1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন

৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

মোট আক্রান্ত

২৪২,০৪৯

সুস্থ

১৩৭,৯০৭

মৃত্যু

৩,১৮৪

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৫২,২২৪
  • চট্টগ্রাম ১৪,৪৮৯
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৮৮০
  • কুমিল্লা ৫,৫৭৬
  • বগুড়া ৪,৮৭৬
  • ফরিদপুর ৪,৮৬২
  • খুলনা ৪,৩৬৭
  • গাজীপুর ৪,২৩৬
  • সিলেট ৩,৭৮৭
  • কক্সবাজার ৩,৩৯১
  • নোয়াখালী ৩,১৮৬
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,০২১
  • ময়মনসিংহ ২,৭২৩
  • কিশোরগঞ্জ ১,৯৯৫
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১,৯৪৭
  • নরসিংদী ১,৯২৬
  • যশোর ১,৮৯৯
  • চাঁদপুর ১,৮৫৩
  • টাঙ্গাইল ১,৬৯০
  • বরিশাল ১,৬৮৬
  • কুষ্টিয়া ১,৫৯৪
  • রংপুর ১,৫৩৯
  • লক্ষ্মীপুর ১,৪৫৩
  • সিরাজগঞ্জ ১,৪৪০
  • দিনাজপুর ১,৩০৮
  • ফেনী ১,৩০৮
  • সুনামগঞ্জ ১,২৭৮
  • রাজবাড়ী ১,২৭৭
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • হবিগঞ্জ ১,০৫৫
  • পটুয়াখালী ১,০২৫
  • ঝিনাইদহ ৯৮৩
  • নওগাঁ ৯৩১
  • জামালপুর ৯১৬
  • পাবনা ৮৪৩
  • মানিকগঞ্জ ৮৪০
  • মৌলভীবাজার ৮৩৯
  • মাদারীপুর ৮৩২
  • গোপালগঞ্জ ৭৯৯
  • নড়াইল ৭৬২
  • সাতক্ষীরা ৭৪৮
  • জয়পুরহাট ৭১৪
  • শরীয়তপুর ৬৬৮
  • রাঙ্গামাটি ৬৫৭
  • চুয়াডাঙ্গা ৬৪৩
  • নেত্রকোণা ৬৩৮
  • বাগেরহাট ৬০৮
  • নীলফামারী ৬০০
  • গাইবান্ধা ৫৭৮
  • বান্দরবান ৫৫৪
  • খাগড়াছড়ি ৫৩২
  • ভোলা ৫২৮
  • বরগুনা ৫১১
  • নাটোর ৪৯২
  • মাগুরা ৪৬০
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৪৪৮
  • কুড়িগ্রাম ৩৭৭
  • শেরপুর ৩১৫
  • ঠাকুরগাঁও ৩০১
  • লালমনিরহাট ২৯৪
  • ঝালকাঠি ২৪২
  • পঞ্চগড় ২৩৩
  • পিরোজপুর ২১৮
  • মেহেরপুর ১৮৭
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

ফটিকজল পাখিদের এখন আর চেনা যাচ্ছে না -ঝর্না রহমান

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১৮
  • ২৭৩৯ বার ভিউ করা হয়েছে

গেট দিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকতেই জাহিদ দেখে তনিমা গ্যারাজে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রিনে কিছু দেখছে। নিশ্চয়ই কোনো ছবি তুলেছে ! জাহিদের ভ্রæ সামান্য কুঁচকে ওঠে। মোবাইল ফোনে ক্যামেরা থাকাতে আজকাল মানুষ ছবি তোলায় ক্রেজি হয়ে পড়েছে। হাতপায়ের পোড়া ঘা থেকে শুরু করে গর্ভের বাচ্চার ফোর ডি ছবিও পোস্ট করে দেয়।

 

তনিমারও খুব ছবি তোলার নেশা। হাতিঘোড়া বাঘ ভাল্লুক সামনে যা পড়বে সব কিছুরই ছবি তোলে। ফেসবুকে পোস্ট দেয়। তবে ছবি তুলেই সেটা আপ করে না। ছবিকে এডিট করে কেটে ছেঁটে আলো ছায়া দিয়ে রীতিমতো একটা শিল্পকর্মে পরিণত করে তবেই পোস্ট করে। তাই তনিমার ছবিতে একজন ক্যামেরা আর্টিস্টের শৈলী থাকে। কমেন্ট আর লাইকে ভরে ওঠে।

জাহিদের ছবি তোলায় আগ্রহ নেই। কদাচিৎ ক্যামেরার শাটার টেপে। বলে, শুধু শুধু সময় নষ্ট আর হ্যান্ড সেটের স্পেস অকুপাইড করে রাখা। তনিমা বলে, বেশি জমে গেলে অন্য কোথাও স্টোর করলেই হলো ! কত স্মৃতি, কত কত সুন্দর, দামি মুহূর্তকে এখন ক্যামেরার দৌলতে ধরে রাখা যায়, বল তো ! এ যুগে মানুষের স্মৃতি আর হারিয়ে যাবে না !

বর্তমানের ধর্ম অতীত হওয়া। কাজেই স্মৃতি ধরে রেখে লাভ          কী ? স্মৃতিকেও হারাতে দিতে হবে ! যা হারাবার তা ধরে রাখতে চাইলে দাম থাকবে না।

যেসব স্মৃতি ধরা থাকে, তার দাম থাকে না, কী বলো ? তা হলে ইতিহাস ঐতিহ্য প্রতœ রতœ কোনোটারই কোনো দাম থাকত না ! এই যে আমার কানের দুল জোড়া ! মায়ের স্মৃতি!

