Home রঙ্গশালা/আবৃত্তি আমি একটা থিয়েটার ল্যাবরেটরি করতে চাই -আনন জামান

আমি একটা থিয়েটার ল্যাবরেটরি করতে চাই -আনন জামান

2116
0
SHARE

ছেলেবেলা থেকেই থিয়েটারের প্রতি প্রবলভাবে অনুরক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত¡ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, নাট্যকার আনন জামান। বর্তমানে পিএইচডি করছেন বাংলা নাটকের রচনারীতি নিয়ে। হিজড়াদের নিয়ে তাঁর রচিত ‘শিখÐীকথা’ চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও ধারাবাহিক নাটক হিসেবে বেশ আলোচিত হয়েছে। নয়টি নাট্যদল সারাদেশে ‘শিখÐীকথা’ নিয়মিত মঞ্চায়ন করছে। তাঁর রচিত নাটক ও নাট্যভাবনার কথা জানিয়েছেন আনন্দভুবনকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রশান্ত অধিকারী

আনন্দভুবন : থিয়েটারের সঙ্গে আপনার যোগসূত্র কীভাবে, কখন ?

আনন জামান : ছেলেবেলায় হ্যাজাক বাতির আলো-আঁধারে দেখা যাত্রাপালাÑ আমার মধ্যে এক অপার্থিব অনুভব সঞ্চার করে। সামিয়ানার নিচে অভিনেতার হাসি-কান্না চিৎকারের কম্পন বুকের ভেতর বাজত সব সময়। স্কুল শিক্ষক বাবা জালাল উদ্দিন বৈঠকি গান করতেন। বাড়ির উঠানে বসতো গানের আসর। শুধুমাত্র গীতরঙ্গ হওয়া নয়Ñদর্শক-শ্রোতা এবং গায়েন মিলে চলত গানের অর্থ অন্বেষণের প্রচেষ্টা। এ প্রসঙ্গে হাকিম আলী গায়েন চাচার ‘কালু গাজী চম্পাবতী’, ‘গুলেবাকাওয়ালী’, ‘জামাল কামালের পালা’র কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কথা আর গীতে তার কাহিনী বয়ান এক ঘোর লাগা বিস্ময় তৈরি করত। এই সকল ঘটনা আমার মধ্যে দারুণভাবে লিখবার প্রেরণা তৈরি করেছিল। যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন লিখলাম যাত্রাপালা ‘রুদ্রলীলা’। পাড়ার ছোট-বড়ো সবাই মিলে স্কুল মাঠে মাটি তুলে চৌকোনা খোলা যাত্রা মঞ্চ বানালাম। দলের নাম ঠিক হলো ‘সেজুঁতি নাট্যগোষ্ঠী’। সেই প্রথমÑ নাটক আর অভিনয় নিয়ে দর্শকের মুখোমুখি হওয়া।

আনন্দভুবন :  আপনার লেখা ‘শিখÐীকথা’ চলচ্চিত্র, মঞ্চ অথবা ধারাবাহিক নাটকÑ কোন মাধ্যমে বেশি সফল।

আনন জামান : মঞ্চনাটক হিসেবেই শিখÐীকথা বেশি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশানকৃত নয়টি দল সারাদেশে ‘শিখÐীকথা’ নিয়মিত মঞ্চায়ন করছে। ফলে দর্শক-শ্রোতার মধ্যে হিজড়াদের নিয়ে একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরী হয়েছে। সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি ও নানাবিধ সুবিধা প্রদানের নেপথ্যে ‘শিখÐীকথা’ নাটকটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ‘মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়’ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় নয়দিনব্যাপী জাতীয় শিখÐীকথা নাট্য উৎসব করেছে। যেখানে নয় জন নির্দেশকের নয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে ‘শিখÐীকথা’ অভিনীত হয়েছে। একটি মঞ্চনাটকের মাধ্যমে একটি অনগ্রসরমান জনগোষ্ঠীর ইতিবাচক আলোচনা পাদপ্রদীপে চলে এসেছে।

আনন্দভুবন : নাটকের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে গ্রæপ থিয়েটারে নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণ কি?

আনন জামান : সত্যিকার অর্থে নাটককে ভালোবেসে নাটক নিয়মিত চর্চার জন্য তো আর সবাই পড়ে নাÑ আট দশটি বিভাগের মতোই চাকরি একটি প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। থিয়েটারে যেহেতু পেশাদারিত্ব নেই, তাই পেশার খাতিরে তাদের নিয়মিত নাট্যচর্চা করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। এসব সীমাবদ্ধতা ছাপিয়েও নাটকের শিক্ষার্থীরা নাটক রচনা, নির্দেশনা, সেট, লাইট, প্রপস, পোশাক ও অন্যান্য ডিজাইনের ক্ষেত্রে তাদের মেধা প্রমাণ করছে।

আনন্দভুবন : আপনি সেলিম আল দীন-কে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন। তার আধুনিক বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি আপনার রচনাকে কতখানি প্রভাবিত করেছে বলে আপনি মনে করেন ?

