Home অঁভোগ পানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

পানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

420
0
SHARE

পানির অপর নাম জীবন

পানি জীবনের এক অপরিহার্য উপাদান। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কখনোই কল্পনা করা যায় না। পানি নেই বলে অন্য কোনো গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধু জীবন কেন, মানব সভ্যতাও গড়ে উঠেছে এই পানি ঘিরেই। তাই পানি জীবনের অস্তিত্ব তৈরির পাশাপাশি গড়ে তুলেছে সভ্যতাও। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই পানিই আবার জীবন বিপন্ন করে থাকে। পানি নিয়ে এবারে থাকছে অঁ ভোগ আয়োজন…

 

পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ৭০ ভাগ পানি দিয়ে বেষ্টিত। পৃথিবীর মোট পানির ৯৭ ভাগ দিয়ে সমুদ্র গঠিত আর বাকি ৩ভাগ দিয়ে নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, গেøসিয়ারসহ, অন্যান্য সবকিছু গঠিত। এই পানি কখনো তরল, কখনো বরফ আবার কখনো বাষ্প হয়েছে আবার সময়কালে বৃষ্টি হয়ে ভূপৃষ্ঠে ঝরে পড়েছে। পৃথিবীতে জল প্রতিনিয়তই বাষ্পীভূত, ঘনীভূত, বাষ্প ত্যাগ, ইত্যাদি বিশিষ্ট পানিচক্রের মাধ্যমে ঘূর্ণায়মান। বাষ্পীভূত ও বাষ্প ত্যাগের কারণেই পৃথিবীতে বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ইত্যাদি ঘটে। এভাবে পৃথিবীতে পানির পরিমাণ সবসময় একই থেকেছে।

পৃথিবীতে পানির উৎপত্তি

ধারণা করা হয়, পৃথিবী সৃষ্টি হয় প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে, এবং ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাসাগর গঠিত হয়। এই মহাসাগর সৃষ্টিতে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ পানি পৃথিবীতে এলো কীভাবে ? বিজ্ঞানীদের কাছে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এক ধাঁধা।

দুইটি হাইড্রোজেন অণু ও একটি অক্সিজেন অণু মিলে পানির অণু [ঐ২ঙ] গঠন করে। মহাবিস্ফোরণের  অল্পকিছুক্ষণ পরেই বিগ-ব্যাং থেকে উদ্ভূত কিছু কণা একত্র হয়ে প্রথম পরমাণু হাইড্রোজেন [ঐ] গঠন করে কিন্তু অক্সিজেন [ঙ] তৈরি করতে মহাবিশ্ব প্রায় এক বিলিয়ন বছর সময় নেয়। অক্সিজেন প্রথম তৈরি হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণের [ঝঁঢ়বৎহড়াধ ঊীঢ়ষড়ংরড়হ] মাধ্যমে। এরপর হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিত হয়ে পানির অণু গঠন করে এবং মহাবিশ্বের ধুলিকণার সাথে মিশে থাকে। বিভিন্ন গ্যালাক্সির নেবুলা পর্যবেক্ষণ করেও পানির অণুর অস্তিত্বের সপক্ষে প্রমাণ মিলেছে, অর্থাৎ মহাবিশ্বে বেশ আগে থেকেই পানি ছিল। তা হলে এটা নিয়ে আর চিন্তা কী ? কিছু তো গড়বড়ে ব্যাপার আছেই। সূর্যের চারপাশে আবর্তনরত আন্তঃনাক্ষত্রিক ধুলিকণা [ওহঃবৎংঃবষষধৎ উঁংঃ] থেকে যখন পৃথিবী সদ্য গঠিত হয়েছিল তখন এর তাপমাত্রা প্রায় সুর্যের তাপমাত্রার সমান ছিল, উপরন্তু বায়ুমÐল-জাতীয় কোনো খোলক ছিল না। তাই উক্ত ধুলিকণাতে যদি পানি উপস্থিতি থাকত সেটা বাষ্প হয়ে মহাশূন্যে চলে যাওয়ার কথা। সুতরাং, পানি নিশ্চয় পৃথিবী গঠিত হওয়ার পরে এসেছিল।

পৃথিবীতে পানির উৎপত্তি বা উৎস সম্পর্কে মোটামুটি চারটি ধারণা বেশ জোরালো অবস্থানে আছে। প্রথমত পৃথিবীতে আছড়ে পড়া গ্রহাণু [অংঃবৎড়রফং] বা উল্কাপিÐের [গবঃবড়ৎরঃবং] সাথে পানির আগমন ঘটেছিল। দ্বিতীয়ত, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পৃথিবীর অভ্যন্তরেই পানি উৎপন্ন হয়েছিল, যেটা পরবর্তীসময়ে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের [ঠড়ষপধহরপ ঊৎঁঢ়ঃরড়হ] মাধ্যমে বায়ুমÐলে বাষ্প আকারে জমা হয় এবং বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। তৃতীয়ত, আন্তঃনাক্ষত্রিক ধুলিকণাতে শুরুতেই পানির অণু ছিল, এই ধুলিকণা জড়ো হয়ে পৃথিবী গঠন করে এবং সেখান থেকেই পানির উৎপত্তি। চতুর্থত, ধূমকেতু পৃথিবীতে পানি বয়ে নিয়ে আসে। এই চারটি ধারণার কোনোটাই পৃথিবীতে পানির উৎপত্তি সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি যদিও, তবে প্রতিটারই জোরালো ভিত্তি আছে।