স্মৃতিতত্ত¡ নিয়ে জাহিদের সঙ্গে তর্ক হলেও তনিমার ছবি তোলার নেশা কমে না।

তবে মোবাইল হাতে পেয়ে তনিমা প্রথম প্রথম কিছুদিন সেলফিপ্রিয় হয়ে উঠলেও অচিরেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। এখন তার মেমোরি কার্ড ভরতি শুধু প্রকৃতির ছবি। পোস্টের অধিকাংশ জুড়ে থাকে নৈসর্গিক দৃশ্য। গাছপালাফুলপাখিঘাসলতাপাতাÑ এমন কি কলের মুখ থেকে ঝরে পড়া জলের ফোঁটাও। ল্যান্ডস্কেপের খুব ভালো ফ্রেমিং জানে তনিমা। এক একটা ছবি ফেসবুকে পোস্ট করলে কমেন্ট বক্স ভরে উঠতে থাকে খুব দ্রুত।

অফিস থেকে বাসায় ফিরেই জামাকাপড় বদলে পায়ে কেডস গলিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে যায় জাহিদ। ঝড় বৃষ্টি ছাড়া এ-নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে না। ফুটপাথে অথবা লেকের ধারে ইভনিং ওয়াক সেরে ঘণ্টাখানেক পর বাসায় ফিরে আসে। ততক্ষণে সন্ধ্যারানি রাতের দিকে যাত্রা করেন। আর তনিমা তখন টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখে বা ইউটিউবে নানা লিংকে ঘুরে বেড়ায়।

তনিমাকে এই অসময়ে গ্যারেজে দেখে তবুও অবাক হয় না জাহিদ। রুমালে ঘাম মুছে তরল গলায় বলে,

কী ব্যাপার ? ছবি তুলছো নাকি ? বাঁশফুল ফুটেছে ? না কি সন্ধ্যার আকাশ ?

নাহ! বাঁশফুল পাবো কোথায় ? পাখির ছবি।

তনিমা ফোন স্ক্রিনে তাকিয়েই গুনগুন করে উত্তর দেয়। জাহিদের গলায় প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ। সেটাকে উপেক্ষা করাই তনিমার অস্ত্র।

পাখির ছবি ? এই রাতের বেলা ? কোথায় পেলে পাখি ?

হ্যাঁ, এবার কৌতূহল নিখাদ। তনিমাও উৎফুল্ল।

এখানেই ! এই পেঁপে গাছে।

কী পাখি ? কাক না চড়–ই ?

আবার কটাক্ষ। তনিমা গুনগুন করে। কী যেন পাখি। চিনি না। ভালো করে তোলাও গেল না ! উড়ে গেল।

দেখি তো, কেমন তুললে !

তনিমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নেয় জাহিদ। বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দুদিকে টেনে স্ক্রিনটা জুম করে ছবিটা পরখ করে। তারপর প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে। আরে এ তো ফটিকজল !

ফটিকজল ? তনিমার মুখে আভা। পাখির নাম ফটিকজল ? মজার তো ?

ফোনস্ক্রিনে জাহিদের দৃষ্টি নিবিড়। সদ্য তোলা ফটোর ডিসেকশান চলছে। পাখিটাকে স্ক্রিনে ঠিকমতো সেট করে তনিমার দিকে তুলে ধরে।

হ্যাঁ ফটিকজল। এই দেখো। একটা তো ভালো করেই বোঝা যাচ্ছে ! গাঢ় হলুদ রঙের পালক ! এই পালকগুলো খুব সফট। একেবারে তুলতুলে তুলার মতো পালক দিয়ে ঢাকা থাকে ফটিকজলের শরীর ! কালোও হয়, সবুজও হয় এই পাখি ! এ পাখি স্ফটিক স্বচ্ছ পানি ছাড়া অন্য পানি খায় না। তাই মেঘের আশায় আসমানের দিকে গলা তুলে ডাকে ফটিক জল ! ফটিক জল ! দেখেছ না ?

দূর ! আমি তো এই পাখি দেখা থাক দূরের কথা, নামই শুনিনি ! চাতক পাখির কথা জানি, যে পাখি মেঘের আশায় চেয়ে থাকে।

ফটিকজলেরই ডাক নাম চাতক !

তুমি এত কিছু জানলে কীভাবে ? পাখির ডাক নাম অফিসিয়াল নাম ! বাব্বাহ ! তনিমার চোখে প্রশংসা।

জাহিদ তার ভ্রুজোড়া এক সেকেন্ড উঁচু করে ধরে রেখে ছেড়ে দেয়। ভ্রæর ঝাঁকুনিতে নানারকম অর্থ লাফ দিয়ে ওঠে। তনিমা একটা অর্থ পিক করে। তা হলো, আমার জানাবোঝা সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা আছে, উম ?

বদলে তনিমার ঢেউয়ের আদলে প্লাক করা ভ্রæতেও ভঙ্গিমা। কটাক্ষ। হুহ ! কত জানো, জানা আছে ! পেঁপের ডালে চাতক পাখি বাসা বাঁধতে পারে, এ কথা কি জানতে মশায় ?

তনিমা হাত বাড়ায়। হুম ! ফোনটা দাও। দেখি, তোমার ফটিকজল !

জাহিদের চোখে তনিমার ভ্রæভঙ্গি এড়ায় না। তবে পাত্তা দেয় না।

না, আমার না, তোমার ফটিকজল ! তোমার আবিষ্কার !

তনিমা ভালো করে ছবিগুলো দেখতে দেখতে বলে, দেখ, জোড়াটা বড়ো পাতাটার আড়ালে মাথা ঢুকিয়ে আছে। ভালো বোঝা যাচ্ছে না। শুধু লেজটা দেখা যাচ্ছে !

দেখেছি। ফটিক জলের লেজে হালকা সবুজ পালক থাকে ! তবে অন্ধকারের জন্য রঙটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ! দিনের বেলা হলে বোঝা যেত।

বাব্বাহ ! এই পাখির সব পালকের রঙও মনে হচ্ছে তোমার  মুখস্থ ! এমন পক্ষিবিশারদ হলে কবে ?

তনিমা পিঞ্চ করছে ! জাহিদ টের পায়। তবুও সহজভাবে বলে, আমাদের অফিসের পল্লব রায়হান আছে না, ও হচ্ছে শৌখিন পাখি শিকারি ! মানে পক্ষির ছবি শিকারি। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে মাঝে মাঝে জঙ্গলে গিয়ে পাখির ছবি তোলে। ওর কাছ থেকেই বিদ্যা পেয়েছি ! রেয়ার পাখি !

এই ন্যাড়া শহরে বনজঙ্গলের রেয়ার পাখি ফটিকজল কী করে এলো ? আশ্চর্য !

