Home দূরদেশ ইউরোপের দিনগুলো পর্ব-১১

ইউরোপের দিনগুলো পর্ব-১১

392
0
SHARE

বেলায়েত হোসেন

এমনিভাবে সকাল-সন্ধ্যা-রাতে ফ্রাঙ্কফুর্টের দিনগুলো ভালোই কেটে যাচ্ছিল আমাদের। আবহাওয়া তো এক কথায় লা জবাব। তাপমাত্রা থাকছে আঠারো থেকে পঁচিশ ডিগ্রির মধ্যে। কখনো কখনো হঠাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ভিজিয়ে দেয় পথঘাট, মানুষজন, গাছগাছালি।  এ শহরের লোকজন এতে অভ্যস্ত। তাই প্রায় সবারই ব্যাগে কী হাতে থাকে ফোল্ডিং ছাতা। প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।

মাইন নদীর ওপারে যে শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নানা জাদুঘর রয়েছে , প্রথম দিন থেকেই আমার লোভ রয়েছে তাতে। সময় আছে আর মাত্র দুদিন। ঠিক করলাম, দুপুরে লাঞ্চের পর সোজা বেরিয়ে যাব। একঘণ্টায় ফিরে আসব। লাঞ্চের পরের সেশনটি মিস হলেও পরেরটা অবশ্যই ধরতে হবে। পাঁচতলার ওপর থেকে দ্রুত নেমে, দ্রুত পথ ধরি। সামান্য পথ হেঁটে ব্রিজ  ধরে পার হয়ে যাই মাইন নদী। এই ভরদুপুরে তখনও কেউ কেউ নদীর ধারের ফাঁকা পথ ধরে সাইক্লিং করছে, গাছের শীতল ছায়ায় বেঞ্চে বসে কত-না জন পার করে দিচ্ছে অলস দুপুর।

এ পারে লাইন ধরে সব জাদুঘর আগেই বলেছি। ডানদিকে বাড়তেই চোখে পড়ে দীর্ঘ উচ্চতার পাঁচতলা ভবনে ‘ফবঁঃংপযবং ভরষসসঁংবঁস’। সীমিত সময়ের মধ্যেও উৎসাহ হলো, ‘দখিই-না কী আছে ভেতর বাগে’। প্রথমে এটি ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের প্রাচীনতম ফিল্মোলজিক্যাল ইন্সিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে ‘ফবঁঃংপযবং ভরষস ওহংঃরঃঁঃব’  নামে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ধ্বংসযজ্ঞে নতুনভাবে গড়ে ওঠার সময়। ২০০৬ সালে জার্মান চলচ্চিত্র জাদুঘরে রূপ নেয় এবং তার নামকরণ হয় ‘ফবঁঃংপযবং ভরষসসঁংবঁস’। এটি একটি অলাভজনক সংস্থা, যেখানে ফিল্ম ইন্সিটিউট পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার, চলচ্চিত্র বিষয়ক লাইব্রেরি, ইউরোপ তথা বিশ্বের দুর্লভ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ও তার ওপর  সেমিনার সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা ইত্যাকার কর্মাদি পরিচালনা করা হয়। বার্ষিক প্রকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব ‘লুকাস’ এবং কেন্দ্রীয় ও ইউরোপীয় চলচ্চিত্র উৎসব ‘গোয়েস্ট’ এরও আয়োজন করা হয়। খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি।  ঢুকেই বিশাল লবি, চারিদিকে কাঠের বিভিন্ন রকম র‌্যাকে ফিল্ম বিষয়ক ক্যাটালগ, পুস্তকাদি, বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ছবির সংগ্রহ। এই মিউজিয়ামে প্রবেশ করার একটা ফি আছে, বড়োদের জন্য ছয় ইউরো, আর ছাত্রদের জন্য তিন ইউরো। ছবি দেখার ক্ষেত্রে বড়োদের জন্য সাত ইউরো, আর ছাত্রদের জন্য পাঁচ ইউরো। এমনি প্রতিটি বিষয়েই টিকেট নির্ধারণ করা আছে। সমস্ত প্রয়োজন মেটাবার জন্য সম্মুখভাগেই রয়েছে বেশ বড়োসড়ো  রিসেপশন। আছে নানা সব বিখ্যাত ছবির পোস্টার। সময়াভাবে ভেতরে না ঢুকে বেরিয়ে পড়ি ।

