Home কাভার গার্ল ইচ্ছেতলার ইচ্ছেগুলো

ইচ্ছেতলার ইচ্ছেগুলো

1079
0
SHARE

‘ইচ্ছেতলায় ইচ্ছে যত, মেলুক ডানা ইচ্ছেমতো’-এমন ভাবনা নিয়েই গড়ে উঠেছে শিশুদের সংস্কৃতি চর্চার একটি অঙ্গন ‘ইচ্ছেতলা’। সুবিধাসম্পন্ন-সুবিধাবঞ্চিত, শারীরিক সক্ষমতা-প্রতিবন্ধকতা, উচ্চশিক্ষা-নিম্নশিক্ষাÑ এসব শব্দ পেছনে ফেলে আর্থিক-বৈচিত্র্য, শারীরিক-বৈচিত্র্য, মেধা-বৈচিত্র্য এসবকিছু মিলিয়ে এক নতুন পৃথিবীর মানুষ হিসেবে শিশুদের গড়ে তোলাই ‘ইচ্ছেতলা’র দর্শন। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার আগে শিশুরা হয়ে উঠবে সৃজনশীল ও সংবেদনশীল মানুষ। আনন্দভুবনের ‘মা ও শিশু’ সংখ্যার বিশেষ আয়োজনে থাকছে ‘ইচ্ছেতলা’ নিয়ে বিস্তারিত…

 

ইচ্ছেতলার যাত্রা

ইচ্ছেতলার যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালের ১১ মার্চ। এর অবস্থান উত্তরায়। ইচ্ছেতলা নামটি রেখেছেন ড. বিপ্লব বালা। ইচ্ছেতলা গড়ে ওঠার পেছনের গল্প প্রসঙ্গে এর প্রধান পরিচালক আফসানা মিমি বলেন, অনেক আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যেখানে শিশুরা সৃজনশীল মননশীল মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে। প্রথমে ২০১৬ সালে বড়োদের জন্য ‘বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন একাডেমি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি আমরা। সেটা করতে গিয়ে দেখলাম, যেসব ছেলেমেয়েরা আসছে তাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে ধারণা খুব কম বা নেই বললেই চলে। এ-বিষয়ে আগ্রহ থাকলেও ছেলেবেলা থেকে চর্চার সুযোগ তারা পায়নি বা চর্চা করেনি। তখন আমরা ভাবলাম, আমাদের প্রথমে শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করতে হবে যাতে এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্তি¡ক দূরত্ব না থাকে। সেই ভাবনা থেকেই ইচ্ছেতলার শুরু। ইচ্ছেতলা শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র। শিশুরা এখানে সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানবে, কাজ করবে। এভাবে যে বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ এবং ভালোবাসা তৈরি হবে তখন সেই বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠবে। ইচ্ছেতলার সাথে যারা যুক্ত রয়েছেন এবং শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তারা প্রত্যেকেই চেষ্টা করেন তাদের সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা দিয়ে শিশুদের সৃজনশীল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার।

 

ইচ্ছেতলার বর্তমান কার্যক্রম

পাঁচ থেকে বারো-তেরো বছর বয়সের সুবিধাসম্পন্ন শিশুরা প্রত্যেক শুক্র ও শনিবার এই দুটো দিনেই ইচ্ছেতলায় আসে বিকাল ৩.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত সাপ্তাহিক ৬ ঘণ্টা সময়ের জন্য এবং একই বয়সের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা আসে সকাল ১০.৩০ থেকে দুপুর ১২.৩০ পর্যন্ত সাপ্তাহিক ৪ ঘণ্টা সময়ের জন্য। এখানে শিশুরা চারু-কারু, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, নাচ-গান, আবৃত্তি, অভিনয়, মার্শাল আর্টের বেসিক ওরিয়েন্টেশন, শরীরচর্চা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে জানে এবং চর্চা করে। এখানে ওরা সিনেমা দেখে প্রজেক্টরে, কখনো  লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখে এবং সে-স্বপ্নের কথা বলে, নিজেরাই গল্প লেখে। বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে তারা অংশগ্রহণ করে। পয়লা শ্রাবণে শিশুরা মেতে ওঠে গাছ লাগানোর উৎসবে। চৈত্রসংক্রান্তি, পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা, হস্তশিল্পপণ্য তৈরি, প্রবারণা পূর্ণিমাতে ফানুস ওড়ানো, ক্রিসমাস ডেতে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, আবার কখনো কখনো শিশুদের নিয়ে চড়–ইভাতিÑ এমন নানা আয়োজন চলতে থাকে ইচ্ছেতলায় বছরজুড়ে।

সব বাবা-মায়েদের জন্য রয়েছে ‘বাবা-মা’র ইশকুল’ নামে একটি কার্যক্রম। যেখানে সন্তানকে গড়ে তোলার পরামর্শের পাশাপাশি বাবা-মায়েদের জন্য সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে ইচ্ছেতলায়। বিগত তিন বছরে বাবা-মায়েরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এবং অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এভাবে শিশু-কিশোর-তরুণ এবং অভিভাবকদের নিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চার একটি বলয় তৈরির চেষ্টা চলছে ইচ্ছেতলায়।

 