মনে হয় এখানে কোথাও ক্রিস্টাল ক্লিয়ার পানি মানে ফটিক জলের সন্ধান পেয়েছে ! জাহিদের কণ্ঠস্বরে আবার খোঁচাখুঁচি।

শহরে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার পানি ? কলের পানিতেই বলে নর্দমার পোকা চলে আসে ! এক ফোঁটা মাইক্রোস্কোপের তলায় রাখলে দেখা যাবে দুনিয়ার ব্যাকটেরিয়া কিলবিল করছে ! আবার ফটিক জল ! তনিমার কথায় হালকা হাসির সাউন্ডওয়েভ।

এরা বোধ হয় নাগরিক পাখি। আর্সেনিক, আয়রন, ব্যাকটেরিয়া পোকামাকড় হাবিজাবি মেশানো দূষিত পানি খেলেও কিছু হয় না। অল রেজিস্ট্যান্ট !

মানে?

ওই আর কি ! মানে খুঁজো না ! জাহিদ ফাইনালি ঘাড়গলা মুছে হ্যান্ড টাওয়েলটা মুঠোর ভেতর দুমড়াতে থাকে। বাথরুমে ঢুকতে হবে।

তনিমা পাখির ফটো দেখতে দেখতে আপনমনে বলে, আম না জাম না কাঁঠাল জামরুল না, বাসা বানাতে আর কোনো গাছ পেলো না এই ফটিকচাঁদেরা ? না কি এ-পাখি পেঁপে-পাতা            খায় ? পাখি পেঁপে পাতা খায়, পাখি পেঁপে পাতা খায়, পাখি পেঁপে পাতা খায়…

তনিমার ছেলেমানুষি ছড়া কাটা দেখে হেসে ফেলে জাহিদ।

তোমার সাথে সই পাতাতে এসেছে !

আমার সাথে না পেঁপে গাছের সাথে সই পেতেছে !

জাহিদের পকেটে নিজের ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিন সোয়াইপ করে কানে লাগাতে লাগাতে লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে যায় জাহিদ।

তনিমার ‘পক্ষিবিশারদ’ পিঞ্চিংটা কানের চামড়ায় একটু ফুটে আছে। শোধ নিয়েছে। কদিন আগেই পেঁপের জিন আবিষ্কারের কথা বলে তনিমাকে খোঁচা দিয়েছিল। তনিমাকে আলাভোলা দেখায়, কিন্তু কিছু ভোলে না। অবশ্য জাহিদও ভোলে না। নিউরোনের কোনো একটা তাকের ওপর চুপ করে রেখে দেয়। সুযোগ মতো সেটা নেমে এসে নখ বিঁধিয়ে দেয়।

তনিমা জানে জাহিদ এখন ঢুকে যাবে তার ঘরে। ডেস্কটপের সামনে বসবে। হাতের কাছে থাকবে স্মার্ট ফোন, ট্যাব আর ল্যাপটপ। একসাথে চারপাঁচটা যন্ত্রে জাহিদের আঙুল আর চোখ। বটম বার জ্যাম হয়ে থাকে মিনিমাইজড উইন্ডোজে। তনিমার উপস্থিতিতে কখনো চট করে কোনো পেজ চলে যায় নিচে, কোনো পেজ চলে আসে ওপরে।

কৌশলগুলো এখন তনিমাও জানে। একসময়ে কম্পিউটারে মূর্খ ছিল তনিমা। এমন কি ফোন নম্বরও সেভ করতে জানতো না। এখন সব নখের ডগায়।

তাই জাহিদও জানে, তনিমাও যখন ল্যাপটপে, নানা উইন্ডো খুলে মগ্ন, জাহিদের উপস্থিতিতে তনিমারও চলে পেজের ডুবজল আর চিৎসাঁতারের খেলা। একই ছাদের তলায় থেকে দুজনের আলাদা বসত। আলাদা ঘর। আলাদা পৃথিবী। কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। সাংসারিক ব্যস্ততা, সমস্যা, ঝামেলা এসবের মধ্যেও একটা ঐক্য ছিল। বিয়ের পর বছর দুয়েক প্রেমট্রেম রোমাঞ্চ এসবও ছিল। ছুটির দিনে বেড়াতে যাওয়া, সিনেমা দেখা অবসরে ঘরে বসে একসাথে টিভিতে কোনো প্রোগ্রাম দেখা, গল্পসল্প করা। তারপর মেয়ে টিনা, ছেলে রোমেল এলো। ধীরে ধীরে সংসারের ডিজাইন পাল্টে যেতে থাকল। রোমাঞ্চের রংটং চটে গেল। নিত্যদিনের নানা সমস্যা আর ব্যস্ততার নানা অনুষঙ্গ যুক্ত হলো। সেইসঙ্গে যুক্ত হলো প্রযুক্তি। আর তখন থেকেই যেন দুজনের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ঢুকে যেতে থাকে।

তনিমাকে একটা ফেসবুক আইডি খুলে দিয়েছিল জাহিদই।

কারণ, জাহিদ ঘরে বসে যখনই ফেসবুকে ঢুকত তনিমা গালে হাত দিয়ে জাহিদের পাশে বসে পড়ত। বিভিন্নজনের স্ট্যাটাস আর মন্তব্য পড়ত। চেনাজানা লোকজনের ছবি-টবি খবরাখবর এগুলো দেখে খুব মজা পেত। নানারকম মন্তব্য করত। প্রথম দিকে জাহিদ তনিমাকে আগ্রহ নিয়ে এসব দেখালেও পরে আর দেখাত না। টুক করে ফেসবুক পেজ মিনিমাইজ করে চলে যেত অন্য পাতায়। কাজের পাতায়। তনিমাকে অনিচ্ছাসত্তে¡ও উঠে যেতে হতো।

ফেসবুক আইডি খোলার পর প্রথম প্রথম এটা সেটা জানাবোঝার জন্য জাহিদকে ডাকত তনিমা। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তনিমা রীতিমতো ভার্সেটাইল ইউজার হয়ে ওঠে। এক সময় দেখা যায় তনিমা আর জাহিদ পাশাপাশি বসে আছে অথচ তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে নিজ নিজ জগতে। তাদের হাতে স্মার্ট ফোন অথবা ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ। হয় তো তখন টেলিভিশন চলছে, কিংবা হাতের কাছে পড়ে আছে খোলা পত্রিকা, চায়ের কাপের ধোঁয়া ওড়াও  শেষ ! কিন্তু তনিমা আর জাহিদ অদ্ভুত এক নীরবতার আয়োনোস্ফিয়ারে ভেসে বেড়াচ্ছে।

একদিন রোমেল বাপমা দুজনকে মোবাইল ফোনে নিমগ্ন হয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলে, তোমরা কি সারাদিনই ফেসবুকিং করো মা ? তনিমা তাড়াতাড়ি ফোন স্ক্রিন অফ করে বলে, দূর পাগলা, আমি তো তোর জন্য নতুন একটা রান্নার রেসিপি দেখছিলাম !

