়ে তাদের ধর্মবিশ্বাস ও জীবনাচারে পরিবর্তন এসেছে। ঋগ্বেদের শ্লোকগুলো বিশ্লেষণ করলে সে-যুগের আর্যদের দার্শনিক চিন্তাচেতনা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। সে-যুগের আর্যরা জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার পক্ষে ছিলেন। ধর্মনেতারা মনে করতেন, গভীর বনে তপস্যা করে জীবন নিঃশেষ করে দেওয়ার মধ্যে মানবজীবনের কোনো কল্যাণ নিহিত নেই। এ কারণে ঋগ্বৈদিকযুগের ঋষিগণ পার্থিব জীবন থেকে নিজেদের বিযুক্ত রাখেন নি। তাঁরা সামগ্রিকভাবে জীবনকে উপভোগ করার পক্ষপাতি ছিলেন। ঋষিরা বিশ্বাস করতেন দেবতাদের আশীর্বাদ নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন নির্বাহ করার জন্য পৃথিবীই হচ্ছে উপযুক্ত স্থান। তাই ঋগ্বৈদিক যুগের আর্যদের ধর্ম ও দর্শনে হতাশাবাদের কোনো স্থান ছিল না। আর্য ঋষিদের সৃষ্ট ঋগ্বেদে যে প্রার্থনাসংগীতের শ্লোক রয়েছে সেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ জীবন লাভ, রোগ থেকে মুক্তি, জীবেন মর্যাদা লাভ, শত্রæকে প্রতিরোধর শক্তি অর্জন, ধন ঐশ্বর্য লাভ, পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানীয় প্রাপ্তি প্রভৃতির জন্য দেবতাদের সন্তুষ্টি অর্জন। তারা প্রাকৃতিক শক্তির যে আরাধনা করতেন তার পেছনেও ছিল জাগতিক কল্যাণ লাভের আকাক্সক্ষা।

আর্য ঋষিগণ মনে করতেন ন্যায়পরায়ণ মানুষের জন্য মৃত্যু-পরবর্তীজীবনেও সুখ অপেক্ষা করছে। ঋগ্বৈদিক ধর্ম-দর্শনে পরজগতে স্বর্গের ধারণা থাকলেও নরক সম্পর্কে কোনো বক্তব্য স্পষ্ট ছিল না। বলা হতো যাগযজ্ঞ পালন ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দ্রব্য উৎসর্গের মধ্যদিয়ে স্বর্গে যাওয়ার পথ তৈরি করা সম্ভব। ঋগ্বৈদিক দর্শনে আরো মনে করা হতো মানুষের বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের কোনো সংঘাত নেই। তাই ঋগ্বেদের ভাষ্যে ধর্ম, অর্থ ও কাম-এর সহ-অবস্থান ছিল মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা। পুনর্জন্মের মতবাদটিও সে-যুগে পরিপূর্ণতা লাভ করে নি। ঋগ্বেদের শ্লোক বিশ্লেষণে মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের তেমন কোনো ধারণা স্পষ্ট হয় না।

সে-যুগে মৃত্যুর পরে শবদেহ দাহ করার জন্য চিতায় নিয়ে যাওয়া হতো। মৃতের স্বামী বা স্ত্রী এবং নিকট আত্মীয়েরাও সঙ্গে যেতেন। মৃতদেহের চারপাশে কাঠ সাজিয়ে আগুন জ্বালানো হতো। এ-সময় পরিবারের সদস্যরা চিতার চারপাশে দাঁড়িয়ে সমস্বরে গান গাইত। এ-সব ধর্মসংগীতের সারকথা ছিল, ‘তুমি চলে যাও যেখানে তোমার পূর্ব-পুরুষেরা গিয়েছে।’ শবদেহ আগুনে ভস্ম হয়ে যাওয়ার পর হাড়গুলো সংগ্রহ করে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে একটি মাটির পাত্রে রেখে পাত্রটি মাটিতে পুঁতে রাখা হতো। ঋগ্বেদে মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ মৃত্যের আত্মা ‘পিতৃলোকে’ অর্থাৎ আদি পিতার দেশে চলে যায়। যেখানের মৃতদের রাজা ‘যম’ আত্মা গ্রহণ করেন এবং তিনিই আত্মার কৃতকর্মের বিচার করেন।

