Home বেড়ানো ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন শ্রীমঙ্গল

ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন শ্রীমঙ্গল

1608
0
SHARE

দেশের অন্যতম পর্যটন স্থান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল। নানা কারণে খ্যাতি রয়েছে শ্রীমঙ্গলের। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের চায়ের একটি অংশ উৎপন্ন হয় এখানে। শ্রীমঙ্গলে চা বাগানের পাশাপাশি রয়েছে রাবার, লেবু ও আনারসের বাগান। বাংলাদেশের লেবুর চাহিদার বড়ো জোগান আসে শ্রীমঙ্গল থেকে। সবুজ প্রকৃতির মায়াবী রূপের কারণে শ্রীমঙ্গলের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। শুধু দেশে নয়, বিদেশের পর্যটনপিপাসুদের কাছেও এই জায়গাটির কদর রয়েছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে শ্রীমঙ্গলের অবস্থান প্রথম সারিতে। শ্রীমঙ্গলের আশেপাশে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। ঈদের ছুটিতে তাই সপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন শ্রীমঙ্গল ও তার আশপাশের এলাকায়।

মাধবকুণ্ড ঝরনা : বাংলাদেশের উচ্চতম ঝরনা এটি। প্রায় দুইশ ফুট উচু থেকে প্রবল বেগে অনর্গল পানি ঝরে। পানির প্রচণ্ড গতির কারণে নিচে সৃষ্টি হয়েছে একটি পুকুর। পর্যটকদের কেউ কেউ আনন্দে আত্মহারা হয়ে নেমে পড়েন পুকুরের হিমশীতল জলে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঝরনা মাধবকুণ্ড দেখতে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটকের ভিড় জমে।

পরীকুণ্ড ঝরনা : সচরাচর লক্ষ করা যায় দর্শনার্থীরা কেবল মাধবকুণ্ড ঝরনা দর্শন করেই ফিরে আসে। তাদের বেশির ভাগেরই জানা নেই মাধবকুণ্ডের কাছেই রয়েছে পরীকুণ্ড নামে দৃষ্টিনন্দন আরো একটি ঝরনা। মাধবকুণ্ড যেতে পায়ে হাঁটা পথের মাঝামাঝি গিয়ে ডান দিকে নেমে গেছে আর একটি পথ। পথটি ধরে নামলেই ছরা, তারপর ছরা ধরে হাঁটতে হবে বিশ থেকে পঁচিশ মিনিটের মতো। দেখবেন আপনার সামনেই ঝরছে পরীকুণ্ডের অনর্গল ধারা। মাধবকুণ্ড ও পরীকুণ্ড যাওয়ার পথে দুপাশে উঁচু-নিচু পাহাড় ও টিলাগুলো দেখবেন চা-গাছে আবৃত।

শীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা : ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র চিড়িয়াখানা শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত। শীতেশ নামক স্থানীয় এক প্রকৃতিপ্রেমী একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন এই মিনি চিড়িয়াখানা। দিনে দিনে তার সংগ্রহে যুক্ত হয়েছে অনেক প্রজাতির পশুপাখি। সাদা বাঘ, মুখপোড়া বানর, সজারু, হরিণ, উল্লুক, ধনেশ পাখি, একাধিক প্রজাতির কাঠবিড়ালি এই চিড়িয়াখানার অন্যতম প্রাণী। শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন থেকে চিড়িয়াখানায় পৌঁছাতে পনেরো টাকা রিকশাভাড়া লাগে। ভেতরে প্রবেশ করতে দশ টাকার টিকিট কাটতে হয়।

সাত রং চা : চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল যাবেন অথচ সাত রং চায়ের স্বাদ গ্রহণ করবেন না, তা কি হয় ? একই গ্লাসের মধ্যে স্তরে স্তরে সাজানো সাত রং-এর চা ! ভাবতেই যেন কেমন আশ্চর্য লাগে। চা ভর্তি গ্লাসটি যখন আপনার সামনে পরিবেশিত হবে হয়ত বিস্মিত হয়ে ভাববেন, তরল পানীয়কে কীভাবে সাতটি স্তরে সাজানো সম্ভব ! ব্যাপারটি বিস্ময়েরই বটে। অর্ডার করলে গোপন ঘরে প্রস্তুত করার পর সেই চা আপনাকে পরিবেশন করা হবে। প্রতি গ্লাসের মূল্য ৭০-৯০ টাকা।

টি এস্টেট : চাইলে শ্রীমঙ্গলের চা কারখানাও ঘুরে দেখতে পারেন। ‘টি রিসার্স ইন্সটিটিউট’ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের একটি জায়গা। এখানে গেলে দেখতে পাবেন চা প্রস্তুত-প্রণালি। বাগানের ভেতর শ্রমিকদের সঙ্গে খানিকটা সময়ও কাটাতে পারেন। শ্রীমঙ্গলে থাকার জায়গা হিসেবে টি রিসার্স ইন্সটিটিউটের ‘টি রিসোর্ট’ চমৎকার একটি জায়গা। টিলার উপর বিশাল জায়গা নিয়ে নির্মিত রিসোর্টে রয়েছে দশ-বারোটি কটেজ। বৃক্ষের ছায়াতলে অনেক দূরে দূরে একেকটি কটেজ। বড়সড় রেস্তোরাঁর সঙ্গে রয়েছে পুরনো আমলের সুইমিংপুল। পাশেই নেট দিয়ে ঘেরা জায়গার মধ্যে চরে বেড়ায় বেশ কয়েকটি চিত্রল হরিণ। কেবল রিসোর্ট সীমানার মাঝে অবস্থান করে ও আশপাশের চা বাগান দেখেই কাটিয়ে দেয়া সম্ভব দু’তিন দিন।