যাহোক, নিশ্চিত করে বলা যাবে না পৃথিবীতে পানি কীভাবে এসেছে কিংবা আগে থেকেই ছিল কি না ! হয়ত এর কোনো একটি ঠিক বাকিগুলো ভুল। আবার এমনো হতে পারে মোট পানির একাংশ পৃথিবীতে ছিল, বাকি অংশ বাইরে থেকে এসেছে।

 

স্বাদ ও গন্ধ

বিভিন্ন ধরনের পদার্থ পানিতে দ্রবীভূত হয়ে তাতে বিভিন্ন স্বাদ ও গন্ধের সৃষ্টি করতে পারে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী তাদের ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করতে সক্ষম যে কোন পানি পান করার উপযুক্ত। কোনো প্রাণীই লবণাক্ত অথবা দূষিত পানি পান করে না। ঝরনার পানি এবং খনিজ মিশ্রিত পানিতে যে স্বাদ পাওয়া যায় তা সেই পানিতে মিশ্রিত খনিজ পদার্থ থেকে উদ্ভূত। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি [ঐ২ঙ] সম্পূর্ণ স্বাদহীন ও গন্ধহীন। খনিজ মিশ্রিত পানির বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে যে বিশুদ্ধতার দাবি করা হয় তা আসলে পানিতে কোনো ধরনের জীবাণু, দূষিত পদার্থ অথবা বিষের অনুপস্থিতিই নির্দেশ করে। প্রকৃত অর্থে সেই পানি বিশুদ্ধ নয়। কারণ তাতে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মিশ্রিত থাকে।

পানির গুরুত্ব

পানি ছাড়া কোনো প্রাণী এবং উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারে না। তাই পানির অপর নাম জীবন। আমাদের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে পানি প্রয়োজন। কৃষি, গৃহস্থালি এবং শিল্পকারখানায় নানা কাজে ব্যবহৃত হয় পানি। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানব দেহের শতকরা ৬০ ভাগ পানি। শরীরের কার্যক্রম চালাতে পানি অনেকটা জ্বালানির মতোই কাজ করে। একজন সুস্থ মানুষের শরীরে প্রতিদিন দুই থেকে তিন লিটার পানির প্রয়োজন হয়। পানিশূন্যতার কারণে যেকোনো প্রাণী এবং উদ্ভিদের মৃত্যু হতে পারে। তাই পানির গুরুত্ব অপরিসীম।

পানি পানের ঠিক নিয়ম

ঠিক পদ্ধতিতে পানি পান না করলে শরীরের কোনো উপকারই হয় না। তাই তো তৃষ্ণা মিটলেও শরীরের ভেতর প্রবেশ করা পানি আদৌ আমাদের দেহের কোনো কাজে লাগে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পানি পানের সময় সাধারণত যে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে, সেগুলো হলোÑ

১. অনেকই আছে যারা পানি পানের সময় একেবারে অনেক মাত্রায় পানি পান করে থাকেন এবং এমন করতে গিয়ে পানি প্রায় গিলে গিলে খান। এইভাবে পানি পান করলে শরীরের ভিতর হঠাৎ করে চাপ খুব বেড়ে যায়, ফলে নানাবিধ অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সব সময় অল্প অল্প করে পানি পান করতে হবে।

২. শরীরে পানির পরিমাণ কমতে থাকলে নানাবিধ লক্ষণের প্রকাশ ঘটে থাকে। যেমন ধরুন প্রস্রাব হলুদ হতে থাকে, সেইসঙ্গে ঠোঁট এবং গলা শুকিয়ে যায়। এ-ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পেলে সঙ্গে সঙ্গে পানি পান করা জরুরি। এই বিষয়ে যত সচেতনতা বাড়বে, তত রোগের প্রকোপ কমতে থাকবে। কারণ, শরীর চাঙ্গা রাখতে পানি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

৩. শরীরের কথা ভেবে এই বিষয়টা সর্বক্ষণ মনে রাখতে হবে যে, ভুলেও দাঁড়িয়ে পানি পান করা চলবে না। কারণ, এমনটা করলে দেহের ভেতর জলের ভারসাম্য ঠিক থাকে না। ফলে জয়েন্টে পানি জমে গিয়ে আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। তাই যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, বসে পানি পান করতে হবে।

