Home বিশেষ রচনা নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের দ্বারা অনেক কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব -ড. কামালউদ্দিন কবির

নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের দ্বারা অনেক কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব -ড. কামালউদ্দিন কবির

494
0
SHARE

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

 

আনন্দভুবন : আপনি শিক্ষক হিসেবে নাট্যকলা বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন কিংবা কেন শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে পাঠদান করাতে চান ?

কামাল উদ্দিন কবির : আমার কাছে নাট্যকলা বিষয়টি হচ্ছে এমন একটি বিষয় ; যেটি দিয়ে আসলে সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতির বিশেষ পাঠ গ্রহণ করা সম্ভব। আমি যদি আমার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবস্থান ও জনসংস্কৃতির প্রাণবন্ত ইতিহাস জানতে চাই, তা হলে মূলত গীতরঙ্গ পাঠ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই সেটা জানতে পারব। অতএব, গীতরঙ্গের গীত-বাদ্য-নৃত্য সকল উপদানের সমন্বয়ে যে আঙ্গিকটি তৈরি হয়, সেটি হচ্ছে নাট্যকলা। নাট্যকলা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গণমাধ্যম ; যেটি সরাসরি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। অন্যান্য শিল্পও সংযোগ স্থাপন করে ; তবে নাট্যকলার ক্ষেত্রে এই সংযোগ স্থাপনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, দর্শক এখানে নিষ্ক্রিয় থাকে না।

ইদানীং আমার মনে হয়, শিশুশিক্ষার সঙ্গে নাট্যকলার শিক্ষার্থীরা যুক্ত হলে ইতিবাচক একটা ফল ফলবে। কারণ, এখন আমরা জানি যে, শিক্ষার কাজ কেবল মুখস্থ করানো আর পরীক্ষায় পাস করানো নয়। শিক্ষা মানে হচ্ছে একটা বিষয়ের সঙ্গে কাউকে আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা। আপনি সাহিত্য বলুন, সমাজ বলুন, দর্শন কিংবা ইতিহাস            বলুন ; সবের সারকথা কিন্তু এই নাট্য মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব।

আনন্দভুবন : এই যে আপনি বললেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর শেষ করে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, থিয়েটারের সঙ্গে থাকছে না। থিয়েটার থেকে অর্থ রোজগারের সুযোগ নেই বলে কি ?

কামালউদ্দিন কবির : তা তো বটেই। সে তো থিয়েটারের অন্য কর্মীদের মতো কাজ করতে পারবে না। তার তো জীবিকার প্রশ্ন আছে।

আনন্দভুবন : প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পেশাদারিত্বের বিকল্প কোনো ভাবনা বা প্রক্রিয়া হতে পারে কি ? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে ?

কামালউদ্দিন কবির : নাট্যকলা বিভাগ খোলা হচ্ছে, নাট্যকলায় ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে, এটা একটা ভালো দিক। এই বিষয়টাকে আরও একটু কার্যকরী করার জন্য এই বিভাগগুলোর যদি একটা পেশাদারি নাট্যদল থাকে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর শেষ করে এই রেপার্টরি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত থাকবে নির্দিষ্ট শর্তের মধ্যে ; যে তারা ৩-৪টি প্রযোজনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এজন্যে একটা টিম থাকবে ডিরেক্টর-পারফর্মার। ব্যাপারটা হবে এমন, যদি সাদামাটাভাবে বলি, যেমনÑ আমাদের ৬৪টি জেলা আছে, এই ৬৪টি জেলায় যদি ৬৪টি ট্রিপ হয়, তা হলে ৬৪টি জেলায় তিনটি করে নাটকের প্রদর্শনী হতে পারে। সেই তিনটি নাটক তিনটি আঙ্গিকে যেমনÑ একটি যাত্রা, একটি ইউরোপীয় আরেকটি নিরীক্ষাধর্মী নাটক, তা হলে কেমন হয় ? মানুষের মাঝে কতরকমের প্রভাব পড়তে পারে। যাত্রা শব্দটা উচ্চারণ করলেই এখন আমাদের শিক্ষিত সুশীলজনেরও নাক কুঁচকে যায়, কেন ? ১৯৭৫-এর পরে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিকগুলোকে একেবারেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে। সে কারণে যাত্রা শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমাদের ভদ্রজনদের একটু অসুবিধা হয়। নাট্যকলার শিক্ষার্থী হিসেবে আমি কেন আমার এই শক্তিশালী আঙ্গিকটি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করব না ?

