1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন

৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

মোট আক্রান্ত

২৪২,০৪৯

সুস্থ

১৩৭,৯০৭

মৃত্যু

৩,১৮৪

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৫২,২২৪
  • চট্টগ্রাম ১৪,৪৮৯
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৮৮০
  • কুমিল্লা ৫,৫৭৬
  • বগুড়া ৪,৮৭৬
  • ফরিদপুর ৪,৮৬২
  • খুলনা ৪,৩৬৭
  • গাজীপুর ৪,২৩৬
  • সিলেট ৩,৭৮৭
  • কক্সবাজার ৩,৩৯১
  • নোয়াখালী ৩,১৮৬
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,০২১
  • ময়মনসিংহ ২,৭২৩
  • কিশোরগঞ্জ ১,৯৯৫
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১,৯৪৭
  • নরসিংদী ১,৯২৬
  • যশোর ১,৮৯৯
  • চাঁদপুর ১,৮৫৩
  • টাঙ্গাইল ১,৬৯০
  • বরিশাল ১,৬৮৬
  • কুষ্টিয়া ১,৫৯৪
  • রংপুর ১,৫৩৯
  • লক্ষ্মীপুর ১,৪৫৩
  • সিরাজগঞ্জ ১,৪৪০
  • দিনাজপুর ১,৩০৮
  • ফেনী ১,৩০৮
  • সুনামগঞ্জ ১,২৭৮
  • রাজবাড়ী ১,২৭৭
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • হবিগঞ্জ ১,০৫৫
  • পটুয়াখালী ১,০২৫
  • ঝিনাইদহ ৯৮৩
  • নওগাঁ ৯৩১
  • জামালপুর ৯১৬
  • পাবনা ৮৪৩
  • মানিকগঞ্জ ৮৪০
  • মৌলভীবাজার ৮৩৯
  • মাদারীপুর ৮৩২
  • গোপালগঞ্জ ৭৯৯
  • নড়াইল ৭৬২
  • সাতক্ষীরা ৭৪৮
  • জয়পুরহাট ৭১৪
  • শরীয়তপুর ৬৬৮
  • রাঙ্গামাটি ৬৫৭
  • চুয়াডাঙ্গা ৬৪৩
  • নেত্রকোণা ৬৩৮
  • বাগেরহাট ৬০৮
  • নীলফামারী ৬০০
  • গাইবান্ধা ৫৭৮
  • বান্দরবান ৫৫৪
  • খাগড়াছড়ি ৫৩২
  • ভোলা ৫২৮
  • বরগুনা ৫১১
  • নাটোর ৪৯২
  • মাগুরা ৪৬০
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৪৪৮
  • কুড়িগ্রাম ৩৭৭
  • শেরপুর ৩১৫
  • ঠাকুরগাঁও ৩০১
  • লালমনিরহাট ২৯৪
  • ঝালকাঠি ২৪২
  • পঞ্চগড় ২৩৩
  • পিরোজপুর ২১৮
  • মেহেরপুর ১৮৭
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

অপসঞ্চয় -মাকিদ হায়দার

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১৮
  • ১৬৯৯ বার ভিউ করা হয়েছে

যেদিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে সেদিন শিরিন বেগমের খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে এবং ইচ্ছেটাকে তিনি পূরণ করেন যেহেতু তার জীবনে পূরণের চেয়ে অপূরণের ভাগ অনেক বেশি। তাই তাকে ভাড়া বাড়ির দোতলার ছাদে গিয়ে বৃষ্টির ভেতরে অনেকক্ষণ ভিজতে হয়, এবং  একইসাথে তার দীর্ঘদিনের জমানো কষ্টগুলো চোখের জল হয়ে বৃষ্টির জলের সাথে হারিয়ে যায় দোতলার ছাদে। তার একটাই ইচ্ছে হয়Ñ হারানো কষ্টগুলোকে যদি এই বৃষ্টিভেজা খোলা ছাদে এনে দাঁড় করাতে পারতেন কিংবা কলেজজীবনের দুই একটি প্রিয়মুখ, যে দুই একটি প্রিয়মুখ কখনো সমুখে এসে দাঁড়ায়, নত চোখে কি যেন বলতে চায়, অথচ কিছু না বলেও যেন হাজার কথা শুনিয়ে যায় সেই মুখ, সেই মুখের, চোখের ভাষা শিরিন বেগম সেদিন বুঝতে পারেননি, পারলে এই বৃষ্টিভেজা দিনে-রাতে তার সমস্ত চোখের জল বৃষ্টির জলের সাথে মিশিয়ে না দিয়ে, নিশ্চিন্তে সেই প্রথম মুখটিকে চিরতরে রাখতেন নিজের কাছে। হারিয়ে যেতে দিতেন না, কখনো কোনোদিন।

যে-ব্যথা, যে-বেদনা, যে-বোধ, যে-কষ্ট আজ তাকে নিয়ে খেলছেÑ সেটিও ওই ব্যথা, ওই বেদনা, ওই বোধ এবং কষ্ট তাকে নিয়ে খেলতে পারত না, যদি তিনি দ্বিতীয় মুখটিকে একটু প্রশ্রয় দিতেন, যদি তিনি একটু হেসে কথা বলতেন, যদি তিনি শুধু একবার বলতেন, কালকে দেখা হবে। না, তিনি সে-সবের কিছুই বলেননি বরং করুণার চোখে বিদায় করেছেন। করেছেন অবহেলা। অবহেলা এবং করুণা যদি তিনি দ্বিতীয় মুখটিকে উপহার না দিতেন তাহলে আজকে তিনি উপসচিবের স্ত্রী হয়ে থাকতেন এই ঢাকা শহরে, তৃতীয় মুখটি তার স্বামীর। একটি পোশাক কারখানার হিসাব রক্ষক, তাকে প্রতিদিনই যেতে হয় ঢাকা শহরের উত্তর প্রান্তের আশুলিয়ায়, সকাল আটটায় বাসা থেকে বের হয়ে ফিরতে হয় ঘণ্টা দশেক পরে। যদিও টঙ্গির আরিচপুর থেকে আশুলিয়ার জামগড়া গ্রামের অনেকটা ভেতরে তাদের অনেককেই যেতে হয়, যারা ওই শিল্প কারখানার উপরের দিকে আছেন তাদের জন্য মাইক্রোবাস থাকলেও আবদুল হামিদের মতো যারা নিচের দিকে আছেন তাদেরকে যেতে হয় ভিন্ন উপায়ে। এই রকম বৃষ্টিভেজা দিনে কাদা মাখানো রাস্তায়Ñ কষ্টেসৃষ্টে অনেকের মতোই তিনি যখন তার অফিসে পৌঁছান, তখন তার কারখানার টাইম কিপারে তিনি স্পষ্ট দেখতে পান গত পরশুর চেয়ে আজকে প্রায় মিনিট কুড়ি দেরি হয়ে গেছে কারখানায় পৌঁছাতে।