৪. ঘুম থেকে উঠেই পানি পান করলে শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিক উপাদানগুলো বেরিয়ে যায়। ফলে রোগভোগের আশঙ্কা একেবারে কমে যায়। এ-কারণেই তো ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে কম করে দুই গøাস পানি পান করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। গবেষণায় দেখা গেছে, সকাল সকাল পানি পানের অভ্যাস করলে কিডনি এবং ইনটেস্টাইনের কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

৫. চিকিৎসকেদের মতে খাবার খাওয়ার কম করে আধা ঘণ্টা পর পানি পান করা উচিত। এমন না করলে হজমে সহায়ক পাচক রসের কর্মক্ষমতা কমতে শুরু করে। ফলে হজম ঠিকমতো না হাওয়ার কারণে বদ-হজম এবং গ্যাস-অম্বলের মতো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

৬. কিডনির সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদেরাগ ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা আছে, এমন রোগীদের চিকিৎসকেরা পানির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন।

৭. ভারি কাজকর্ম বা ব্যায়ামের পর তিন-চার গøাস পানি পান করুন। হ

গ্রন্থনা : তৃষা আক্তার

পানি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

১  সারা পৃথিবীতে ৬৬.৩ কোটি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে ভুক্তভোগী। এত সংখ্যক মানুষের বাড়ির কাছাকাছি পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা নেই

২     পৃথিবীর মোট তিন ভাগ পানি ও একভাগ স্থল। এমন কথা আমরা ছেলেবেলা থেকেই বইয়ের পাতায় পড়ে এসেছি। তবে সেই পানির কতটা ব্যবহারযোগ্য তা আমরা অনেকেই জানি না। ফলে নদী, খাল, বিল, সাগর, সমুদ্রে প্রচুর পানি থাকলেও তার সমস্তটা ব্যবহারযোগ্য নয়

৩    দেখা গেছে, পৃথিবীর মোট পানির ৯৭ শতাংশ হলো সমুদ্রের নোনা পানি। ফলে তা পানযোগ্য নয়। বাকি তিন শতাংশের মধ্যে দুই শতাংশ বরফ হয়ে হিমবাহ বা অন্য জায়গায় জমে রয়েছে। ফলে সারাপৃথিবীর মানুষের ব্যবহারের জন্য রয়েছে শুধুমাত্র এক শতাংশ পানি

৪    আটলান্টিক মহাসাগর সারাপৃথিবীর মোট সামুদ্রিক পানির ২৩ শতাংশ ধারণ করে রেখেছে। এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে মোট পানির ৪৮ শতাংশ রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

৫     সারা পৃথিবীতে সমন্ত নদী মিলিয়ে যে-পরিমাণ পানি রয়েছে তার চেয়ে বেশি পানি মজুত রয়েছে পরিবেশে, হাওয়ায়। যদি পরিবেশে মিশে থাকা সমস্ত পানিকণা একসঙ্গে বৃষ্টি আকারে ঝরে পড়ে তা হলে পৃথিবীর সমস্ত ভ‚ভাগ গড়ে এক ইঞ্চি পানি নিচে ডুবে যাবে

৬    একটি সাধারণ নল দিয়ে মিনিটে দুই গ্যালন করে পানি বের হয়। প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার সময়ে কলের মুখ বন্ধ করে রাখলে ফি-দিন আপনি চার গ্যালন করে পানি বাঁচাতে পারেন। এমনকি বিভিন্ন পাবলিক টয়লেটে দিনে গড়ে ২০০ গ্যালন করে পানি নষ্ট হয় বলেও দেখা গেছে

৭    সারাপৃথিবীতে ১৮০ কোটি মানুষ দূষিত পানি পান করে বেঁচে রয়েছেন। ফলে ডায়রিয়া, কলেরার মতো রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়

৮    পানি খরচে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবাসী। প্রতিদিন একজন আমেরিকাবাসী গড়ে ১০০ গ্যালন পানি ব্যবহার করে। সেখানে ইউরোপীয়রা গড়ে ৫০ গ্যালন, সাব সাহারন আফ্রিকার বাসিন্দারা মাত্র ২-৫ গ্যালন পানি জনপ্রতি ব্যবহার করতে পারেন

৯     বাংলাদেশ ও ভারতের মতো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে মূলত মহিলারা পানি জোগাড়ের কাজ করেন। সারাদিনের এক চতুর্থাংশ সময়ই এই কাজে অতিবাহিত করেন তারা

১০    প্রতিবছর নোংরা পানি ব্যবহার করে ও শৌচাগারের অভাবে সারা বিশ্বে ৮ লাখ ৪২ হাজার মানুষ মারা যান। সারা বিশ্বে বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের ব্যবহার সঠিক হলে মোট রোগ ৯.১ শতাংশ হারে কমবে। সবমিলিয়ে মৃত্যুর হার ৬.৩ শতাংশ হারে কমবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here