জাহিদ ছেলের দিকে চেয়ে বলে, বাপজান, শাসন করতে           এসেছ ? ইউ শুড আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট সোয়াইপিং দ্য ডিজিটাল স্ক্রিন নট মিনস ওনলি ফেসবুকিং, এখন প্রযুক্তির যুগ। সব কাজের জন্যই কম্পিউটার বা ফোন লাগে !

তবে ছেলেকে বোঝালে কী হবে, মানুষ যে এখন ফেসবুক এডিক্টেড হয়ে পড়েছে এ কথা তো সত্যি ! আজকাল অফিসে দোকানে বাসে রিকশায় এমনকি হাঁটা পথেও মানুষ মোবাইল ফোনের স্ক্রিন সোয়াইপ করতে থাকে। একদিন তনিমা রাস্তায় জ্যামে আটকে থেকে অদ্ভুত দৃশ্য দেখে। আশেপাশে যত মানুষ গাড়ি রিকশা মটর সাইকেলে বসে আছে তাদের বেশিরভাগই মোবাইল ফোনে ফেসবুকিংয়ে মগ্ন। দুঃসহ জ্যাম যেন কারো গায়েই লাগছে না। সবাই যেন আপনমনে অন্য ভুবনে ঘুরে বেড়াচ্ছে !

এক সময় তনিমাও এসবের তীব্র সমালোচনা করত। ছেলের জন্য আঠারোর আগে কড়াভাবে মোবাইল রেস্ট্রিকটেড করেছে। কিন্তু এখন দেখে সে নিজেই এই চক্রের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। সাংঘাতিক একটা নেশা ! যেন সবাই মেনে নিয়েছে, যেকোনো সময়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষ তার নিজের প্রযুক্তি-জগতে ঢুকে পড়তে পারবে। যেন এটি তার মৌলিক অধিকার। অদ্ভুত এই অধিকার ভোগ করতে প্রথম প্রথম অস্বস্তি হতো তনিমার। নিতান্ত নিজের সময়টুকু ছাড়া সে অনলাইনে যেত না। কিন্তু ধীরে ধীরে সব কেমন বদলে গেল। এখন দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও আলাদা হয়ে যাওয়াকে স্বাভাবিকভাবেই দেখা হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় তনিমা আর জাহিদ একই খাটে পাশাপাশি বসে দুজন দুজনের ফোনে বা ট্যাবে মগ্ন আছে। প্রয়োজনীয় কথাবার্তাও তার মধ্যেই হচ্ছে। কিন্তু চোখ থাকছে ফোন স্ক্রিনে। কী অদ্ভুত সময় এলো ! একসময় এই অদ্ভুততার অনুভূতিও আর থাকে না। অদ্ভুততাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তোমার জগৎ তোমার আমার জগৎ আমারÑ এই তো চলছে !

 

কদিন ধরেই তনিমা পাখিটার ছবি তোলার জন্য চেষ্টা করছিল। ভীষণ সতর্ক পাখি। একটু আলিঝালি ছায়া দেখলেই উড়ে পালায়। যখন উড়ে যায় ছোট্ট পাখিটাকে মনে হয় একটা প্রজাপতি।

এতদিন মনে করেছে একটা পাখিই বাসা করেছে। আজ ছবি তুলতে গিয়ে দেখে পাশাপাশি বসে দুটো পাখি ! সাবধানে অনেকটা কাছে যাওয়ার পরও দেখা গেল পাখি নড়ে না। বাহ ! ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে ! তনিমা ক্যামেরার ফ্লাশ বন্ধ করে দিয়েছে। যদি আলোর ঝলকানি দেখে উড়ে পালায় ! দু তিনটা ছবি তুলতে পারে। তারপরই টের পেয়ে যায় ওরা। ঝটপট ডানা ঝাপটে পেঁপে গাছের পাতার ভেতর থেকে বের হয়ে পালায়। মনে হয়, ছোট দু টুকরো পেঁপে পাতাই উড়ে গেল ! এই পাখি কি নিজেদের ক্যামুফ্লাজড করে রাখতে ভালবাসে ? তনিমা উড়ে পালানো পাখির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে।

 

দিন পনের আগে তনিমা প্রথম আবিষ্কার করে পাখিটাকে।

গ্যারেজের একপাশে কয়েকটা টব রাখা আছে। সেগুলোর একটু দেখশোন করা তনিমার অভ্যাস। কোনটাতে পানি দেওয়া দরকার, কোনটায় ফুলের কলি এলো, কোনটায় নতুন পাতা গজালো এসব দেখতে ভালো লাগে। একটা বড়ো টবে জন্মেছে ধ্যাড়ধেড়ে লম্বা পেঁপে গাছটি। কবে কোন পাখির ঠোঁট থেকে ঐ গাছের বীজ এসে পড়েছিল টবের রুখুসুখু মাটিতে কে জানে ! তা থেকে একদিন বেরিয়ে এলো টিঙটিঙে এক চারা। কয়েকটা পাঁচ আঙুল মেলা হাতের পাতার মতো পাতাও ফুটলো। একদিন ধ্যাড়েঙ্গা চারাটা দেখে তনিমার ভালো লেগে গেল। চারাটা মাটিতে পুঁতে দিতে পারলে হতো। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টে তো কোথাও এতটুকু মাটি নেই।