মাধবপুর লেক : কোন কালে সৃষ্টি হয়েছে এই লেকে তা কেউ বলতে পারে না। সমতল থেকে উঁচুতে পাহাড়ে লেকটির অবস্থান। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব সুন্দর। সময় করে লেকের চারপাশ প্রদক্ষিণ করতে পারলে নিঃসন্দেহে তা হবে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
হাকালুকি হাওর : শ্রীমঙ্গল যাবেন আর হাকালুকি হাওর দেখবেন না তা কি হয়। একই ভ্রমণে ঘুরে আসুন হাকালুকি হাওর ‘মিনি কক্সবাজারখ্যাত হাকালুকি হাওর। ১৯২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল জলরাশি এই হাকালুকি হাওর। শ্রীমঙ্গল থেকে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। এখানকার সাধারণ প্রকৃতি অসাধারণ। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে এই হাওরে বসে অতিথি পাখির মেলা। দেশের সীমানার বাইরে দূর-দূরান্ত থেকে লাখ লাখ অতিথি পাখি এখানে এসে টানা কয়েক মাসের জন্য অস্থায়ী নিবাস গড়ে তোলে। পাখির কলরবে মুখর হয়ে যায় হাকালুকির প্রকৃতি। হাওরের বুকে জমে ওঠা পাখির কলতান উপভোগ করতে শত শত পর্যটক ভিড় জমান শীতের সময়। এই বর্ষায় হাওরের আবার অন্য রূপ দেখা যায়।
সব ঋতুতেই অপরূপ সুন্দর্যময় স্থান বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি হাওর। হাকালুকি হাওর শীতের সময় যেমন অতিথি পাখিদের মিলন মেলায় পরিণত হয়, ঠিক তেমনি জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে নানা প্রজাতির মাছের সম্ভার পর্যটকদের আকর্ষণ করে । ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ‘মিনি কক্সবাজারখ্যাত হাকালুকি হাওর’। প্রতিবছর ঈদের দিন থেকেই পর্যটকদের ভিড় দেখা যায় হাকালুকির পশ্চিম তীর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া বাজার জিরো পয়েন্টে। যেখান থেকে হাকালুকি হাওরকে মিনি কক্সবাজারের মতো দেখায়।
সিলেটসহ ৬ উপজেলাজুড়ে অবস্থিত হাকালুকি শুধু ঈদকেন্দ্রিক নয়, বিভিন্ন সময়ে হাকালুকির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকেরা। এমনকি শিক্ষা সফরেও এখানে আসেন বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাকালুকির দৃশ্য যেখান থেকে অবলোকন করা হয়, সেই ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টে রয়েছে শতবর্ষী বটগাছসহ বৃক্ষরাজি। ঘিলাছড়া বাজারের পাশেই রয়েছে হযরত শাহ জালাল [র.] এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত গোলাপশাহ [র.] এর মাজার। আগন্তুকদের অনেকে ভ্রমণের সময় মাজার জিয়ারত করেন।
বর্ষা মৌসুমে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকেরা। কখনো বাতাসের ক্ষীপ্রগতি উত্তাল করে তোলে হাকালুকি হাওরকে। ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি করে মাছ ধরেন জেলেরা। আবার কখনো নীরব নিস্তব্ধ জলরাশি শীতল পাটি বিছিয়ে যেন কাছে টানে পর্যটকদের। তাই তো স্বচ্ছ জলে আকৃষ্ট হয়ে সাঁতার কাটতে নামেন অনেকেই। আর সাঁতার না-জানা লোকদের জন্য পর্যটকেরা যেন ভ্যানগার্ড হয়ে কাজ করেন বিনিময় ছাড়াই।
নিজ ব্যবস্থাপনাতেই শ্রীমঙ্গল ও তার আশপাশের এলাকা ভ্রমণ করা সম্ভব। ঢাকা থেকে ট্রেনে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক। জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস এবং সুরমা মেইল কমলাপুর থেকে নিয়মিত সিলেট যাতায়াত করে। আপনাকে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল স্টেশনে। এ ছাড়াও ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালি ও ফকিরাপুল থেকে সারাদিনই বাস সার্ভিস রয়েছে। শ্যামলী, সোহাগ পরিবহণ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সৌদিয়া এই রুটের অন্যতম বাস। শ্রীমঙ্গল ও সিলেট ভ্রমণে ট্যুর অপারেটরদের বছরজুড়েই অফার থাকে। তাদের মাধ্যমেও শ্রীমঙ্গল ঘুরে আসতে পারেন।
লেখা : প্রশান্ত অধিকারী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here