Home কাভার গার্ল বড়ো ছেলে ইকবালের স্বপ্ন এবং সার্থকতা

বড়ো ছেলে ইকবালের স্বপ্ন এবং সার্থকতা

535
0
SHARE

১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাসায় সময় মত কখনই খেতে পারিনি। টিউশনি শুরু করতাম সেই ভোর থেকে। শেষ হতে হতে কখনো এগারো কিংবা বারোটা বেজে যেত। যেখানে যা পেতাম তাই খেয়ে নিতাম। স্বপ্ন একটাই ছিল ভাই বোনদের পড়ালেখা করাতে হবে। সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। পরিবারের কথা চিন্তা করে সময় মত বিয়ে করা হয়নি। আর নানা ঝামেলায় এখন পর্যন্ত বিয়েটাও করা হয়ে ওঠেনি। জীবন যুদ্ধে পরিবার নিয়ে লড়াই করার স্মৃতিগুলো স্মরণ করে কথাগুলো বলেছেন কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির চর চারিপাড়া গ্রামের ইকবাল হোসেন।

অতীতের জীবনে লড়াই করা হারানো সে সময়গুলোর কথা বলার সময় চোখের কোণে টলমল করছিল অশ্রুবিন্দু। মুখ হয়েছিল গম্ভীর। মনে হয়েছিল তার অতীত যেন সে পুনরায় সামনে দেখতে পাচ্ছে। একসময় চোখের জল আর চোখে রইল না, আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে গড়িয়ে পড়ল। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে পুনরায় বলতে শুরু করলেন-

আমার দাদা ছিলেন দলিল লেখক। তৎকালীন মেট্রিক পাশ। সেই সময়ের গ্রামের আশপাশে হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষিত মানুষের মধ্যে দাদা অন্যতম। এলাকায় বেশ সুনাম ছিল তার। কিন্তু অল্প বয়সে দাদা মারা যাওয়ায় বাবার প্রচ- ইচ্ছে থাকার পরও পড়ালেখা করতে পারেননি। আমার ইচ্ছে ছিল দাদার মতই আমরা যেন ভালো কিছু করতে পারি। নানা বাধা পেরিয়ে আমার ভাইবোনদের শিক্ষায় সর্ব উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে এটাই ছিল আমার লক্ষ্য ও স্বপ্ন।

তিন ভাই, তিন বোন। আট সদস্যের সংসার। পরিবারের নানা অভাব অনটনে বাবা মনিরুল হক ইরাকের পথে পাড়ি দেন ১৯৮৪ সালে। তারপর কুয়েত গিয়ে মাঝে কর্মস্থল পরিবর্তন করার জন্য ১৯৯৭ সালে ছুটিতে দেশে আসেন। কিন্তু দেশে এসে মেডিক্যাল চেকআপে এসবিএস [জন্ডিস] ধরা পড়ে। কোনোভাবে পুনরায় কুয়েত যাওয়ার পর তিন থেকে চার মাসের মাথায় স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখন আমি মাত্র উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি। ভাইবোন সবাই কমবেশি পড়ালেখা শুরু করেছে। পরিবারে আবার এমন ধাক্কা। চারদিকের ঋণের কোনো সমাধান না থাকায় বাবা চেয়েছিলেন আমার জন্য বিদেশ থেকে ভিসা নিয়ে আসতে। কিন্তু আমার কোনোভাবেই ইচ্ছা ছিল না দেশের বাইরে যাওয়ার। তখন এইচএসসি শেষ করলাম। বাবা চাচ্ছেন এবার আমি দেশের বাইরে যাই। আমার মাথায় একটা বিষয় সব সময় ঘুরপাক খেত। আমি বিদেশে গেলে পরিবারের যা অবস্থা আমার ভাইবোনদের পড়ালেখা হবে না। বাবা আমার জন্য বিদেশ থেকে ভিসা নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। পরে আবার আমার জন্য স্পেনের ভিসা পেলেন। কিন্তু আমি সাড়া দিইনি। বেতন তখনই ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাবা আমাদের বেশকিছু জমি বিক্রি করে দেন। তা দিয়েই আমাদের পরিবারে খাদ্যোর জোগান চলে। দেশে এসে অনেক কাজ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। সেই থেকে আমার জীবন-সংগ্রাম শুরু।

তখন এলাকায় শিক্ষার হার অনেক কম। শিক্ষিত ছেলে হওয়ায় শখে কম-বেশি টিউশনি করতেন ইকবাল হোসেন। প্রথমে শখের বশে করলেও টিউশনিই তার পরিবার চালানোর একমাত্র উপায় হয়ে ওঠে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছুটেছেন টিউশনিতে। আর চাইতেন দেশে থেকেই পরিবারের জন্য কিছু করতে।

ছোট ভাই হাবিবকে প্রাইমারি স্কুল থেকে স্থানীয় উপশহর গৌরীপুরে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করান। সেই সময় গৌরীপুরে হাতেগোনা কয়েকটা কেজি স্কুল ছিল। সেখানে পড়ালেখাও ছিল ব্যয়বহুলও, এতে তার বাবা রেগে যান এবং রাগের মাথায় ইকবালের ডিগ্রির একটি বই ছিঁড়ে ফেলেন। বাবা যে পড়ালেখার বিরুদ্ধে ছিলেন এমন নয়। তার নিজের ইচ্ছে থাকার পরও তেমন পড়ালেখা করতে পারেনি। কিন্তু সংসারের অভাব অনটনের কাছে সন্তানদের শিক্ষিত করার ইচ্ছেটা ছিল অসহায়।