দারোয়ান আসগর আলী বলে, টবের গাছেও পেঁপে হয়। তাহলে টবেই থাকুক গাছটা। এই টবও তেমন জরুরি না। ফল না ধরুক। দুটো সবুজ পাতা ফলাতে পারলেও এই পোড়া শহরে এক চামুচ অক্সিজেনের স্টক বাড়বে। ইঁট কংক্রিটের শহরে মাটি নেই বলে আজকাল ছাদে বাগান করার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। ছাদবাগান সমিতিও আছে। ফেসবুকে দেখা যায় নানারকম বাগানের গ্র“প। সেখানে কত ফুল ফল গাছপালার ছবির পোস্ট ! তনিমাও একটা গ্র“পের সদস্য। গ্র“পের নাম বনবাদাড়। টবের ধ্যাড়েঙ্গা পেঁপে চারার ছবি বনবাদাড়ে পোস্ট করে দিলো তনিমা। দারুণ সাড়া পাওয়া গেল। লোকজন ছাদবাগানে পেঁপে গাছের ছবি দিয়ে ভরিয়ে ফেলল।

তনিমাদের আ্যাপার্টমেন্টের ঠিক লাগোয়া সাততলা বাড়িটার ছাদে একটা বাগান আছে। সেখানে হেন গাছ নেই যার চাষ না করা হয়। ল্যাংড়া আম, কাজি পেয়ারা, থাই জামরুল, এমন কি ড্রাগন ফলও। একদিন নৌকার লগির মতো পাঁচ হাত লম্বা এক আখ নিয়ে এলো আসগর আলী। ও বাড়ির মালিক ইয়াকুব হোসেনের বউ লাভলি বেগম পাঠিয়েছেন। বয়স্ক মহিলা। লতাপাতায় একটা আত্মীয়তাও বের করে ফেলেছেন তনিমার সঙ্গে। তিনি এখন তনিমার খালা হিসেবে দিব্যি অভিভাবকগিরি করেন। তনিমারও ভালোই লাগে। লাভলি খালার বাগানের বিভিন্ন গাছের ছবি আছে তনিমার কাছে। তিনি ছবিটবি তুলতে পারেন না। তাই বাগানে নতুন কিছু এলে তনিমাকে খবর পাঠান। লাভলি খালার ছাদের আখ দেখে তনিমা সত্যি মহাঅবাক হয়েছিল। বিভিন্ন এঙ্গেলে সেই আখের ছবি তুলে পোস্ট করেছিল।

কাজেই ছাদের মাটিতে আখ হতে পারলে টবের মাটিতে পেঁপে হবে এ তো খুবই স্বাভাবিক। আজকাল সব ফল কার্বাইডে চোবানো আর সব শাকসবজি ফর্মালিনে মাখানো। ওসবের জায়গায় যদি দুচারটি ত্যাড়াব্যাকা পেঁপে বাড়ির গাছে পাওয়া যায় ক্ষতি কী ? অতএব টবের মাটিতে পেঁপে গাছ বহাল থাকলো। আর গ্যারেজের দেয়ালের ছায়া যতই ওর চোখে ধাক্কা খেতে লাগলো ততই পেঁপে ছুঁড়ি ঘাড় পিছিয়ে টিংটিঙে মাথাটাকে বকের মতো লম্বা করে দিতে লাগলো। কয়েকমাসেই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে চোঁ চোঁ করে সূর্যের আলো গিলতে লাগল। একদিন জলপাই সাইজের কয়েকটা সবুজ লেবেঞ্চুষ পেঁপেশিশুও বেরিয়ে এলো। গ্রিলের নিচের দিকে কয়েকটা বড় পাতা আর বাচ্চা পেঁপে নিয়ে সে গাছ অর্ধেক সংসার ছায়ায় অর্ধেক সংসার আলোয় করতে লাগল।

ঢ্যাঙা পেঁপে গাছটা তনিমাকে ভালো পেয়ে বসল। মাঝে মাঝেই পেঁপে গাছের নিচে নিবিড় চোখে ডালপাতা লক্ষ করে। জাহিদ একদিন ঠাট্টা করে বলে, তুমি কি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের পাটের জিন আবিষ্কারের মতো পেঁপের জীবন রহস্য আবিষ্কারে নেমেছ ?

তনিমার খুব রাগ হয়েছিল। স্ত্রীর প্রতি জাহিদের ব্যবহারে বাইরে থেকে কোথাও কোনো খামতি বোঝার উপায় নেই। তনিমার ইচ্ছে অনিচ্ছে কোনোটাতেই বাধা দেয় না জাহিদ। ঘর সংসারের দায়দায়িত্বও দুজন মিলেই ভাগ করে নিয়েছে। তারপরেও তনিমা টের পায় জাহিদ তনিমার বুদ্ধিবৃত্তিকে খুব ওপরে তুলে ধরতে রাজি না। সেখানে খোঁচা ব্যঙ্গ ঠাট্টা মশকরার ছলে আন্ডার এস্টিমেশন জায়গা করে নেয়। প্রথম প্রথম তনিমা যখন জাহিদের কাছে কম্পিউটার ব্যবহার শিখতে চাইত, জাহিদ শুধু অফ অন শিখিয়ে দিয়ে কিছু গান আর মুভি ডাউনলোড করে দেয়। বলে এগুলো দেখ। পরে তোমার পছন্দমতো আরও নামিয়ে দেব। কিন্তু অন্য কিছু শিখতে চাইলেই বলত, ওসব তুমি পারবে না। ঝামেলা আছে। নয়ত বলত যা কিছু চিহ্ন আছে খুলে খুলে দেখবে, স্ক্রিনের চারপাশে তাকাবে, পড়বে। নিজেই বুঝতে পারবে। তনিমা নিজেই বুঝেছে। ফেসবুকে তনিমার বন্ধু সংখ্যা দু বছরেই দু হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তনিমা সারাদিন অনলাইনে। জাহিদ তনিমা দুজনের ফোনেই সারাক্ষণ মেসেজ আসার টুং টাং শব্দ। রান্নাঘরেও তনিমা মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে, ভাইবারে, ইউটিউবে, গুগলে।

 