আমরা বলেছি, ঋগ্বেদ রচিত হয়েছে বহু শতাব্দী ধরে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঋগ্বৈদিকযুগে প্রকৃতি ও অতীন্দ্রিয়বাদ সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন আসতে থাকে। সে-যুগের শেষ দিকে ঋগ্বেদে যে সকল শ্লোক রচিত হয়েছে তার ভেতর একেশ্বরবাদী ও অদ্বৈতবাদী ধারণার প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। ঋগ্বেদের শেষদিকের একটি শ্লোকে একজন প্রধান দেবতার উল্লেখ আছে। এই শ্লোক বিশ্লেষণ করে ইংরেজ স্কলার ইতিহাসবিদ ও খ্রিশ্চিয়ান থিয়োরোলজিয়ান এইচ. জি. রাওলিনসন (ঐ.এ. জধযষ ষরহংড়হ) তাঁর ‘ওহফরধ, অ ঝযড়ৎঃ পঁষঃঁৎধষ ঐরংঃড়ৎু’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘এভাবে আর্যদের মধ্যে এক ঈশ্বরের ধারণা জন্ম নিতে থাকে। এক ঈশ্বরেরই বিভিন্ন নাম বহু দেবতার রূপকে বলা হয়েছে।’

দশ

ইতিহাসবিদ ও প্রতœতাত্তি¡ক গবেষক ও নৃবিজ্ঞানীরা ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন সভ্যতা বা ঋগ্বৈদিক সভ্যতার বিকাশ ও পরিণতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন ও মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও মন্তব্য একটি সুতায় বেঁধে ঋগ্বৈদিকযুগের সামাজিক রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র আঁকা যায় :

ঋগ্বৈদিকযুগে আর্যজাতির অবস্থান ছিল বর্তমান পাঞ্জাব ও তার সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে। ঋগ্বেদের বহুস্থানে প্রাচীন নদী সরস্বতীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও ঋগ্বেদে কোথাও কোথাও গঙ্গা ও যমুনা নদীর উল্লেখ রয়েছে। অনুমান করা হয়, ঋগ্বৈদেকিযুগে আর্যরা ভারতের পূর্বাঞ্চলে বেশিদূর অগ্রসর হয় নি। দ্রæত অভিবাসনের ব্যাপারে ঋগ্বৈদিক আর্যরা খুব একটা তৎপর ছিল না। তারা বংশপরম্পরায় অভিবাসন বিস্তার করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। উত্তর ভারতে তারা আর্য-পূর্ব দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে আগে মিশেছিল তারপর ক্রমান্বয়ে পূর্ব-ভারতের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। পাঞ্জাবে বসতি গড়ার কালেই তারা আর্য-পূর্ব স্থানীয় দ্রাবিড় অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। ঋগ্বেদে এই আর্য-পূর্ব জাতিকে বলা হয়েছে ‘দস্যু’। আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের পরাজিত করে বিজিত অঞ্চল নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর সেই অঞ্চলের রাজা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন আর্য গোত্রপ্রধান। পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে সিন্ধু-গঙ্গা উপত্যাকায় আধিপত্য বিস্তারের পর আর্যরা ‘ভরত’ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই ‘ভরত’ রাজ্যে সবচেয়ে বেশি আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের বাস ছিল। ফলে আর্যদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ক্রমাগত সংগ্রাম করে করেই তাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। এ সংগ্রাম যে কেবল স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গেই ছিল তা নয়, সংগ্রাম করতে হয়েছিল বহু শাখায় বিভক্ত আর্য-জাতির অন্য গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও। পূর্বের আলোচনায় যে ‘দশরাজা’র যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে ; সুদাসের নেতৃত্বে ‘ভরত’ গোষ্ঠীর জয় লাভের কথা বলা হয়েছে তা এ-সব সংঘাতেরই ধারাবাহিকতা, এভাবে প্রতিবেশী দুর্বল গোষ্ঠীগুলোকে পরাজিত করে রাজার কাছে আনুগত্য স্বীকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বড়ো সাম্রাজ্য। বিজয় বিস্তৃত করে রাজা পরিণত হয়েছিলেন ‘সম্রাটে’। আর এরই পথ ধরে ভারতে রাজতন্ত্র শাসিত রাজনৈতিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