মা এই সকল বিষয় নিয়ে কী বলতেন জানতে চাইলে ইকবাল বলেন, মা কিছু বলতেন না, ভালোও না, খারাপও না। তবে মনে মনে চাইতেন সবাই পড়ালেখা করুক। সাথে মামা শাহ্ আলম ছিলেন সবসময় ইকবালের পক্ষে। মামা বলতেন, ইকবাল তো ভাইবোনের জন্য কষ্ট করে ঋণী হচ্ছে, নেশা করে অযথা টাকা নষ্ট করছে না।

এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে ইকবালের ডিগ্রি পরীক্ষা শেষ হয়। ২০০০ সালে একটি ওষুধ কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টিভ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এর আগে অল্প কমিশনে নানা দোকানে ওষুধ বিক্রি করতেন। তখনো সংসারে টানপোড়েন। ছোট ভাই ইব্রাহিম হামজার উচ্চমাধ্যমিক পড়াকালীন বাবা চেষ্টা করেন ইব্রাহিমকে বিদেশে পাঠানোর। তাতেও ইকবালের বাধা। বিদেশের জন্য জমা দেওয়া পাসপোর্ট গোপনে ফেরত নিয়ে আসে ইকবাল। ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করার সুবিধার ক্ষেত্রে বাইকের জন্য লোন পান পঞ্চাশ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে বাইক না কিনে ঢাকায় রেখে মেডিকেল টেকনোলজিতে ভর্তি করিয়ে দেন ছোট ভাই ইব্রাহিমকে। ইকবাল বলেন, তখন সকাল কীভাবে যায়, সন্ধ্যা কীভাবে আসে আমি বলতে পারতাম না। যে মাসে আমার উপার্জন ছিল ১০ হাজার টাকা, সে মাসে খরচ ছিল ১৫ হাজার টাকা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই পাওনাদার ঘরে এসে বসে থাকত। আমার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসত। তবে আশার আলো ছিল ভাইবোনেরা পড়ালেখা করছে।

এদিকে ছোটবোন কুলসুম ২০০৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করে। তাকে রামচন্দ্রপুর আব্দুল মজিদ কলেজে ভর্তি করাই। বাড়ি থেকে দূরত্ব বেশি, তখন কত মানুষের কটুকথা শুনতে হয়েছে। ঠিকমতো সব ভাইবোনের প্রাইভেটের টাকা দেওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। কখনো টাকার জন্য অপমানও সহ্য করতে হয়েছে। তাও ভালো ভালো শিক্ষকের কাছে ভাইবোনকে পড়িয়েছি। আশপাশের অনেকেই চাইত না আমার পরিবার শিক্ষিত হোক। নানা প্রশ্ন করত, আমায় বলত ভাইবোনকে শিক্ষিত করবি, তোর ভবিষ্যতের কী হবে ?

কখনো চট্টগ্রাম থেকে পাইকারি চা-পাতা এনে ব্যবসা করেছি। ডিসেম্বরে কখনো বাংলাবাজার থেকে পাইকারি বই নিয়ে এলাকায় বিক্রি করেছি। এমনি করে নানাভাবে ভাইবোনকে শিক্ষিত করার লড়াই চালিয়েছেন আঠারো থেকে বিশ বছর। এরপর ট্রাভেল এজেন্সি, স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি গার্মেন্টের ব্যবসাও করেছেন।

বিয়ে সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে ইকবাল বলেন, প্রথমে ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের অসম্মতি ও ভাইবোনের চিন্তা এবং সংসারের দায়িত্ব চলে আসায় আর বিয়ে করা হয়নি। পরে নানা ব্যস্ততায় আর বিয়ে জন্য সময়ও হয়ে ওঠেনি। হ

লেখা : সোহান আহামেদ

একনজরে পরিবার

বাবা-মনিরুল হক, মা-মরিয়ম বেগম। বড়ো ছেলে ইকবাল হোসেন, যার কাঁধেই ছিল পুরো পরিবারের দায়িত্ব বড়ো মেয়ে ফেরদৌসী, বাবা বিয়ে দিয়েছেন, ইকবাল দুই বছর পড়িয়েছেন। মেজো ছেলে ইব্রাহীম হামজা, তিনি প্যাথলোজি নিয়ে পড়ালেখা শেষ করে এখন গৌরীপুর বাজারে নিজেদের ডায়াগনস্টিক সেন্টার ‘মেডিএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নিয়ে আছেন। মেজো মেয়ে উম্মে কুলসুম, বর্তমানে আমেরিকার সিটিজেন, ওখানে পড়ালেখা শেষ করে মেডিক্যালে সরকারি চাকরি করছেন। বাবা-মা এখন এই মেয়ের সঙ্গেই আমেরিকায় থাকেন। ইকবাল এই বোনকে আমেরিকায় পাঠিয়েছেন এবং ফুপাতো ভাই নাসির উদ্দিনের সাথে বেশ ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার পর তারা এখন আমেরিকা প্রবাসী। ছোট ছেলে হাবিবুর রহমান স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে এখন সাংবাদিকতা করছেন। ছোট মেয়ে ফাহমিদা হক চায়না থেকে সদ্য এমবিবিএস শেষ করে দেশে এসেছেন। পরিবার থেকে বর্ণমালা নামে নিজ গ্রামে একটি স্কুল নির্মাণের কাজ চলছে। ইকবালের স্বপ্ন এখন অনেকটাই সার্থক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here