পাতার আড়ালে অর্ধেক লুকিয়ে থাকা পাখিটাকে সযতেœ এডিট করে নেয় তনিমা। নেগেটিভ এফেক্ট দিয়ে আরও একটু রহস্যময় করে তোলে। আলোছায়ার বিন্যাসে চকচকে এক টুকরো স্ফটিকের মতোই লাগে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই পত্রপল্লবের মেসেঞ্জারে পোস্ট করে দেয়। পল্লবের আইডির নাম পত্রপল্লব। প্রোফাইল ছবিতে গাছপালার পাতার ভেতর বিশেষ এঙ্গেলে মুখের একটা পাশ। হঠাৎ দেখলে মনে হয় এক গোছা পাতা। পল্লব চব্বিশ ঘণ্টাই অনলাইনে। মেসেঞ্জারে আরও অসংখ্য সবুজ আলো। তনিমা জানে তাকে ফেসবুকে দেখে এখন টুপটাপ মেসেজ আসতে শুরু হবে। তনিমাও পছন্দসই মেসজেগুলোর উত্তর লিখবে। কোনোটাতে চট করে লাইক বা ইমো বা যিফ। তবে টানা কথা হয় পল্লবের সাথে। পল্লবের কথায় রোমান্টিকতা, তনিমার প্রতি মুগ্ধতা, ছবি তোলার প্রশংসা, কখনো কখনো গাঢ় মাদকতা। পল্লব তনিমাকে নানারকম ছবি আর ভিডিও পাঠায়। বলে আমার পছন্দের জিনিস শেয়ার করার এক নম্বর মানুষ হচ্ছ তুমি। তনিমার ভালো লাগে। রোজই কয়েকবার মেসেঞ্জারে কথা হয় তনিমা আর পল্লবের।

পাখির ছবিটা দেবার সাথে সাথে উত্তর আসে পল্লবের, কীসের ছবি গো ?

তনিমা দ্রুত টাইপ করে Ñ বল তো কীসের !

গাছের পাতা বোঝা যাচ্ছে। কী গাছ ? পাতার ভেতরে ওটা কি ? গাছের ফল ?

উঁহু। হয়নি।

চারটা অপশন দাও। টিক দিই।

না টিক সিস্টেম নেই। বলতে হবে !

পাখি নাকি ? পাখিই, তাই না ?

হুম। কী পাখি, এখন বলো পক্ষিবিশারদ।

অরিজিনাল ছবিটা দাও। এডিটেড ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে না।

ধেৎ, একটু ক্যামুফ্লাজড করতে চাইলাম !

কোনো কিছুই বেশিক্ষণ ক্যামুফ্লাজড থাকে না, ধরা পড়তে হয়, জানো না?

তুমি তো বেশ ছিলে! পত্রপল্লবের আড়ালে ! তোমার পাতার ঝালরে ঢাকা ছবিটা তো আমি অনেকদিন চিনতেই পারিনি। এমন কি ফিল্ম ফেস্টিভালে জাহিদের সঙ্গে তোমাকে দেখেও না !

না চেনাতেই ভালো হয়েছে। তোমাকে পাওয়া গেছে। নইলে তো সম্পর্কটা ফরমাল হতো। তোমাকে ভাবি ভাবি করতে হতো। সেলাম ঠুকতে হতো। তোমার বুকে মাথা ঠুকতে পারতোম না !

ধেৎ, সারাক্ষণ ফাজলামি !

এখন অরিজিনাল ছবি দাও সোনা পাখি !

তনিমা পাখির অরিজিনাল ছবিটা পোস্ট করে।

এটা তো ফটিকজল ! দুটি পাখি ! একেবারে বলের মতো গোল হয়ে ঘুমুচ্ছে ! কোথায় পেলে ?

জাহিদও দেখেই চিনেছে।

জাহিদও পক্ষিবিশারদ হযে গেছে ? বাহ !

হুম। শুধু আমিই চিনলাম না। দুই পক্ষিবিশারদ দুপাশে তাও মূর্খ থাকলাম !

আমাকে তো ফেসবুকের বাকসে বন্দি রেখেছ। তাই জ্ঞান বাড়বে না। বুকের বাকসে রাখো, জ্ঞানী হয়ে যাবে !

বুকের বাকসেই রেখেছি। তা নইলে এত কথা বলি কেন তোমার সাথে ?

তা হলে তোমার বুকের পক্ষি দুটোর অরিজিনাল ছবি দাও।

মানে কী ?

মানে আবার কী ? আদম যুগের অরিজিনাল হাওয়ার ছবি !           গোল ! ঘুমন্ত ! দাও না ! কী হয় ! ছবিই তো !

ধেৎ ! কী সব বাজে কথা !

পল্লবের কাছ থেকে একটা ছবি আসে। ওপরে লেখা হোয়াটস দিস ?

তনিমার দু সেকেন্ড লাগে ছবিটা কী, বুঝতে। তারপর মাথা চিড়িক করে ওঠে।

এসব কী ? কিসের ছবি পাঠিয়েছ ?

বল তো, বলতে পারলে অরিজিনালটা পাঠাব। এটা এডিটেড !

জঘন্য। তুমি এত নীচ ! আমাকে এমন ছবি পাঠাতে পারলে ? ঘেন্নায় আমার বমি আসছে। ছিঃ

সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও মোডে চলে আসে পল্লব। তার হাতে একটা আধ খাওয়া বেকড কর্ন।

আমি তো হাতের মুঠোয় চেপে রাখা এই নিরীহ কর্নটার ছবি দিয়েছি। গলির মোড়ে বিক্রি হচ্ছিল। কয়লার আগুনে সেঁকে এনেছি। একদম গরম। আর কর্নের আগায় নুন। আলুনি জিনিস কি খেতে ভালো লাগে সোনা ? অরিজিনালটা দেখ।

তনিমা ভিডিও ক্যামেরা অন করে না। কথাও বলে না। লেখে, তোমার সাথে এখানেই শেষ !

খামাখা এমন রেগে গেলে কেন ? আশ্চর্য !

তোমার রুচির বিকৃতি ঘটেছে। সম্পর্ক শেষ।

অরিজিনালটা একবার না দেখেই শেষ করবে ? উম ! দেখ না একবার পাখি !

