Home রঙ্গশালা/আবৃত্তি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন নাটক লিখেছি -অলোক বসু

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন নাটক লিখেছি -অলোক বসু

1183
0
SHARE

অলোক বসু নাটকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৩০ বছর ধরে। পরিবারের প্রায় সকলেই ছিলেন নাটকের মানুষ। বহু  নাটকের বই নেড়েচেড়ে বেড়ে ওঠা তার। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন খেলার ছলে নাটক রচনা করেছিলেন। সে-নাটকে অভিনয় করে সকলের প্রশংসা কুড়িয়ে বর্তমানে তিনি সফল একজন নাট্যরচয়িতা, নির্দেশক এবং অভিনয়শিল্পী। তার নতুন সংগঠন ‘থিয়েটার ফ্যাক্টরি’র নতুন চমক নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই দর্শকের সামনে হাজির হবেন অলোক বসু। এবারের আনন্দভুবনের রঙ্গশালায় থাকছেন অলোক বসুর নাট্যজগতের কথা…

 

আনন্দভুবন : কেমন আছেন ?

অলোক বসু : ভালো আছি। [হাসি]

আনন্দভুবন : কবে, কীভাবে মঞ্চনাটকে যাত্রা শুরু হলো আপনার ?

অলোক বসু : আমার মূলত মঞ্চনাটকে যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের সঙ্গে। এই যাত্রার আগে আমার কিছু ইনফরমাল কাজ রয়েছে। আমাদের গ্রামে [বরিশাল] আমার পরিবার খুব শিক্ষিত ছিল। তখন বর্তমানের মতো এত শিক্ষিত পরিবার ছিল না। আমার বাবা, চাচা তারা সেই সময়ে গ্রাজুয়েট ছিলেন। আর আমার বাবা ছিলেন গ্রামের হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। তাই আমাদের পরিবারের  পরিমÐলে ছিল সাংস্কৃতিক আবহাওয়া। বাড়িতে বই ছিল প্রচুর, বিশেষ করে নাটকের বই। আমাদের বার্ষিক একটি নাটক হতো, সেই নাটকে আমার বাবা, চাচা, দাদু সবাই অভিনয় করতেন। অনেক নাটক হতো, তবে বিশেষ করে ঐতিহাসিক নাটক হতো বেশি। সেই সময়ে আমার থেকে বয়সে অল্প বড়ো একজন কাকা ছিলেন। তিনি সব সময় নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেতেন কিন্তু আমি পেতাম না। সেই সময়ে মনে হতো আমি পারছি না কেন, আমাকেও পারতে হবে। সেই সময়ে আমাদের গ্রামে একটি নাটক হয়। সেই নাটক দেখার পরে কয়েকদিনের মধ্যে আমি সেই নাটকটি আমার মতো করে লিখে ফেললাম। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। সেই নাটকে আমার বন্ধুরা, পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে অভিনয় করলাম কোনো এক সন্ধ্যাবেলা। পরিবারের সবাই সেখানে উপস্থিত ছিল। তখন আমার নাটকের মূল দর্শক ছিল আমার পরিবার। পাড়ার অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল। সেটা আমার বড়ো অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। আমি নাটক লিখতে পারি, নির্দেশনা দিতে পারি, অভিনয়ও করতে পারি। এরপরে স্কুলে, পাড়ায় আরো অনেক জায়গায় আমি নাটকে কাজ করেছি, এগুলো ছিল আমার ইনফরমাল মঞ্চনাটকের ইতিহাস। এরপরে আমি প্রফেশনালি ১৯৮৯ সালে ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হই এবং সেখানে অভিনয় করি। এভাবেই মঞ্চনাটকে পথচলা।

আনন্দভুবন : প্রথম সংগঠন ‘আরণ্যক’র সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন ?

