Home অঁভোগ তালবন্দনা

তালবন্দনা

1855
0
SHARE

শৈশবের কবিতার কথা বললে প্রথমেই মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে’ কিংবা নজরুলের ‘বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে’ এবং কবি মঈনুদ্দীনের ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ’ কবিতাগুলো। এই কবিতাগুলোর মধ্য দিয়েই শৈশবে তাল শব্দের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে বাঙালির। তবে শৈশবে তাল শব্দটি শুধু গাছ এবং ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় তাল শব্দের নানা অর্থ। তালগাছ, তালফল, সংগীতের তাল, পিঠে তাল, তালকানা এমন কত কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাল। তাই তালের অর্থ নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেললেই মুশকিল। এবারের অঁ ভোগ আয়োজনে থাকছে তাল। লিখেছেন তৃষা আক্তার …

তাল যখন গাছ : একসময় প্রামবাংলার পথে পথে দেখা মিলত তালগাছের। বাড়ির আঙিনায়, পুকুরের চারপাশে, রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে তালগাছ লাগানাে হতো। এখন তালগাছের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। তালগাছের আদি নিবাস আফ্রিকায়। বহুকাল আগে এই দেশে তালগাছের আগমন ঘটে। তালগাছ খুব ধীরে ধীরে বাড়ে। উ”চতায় ২০ থেকে ২৫ মিটার হয়ে থাকে এবং দীর্ঘজীবী উদ্ভিদের অন্যতম তাল। তালগাছ ১৪০-১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচে। তাল পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়লিঙ্গের গাছ। একই গাছে দুই রকম ফুল ফোটে না। পুরুষ গাছে ফুল হয়, ফল হয় না, ফুল জটা নামে পরিচিত। পুরুষ তাল গাছের রেণু বাতাসে ভেসে অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়ে পরগায়ন ঘটাতে সম্ভব। বসন্তের শেষে তালগাছে ফুল ধরে, ফল পাকে শরতে। তাল নিয়ে একটি লোক ছড়া খুব জনপ্রিয়Ñ ‘বায়ে লাগায় পুতে চায়, তার পুতে খায় বা না-খায়।’

সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাস সময়ে তালগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। একটি তালগাছ থেকে ৭০০-১৫০০ লিটার পর্যন্ত রস পাওয়া যায়। টাটকা রস শরীরের জন্য বেশ উপকারী। তবে সংগৃহীত রস বিলম্বে পান করলে শরীরে খানিকটা অবশ অনুভূতির সৃষ্টি হবে। তালের রস থেকে তৈরি তালমিসরি সর্দি-কাশিতে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। যকৃত ভালো রাখে এবং পিত্তনাশক হিসেবে কাজ করে। তালের রস হতে গুড়, পাটালি, ভিনেগার ইত্যাদিও তৈরি করা হয়ে থাকে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে তালগাছের ব্যাপক অবদান রয়েছে। তালগাছ টেকসই, লবণ সহিষ্ণু, ভূমিক্ষয় ও ঝড়বাদল প্রতিরোধক একটি গু”ছমূল প্রজাতির গাছ। তালগাছ বজ্র প্রতিরোধক। তালগাছ উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত নিজে গ্রহণ করে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীদের রক্ষা করে। তাই বর্তমানে গ্রামবাসীর তলগাছ রোপণের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হ”েছ।

ঘরের খুঁটি, আসবাবপত্র, নানারকম হস্তপণ্য তৈরিতে তালগাছ এবং তালপাতা ব্যবহার করা হয়। এক সময় তালপাতায় লেখা হত। তাছাড়া তালপাতার হাতপাখা গরমে স্বস্তির এক বিশেষ উপকরণ।