তাড়াতাড়ি উইন্ডো অফ করে দেয় তনিমা। কানের ভেতর কেমন শোঁ শোঁ শব্দ ! গরম হয়ে উঠছে কানের লতি।

যথেষ্ট হয়েছে। আর না। বøক করে দেবে পল্লবকে।

কিন্তু বøক অপশনটা খুঁজে পায় না তনিমা। দু একবার চেষ্টা করে জাহিদের ঘরে ঢোকে। জাহিদ ল্যাপটপে দুচোখ স্থির করে বসে আছে। কোনো মুভি চলছে। তনিমা এক নজর দেখে। ইংরেজি ছবি। বটমবারে অনেকগুলো মিনিমাইজড পেজ।

কী ছবি দেখছ ?

এই একটা নতুন মুভি।

স্ক্রিনে একটি বন্ধ জানালার পাল্লা দুম করে খুলে গিয়ে রক্তাক্ত ভয়ংকর একটি মুখ ভেসে ওঠে।

উঃ মাগো ! কেঁপে ওঠে তনিমা। হরর ফিলম দেখছ নাকি ?

তনিমা ভৌতিক ছবি খুব ভয় পায় আবার পছন্দও করে। তনিমার গলায় আগ্রহ টের পেয়ে জাহিদ মুভি পজ করে।

না হরর না। ডিটেকটিভ। সিরিয়াল কিলার। মার্ডার টার্ডারে ভরা। তোমার নার্ভে চাপ পড়বে। দেখার দরকার নেই।

তনিমা অজান্তেই কপালের দুপাশের শিরা চেপে ধরে। ফোঁস করে একটা দম ফেলে।

জাহিদ চট করে তনিমাকে দেখে নেয়। একটু ফ্যাকাশে মুখ। চোখ দুটিতে ক্লান্তির দু পোঁচ কালি। চোখের নিচে হালকা ঢেউ খেলেছে চামড়ায়। নাকের পাশের ভাঁজ দুটোও একটু খাদে নেমেছে। বয়স বেড়ে গেছে তনিমার। অনেকদিন যেন তনিমার দিকে ভালো করে তাকানো হয়নি। একসঙ্গে ঘর সংসার করে, এক বিছানায় শুয়ে, এক টেবিলে ভাত খেয়ে, এক সাথে নানান আচরণের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করেও যেন বহুদিন জাহিদ তনিমাকে ভালো করে দেখেনি।

নিজের অফিস আর কাজের বাইরে তনিমার জন্য কোনো সময় থাকে না জাহিদের। অফিস থেকে বাসায় ফিরেই হাঁটতে বেরিয়ে যায় জাহিদ। বাসায় ফিরে নিজের রুমে ঢুকে যায়। যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ নিজের ঘরেই। তনিমা চায়ের জন্য ডাকলে হাতে ফোন নিয়ে এসে বসে। চা খেতে খেতে ফোনে নেট ব্রাউজিং আর কল রিসিভ অথবা কল করা চলতে থাকে। চা শেষে আবার নিজের ঘরে ঢুকে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ সেঁটে বসে যায় জাহিদ। তনিমা মাঝেমধ্যে এসে উঁকি দিয়ে দেখত। তনিমার উপস্থিতিতে জাহিদ এমন দৃষ্টিতে তাকাত, যার অর্থ, কিছু বলার থাকলে বল। ধীরে ধীরে তনিমাও নিজের একটা একাকী জগৎ গড়ে তোলে। বাস্তবে থেকেও অবাস্তব এক উড়ন্ত ভুবনে উড়ে বেড়ানো। কেমন নেশা ধরা সে ভুবনের পথঘাট।

 

কী হলো ? কিছু বলবে ? মাথা ব্যথা করছে না কি ?

ল্যাপটপের ডালা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায় জাহিদ। তনিমার জন্য এক ঝলক আকুলতা। তনিমা জাহিদের ল্যাপটপের ডালা বন্ধ করাটা ক্রূর চোখে দেখে। চোখ জ্বলে ওঠে।

না মাথা ব্যথা করছে না। ল্যাপটপ বন্ধ করলে কেন ? তোমার কাজ তুমি করো। আমার জন্য তোমার মুভি দেখা, চ্যাটিং, ব্রাউজিং কোনো কিছুই বন্ধ করতে হবে না।

কী হলো ? রেগে যাচ্ছো কেন ? কী বলতে এসেছিলে সেটা বলো। কপালের শিরা টিপে যাচ্ছো তাই জানতে চাইলাম। কাজ করছিলাম। একটা প্রোগ্রাম বানাচ্ছি।

মিইয়ে যায় তনিমা। জাহিদ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। সে তো কম্পিউটার নিয়েই থাকবে !

তনিমার কপালের দুপাশ সত্যিই দপদপ করছে। মনে হচ্ছে শিরা ছিঁড়ে যাবে। পল্লব এমন কাÐ করবে বুঝতে পারেনি।

তনিমা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। বলে, মেজাজ খারাপ। তাই মাথা ব্যথা করছে। আচ্ছা আইডি ব্লক করে কীভাবে বল তো ? অপশন খুঁজে পাচ্ছি না। এক হারামজাদাকে বøক করব।

কে ? কী করেছে ?

আছে একজন। বাজে কথা লিখেছে।

কী লিখেছে ? আজকাল ফেসবুকের অর্ধেকই ফেক আইডি। বুঝে শুনে ফ্রেন্ড সিলেক্ট করতে হয়। তুমি রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলে তাকে ? না এড করেছ ?

আরে, এড করেছিলাম।

চিনতে ?

কিছুটা চিনতাম। এখন দেখি চেনাটা ঠিক ছিল না। মানুষ চেনা খুব মুশকিল। যাই হোক, তুমি বলো বøক অপশন কোথায় থাকে ?

দাও, কাকে বøক করবে, করে দিই।

আমিই করবো। তুমি শুধু সিস্টেমটা বল।

জাহিদ একঝলক তাকিয়ে থাকে তনিমার দিকে। তনিমা জানাতে চায় না, কাকে বøক করবে। এক সময় তনিমা সব কিছু জাহিদের সঙ্গে শেয়ার করত। এমন কি বিয়ের আগে কে কে তাকে প্রেম নিবেদন করেছে, তাও। খোলা বইয়ের মতো স্পষ্ট ছিল তনিমা। এখন কেমন আড়াল তুলেছে। একটা কূটবেশ জড়িয়ে আছে যেন।

জাহিদের দিকে তাকিয়ে তনিমাও ঝকঝকে কৌতুকী করে তোলে চোখ।

কী হলো, অমন চেয়ে আছ কেন ? কাকে বøক করবো দেখাচ্ছি না তাই ? তোমার দেখার দরকার নেই তাই দেখাচ্ছি না। আমার ব্যক্তিগত বিষয়। ধরো তোমাকে বøক করবো। মানে তোমার আইডিটায় প্র্যাকটিস করি !