অলোক বসু :  ‘আরণ্যকে’ যুক্ত হওয়ার আগে আমি ঢাকার একটি দলে কাজ করতে গিয়েছিলাম পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে। তো সেখানে গেলাম কোনো এক সন্ধ্যায়। কিন্তু তাদের কাজ দেখে আমি তেমন সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ-ধরনের কাজ তো আমিই পারি। আমি চেয়েছিলাম অন্যরকম কিছু, আলাদা কিছু, তাই আর ঢুকিনি। ১৯৮৮ সালে বন্যার পরে ‘আরণ্যক’ নাট্যদল একটি উৎসব করেছিল। সেখানে কলকাতার অভিনয়শিল্পীরা এসেছিলেন। বিভাষ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় তারা একটি নাটক করে সেই নাটক দেখে আমি খুব অনুপ্রাণিত হই। নাটকটি ছিল আমাদের ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র উপর। তারপর চেষ্টা করলাম ‘আরণ্যক’ নাট্যদলে যোগ দেওয়া যায় কি না বা কাজ করা যায় কি না। এর কিছুদিন পরে দেখলাম ‘আরণ্যকে’ অভিনয়শিল্পী নেবে অভিনয়ের জন্য। তো আমি যথারীতি আবেদন করলাম, সেখানে অডিশন দিয়ে পাশ করলাম এবং আরণ্যকে কাজ করতে শুরু করলাম। আমি আরণ্যক নাট্যদলে যুক্ত হলাম।

আনন্দভুবন : বর্তমানে কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন ?

অলোক বসু : আমি আরণ্যকে কাজ করেছি পাঁচ বছরের মতো। এরপরে আমরা কয়েকজন মিলে একটি সংগঠন চালু করি তার নাম দিই ‘নাট্যধারা’। আমি নাট্যধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম ২৪ বছর। গতবছর ২০১৭ সালে আমি যেকোনো কারণবশত ‘নাট্যধারা’ থেকে পদত্যাগ করি। ‘নাট্যধারা’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলাম আমি। ‘নাট্যধারা’য় দীর্ঘদিন কাজ করেছি। ‘নাট্যধারা’র বেশির ভাগ নাটকই আমার করা। আমি চলে আসার পর এখনো ওরা আমার নাটক করে। ২০১৭ সালে ২০ অক্টোবর আমরা কয়েকজন মিলে নতুন একটি নাট্যসংগঠন তৈরি করি, সেটির নাম হলো ‘থিয়েটার ফ্যাক্টরি’। গত বছর থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি। আশা করি ২০১৮ সালের মধ্যে আমাদের প্রথম প্রযোজনা নিয়ে দর্শকের সামনে উপস্থিত হতে পারব।

আনন্দভুবন : ‘আরণ্যকে’ প্রথম নাটকের স্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাই ?

অলোক বসু : ‘আরণ্যকে’ই আমার মূল আত্মপ্রকাশ। ‘আরণ্যক’ দু-ধরনের নাটক করে থাকে। পথনাটক এবং মঞ্চনাটক। আমি প্রথমে যে-পথনাটক করেছিলাম সেটি হলো ‘আদাব’। সমরেশ বসুর একটি বিখ্যাত গল্প আছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ওপরে। সেই গল্পটির নাট্যরূপ দিয়েছেন মান্নান হীরা এবং নির্দেশনা দিয়েছেন আজিজুল হাকিম। এটি হলো পথনাটক। আর মঞ্চে ছিল ‘কোরিওলেনার’। এর আগে অবশ্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে একটি নাটক করেছিলাম। তবে আমার মঞ্চে আত্মপ্রকাশ হলো ‘কোরিওলেনার’ দিয়ে। এটি ছিল শেক্সপিয়ারের একটি নাটক। এটার অনুবাদ করেছিলেন মান্নান হীরা এবং নির্দেশনা দিয়েছিলেন মামুনুর রশীদ।

আনন্দভুবন : আপনি তো সেই তৃতীয় শ্রেণি থেকে মঞ্চনাটক করেন তবে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে মঞ্চে পা রাখলেন আরণ্যকের মাধ্যমে সেই অনুভূতি কেমন ছিল ?

অলোক বসু : আমার মনে হয়েছিল, এই বুঝি আমার জার্নি বা সফর শুরু হলো। ছেলেবেলায় নাটক ছিল অন্যরকম। ডিমের যেমন ওপরের সাদা অংশ আমরা দেখতে পারি কিন্তু ভেতরের অংশ দেখতে পারি না, সেটা ছিল ওই রকমের। যখন আমি ‘আরণ্যকে’ যুক্ত হলাম তখন আমার মনে হলো যে, আমি উঠতে শুরু করলাম। আমার অনেক কাজ আছে সামনে। কাজগুলো আমাকে করতে হবে। আমাকে নাটক করতে হবে। সেই জায়গা থেকে আমি আজ পর্যন্ত কাজ করে চলেছি।

আনন্দভুবন : সম্প্রতি কী নিয়ে ব্যস্ততা চলছে ?