প্রথম মুখটির নাম আবু সাদাত। আর সাদাতের মুখ শিরিন বেগমকে খুব যে আন্দোলিত করে সে কথা আর কেউ না জানলেও শিরিন বেগম ভালোই জানেন আবুর অনেক কথা। বরং তার কথা মনে এলে একরাশ থুথু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে, রোদ-বৃষ্টি, শীত-বসন্তের যে কোনোদিনে। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সঙ্গে তাকে বলতে হয়, একটি বহু ব্যবহৃত শব্দ, রাজাকার। রাজাকার শব্দটি মনে আসতেই পুনরায় উগরে দিতে হয় একরাশ থুথুÑ সেই কলেজজীবনের সেই প্রথম মুখটির উপর।

মাঝে মাঝে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের বছরের ২৯ জুনের কথা। যেদিন তার জন্মদিন ছিল, জন্মদিনের কথাটি মনে এলেও শিরিন বেগম নিজের মনের ভেতরেই দিনটিকে লালন করলেও পালন করেননি জন্মোৎসব। এমনকি ছোট বোন মিনাকে, অথবা বড়ো ভাই আনিসকে বলা যেত, তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধে না যেতেন বরং মা এসে জানিয়েছিলেন, তোর আজ জন্মদিন, সতেরোতে পড়ল, বাবা মাথায় হাত দিয়ে শিরিনের সুখী জীবন হয়তো-বা দীর্ঘায়ু কিংবা ভবিষ্যৎটা যেন সুখের হয়, সেই কামনাই করেছিলেন, ভেবেছিলেন বড়ো মেয়ের জন্মদিনে মেয়েটিকে একটি শাড়ি কিংবা কিছু মিষ্টিÑ মিষ্টি শব্দটি মনের দোরগোড়ায় আসতেই বাড়ির দরজায় কয়েকটি টোকা পড়তেই হাবিবুর রহমানকে একটু ভাবতে হয়েছিল, কলিং বেল থাকতে দরজায় টোকা কেন ! তার সে-ভাবনায় ছেদ পড়ল এবার অনেক বেশি জোরে যখন দরজার উপর কারো পায়ের গোটা দুয়েক লাথি এসে পড়তেই হাবিবুর রহমান তখুনি বুঝতে পারলেন, নিশ্চয়ই মিলিটারি এসেছে। দেরি না-করে দরজা খুলেই তিনি ঠিকই দেখলেন বাড়ির বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি জিপ, ভেতরে একটি লোক, কালো চশমা চোখে হাবিব সাহেবের সামনের ছেলেটি অপরিচিত। ছেলেটির পেছনে আরো জনা দুই-তিনেক তরুণ। প্রত্যেকের হাতেই অস্ত্র। প্রথমে রহমান সাহেব ভেবেছিলেন এই রাজাকারগুলো জানতে চাইবে তার যে ছেলে যুদ্ধে গিয়েছে তার কথা। সে-সব কথা না-বলে নিজেই পরিচয় দিলেন অস্ত্রধারীদের দলনেতা। আমি আবু সাদাত, আমি আর আপনার মেয়ে শিরিন কলেজের সহপাঠী।

শিরিন বেগম নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঘরের কোণায়, মা আর ছোটবোন ব্যাপারটি ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই, হাবিব সাহেবের মৃদুলয়ের কণ্ঠে যেটুকু শুনলেন, শিরিনেরা দুই বোন এবং মাÑ সেটি যেন সম্পূর্ণ একটি নতুন কথা শুনলেন, যেটি এ-বাড়ির কেউ-ই কল্পনা করেননি, বিশেষত এই মুক্তিযুদ্ধের কঠিনতম দিনে।

আবু ইতি-উতি তাকিয়ে পেছনে দাঁড়ানো ছেলেটিকে বললো, তোরা জিপে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকবি, ক্যাপ্টেন সাহেব কিছু জিজ্ঞেস করলে জানাবি আবু ভাই এসে জানাবে আপনাকে। ছেলে তিনটি জিপের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই আবু বন্দুকের কার্তুজ রাখা পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটি সদ্যফোটা লাল গোলাপ বের করে হাবিব সাহেবের নিকট জানতে চাইলেন শিরিন কোথায়, এমন প্রশ্নের জন্য হাবিব সাহেব মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না বরং ছেলেটি যখন তার কার্তুজ রাখার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছিল চিংড়ি মাছের ঘের ব্যবসায়ী হাবিব সাহেব তখুনি প্রমাদ গুনতে শুরু করেছিলেন হয়ত পকেট থেকে কয়েকটি কার্তুজ বের করে সেই কার্তুজের শব্দ প্রতিবেশীদের উপহার দেবে। কেননা, তার একমাত্র ছেলে আনিস গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, সেই অপরাধে। কিন্তু নাÑ ভুল ভাঙলো যখন আবু নরম চোখে অনুনয়ের সাথে জানতে চাইল। শিরিন কোথায়। আজ ওর জন্মদিন, ওর হাতে এই গোলাপটি দিয়ে যেতে চাই।