ইচ্ছেতলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত শিশুদের জন্য থাকছে তিন বছরের কার্যক্রম। তিন বছর তিনটি আলাদা ভাবনা নিয়ে কার্যক্রম সাজানো হয়েছে। প্রথম বছরের ভাবনা ‘প্রকৃতি’। প্রথম বছর নাচ, গান, চারু-কারু, গল্প-কবিতা-নাটক সবকিছুই হবে প্রকৃতি নিয়ে। দ্বিতীয় বছরের ভাবনা ‘দেশ ও মানুষ’। দ্বিতীয় বছরের সব আয়োজন হবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে। তৃতীয় বছরের ভাবনা ‘ভাষা ও সংস্কৃতি’।

নয় থেকে বারো-তেরো বছরের শিশুরা প্রথম তিনটি বছরের মতো সকল কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রথম বছর থেকেই তাদের বিষয় নির্বাচনকে গুরুত্ব দেবে। কারণ এ-বয়সের শিশুরা নিজেদের ভালো লাগা বা পছন্দ স্পষ্ট বুঝতে পারে। নয় বছর বয়স থেকে যেকোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারঙ্গম হয় শিশুরা। তাই তাদের বিষয় নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে বিশেষ প্রশিক্ষণ-চর্চা শুরু হবে এ-সময় থেকে।

১৩-১৯ বছর বয়সের কৈশোরত্তীর্ণরা যেন পথ না হারায়, সৃজনশীলতার চর্চায় নিয়োজিত থাকতে পারে, তাদের জন্য টিনস ক্লাব/কৈশোরক। টিনস ক্লাবে ওরা খুঁজে পাবে ওদের মেন্টরদের। বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদু-নানু, শিক্ষক বন্ধু হবে ওদের। সৃজনশীল চর্চা ও সমাজসেবা ওদের জীবনকে করবে আনন্দময় ও অর্থবহ। সব সময়ের জন্য থাকবে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা। সপ্তাহে একদিন থাকবে অনুষ্ঠান আয়োজন, যেখানে বিশিষ্টজনেরা শিশু-কিশোরদের শোনাবেন নিজেদের জীবনের কথা। দেবেন জীবনপথের দিক নির্দেশনা।

সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত সব আয়োজন নিশ্চিত করা হবে। ক্রমান্বয়ে সুবিধসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসিক ব্যবধান কমে যেন পরস্পরের মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টি হয় এমন পরিবেশ তৈরি করা হবে। একইভাবে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে শিশুরা যেন একসঙ্গে মিশতে পারে সেজন্য বিশেষায়িত কারিকুলাম ও সেশন পরিচালনা করা হবে।

বিভিন্ন ধরনের বই ও রেকর্ড প্রকাশ করা। যেমন ১০০ গান, ১০০ ছড়া ও কবিতা, ১০০ জীবনকথা,  ১০০ বিজ্ঞানকথা এমন আরো অনেক কিছু। যেন এইসব নির্বাচিত গান, ছড়া-কবিতা, গল্প, জীবনকথা ওদের মনন ও সৃজনের পথ তৈরি করে দেয়। ওদের কণ্ঠে এবং অন্য শিশু-কিশোর সংগঠনের শিশুদের নিয়ে প্রয়োজনীয় গান, ছড়া-কবিতা, এসব রেকর্ড করা হবে পড়ার পাশাপাশি শোনার জন্য।

ইচ্ছেতলা [শৈশব], টিনস ক্লাব, [কৈশোরক], বাবা-মার ইশকুল নিয়ে একটি সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রের মডেল তৈরি করা এবং সারাদেশে এই মডেলটি ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন আফসানা মিমি। যেমন ছিল খেলাঘর বা কচিকাঁচার আসর দেশজুড়ে। পরবর্তী পদক্ষেপে সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রম যুক্ত করার ইচ্ছে রয়েছে ইচ্ছেতলায়। যেভাবে বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাজ করে, অনেকটা সেই রকম। যেন শৈশব-কৈশোর থেকেই একজন শিশু তার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সৃজনশীলতা বিকাশে মেধার পূর্ণ প্রয়োগ ঘটাতে পারে।

ইচ্ছেতলা ও শিশু-কিশোর ফাউন্ডেশন

ইচ্ছেতলার পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে শিশু-কিশোর ফাউন্ডেশন, সংক্ষেপে ‘শিকি’ ফাউন্ডেশন। যেখানে শিশুদের জন্য প্রকাশনা, অনলাইন প্রকাশনা, অনলাইন টেলিভিশন, অনলাইন রেডিও ইত্যাদির পরিকল্পনাও প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। শিশু-কিশোর ফাউন্ডেশনে থাকবে ‘শিকি ডট নেট’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে শিশুরা পাবে বিনোদন ও বিনোদনমূলক শিক্ষা। সময় ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে শিশুদের জন্য বিনোদনের মাধ্যম যেন আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শিকড়ের সাথে যুক্ত থাকে এবং শিক্ষামূলক ও বিজ্ঞানমনস্ক হয় তাই এই প্রয়াস। শিশু-কিশোর ফাউন্ডেশন ও ইচ্ছেতলা পরস্পর যুক্ত হয়ে শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করে যাবে শিশু-কিশোরদের জন্য।

ইচ্ছেতলার মূল শক্তি ভালোবাসা, পরিশ্রম ও স্বচ্ছতা। এর শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই… হ

গ্রন্থনা ও লেখা : তৃষা আক্তার . ছবি : জাকির হোসেন, সংগ্রহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here