তাল যখন ফল : ভাদ্রমাসের গরম মানেই তালপাকা গরম। কারণ ভাদ্র মাসের প্রচÐ গরমে তাল ফল পাকে। তাই তাল ফলের অন্য নাম হয় ভাদুরে ফল। তাল ফলের আকার গোলাকার চ্যাপ্টা। প্রতি ফলের গড় ওজন ১ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলের রং প্রথমে হলুদ সবুজ, পরিপক্ব ফলের রং হলুদ, খয়েরি কালো রঙের হয়। তাল ফলে এক থেকে দুটি বা তিনটি আটির ফল ধরতে দেখা যায়। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে পাওয়া যায় তালের শাঁস। এই কচি তালের শাঁস সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। ভাদ্রমাসে তালফল পাকে। পাকাতালের মোহনীয় গন্ধ জানান দেয় এটা ভাদ্র মাস। তাল পাকলেই গাছ থেকে ঝরে পড়ে যায়। এটাই প্রকৃত পাকা তালের বৈশিষ্ট্য। এক সময় পাকা তাল কখনো গাছ থেকে পেড়ে কেউ খেত না। গাছ থেকে পড়লেই তাল খাবার উপযুক্ত হয়। আজকাল বাজারে যেসব তাল কিনতে পাওয়া যায় তার বেশির ভাগই হ”েছ পীড়কাটা বা গু”ছকাটা। যেসব কাঁচা তাল গু”ছ থেকে পেড়ে ঘরে রেখে পাকিয়ে বাজরে নিয়ে বিক্রি করা হয়, সেসব তাল পীড়কাটা তাল বা ইঁচড়ে পাকা তাল। এসব তালের স্বাদ হয় তেতো। যেসব তাল পেকে গাছ থেকে মাটিতে পড়ে সেসব তালই হ”েছ প্রকৃত খাবার উপযুক্ত তাল।

বাঙালিরা পাকা তাল দিয়ে মুখরোচক খাবার তৈরি করে। তালের পিঠা, তালের বড়া, তালের ক্ষীর, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার। কচি ও কাঁচা তালের নরম শাঁস পুষ্টিকর এবং গ্রীষ্মের তৃষ্ণা নিবারণে কাজ করে। এছাড়া পাকা তালের রস বের করর পর যে আঁটি থেকে যায় সেই আঁটি ব্যাগে ভরে মাটিতে পুঁতে রাখলে বা ঠান্ডা কোনো ¯’ানে রেখে দিলে কয়েকমাস পর তার অঙ্কুরোদগম হয়। তখন আঁটি কাটলে ভেতর থেকে সাদা রঙের নরম আর্দ্র ও মিষ্টি শাঁস বের হয়। এই শাঁসও বেশ সুস্বাদু।

সংগীতে তাল : তালকে বলা হয় সংগীতের প্রাণ। বলা হয়ে থাকে বেসুরো সংগীত তবুও শ্রবণযোগ্য, তবে তালহীন গান সহ্য করা সম্ভব নয়। শুধু সংগীতই নয়, বাদ্যযন্ত্র এবং নৃত্যের ক্ষেত্রেও তাল অপরিহার্য। তাল হলো সংগীত বা নৃত্যে ছন্দের নিয়ামক এবং ছন্দের অংশগুলোর আপেক্ষিক লঘুত্ব বা গুরুত্বের নির্ধারক। সংগীতে প্রচলিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তালের নাম দাদরা, কাহারবা, আড়াঠেকা, ঝাঁপতাল, চৌতাল, সুরতাল, আড়খেমটা, ধামার ইত্যাদি।

কথায় কথায় তাল : বাঙালির কথায় কথায় চলে আসে তাল। কাÐজ্ঞানহীন মানুষ দেখলে বলা হয় তালকানা। পিঠে কিল মারলে বলা হয় পিঠে তাল পড়েছে। ছোট কোনো ঘটনাকে বড়ো করে বলা তিল থেকে তাল। কোনোকিছুর পিÐ বা দলাকে তাল বলা হয়। কোনো কাজে এলোমেলো কিছু করলে বলা হয় তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। লম্বা গড়নের অধিকারী হলে তাকে তালগাছ বলেও ডাকা হয়। আবার ক্ষীণদেহী ব্যক্তিদের বলা হয় তালপাতার সেপাই। তালগাছে যে বাবুই পাখি বাসা বাঁদে তাদের বলা হয় তালচোঁচ। হিন্দুধর্মে তাল এবং বেতাল দুই পিশাচের নাম। রাজা বিক্রমাদিত্য এদেরকে নিজের অনুচরে পরিণত করেছিলেন। দোন্তিকেরা ভাদ্রমাসের শুক্লা নবমীকে তাল নবমী বলে থাকে। সমাজজীবনেও আমাদেরকে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। অনেক সময় ই”ছা বা অনি”ছা সত্তে¡ও কারো সঙ্গে তাল মিলিয়ে কথা বলতে হয়। বুঝতেই পারছেন, জীবনে যদি না পাকে তাল তবে লেগে যাবে গোলমাল। তাই করতেই হবে তালের বন্দনা। হ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here