আজ কয়েকদিন ধরে ভীষণ অস্থিরতার ভেতরে কাটছে আবদুল হামিদের এবং একইসঙ্গে মালিক পক্ষের, দিন কয়েক আগে পাশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে লক্ষ কোটি টাকার জামা-কাপড় পুড়ে গিয়েছে, অনেকেই বলেছেন ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগেনি, আগুন দেওয়া হয়েছিল, যারা ওই আগুন দিয়েছিল তারা বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেনি জনা দশেক মেয়ে-পুরুষ এমনকি ওই গার্মেন্টসের সুপারভাইজার রমেশ সাহা, রমেশ বাবু গত মাসের শেষ সপ্তাহে হামিদকে জানিয়েছিলেন তাদের গার্মেন্টসের মালিকদের ভেতরে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে মাস কয়েক আগে থেকে, মালিকরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে ; ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেশ অনেকদিনই বলে আসছেন শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে হবে, সঙ্গে মাতৃকালীন সময়ে একমাসের বেতন অগ্রিম দিতে, সঙ্গে মেডিকেলের খরচ ওষুধপত্র যা কিছু দিতে হয়Ñ তাকে থামিয়েÑদিয়েছিলেন জনা তিনেক পরিচালক। ব্যবস্থাপনা পরিচালকÑ যতই অনড় হয়েছেন তার ইচ্ছার প্রতি, ঠিক তার বিপরীতে আরও কঠিনতরভাবে অনড় হয়েছিলেন তারই পরিচালকবৃন্দ। এবং এমন কথা ব্যবস্থাপনা পরিচালককে শুনতে হয়েছিলÑ যেহেতু তার ছেমেমেয়ে নেই গোটা দুয়েক স্ত্রী থাকতেও তার উপরে কেন চোখ পড়েছিল এই কোম্পানির সুশ্রী চিফ কার্টার নাজমা বেগমের দিকে। হয়ত নাজমার পেটেÑ পরের কথাগুলো যিনি শুনেছিলেন, তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরই ব্যক্তিগত সহকারী এলিনা গোমেজ। এলিনা যে মিথ্যে বলবেন না, সে কথা ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদশা মিয়া ভালো করেই জানেন। জানেন যেহেতু আর নতুন করে জানতে চাননি, পরের কথাগুলো। হঠাৎ করেই একটি মোবাইল আসায়, এলিনা শুধু শুনতে পেলেন, ড্রাইভারকে এক্ষুণি বলুন, এয়ারপোর্ট যেতে হবে, হল্যান্ড থেকে পোশাক ক্রেতারা আসছেন, আর বড়ো যেকোনো একটি হোটেলে বলে দিন, একটু থেমে বাদশা মিয়া বললেন, হোটেলটা যেন পাঁচতারা হয়, না-হলে তিন তারার নিচে নয়। বাদশা মিয়া চেয়ার থেকে দ্রæত উঠতে গিয়ে টেবিলের কোণায় কখন যে ভুল করে পানীয় জলের গøাসটাকে রেখেছিলেন, নিজের হাতের সামান্য ধাক্কায় গøাসটা মেঝেতে কুপোকাৎ হয়েই ক্ষান্ত হয়নি তার পেটের ভেতরে অর্ধেক যে জল ছিল, সেটা দিয়েই ভিজিয়ে দিয়েছিল বাদশা মিয়ার দামি জুতোর এক পাটি। সহকারী এলিনা গোমেজ চাপা প্যান্টের পেছন থেকে বিদেশি একটি সুগন্ধি মাখানো রুমাল দিয়ে বাদশা মিয়ার জুতো মুছতে গিয়ে যখন উপুড় হয়েছিল ঠিক তখন অবিবাহিত এলিনা গোমেজের অর্ধবৃত্তের বক্ষ দেখে কিছু একটা অনুভব করলেও বাদশা মিয়া বার দুয়েক নিজের চোখকে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলেনÑ ছিঃ শব্দটা ব্যবহার  করে, ব্যক্তিগত সহকারী এলিনা গোমেজ সে কথা সেদিন শোনেনি, বরং এক পাটি ভেজা জুতো পায়ে দিয়ে লিফটের কাছে পৌঁছানোর আগে মিস গোমেজ সঙ্গে থেকে নিয়ে এসেছিলেন বাদশা মিয়াকে গাড়ির দরজা পর্যন্ত। প্রতিদিন যেভাবে তিনি এগিয়ে দেন। মিস গোমেজ জুতোর উপরটা সুগন্ধি রুমাল দিয়ে মুছে দিলেও জুতার ভেতরে যে জল ঢুকেছিল সে কথা যেমন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মনে হয়নি, হয়নি ব্যক্তিগত সহকারী সুশ্রী সুন্দরী অর্ধবক্ষ খোলা তরুণীর।

গাড়ির গেট পর্যন্ত পৌঁছানোর মুহূর্তেই বাদশা মিয়ার কানে এল, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার কথা, এমনকি তাকে শুনতে হলো জ্বালাও পোড়াও শব্দটা। যে-শব্দটির সঙ্গে তিনি নিজে খুবই পরিচিত। যে-শব্দটির হাত ধরে শ্রমিক নেতা কাজী জাফরের চোখের মধ্যমণি হয়েছিলেন সেই ’৬৯-এর গণআন্দোলনে, এমনকি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই টঙ্গির শিল্পাঞ্চলের অবাঙালিদের জুতোর কারখানাটি রাতারাতি দখল করলেও অবাঙালিদের কাউকে খুন, গুম, হত্যা কিছু না করেই স্বসম্মানে তাদেরই ভক্সওয়াগন মোটর গাড়িতে একজনকে গুলশানে অপর দুজনকে তাজমহল রোডের যে-বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই বাড়িতে বাদশা মিয়ার প্রথম পক্ষের স্ত্রী রাবেয়া সুলতানাকে নিয়ে তিনি বর্তমানে থাকেন। জুতা ফ্যাক্টরির মালিকদের বাদশা মিয়া নিজে ট্রাকে তুলে দিয়ে ছেলেমেয়ে বউসহকারে পৌঁছে দিয়েছিলেন তেজগাঁও এয়ারপোর্টে। অবাঙালি মালিকেরা পাকিস্তান যাবার সময় জুতা ফ্যাক্টরির, তাজমহল রোডের বাড়ির দলিল দস্তাবেজ এবং ভক্সওয়াগন গাড়িটির চাবি বাদশা মিয়ার হাতে তুলে দিলেও, গুলশানের বাড়ির দলিল এমনকি বাড়িটার গেটের দরজার চাবি বাদশা মিয়ার হাতে পৌঁছোনোর আগেই ফ্যাক্টরির আরেক মালিক বাড়ির গাড়ির চাবি নাকি দিয়ে গিয়েছিলেন বাঙালি বাড়ি রক্ষক দারোয়ানের নিকট। যদিও বাদশা মিয়ার যদি একবার মনে হতো… আর ও দু’একটি শিল্পকারখানা অনায়াসেই নিজের করায়াত্তে আনা যেত, যেহেতু তিনি কাজী জাফরের স্নেহ আদরে শিল্পাঞ্চলের বিখ্যাত শ্রমিক নেতা হিসেবে সকল শ্রমিকই তাকে গ্রহণ করেছিলেন, বাদশা মিয়ার একনিষ্ঠ কথাবার্তায় এবং দেশমাতৃকাকে অবাঙালিদের হাত থেকে একদিন এনে দিতে হবে বাঙালিদের হাতে। বাঙালিদের হাতে আনবার আগে শ্রমিকগুরু নেতাই একদিন শিখিয়ে দিয়েছিলেন, শ্রমিকদের দাবি দাওয়ার প্রথম ছত্রটি জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাওÑ আজ দীর্ঘদিন পরে বাদশা মিয়া নিজ কানে শুনলেন সেই অতীতদিনের ¯েøাগান।

সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এ-বৃষ্টি যে কয়েক ঘণ্টার ভেতরে থামবে তেমন কোনো লক্ষণই আবদুল হামিদের চোখে পড়ছে না, অথচ তাকে তাদের ফ্যাক্টরিতে যেতেই হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী এলিনা গোমেজ জানিয়েছে সাতসকালেই। অন্যান্য দিনের চাইতে প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে বাসা থেকে বের হয়েও খুব যে একটা সুবিধে হলো সেটাও নয়, অথচ তাকে যেতে হবে এই সাত সকালের বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আশুলিয়ার জামগড়ার অনেক ভেতরে তার কর্মস্থলে, ঢাকা-টাঙ্গাইল বা সরাসরি উত্তর বঙ্গের যে বাসগুলো চোখের সামনে দিয়ে পালিয়ে গেল তাদের দুই একটি বাসকে থামানোর চেষ্টা যে করেনি হামিদসহ আরো জনাকয়েক যাত্রী। একজন তো দৌড়ে গিয়েও চলন্ত বাসে উঠতে পারেনি। তবে আবদুল্লাপুরের মোড়ে এলে বাস ড্রাইভার যখনই বাসের গতি কিছুটা কমিয়ে দেবে তখুনি সুযোগ সুবিধেমতো দুই একজন লাফিয়ে উঠলেও আবদুল হামিদের পক্ষে সেটি প্রায় অসম্ভব। সে বেশ কয়েক বছর আগে হুড়োহুড়ি করে বাসে উঠতে গিয়ে যে শিক্ষাটা সেদিন সে পেয়েছিল সে কথা তার এখনো মনে আছে। হুড়োহুড়িতে উঠতে যাবার আগে মানিব্যাগ এবং মোবাইলটা দুপুরের টিফিন ক্যারিয়ারের ব্যাগে লুকিয়ে রাখলেও সেদিন সে বাসে উঠতেই অনিচ্ছাকৃতভাবেই ধরে ফেলেছিলেন একজন মেয়ে যাত্রীর, বাম হাত হামিদের নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার সময়ই তার ডান হাত স্পর্শ করেছিল মেয়েটির স্পর্শকাতর ডান বক্ষেই, তখুনি গর্জে উঠেছিলেন তিনি। অন্য যাত্রীরা হামিদের অনিচ্ছাকৃত স্পর্শের কথা কিছুতেই শুনতে চাননি। বরং দুই একটি প্রহার যে তার কপালে জোটেনি সে কথা এখনো ভুলে যাননি, বৃষ্টিতে আধা ভেজা, আবদুল্লাপুর বাস স্টপেজের যাত্রী আবদুল হামিদ। হয়ত তার কপালে আরো বেশি প্রহরাদি অপেক্ষা করছিল, তার আগেই স্পর্শকাতরে সিক্ত, যাত্রী মেয়েটি নিজেই থামিয়ে দিয়ে বললেন, যাত্রী ভাইয়েরা লোকটিকে মারবেন না, এ রকম প্রায় প্রতিদিনই হয়, বুঝলাম ভদ্রলোক আজ না হয় অনিচ্ছাকৃত আমার স্পর্শকাতর জায়গটিতে হাত দিয়েছেন, কিন্তু অন্যান্য দিন অনেক ভদ্রবেশী চেহারার যাত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু একটা ঠেকিয়েÑ এবং তিনি নিজেকে থামালেন একইসঙ্গে হামিদের নিকট জানতে চাইলেন, কোথায় কি করা হয়, হামিদ জানাতেই মেয়েটি জানালেন, তাদেরও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিটি ওই জামগড়াতে। সেইদিন দুজন ওই একই বাসে করে এসে নেমেছিলেন জামগড়া বাসস্ট্যান্ডে আর তখুনি, মেয়েটি জানিয়েছিল, দেখা হবে। আমি শামিমা বেগম,           আপনি ? আমি আবদুল হামিদ, নিউ অ্যাপারেল কোম্পানির হিসাব রক্ষক।

এই রকম বৃষ্টিভেজাদিনে শিরিন বেগম অকারণেই ভাড়াবাড়ির ছাদে গিয়ে নিজের শরীরটাকে বৃষ্টিতে ইচ্ছামতো ভিজিয়ে অপেক্ষা করেন, যদি একটা বজ্রপাত হতো, যদি সেই বজ্রপাতে মারা যেতাম, আজীবনের জন্যে বেঁচে যেতাম। বিয়ের বয়স প্রায় বছর চার পাঁচেক হলেও হামিদের অনিচ্ছাতেই শিরিন বেগম এখনো একাকী। আষাঢ় শ্রাবণের অজস্র বর্ষণে নিজেকে ভিজিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে একা একা কথা বলে, যখনই বাড়ির ছাদ থেকে নিজের ঘরের দিকে ফিরে আসেন, তখুনি সঙ্গ চায় শরীর। আর তখন মনে পড়ে দ্বিতীয় মুখটির। তখুনি তাকে ভেজা শাড়িতেই যেতে হয় জানালার পাশে, ইচ্ছে করে একটি প্রিয় মুখ কেন তাকে দিন-রাত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেকি আবু সাদাত সেই রাজাকার, যে-ছেলেটি তার জন্মদিনে পকেটভর্তি কার্তুজের ভেতর থেকে একটি গোলাপ তার হাতে তুলে দিয়ে, দ্বিতীয়বার আর তার মুখের দিকে ফিরেও তাকায়নি। যেমন তাকায় না ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফেরত নিউ অ্যাপারেল কোম্পানির হিসাব রক্ষক, তারই স্বামী। আজ ফিরতে বেশ কিছুটা রাত হলেও স্বামীর মুখের দিকে তাকাতেই শিরিনের মনে হলো হামিদ আজ বেশ প্রফুল্ল, আনন্দিত। কেন প্রফুল্ল, কেন আনন্দিত কথাটা জিজ্ঞাসা করবার আগেই, হামিদ নিজেই জানালো, বর্তমান কোম্পানিতে সে আর চাকরি করবে না বাদশা মিয়াকে জানাতেই বাদশা মিয়া যতটা হতবাক হননি, তারচে অনেক বেশি হতবাক হয়েছিলেন বাদশা মিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী মিস এলিনা গোমেজ। মিস গোমেজই বাদশা মিয়ার পক্ষ থেকে জানতে চাইলেন, হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন ? এই ঝড় বৃষ্টির ভেতরে আরিচপুর থেকে, অ্যাপারেলে যথা সময়ে আসতে না পারায়, প্রায় প্রতিদিন অফিসের টাইম পাঞ্চ মেশিনে ১৫ থেকে পঁচিশ, তিরিশ মিটিন দেরি হয়ে যায়, উপরন্তু প্রতিমাসে আমার বেতন থেকে।… বাদশা মিয়া তখুনি মুখ খুললেন এতক্ষণ তিনি শুনছিলেন হিসাব রক্ষকের কথা, আর তখুনি ভাবছিলেন, অফিসের অন্য কর্মকর্তারা, উত্তরা, টঙ্গী থেকে কোম্পানির মাইক্রোবাসে আসা-যাওয়া করে, তখন যদি হিসাব রক্ষককেÑ বাদশা মিয়ার ভাবনার মাঝখানে ছেদ পড়ল, হামিদ তখনই জানতে চাইলেন, কেন তাকে আজ সাত সকালে ম্যাডাম এলিনা ডেকেছেন ? হামিদের সেই প্রশ্নের উত্তর এলিনা না দিয়ে দিলেন স্বয়ং ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানালেন, গত এক বছরের হিসাবসহ বেতন বোনাস ড্রাইভার গার্ড বিদ্যুৎ গ্যাস বাবদ কত খরচ হয়েছে। আর বিদেশ থেকে কাপড়সহ অন্যান্য অ্যাপারেলেস, নিয়ে কাস্টমসে উৎকোচ এবং আনসিন বা অদৃশ্য খরচ কোথায় কত হয়েছে, আপনারা হিসাব বিভাগের যে ক’জন আজকে রাত নয়টার ভেতরেই হিসাব দিয়ে যাবেন এবং আমার অন্যান্য পার্টনারদের ভাগে কত টাকা পড়েছে, সেটা আমাদের সব পার্টনারের অবশ্যই জানা দরকার মনে রাখবেন, এই কোম্পানি ৫২% শতাংশ আমার দুই স্ত্রীর নামে, সেটি অবশ্য আপনিও জানেন, অনেকেই জানেন ওই ৫২ শতাংশের সবই আমার, আর ওদের বাকি অংশটুকু।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার শোনা গেল, আগুন জ্বালাও, চারিদিকে এবার আর গলাবাজি নয়, সরাসরি মাইকে, বাদশা মিয়া যেন মাইকিং শোনেননি, এমন একটি ভান করে আরো কিছু বলার আগেই হামিদ জানালো, আজ সারাদিন সারারাত ভরে আমরা হিসাব আশা করি শেষ করতে পারব, তবে আগামী মাসের এক তারিখ থেকে এই অ্যাপারেলে আমি আর কাজ করব না।