নানা অঞ্চল জয় করে সুদাস যমুনার পূর্বাঞ্চলে ‘ভরত’ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুদাসের বিজয় আর্য ও আর্য-পূর্ব দ্রাবিড়দের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য গড়ে তুলেছিল। গবেষকদের মতে সুদাসের পক্ষে যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের মধ্যে অনেকেই আর্য-পূর্ব স্থানীয় দ্রাবিড় ছিল। আর এই মিশ্রণের মিথস্ত্রিয়ায় গঙ্গা-যমুনার তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল আর্য উপনিবেশ।

আর্য ও আর্য-পূর্ব দ্রাবিড় জাতির মিলিত প্রয়াসে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল পরবর্তীকালে তা আর্য-সভ্যতা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ভারত ভ‚-খÐে নতুন [খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ অব্দের মধ্যে] এই সভ্যতায় তাই আর্য-পূর্ব সভ্যতার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আর্য ও আর্য-পূর্ব দ্রাবিড় জাতির মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই সভ্যতা কালক্রমে ‘হিন্দু-সভ্যতা’ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে। সংস্কৃতি সংমিশ্রণের এই ধারাক্রমকে প্রমাণ করা যায় আর্য-পূর্বযুগের ধর্ম, দর্শন এবং দেব-দেবীর সঙ্গে আর্যযুগের ধর্মীয় ধারণা ও দেব-দেবীর সহ-অবস্থান থেকে। কালের পরিক্রমায় আর্যদের জীবনযাত্রায় আর্য-পূর্ব সংস্কৃতির প্রভাব এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, পরবর্তী বৈদিক-সভ্যতায় ঋগ্বৈদিকযুগের অনেক দেবতার অস্তিত্ব ¤øান হয়ে গিয়েছিল। বরুণ, বায়ু, ইন্দ্র প্রমুখ ঋগ্বৈদিক দেবতা ক্রমে নি®প্র্রভ হয়ে পড়েছিলেন।

ঋগ্বৈদিক আর্যরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ধারক ছিল বলে আর্যদের ধর্মীয় দর্শনে দেবীদের অবস্থান তেমন লক্ষ্য করা যায় না। আর্য-পূর্ব যুগে সিন্ধু-সরস্বতী-গঙ্গা অববাহিকার জনপদে মাতৃকাদেবীর আরাধনা বহুল প্রচলিত ছিল। সংস্কৃতির সংমিশ্রণের ফলে পরবর্তী বৈদিকযুগে পুনরায় মাতৃকাদেবী বিশেষ আসন তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুধু ধর্মই নয়, আর্য-পূর্ব জাতির সংস্পর্শে পশুপালক আর্যরা ক্রমে পুরোদস্তুর কৃষিজীবীতে পরিণত হয়েছিল। এভাবে গড়ে উঠেছিল গ্রাম ও গ্রামীণ-সভ্যতা।

আর্য আগমনের পূর্বে ভারতে জাতি, গ্রোত্র বা বর্ণ বিভাজনের কোনো ধারণা ছিল না বলে গবেষকগণ মনে করেন। তাঁদের মতে আর্যরাই ভারতভূমিতে বর্ণভেদ প্রথা নিয়ে এসেছিল। কেননা আর্যরা বিশ্বাস করত, ‘আর্য-পূর্ব স্থানীয় দ্রাবিড়রা ঈশ্বরের কৃপাভাজন নয়। তাই তাদের গায়ের রং কালো।’ এ কারণে আর্যরা স্থানীয় কালো বা তামাটে বর্ণের দ্রাবিড়দের হীন বা নিচু জাত মনে করত। আর্যদের বিশ্বাস ছিল, ‘তারা ঈশ্বরের বরপুত্র।’ এ কারণেই তাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে অপৌরুষেয় গ্রন্থ ‘বেদ’। ঈশ্বরই তাদের আর্য-পূর্ব ‘দস্যু’দের পরাজিত করার শক্তি দিয়েছে, আর্যদের এই মৌলিক ধারণা থেকেই পরবর্তী বৈদিকযুগে বর্ণবাদ প্রথা ভারতীয় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।

আধুনিক প্রতœতাত্তি¡ক, ইতিহাসবেত্তা, নৃ-বিজ্ঞানী সকল শ্রেণির গবেষকই একমত পোষণ করেন যে, আর্য ও আর্য-পূর্ব স্থানীয় দ্রাবিড়দের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ও প্রচেষ্টায় বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতা।

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY LatestNews