তনিমা জাহিদের প্রোফাইলে যায়।

জাহিদ কিছু বলে না। জাহিদের কয়েকটা আইডি আছে। তার মধ্যে একটাতেই শুধু তনিমা ফ্রেন্ড। অন্যগুলোর কথা তনিমা জানে না। হয় তো তনিমারও আছে একাধিক আইডি। জাহিদ জানে না। জানাজানির ভেতর দিয়ে জীবন শুরু করে কেমন করে তারা ক্রমশ না জানাজানির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত ব্যাপারটা ভাবে জাহিদ। এরপর নিজের ফেসবুকে ঢুকে তনিমার আইডিটা খুলে অপশন বারে গিয়ে দেখিয়ে দেয় বøক করা।

তনিমা একটু অবাক হয়ে বলে, আশ্চর্য ! আমি তো ঐ কোনাতেই ক্লিক করলাম। কোথায় লুকিয়েছিল ব্লক অপশন ? দেখি তো ?

জাহিদ বলে, এটা তো খোঁজার দরকার পড়ে না। একেবারে আঙুলের ডগায় থাকে। কেন যে খুঁজে পেলে না ! তুমি বোধ হয় বেশি এক্সাইটেড বা আপসেট ছিলে। তাই দেখতে পাওনি। তনিমাকে বøকড রেখেই উইন্ডো অফ করে দেয় জাহিদ।

এ কী ! আনবøক করলে না?

জাহিদ সে-কথায় উত্তর না দিয়ে বলে, বøক করা শিখেছ তো ?

হুম ! এই তো। তনিমা জাহিদের প্রোফাইল খুলে বøক করে দেখায়।

আনবøক করলে না ?

সেটা তো শেখাওনি ! কী করে করব ?

হালকা হাসে জাহিদ। থাক সেটা শেখার দরকার নেই। একবার বøক করলে তাকে আর আনবøকড করার দরকার নেই !

পরস্পর স্থির চোখে এক লহমা তাকিয়ে থাকে ওরা।

হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে জাহিদ। আচ্ছা, তোমার ফটিকজলের ছবি এখনো পোস্ট করনি ? দেখলাম না তো ?

এক কাজ করতে পারো, পল্লবকে কয়েকটা ছবি পাঠাতে পারো। ও তো পক্ষিবিশারদ। আমার চেয়ে ভালো বুঝতে পারবে, এটা কোন জাতের পাখি। আদতেই ফটিকজল কি না ! আমি হয় তো ওর মতো অত ভালো চিনি না। পল্লব কি তোমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে ?

তনিমা সহজ গলায় বলে, নাহ, নেই। তোমার কলিগ আমার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকতে যাবে কোন দুঃখে ? কিন্তু জাহিদ জানে, পল্লব তনিমারও কমন ফ্রেন্ড !

আহ হা! থাকতে পারে না ? আজকাল একজনের ফ্রেন্ডের ফ্রেন্ড তস্য ফ্রেন্ডও অন্যের ফ্রেন্ড হতে পারে। যাই হোক, ফ্রেন্ডলিস্টে না থাকলেও মেসেঞ্জারে পাঠাতে পারো। নয়ত আমাকে পাঠাতে পারো। আমি সেন্ড করে দেব পল্লবকে

দরকার নেই এত ঝামেলার। আমিই পোস্ট করবো।

নিজের ঘরে গিয়ে দ্বিতীয়বার না ভেবে পল্লবকে বøক করে তনিমা।

তার আগে বেকড কর্নের ছবিটা ডিলিট করে। কী বিশ্রী এঙ্গেলে তুলেছে ! কর্নের আগায় আবার ফেনায়িত সাদা নুন ! ওয়াক ! ইচ্ছে করে এ-ছবি দিয়েছে পল্লব ! বছর দেড়েকের অনলাইন সম্পর্কে পল্লবের সাথে তনিমার অনেক ধরনের কথাই হয়েছে। কখনো সে-সব কথার মধ্যে শারীরিকতার কথাও ঢুকে পড়ত। চুমটুমুও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। তনিমা ভেবেছে ডিজিটাল চুমুই তো ! স্পর্শহীন হলেও রোমঞ্চ আছে! পল্লব কয়েকবার তাকে স্নানঘরের ভেজা গায়ের ছবিও পাঠিয়েছে। একদিন বলল, তোমার স্নানঘরের ছবি পাঠাও না পাখি !

পল্লবের কথার মধ্যে প্রচÐ মাদকতা, দারুণ রোমাঞ্চ। তনিমার নিস্তরঙ্গ সময়গুলো যেন কেঁপে উঠত। পল্লবের কথার খেলায় মেতে উঠতে ভালো লাগে খুব। তবে কথায় বাঁধন আলগা দেখলেই রাশ টেনে ধরত তনিমা। কখনোই পল্লবকে সীমা অতিক্রম করতে দেয়নি। কিন্তু আজকের এই অশ্লীল ছবিটা তনিমার মনোজগতে একটা ধাক্কা লাগায়। এ খেলা আর না ! আড়াই হাজারের বন্ধুতালিকা ছোট করে ফেলবে। অপ্রয়োজনীয় লোকজনকে আনফ্রেন্ড করে দিতে বসে তনিমা। পাঁচশ তিরিশটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ঝুলে আছে। সব ডিলিট করে দেবে। আর না। তনিমা রিকোয়েস্টগুলো স্ক্রল করতে থাকে। ডিলিট করার আগে কোনো কোনোটার একটু প্রোফাইল দেখে নেয়া যাক, ভাবে তনিমা…। হ

২২.৫.১৮

লেখক : কবি, কথাশিল্পী

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY LatestNews