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে হামিদ শেষ করতেই মিস এলিনা তার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দিকে তাকাতেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলিনাকে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে দেবার আগে বলে দিলেনÑ নিচে গিয়ে দেখে আসুন গাড়ি-ড্রাইভার ঠিক আছে কি না, আসছি মিনিট চারেকের ভেতরেই। আপনাকেও যেতে হবে আমার সাথে, তিন তলায় না এলেও চলবে। মিস এলিনা চলে যাবার পরে খুবই নরম কণ্ঠে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হামিদকে জানালেন, আমি গত বছর প্রায় ৩০ লাখ টাকা অফিসের অ্যাকাউন্টে জমা না-দিয়েÑ হামিদ হয়ত কিছু বলতে চেয়েছিলেন তার আগেই বাদশা মিয়া জানালেন, ওই টাকার বিষয়টি আমার অন্য পার্টনাররা এখনো জানে না, যেহেতু কোম্পানির চেকটা এসেছিল ইটালি থেকে, ইটালিয়ানদেরকে দিতে হয়েছিল ১০ লাখ টাকা, চেকটি আমার নামে দেবার জন্যে। তবে তুমি ছাড়া আর জানে না কেউÑ আজ তুমিই প্রথম জানলে, আগামী মাস থেকে আমি তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে ১০ হাজার টাকা বেশি দেব। তুমি চাকরি ছাড়বে না, কাকপক্ষী, এলিনা গোমেজ কেউ-ই যেন না জানে। জানলে…

কথা অসমাপ্ত রেখে বাদশা মিয়া দ্রæত পায়ে তিন তলা থেকে হেঁটে নিচে থামলেন, লিফট তখন ছিল ১৬ বা ১৮ তলায়। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে সেই সাত সকালে হামিদেরই দেখা হয়ে গেল নিউ অ্যাপারেলে অন্য কোনো কর্মকর্তা কর্মচারীর সঙ্গে নয়, এলিনা গোমেজ বাদে।

 

অন্যদিনে এমনকি মাস পয়লার বেতন পেলেও আবদুল হামিদ কিছুটা নিজের কাছে রেখে বাকিটা শিরিনের হাতে দিয়ে শুধু স্মরণ করিয়ে দেয়, যতটা সম্ভব খরচ কমিয়ে সংসার চালানোর, এর আগে একদিন শিরিন বেগম জেনেছিল হিসাব রক্ষকই জানিয়েছিল, আশুলিয়ার জামগড়ায় দুই-তিন কাঠা জমির জন্যে কিছু টাকা বায়না করেছে, জমির মালিককে নয়মাসের ভেতরে বাদবাকি টাকা দিলেই জমিটুকু হয়ে যাবে শিরিন বেগমের নামে। ওই শুভ সংবাদটা দিয়েছিল প্রায় মাস চারেক আগে, সেদিন হিসাব রক্ষক খুবই খুশি হয়ে শিরিনের হাতে তুলে দিয়েছিল মিষ্টির প্যাকেট আর কিছু টাকা। আর আজকে এই বৃষ্টিভেজা রাতে হামিদ ঘরে ঢুকেই প্রায় চিৎকার করে শিরিনকে ডাকতেই হাতের কাজ ফেলে প্রায় দৌড়ে এসে শিরিন বেগম একটু হতবাকই হয়েছিল স্বামীর সমস্ত শরীর ভেজা হলেও হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা ও মিষ্টি এবং বিজয়ীর বেশে, দিয়েছিল শিরিনকে কয়েকটি উষ্ণ চুম্বন উপহার। বিয়ের পর বিগত চার বছরে যেটি ঘটেনি আজ সেইটাই ঘটিয়ে ফেললেন হামিদ। বৃষ্টির ধারাটাও বোধহয় বেড়ে গিয়েছিলÑ সেই রাতেই বার বার কি যেন বলতে চেয়েছিলÑ সে কি বলতে চেয়েছিল আজ আবদুল্লাপুর বাস স্ট্যান্ডে একটি নতুন মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয়ের কথা। দোদুল্যমান, হামিদ, সে কথা না বলে আরো গোটা দুয়েক চুম্বন শেষে শিরিন বেগমকে জানিয়েছিল, Ñ তার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতিমাসে তাকে ১০ হাজার টাকা বেশি দেবে তার কাজের পুরস্কার হিসেবে। কথা শুনে শিরিন বেগমের ভালো লাগার প্রতিদান দিতে হয়েছিল স্বামীর সমস্ত চাহিদার কাছে। সে-রাতে চাহিদার মাত্রাটা অন্য রাত বা দিনের তুলনায় বেড়ে গিয়েছিল। হামিদ বুঝতে না পারলেও শিরিন বুঝেছিল, কোম্পানির মালিক তাকে আরো দশ হাজার টাকা দেবে সেই আনন্দেই সারারাত জেগে থেকে ভোররাতে শেষ চুম্বনটি শেষ করে বর্ষানত ভোরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বেলা ৯টা-১০টা পর্যন্ত আবদুল্লাপুর বাস স্টপেজের মেয়েটির স্বপ্ন দেখেছিল কি না, সে কথা আমরা কেউ না জানলেও একমাত্র জেনেছিল হিসাব রক্ষক, আবদুল হামিদ।