অলোক বসু : সম্প্রতি আমার লেখা ও নির্দেশনায় একটি নাটক ‘অতঃপর মাধো’ নিয়ে ব্যস্ত আছি। সেটি করেছি ‘মেঠোপথ’ নামে একটি থিয়েটারের সঙ্গে। ‘মেঠোপথ’ একটি নতুন দল। এই নাটকটির বেশ কয়েকটি শো আছে, আগামী কয়েক দিনের মধে হবে। কলকাতায় হবে নভেম্বরের ১৫ তারিখে, অরেকটি হলো দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি ফেস্টিভ্যাল হয় সেই উৎসবে নাটকটি আমন্ত্রণ পেয়েছে। আমরা ডিসেম্বরের ১ তারিখে সেখানে শো করব। বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিল্ম যায়, নাটকও গেছে দুই-তিনটি। এবার আমাদের নাটকটি যাচ্ছে বিশ্বমানের এই আন্তর্জাতিক উৎসবে। আবার ডিসেম্বরের ১৫ এবং ১৬ তারিখে ভারতের কুচবিহার ও জলপাইগুড়িতে শো আছে নাটকটির। এই নাটকের একটি মজার বিষয় হলোÑ দুইটি মেয়ে তারা একইসঙ্গে তেরটি চরিত্রে অভিনয় করে মঞ্চে। এটা নিয়েই ব্যস্ততা চলছে।

আনন্দভুবন : কোন চরিত্রে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনÑ

অলোক বসু : এটা আসলে বলা মুশকিল তবে ক্লাসিক নাটকে কিছু চরিত্র থাকে, সেগুলো করতে ভালো লাগে। তবে আমি মনে করি, ভালো অভিনেতা নই আমি। অভিনয় করতে সাঙ্ঘাতিকভাবে পছন্দ করি। খুব আনন্দের সঙ্গে কাজটি করি। আমি মূলত নাটক লেখা এবং এর পরে নাটক নির্দেশনার কাজটি বেশি করি। অভিনয় করি ; কারণ, অভিনয় করতে ভালো লাগে তাই।

আনন্দভুবন : অভিনয়, নির্দেশনা, নাটক লেখাÑ এই তিনের মধ্যে কোন ক্ষেত্রটি আপনাকে বেশি টানে ?

অলোক বসু : আসলে আমার নাটক লেখাটা ভালো লাগে বলে নাটক লিখি। এটাই আসলে প্রধান কাজ। তবে কোনো কাজই ছোট নয়, সব কাজই জটিল। যখন নাটক লিখি তখন নরমাল লাগে, যখন নাটক মঞ্চে আসে এবং সবাই খুব প্রশংসা করে তখন মনে হয়Ñ না, আসলে কিছু করতে পেরেছি।

আনন্দভুবন : নাটকের অনুপ্রেরণা কে ছিলেন ?

অলোক বসু : নাটকের অনুপ্রেরণা ছিল আমার পরিবার। আমার বাবা, চাচা তারা সবাই অভিনয় করত, তখন তো আর লেখার সুযোগ ছিল না। তাদের দেখাদেখি আমারও ইচ্ছে হয় আমিও অভিনয় করব।

আনন্দভুবন : আপনার নতুন সংগঠন থিয়েটার ফ্যাক্টরি সম্পর্কে জানতে চাইÑ

অলোক বসু : আমরা খুব চেষ্টা করছি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আমার প্রথম প্রযোজনা নিয়ে আসতে। এর নাম ও বিষয়বস্তু এখন প্রকাশ করা যাবে না। কারণ এটি আমাদের প্রথম নাটক তো, তাই। যতদিন পর্যন্ত মঞ্চে না-আসছে আমরা এটি গোপন রাখার চেষ্টা করছি। তবে বলতে পারি নতুন চমক নিয়ে আসছি।

আনন্দভুবন : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

অলোক বসু : আনন্দভুবনকে অনেক ধন্যবাদ। হ

সাক্ষাৎকার : সোহান আহামেদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here