এর পাশেই রয়েছে ‘ফবঁঃংপযবং অৎপযরঃবশঃঁৎব গঁংবঁস’। এও যে ঋদ্ধ একটি জাদুঘর তাতে সন্দেহ নাই। তবে আপাতত স্থাপত্যবিদ্যা সম্বন্ধে অতি উৎসাহ নেই বলে এগুতে থাকি আমার লক্ষ্যবিন্দুর দিকে। সে হচ্ছে ফ্রাঙ্কফুর্টের বিশ্বখ্যাত আর্ট মিউজিয়াম যার নাম ‘স্ট্যাডেল মিউজিয়াম’ [ঝঃধফবষ গঁংবঁস]। স্থাপত্যবিদ্যা জাদুঘর থেকে ক’কদম এগুলেই তার আবিষ্কার। বিস্তৃত এলাকাজুড়ে বিশাল অট্টালিকার চারদিকে ঝুলছে সেই ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিশ্বখ্যাত সব শিল্পীদের আত্মচিত্র এবং তাঁদের আঁকা ছবি। দূর থেকেই আমার চোখ গেল সতেরোশ শতাব্দীর বিখ্যাত জর্মান চিত্রশিল্পী জোহান হেইনরিচ উইলহেল্ম টিশবেইন এর ব্যানারের দিকে যিনি গ্যেটে টিশবেইন নামে পরিচিত ছিলেন। সেই হ্যাট মাথায় গায়ে বাদামি শাল জড়িয়ে রাজকীয়ভাবে পাথরের আসনে বসে থাকা গ্যেটে টিশবেইন, যে ছবি বহুবার দেখেছি। নানাবয়সী অগণিত দর্শক চলমান গতিতে আসছে যাচ্ছে এর চৌহদ্দি পেরিয়ে মিউজিয়ামের ভেতরে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম সেই সব আঁকিয়েদের আঁকা দুর্লভ ছবি। আগেই শুনেছিলাম ফ্রাঙ্কফুর্টের এই  স্ট্যাডেল মিউজিয়ামের কথা। এ  মিউজিয়াম এত ঋদ্ধ যে ফ্রাঙ্কফুর্টে এসে না দেখে গেলে এ নগরে আসাটাই বৃথা ! এর ভেতর ঢুকে আমার মনে হয়েছিল কথাটি এক বর্ণও ভুল নয়। জার্মানির এই মিউজিয়ামটিতে খ্যাতিমান শিল্পীদের ২৭০০ পেইন্টিং আছে যার মাত্র ৬০০টি প্রদর্শিত আছে। একলক্ষসংখ্যক আছে হাতে আঁকা দুর্লভ সব ছবি ও ছাপচিত্র আর আছে ৬০০ ভাস্কর্য।

স্ট্যাডেল জাদুঘরটি জার্মানির প্রাচীনতম জাদুঘরের একটি শিল্প সমৃদ্ধ জাদুঘর যা ফ্রাঙ্কফুর্টের এক ধনাঢ্য আর্ট পৃষ্ঠপোষক জোহান ফ্রেড্রিচ স্ট্যাডেল-এর ইচ্ছা অনুসারে ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যিনি বিশাল সংগ্রহ শালার জন্যে তাঁর বাড়ি ও তাবৎ শিল্প সংগ্রহ, দান করেছিলেন। জানা যায় ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য সংগ্রহশালাটি  ফ্রাঙ্কফুর্টের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দূর থেকেই আমার চোখ গেল সতেরোশ শতাব্দীর বিখ্যাত জর্মান চিত্রশিল্পী জোহান হেইনরিচ উইলহেল্ম টিশবেইন-এর ব্যানারের দিকে, যিনি গ্যেটে টিশবেইন  নামে পরিচিত ছিলেন। সেই  হ্যাট মাথায় গায়ে বাদামি শাল জড়িয়ে রাজকীয়ভাবে পাথরের আসনে বসে থাকা গ্যেটে টিশবেইন, যে ছবি বহুবার দেখেছি।

স্ট্যাডেল জাদুঘরে প্রবেশ করার জন্য ফি হচ্ছে কর্মদিবসে চৌদ্দ ইউরো অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় চৌদ্দশ’ টাকা , আর যদি ছুটির দিন হয় তা ষোল ইউরো যা বাংলাদেশি টাকায় ষোলশ’ টাকা। আমি চৌদ্দ ইউরো দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। স্ট্যাডেল জাদুঘরে সাত শতাব্দী থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় দুর্লভ সব ছবি স্থান পেয়েছে। ভেতরে ঢুকেই আমি রুদ্ধশ্বাসে ওপর-নিচের ফ্লোর ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি। ভাগে ভাগে নানান কোঠা, আর তার উঁচু দেয়াল জুড়ে ঝুলছে বিভিন্ন আকৃতির ফ্রেমে বিশাল, মাঝারি কি ছোট  আকারের নানা ছবি। এ ঘর ও ঘরের মেঝেতে আছে ব্রোঞ্জ, কাঠ বা নানা ধাতুতে গড়া বিভিন্ন ভাস্কর্য। তাও নামকরা সব শিল্পীর গড়া।  অধিকাংশ ছবিই তৈলচিত্র কি প্যাস্টেল কালারে করা। মনুষ্য জীবনযাত্রা, কাম-ক্ষুধা, দ্ব›দ্ব-সংঘাত, প্রার্থনার ভেতর দিয়ে বাক্সময় হয়ে  উঠেছে নানাসব কাহিনি । প্রায় সব ছবিতেই প্রকৃতির পাশাপাশি দলবদ্ধ, একক বা দ্বৈত মানব শরীরের এত জীবন্ত প্রকাশ, তাও আবার এত শতাব্দী আগের খুবই ছুঁয়ে যায় মন।[চলবে]

লেখক : ব্যাংকার, আবৃত্তিকার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here