আনন্দভুবন : জগন্নাথ বিশ্বদ্যিালয়ে কি তেমন কিছু করার চেষ্টা বা ইচ্ছে আছে ?

কামালউদ্দিন কবির : দেখা যাক, আগে তো স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বের হোক। যদিও এ-বিষয়ে একটা মনোযোগ আছে। অবশ্য একটা শুভবোধের ঘাটতি আছে। কিন্তু কেন যে চারপাশটা ইতিবাচক দেখি না, যে-কারণে কাজগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। একটু হতাশও হই মাঝে মাঝে। কারণ, নাট্যকলায় যারা পড়তে আসে তাদের পারিবারিকভাবে পূর্ণ সমর্থন থাকে না। এমনকি নাট্যকলায় যে শিক্ষার্থীরা পড়ে তাদেরও অনেক সমস্যা তৈরি হয়। টিউশনি করতে পারে না। তাতে অন্য একটি পরিচয় দিয়ে টিউশনি করতে হয়। এটা খুবই সমস্যাজনক। এই সমস্যার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে যেতে হয়। দৃষ্টিভঙ্গি যদি পরিবর্তন করতে হয়, তা হলে ভালো উদাহরণ তৈরি করতে হবে। আমাদের বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা যখন ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’ যাত্রাপালা করল, তখন দেখামাত্রই মিলনায়তনে উপস্থিত দর্শকদের অভিব্যক্তিতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। এজন্যে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।

আনন্দভুবন : নাটকে পেশাদারিত্ব তৈরির সঙ্কট কোথায় ?

কামালউদ্দিন কবির : এটার জন্য আসলে কাউকে বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যাবে না। এটা কোথায় ঘাটতি আছে, সেটা আমরা সকলে মিলে ভাবতে পারি। নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের দ্বারা অনেক কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব। শুধু এই নাট্যকলা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিই না, সমাজের নানাবিধ অন্ধকার এবং সেক্ষেত্রে করণীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা সম্ভব।

আমি ঠিক জানি না, শিল্পকলা একাডেমি পেশাদারি থিয়েটার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে কি না। আমাদের নীলু ভাই [কামাল উদ্দীন নীলু] ‘সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার’র মাধ্যমে কতগুলো কাজ উপস্থাপন করেছিলেন। যেখানে পেশাদারি চর্চার একটি প্রক্রিয়া ছিল। কিন্তু এও কোনো ভিত্তি পায়নি বলে মনে হয়। মঞ্চ সঙ্কটের কথা বলেন অনেকে, আমি সেটা মনে করি না। আমি যদি থিয়েটার করতে চাই, তা হলে মঞ্চ বিকল্পভাবে হতে পারে। অতএব সঙ্কট আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায়। যারা সত্যি সত্যি নাট্যকলাকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী, তাদের নির্বাচন করে পরিকল্পনামাফিক সম্মানজনকভাবে পেশাদারি ক্ষেত্র তৈরি করা যেতে পারে। সেটা শিল্পকলা একাডেমি বা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। যারা থিয়েটারকে পেশা হিসেবে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে চায় সারাদেশে এমন অসংখ্য না হলেও এমন কিছু মানুষ তো আছে।

আনন্দভুবন : বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভর্তি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যারা নাট্যকলায় ভর্তি হচ্ছে, তারা কি আগ্রহ বা সদিচ্ছা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে ? নাট্যকলায় ভর্তির বর্তমান এই প্রক্রিয়াকে আপনি যথাযথ মনে করেন কি ?

কামালউদ্দিন কবির : এটা একটা ভয়াবহ জটিল অবস্থা। যার আগ্রহ আছে সে হয়ত এই প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণই করতে পারছে না। আবার যারা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুযোগ পায়, তারা নাট্যকলায় পড়ার মানসিক পারিপার্শ্বিক সমর্থন পায় না। এর মধ্যেও যারা সুযোগ পাচ্ছে, তাদের মধ্যে আগ্রহের জায়গাটি খুবই কম। নাট্যকলায় যারা এই প্রক্রিয়ায় ভর্তি হচ্ছে, তারা ঠিক ঠিক নাট্যকলায় পড়ার মূল জায়গাটিতে যেতে পারে না বলেই আমার ধারণা।

আনন্দভুবন : আপনি এখন বিভাগের চেয়ারম্যান একইসঙ্গে কারিকুলামের সঙ্গে যুক্ত। ভর্তি প্রক্রিয়ার  ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন বা সংযোজনের বিষয়টি ভাবছেন কি ?