বেলা এগারোটার দিকে কাকভেজা হয়ে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থেকে শিরিনের মামা গাজী আবুতালেব কয়েক সের গলদা চিংড়ি, গুলশা এবং চিড়া-মুড়ি নিয়ে ভাগনির বাসার সামনে এসে ঠিক ঠাহর করতে পারছিলেন না, এটা কি আবদুল হামিদের আরিচপুরের ভাড়া বাসা, না কি তিনি অন্য কারো বাড়ির সামনে কাকভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে আছেন। যদিও বৃষ্টির ধারাটা আগের চেয়ে কমে এলেও টিপ-টিপ করে ঝরছে বলেই পাড়ার দু’একজন লোক শুরু করেছে চলাচল। হয়ত সেই চলাচলকারীদের ভেতরের যেকোনো একজনকে গাজী সাহেব জিজ্ঞেস করতে পারতেন বাড়ির ঠিকানাটাÑ সেই জিজ্ঞাসার আগেই জানালা দিয়ে শিরিন দেখতে পেয়েছিল তার আপন মামা দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক জানালার ওপাশে, ভেজা রাস্তার একপাশে। শিরিন বেগম যখন নিশ্চিত হলেন, তারই আপন মামা, তখনি হামিদকে না ডেকে নিজেই নেমে গিয়ে গাজীর হাতের মাছের পুটলি এবং মুড়ি-চিড়ার টিনের দিকে হাত বাড়াতেই তখুনি পেছন থেকে হামিদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ছোটমামাÑ। শিরিন ঘুমন্ত হামিদকে ইচ্ছাকৃতভাবেই ডাকেনি, বরং মনে মনে ভেবেছে আহা কতদিন পর, সারারাত না ঘুমিয়ে কাটালাম দু’জন, হয়ত তখন আরো ভেবেছিল, এই কয়েক বছরে তার দু’একটি ছেলেমেয়ে থাকলে, মা-বাবা হয়ত, তার বাচ্চাদের জন্য নতুন জামা কাপড় এমনকি দু’একটি সোনার অলঙ্কারও দিতে পারতেন। শিরিনের বাবা, চিংড়ির ঘের মালিক গাজী হাবিবুর রহমান। যেমন বড়ো ভাই আনিসের বিয়ের সময় সাত ভরি সোনা দিয়েছিল নতুন ভাবিকে। তার বিয়ের সময় সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় গলার এবং হাতের নেকলেস ও বালা মিলিয়ে চার সাড়ে চার ভরির অলঙ্কার দিলেও দিতে পারেনি, কানের ঝুমকো এবং কপালের টিকলি। তবে মেয়ে শিরিনকে এই বলে শান্ত¡না দিয়েছিল, চিংড়ি মড়ক লাগায় এক্সপোর্ট করতে না পারলেও, আগামী বছর তোদের বিয়ে বার্ষিকী উদ্যাপন করবি ডুমুরিয়ার এই বাড়িতে। খুলনা থেকে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে নিমন্ত্রণ জানাবো। আর সেই দিনই কানের ঝুমকো, হাতের বালা…

গাজী হাবিব ইচ্ছাকৃতভাবে কথা আর এগোয়নি, কেননা তার মনে পড়েছিল, ছোটমেয়ে মিনার কথা। মিনার যদিও এখনো বিয়ের বয়স হয়নি সরকারের আইনানুসারে তবু যে বিয়ে দেওয়া যাবে না, বা ছেলে পক্ষের আত্মীয়স্বজন, পিতা-কাকাদের সাথে কথা বলা যাবে না, সেটাতো সরকার নিষেধ করেনিÑ তবে শিরিন যখন পনেরো ষোল পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হতে না হতেই আবদুল হামিদের পিতা-কাকারা গাজী হাবিবকে মাকড়সার জাল দিয়ে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল তখন আর গাজী হাবিব পাকা কথা প্রায় দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পাকা কথা দেবার আগে চিংড়ির ঘের ব্যবসায়ী সময়মতো বুদ্ধি করে বলতে পেরেছিলেন শিরিনের মায়ের সাথে এবং একমাত্র ছেলে আনিসের সঙ্গে একটু কথা বলে না নিলে, পারিবারিক শান্তি শেষে অশান্তিতে আর অশান্তির আগুনে জ্বলেপুড়ে মরতে হবে আমাকেই। হামিদের বাবা গাজী সাহেবের প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ না করেই জানিয়েছিলেন, আশা করি ভাবি সাহেবা আর আনিস এ-নিয়ে দ্বিমত পোষণ করবে না, কেননা হামিদ বিবিএ পাশ করে আপাতত ঢাকার একটি গার্মেন্টস কোম্পানির হিসাব রক্ষকের চাকরি পেয়েছে। থাকে টঙ্গির আরিচপুরে।

দিন কয়েক পরে শিরিনের মা শিরিনের নিকট থেকে জানতে চাইলেন কলেজের পড়াশোনার খবরাখবর, মা মেয়ের সম্পর্ক মধুর হওয়ার সুবাদে মা শিরিনকে জানিয়েছিলেন তাকে যদি তার পরীক্ষার পর বিয়ে দেওয়া যায় সে রাজি আছে কি না। বাকি পড়ালেখা শেষ না করে তুই বিয়ে করবি কি না, এই প্রশ্নের উত্তর সেদিন শিরিন তার মাকে একটু ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাদেরই বিবিএ ক্লাশের এক বড়ো ভাইয়ের মুখ তার চোখে ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো। ছেলেটির বাড়ি খালিশপুরে, বাবা রেলওয়েতে চাকরি করেন, পরিবারটিও ভালো, দুইবোন, দুই ভাই, বড়ো ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিরিনের মা মেয়ের মনের কথা সহজেই বুঝে গিয়েছিলেন সঙ্গে আরো বুঝেছিলেন, একইসঙ্গে একই কলেজে পড়ে নিজেই মনে মনে চেয়েছিলেন, তার নিজের ওই বয়সের কথা ভেবে। তিনিও তো একদিন ওই বয়েসের ছিলেন, তারও ওই বয়সের এক সহপাঠিকে তার ভালো লাগলেও মন থেকে তাকে মুছে ফেলতে সময় লাগেনি, ছেলেটি ছিল অন্য সম্প্রদায়ের, সেই অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেটির বাবা-মাকে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর আগেই দেশ ছেড়ে পাড়ি দিতে হয়েছিল ভারতে, সেই ৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের পর পরই। সেই প্রিয় সহপাঠির বাবা, মা মুক্তিযুদ্ধের আগে ফেলে যাওয়া নিজেদের খুলনায় পাইকগাছায় ফিরে এসে বাড়িঘর কিছুই পায়নি, বরং তাদের বাড়ির আশেপাশের জমি, এমনকি পৈত্রিক বাড়িটিও যে কবে কখন শত্রæ সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল, সে খবরটি আগে জানলে পরিবারটি পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের কাকদ্বীপ থেকে হাজার আশা নিয়ে কোনোদিনই এই দেশে ফিরে আসত নাÑ তবু কয়েক দিন থেকে গিয়েছিল তাদেরই এক আত্মীয়ের কাছে।