আনন জামান : দেখুন- হাকিম আলী গায়েন আমাদের বাড়ির উঠানে বর্ণনা নৃত্য সংগীত সংলাপ সহযোগে কাহিনী অভিনয় করতেন। তখন আমি বা আমরা তাকে নাটক হিসেবে ভাবিনি। অথচ সেলিম আল দীন ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু মিলে বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির প্রথম পরীক্ষামূলক প্রযোজনা মঞ্চে আনেন হাকিম আলী গায়েনের জামাল কামালের পালা। নাটকের ইতিহাসে বাংলা নাটকের উদ্ভব নিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর ভুল তথ্যের প্রচলন ছিল ; সেলিম আল দীন তার গবেষণায় প্রমাণ করলেন, ইংরেজরা এ-দেশে নাটক চালু করেনি, হাজার বছর ধরে এ ভূখÐে নাটক প্রচলিত ছিল। সেলিম আল দীন একটি জাতির নাটকের জাত চিনিয়ে দেওয়া নাট্যকার। আমার রচিত নাটকগুলো রচনারীতি বিচারে অবশ্যই বর্ণনাত্মক নাটক। তবে আমি মনে করি যে, আমি গল্প বলবার একটি নিজস্ব ঢং তৈরি করতে পেরেছি।

আনন্দভুবন : ‘বুনন থিয়েটার’ প্রযোজিত ‘সিক্রেট অব হিস্ট্রি’ নাটকের পোস্টারে একটি আখড়াই নাট্য আয়োজন দিয়ে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন ?

আনন জামান : নাটকের দর্শক, অভিনেতা, রচনারীতি ও প্রয়োগ নিয়ে নানামাত্রিক পরীক্ষণ নিরীক্ষণ করার জন্য আমি খুব অল্পবেলা থেকেই বুঝে অথবা না বুঝে চারটি নাটকের দল প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। তার মধ্যে হাকিম আলী গায়েন থিয়েটার, বুনন থিয়েটার, নিরাভরণ থিয়েটার বাংলাদেশ গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশান ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য। হাকিম আলী গায়েন থিয়েটার একটি আধুনিক মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করেছে- যেখানে ফেব্রæয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে লোকনাট লোকগীতের উৎসব শিরোনামে মেলা হয়। এই মেলাটি গাজীর গান, হাস্তর গান, লাঠি খেলা, পুতুল নাচ, ঝুমুর, যাত্রা, বিচার গান ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী নাটক ও নাট্যমূলক ক্রিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা করে। অন্য দুটি দলও নিয়মিত নাটক ও উৎসব আয়োজন করে। স্বয়ম্প্রভা থিয়েটার বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য- তারাও দেশজ নাট্যরীতি নিয়ে কাজ করে। চারটি দল মিলে একটি প্রতিষ্ঠান করেছিÑ ‘আখড়াই’ নাম দিয়ে। আখড়াই বাংলাদেশের মফস্বলভিত্তিক নাটকের দলগুলোর জন্য আর্থিক সাহায্য নিয়ে পাশে দাঁড়াবে।

আনন্দভুবন :  আপনার নিয়মিত মঞ্চ নাটকগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।

আনন জামান : ‘শিখÐীকথা’ মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়সহ বরগুনা থিয়েটার, পাবনা ৭৭, রংপুর নাট্যকেন্দ্র, নাট্যধারা চট্টগ্রাম দেশে-বিদেশে নিয়মিত অভিনয় করছে। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত ‘নীলাখ্যান’, ‘নিশিমন বিসর্জন’, ‘অহম তমসায়’-এর দর্শকপ্রিয়তা আমার লেখক মনকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। জেল হত্যাকাÐ নিয়ে বুনন থিয়েটারের ‘সিক্রেট অব হিস্ট্রি’ নিয়মিত অভিনীত হচ্ছে।

আনন্দভুবন : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐ নিয়ে রচিত ‘শ্রাবণ ট্রাজেডি’ মঞ্চপাড়ায় ইতোমধ্যে আলোচনা ও আশাবাদ তৈরী করেছেÑ নতুন এই নাটকটি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি ?

আনন জামান : বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পাঠ করার পর মনে হয়েছে, তিনি একজন ক্লাসিক লিডারÑ তার মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী চেতনার উন্মেষ তাকে যিশুর পুনরুত্থানের সমান মহিমা দিয়েছে।

‘মহাকাল’ নাটকটি প্রযোজনা করলেও ঢাকা থিয়েটার, থিয়েটার আর্ট ইউনিট, সুবচন, প্রাঙ্গণে মোরসহ অন্যান্য দলের অভিনেতারা এটিতে অভিনয় করছেন। নাটকটি নির্দেশনা দিচ্ছেন ড. ইউসুফ হাসান অর্ক। সার্বিক তত্ত¡াবধানে আছেন নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

আনন্দভুবন :  থিয়েটার নিয়ে আপনার স্বপ্ন বা ভাবনা কী ?

আনন জামান : বাংলাদেশে থিয়েটার এমন একটি শিল্প মাধ্যম, যেখানে সবাই কাজ করে পয়সার জন্য নয়, শিল্পরীতিটির প্রতি তার প্রেমের জন্য। আমি একটা থিয়েটার ল্যাবরেটরি নির্মাণ করতে চাই। সেটা কোনো প্রথাগত প্রসেনিয়াম মঞ্চ নয়। একটি বৃহদাকার গোডাউন টাইপের বিল্ডিং হবে, সিলিং থাকবে অনেক উঁচু। যেখানে আমি গল্পটা যেভাবে মনে করছি, সেভাবে বলতে পারব। থিয়েটার নিয়ে এই আমার স্বপ্ন। হ

ছবি : জাকির হোসেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here