কামালউদ্দিন কবির : আমরা গত বছর থেকে কিছুটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। সেটা হলো আমরা বাছাই করা তালিকার মধ্য থেকে একটি লিখিত পরীক্ষা নিয়েছি। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি একজন শিক্ষার্থী সে নাট্যকলায় পড়ার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে আগ্রহী কি না ? এটাসহ আরও একটু ভেবে বিজ্ঞজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে একটা ভালো পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আবার নাট্যকলায় যারা পড়তে আগ্রহী তারা রেজাল্টের কারণে পড়তে পারছে না ; সে ধরনের আসন তৈরি করা উচিত। তবে সুখের কথা, এবার থেকে অর্থাৎ ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির ব্যাপারে উপাচার্য মহোদয় নাট্যকলা সংগীত চারুকলা ও ফিল্ম-টেলিভিশন বিভাগে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি আগেই বলেছি, থিয়েটারে যারা পাশ করে বের হচ্ছে থিয়েটারে পেশাদারিত্ব তৈরি হয়নি বলে অনেকেই মিডিয়ায় যাচ্ছে। আজ যদি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেত তা হলে তারা শিক্ষকতা করতে পারত। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সিলেবাস আছে, নাটকলা পড়ানোর অনুমোদন আছে কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই। এখানেও সঙ্কট। কী করেই বা একজন শিক্ষার্থী সে তার পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে থিয়েটারকে নিয়ে বড়ো করে ভাববে ?

আনন্দভুবন : থিয়েটার শিক্ষক, থিয়েটার কর্মী ও থিয়েটার গবেষক থিয়েটারের এই তিন পরিচয়ের মধ্যে আপনি নিজে কোন পরিচয়কে প্রাধান্য দেন ?

কামাল উদ্দিন কবির : এটা আমার জন্য বলা একটু মুশকিল। পদ-পদবি নিয়ে আমি এত যন্ত্রণার মধ্যে আছি, সে কথা আর কী বলব। মূলত নিজেকে শিক্ষাকর্মী মনে করি। আমার সৌভাগ্য যে শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হকের সান্নিধ্যে আমি তার শেষ ১২টা বছর কাটাতে পেরেছি। তাঁর এই সান্নিধ্য পাওয়ার ফলে আমি আমার পূর্বের সকল পাঠপ্রক্রিয়া ও ভাবনা সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলেছি। তার মধ্যে আমি দেখেছি যে, আগে নিজস্ব ইতিহাস জানতে হবে। তারপর সামনে যেতে হবে।

নালন্দার মতো একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। যেখানে শিক্ষাটা কোনো চাপ না। কোনো লোভের বিষয় না। শিক্ষাটা হলো আনন্দের বিষয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে এমন শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্নই শুধু নয়, চেষ্টা করেছিলেন। আমিও এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি। সত্যি কথা বলতে কি, আমি নাট্যকলায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে, তার নাটক পড়েও রবীন্দ্রনাথকে চিনতে পারিনি, রবীন্দ্রনাথ আসলে কে ? এটি আমি ওয়াহিদুল হকের হাত ধরে চিনতে শিখেছি। আমি একবার ওয়াহিদ ভাইকে বলেছিলামÑ রবীন্দ্রনাথ এত নাটক লিখেছেন কিন্তু নাটকের ব্যাপারে কোনো তত্ত¡ রচনা করেননি কেন ? কেবল রঙ্গমঞ্চ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তখন ওয়াহিদ ভাই বললেনÑ তুমি কি ‘জীবনস্মৃতি’, ‘ছিন্নপত্রাবলী’ পড়েছ ? তুমি ‘সমাজ’, ‘স্বদেশ’, ‘আত্মপরিচয়’ এই বইগুলো পড়েছ ? আমি বললাম না। পরে আমি এই বইগুলো পড়তে থাকি এবং প্রায় একইসময়ে আমি হাতে পাই কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী প্রণীত ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থ বিধি। তাতে করে দেশ-সমাজ-মানুষ-ধর্ম-শিক্ষা-শিশুশিক্ষা-পূজা-প্রেম-আলো ইত্যাদি হরেক প্রসঙ্গ আমি নতুনভাবে উপলব্ধি করবার সুযোগ পেয়েছি। এসব নিয়েই আমি সামনে যেতে চাই। হ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : প্রশান্ত অধিকারী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here