ধনী আত্মীয়ের শলাপরামর্শে সুমন পালিত একদিন সেই আত্মীয়কে সাথে নিয়ে স্থানীয় তোহশিল অফিসে গিয়ে জনাদুয়েক স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিল বেশ কয়েক বছর, তা তো সাত-আট বছর ইতোমধ্যে পার হয়ে গিয়েছে, উপরন্তু পাকিস্তান সরকার এদেশে হিন্দুদের ফেলে যাওয়া সহায়-সম্পদ শত্রæ সম্পত্তি ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সেই যুদ্ধের পরের বছর বিহার, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, মালদহ, মুর্শিদাবাদ থেকে রিউফিজিদের এনে ঢাকাসহ প্রায় সব জেলাতেই বাড়িঘর বানিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলÑ হিন্দুদের দেশ সোনার পাকিস্তান নয়, ওই শালা মালুদের দেশ ইন্ডিয়া। তোমাদেরকে ৪৭ সালের পর থেকে যত রিফিউজি পাক পবিত্র সরকার ঢাকার মোহাম্মদপুর, সৈয়দপুর, পার্বতীপুর ও মীরপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঈশ্বরদীতে জায়গা দিয়েছিল ৬৫ সালের যুদ্ধের পর এদেশের হিন্দুদের পরিত্যক্ত বাড়িঘর জমিজমা এমনকি গরু ছাগলও সবই করায়ত্ত করেই সেই খানেই ঠাঁই দিয়েছে ওই সকল রিফিউজিদের। যার ভেতরে আমি একজন আলী আকবর। এই তোহশিল অফিসের জমির দালাল, আর আমার বন্ধু খায়রুল এই পাইকগাছারই বিশ্বস্ত মুসলিম লীগ নেতা দবিরুল ইসলাম এই তোহশিল অফিসের উচ্চমান কেরানি। তার পরেও আপনারা দুজন যখন এসেছেন দেখা যাক শত্রæ সম্পত্তির লিস্টে আপনার নাম কীভাবে ঢোকানো যায়, তবে খরচপাতি লাগবে হাজার দশেক। আলী আকবর নিজেই যখন থামলেন, তখন সুমন পালিত জানালেন হাজার পাঁচেক টাকা হয়ত দিতে পারব, তবে তার আগে বউ, ছেলে সাধন পালিত আর মেয়েকে নিয়ে যেতে হবে সুন্দরবনের কাকদ্বীপে। সেখানে আমার কিছু টাকা আছে এনে দিতে পারি। তবে তার আগে ‘শত্রæ সম্পত্তি’ কথাটি তোহশিল অফিসের খাতা থেকে সরিয়ে দিয়ে বসাতে হবে আমার নাম, তাই না নরেন, আমি আপনাদের চাহিদামতো টাকা দশ হাজারই দেব। তবে দুই দফায়।

আজকের এই সোমবারের সকালটাকে, সকালের বৃষ্টিটাকে এবং হারিয়ে যাওয়া ছাতাটাকে দোষ দেওয়া গেলেও হামিদকে কোনো অবস্থাতেই দোষ দেওয়া যাবে না। কখনো ঝমঝম করে কখনও বা টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ার ফাঁকে অনেকের মতোই হামিদকে আবদুল্লাপুরের ব্যতিব্যস্ত রাস্তার উপর বাসটা দাঁড়াতেই প্রায় গায়ের জোর খাটিয়ে উঠতে হয়েছিল, ভর্তি বাসের লোকজনকে ধাক্কা দিতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন তার ফুলপ্যান্টের পেছন থেকে কে যেন টেনে ধরেছেন, তখন এমন একটা অবস্থা, হামিদ ভিড়ের ভেতরে পেছনের দিকে ঘাড় ফেরাতে না-পারলেও বুঝতে পারলেন পকেটমারের বৃথা চিন্তার কথা। কেন না তিনি তার ম্যানিব্যাগ আর সামান্য দামের মোবাইলটি দুপুরের লাঞ্চবক্সের সঙ্গে আরো একটি বক্সে শিরিন বেগম স্বযতেœ তুলে দিয়েছে খাবার ব্যাগের ভেতরে। আরো হাতে বিশ-তিরিশ টাকা তুলে দিয়ে জানিয়ে দেয়, টাকাগুলো আসা যাওয়ার রিকশা আর বাস ভাড়া, তার পরেও হামিদ বুঝতে পারলেন, তার ব্যাগের পেছন টেনে যিনি উপরে উঠবার চেষ্টা করছিলেন তিনি তার কণ্ঠস্বর শুনে বুঝলেন, বুঝতে পারলেন একজন মহিলা তাকে বলছেন, আমাকে বাসের ভেতরে যেতে দিন। নিরুপায় হামিদ যদিও মহিলাটির মুখ দেখতে পেলেন না, তবু তিনি একটু ঘন স্বরেই বললেনÑ ম্যাডাম যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেইভাবেই এই বৃষ্টির দিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে আশুলিয়া নবীনগর। হামিদের ঘন কণ্ঠস্বর শুনে বাসের আরেক যাত্রী মহিলার ডানহাত ধরে প্রায় এক ঝটকায় হামিদকে তিরস্কার করেই বললেন, পারলে প্রাইভেট কার নিলেই পারেন। তরুণ ছেলেটি সেই মেয়েটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বামহাতটি মেয়েটির স্পর্শকাতর জায়গাটিতে বেশ জোরে সোরেই চাপ দিয়েÑ দ্রæত বাস থেকে নামার সময় মেয়েটির উরুতেও আরো একটি চাপ দিতে গিয়ে চাপটি পড়েছিল হামিদের উরুতে, ইতোমধ্যে মেয়েটি এক ধরনের সুখ অনুভব করলেও, তার খারাপ লাগেনি, সে খুব ভালো করেই জানে, ভিড়ের বাসে উঠলেই কেউ-না-কেউ স্পর্শকাতরে হাত দেবেই, আর না দিতে পারলে কনুইয়ের সদ্ব্যবহার বুড়ো-জোয়ান কেউ-ই ওই সুযোগ কিছুতেই ছেড়ে দেয় না। সে আরো জানে এই ঢাকা শহরে প্রায় প্রতিদিন হাজার হাজার মহিলা-মেয়ে-গর্মেন্টসের মেয়েরা সকলেই জানেন, নিত্যকার ভোগান্তির কথা, সঙ্গে স্পর্শকাতরে কেউ যদি চাপ টোকা না দেয়, কেন যে ভালো লাগে না, আজ অব্দি, মেয়েটি বুঝতে পারে না। শুধু বুঝতে পারল, যে লোকটির প্যান্ট ধরে বাসে উঠেছিলাম, সেই লোকটি এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন পশ্চিমের দিকে চেয়ে। দুটি হাত ধরে আছে বাসের লম্বা লোহার পাইপটাকে। মেয়েটি পুনরায় ভাবল, যদি প্যান্টওলার সামনে থাকতাম, নিশ্চয়ই তিনিও কোনো না কোনোভাবে উরুতে, পাছায় কিংবা বক্ষে হাত দিতে দ্বিধা বোধ করতেন না। যেহেতু ছেলেরা বৃষ্টিতে ভেজা পরিচ্ছন্ন কচুর পাতা, পানি ইচ্ছে করলেও সেখানে দাঁড়াতে পারবে না অথচ আমার মতো মেয়েদের শরীরে বাস যাত্রীরা প্রতিদিন কাউকে না কাউকে এক বিশ্রি অভিজ্ঞতা নিয়ে রাত নয়টায় ফিরতে হচ্ছে আবদুল্লাপুর আশুলিয়ায়Ñ এমনকি নবীনগরের ছোটখাট বাসগুলোর ভেতরে। কথাটি তার হঠাৎ করেই মনে পড়ল, বেশ কয়েক বছর আগে তার শরীরে কেউ-ই হাত দেয়নি, এমনকি তাকে কেউ বলেনি কটু কথা। বোধহয় সেদিনের সেই বাসে লোক কম ছিল তাই উঠতে অসুবিধে না-হলেও বাস থেকে নামবার আগেই বাসের পাদানিতে দাঁড়ান বাস কন্ডাক্টরকে নিচে নামিয়ে দেবার আগে বাস কন্ডাক্টরকে একরকম প্রায় চিৎকার করেই বলল, মহিলা যাত্রীকে আগে নামতে দিন, দেখছেন না বাসের সিঁড়ির দরজায় কি লেখা আছে। অন্য এক যুবক বাস কন্ডাক্টরকে ধমক দিলেও একটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে বাসের ভেতরে জোর করে উঠবার সময়ই ইচ্ছাকৃতভাবে হামিদা বানুর বাম বক্ষটাকে ইচ্ছাকৃত চাপ দিলেও হামিদা কিছুই বলতে পারেনি সেদিন।

আজ যে-লোকটির প্যান্ট ধরে তিনি এই বাসে উঠলেন, ভদ্রলোক বিরক্ত হলেও মহিলা যাত্রীকে উঠবার সুযোগ করে দিলেন বাসে। তবে তার পেছনে। আর সেই পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল সেই প্রথম দিনের যুবকের মতো আর এক বদমাইশ। কখন থেকে হারামজাদা মনের সুখে ঠেকিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন খেয়ালই নাই। কিন্তু ওই হারামজাদাকে কিছু বলা যাবে না, বললেই কেউ-না-কেউ বলবেন ম্যাডাম, বাসে না-উঠে একটি গাড়ি কিনলে সেখানে আর কারোÑ অথচ আজকেও যখন হামিদা অনুভব করছেন, পিছনে কিছু একটা হচ্ছে, তবু তিনি বলতে পারলেন না। তার আগেই কন্ডাক্টর জানাল সামনেই জামগড়া। প্যান্ট পরিহিত হামিদকেও নামতে হলো, সঙ্গে নামলেন হামিদা বানু। আগেও একদিন নেমেছিল এই বাস স্ট্যান্ডে দুজন একইসঙ্গে আজকেও তাই হলো। দুজনই জানলেন নিজেদের নাম, হামিদা বানু। আমি আবদুল হামিদ। হামিদ আরো জানাল, আমাদের এমডি সাহেব তো আপনার আত্মীয়। মনে আছে কিনা, জানিনে, আমাদের কোম্পানির বার্ষিক ভোজনে আপনি এসেছিলেন, এর আগে একদিন এই রকম বৃষ্টিভেজা সকালে আমি আর আপনি একই বাসে নেমেছিলাম জামগড়া বাসস্ট্যান্ডে। কথাটা শুনে হামিদা দুটি অফার দিলÑ ১. হামিদ, মোবাইল নম্বরটি দিলে খুব খুশি হবো। ২. আজ যদি মাত্র একটি রিকশা পাই, সেই রিকশায় যদি আমরা দুজনে যাইÑ তাহলে কি আপনার খুব একটা অসুবিধে হবে ? হামিদ জানাল, যেতে পারি তবে রিকশা ভাড়া… সেই বৃষ্টিতে সেদিন দুটি রিকশা পেলেও এক রিকশা চালক জানিয়েছিল রাস্তা খারাপ, ভাড়া বেশি দিলেও যাবো না, আরেক রিকশা চালক যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল যেহেতু এই প্রেমিকা প্রেমিকের নিকট থেকে ভাড়া বেশি পাওয়া যাবে। ওই রিকশায় উঠেছিল দুজন।

 

একটু আগে শিরিনের বাবা আর বড়ো ভাইয়ের মোবাইল এসেছিল হামিদ এবং শিরিনের কাছে। আনিস আর শিরিনের ছোট বোন মিনার বিয়ের কথা এসেছে। জানিয়েছিল বাবা আর আনিস ভাই। পাত্র একজন আর্মির ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেনের পিতার চেয়ে ক্যাপ্টেন সাহেবের পছন্দ অধিকতর হওয়ায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার এসেছিল আনিসদের বাড়ি সেই ক্যাপ্টেনের পিতা খুলনার খালিশপুর থেকে। শিরিনকে বাবা হাবিবুর রহমান এবং আনিস আদ্যপান্ত সবই জানিয়েছে ইতোমধ্যে খালিশপুরে গিয়ে ক্যাপ্টেন সাহেবের বাড়িঘর নিজেই দেখে এসেছে আনিস। এমনকি বাড়ির বর্ণনাও দিয়েছে মহসিন কলেজের পশ্চিমে প্রভাতী বিদ্যালয়ের উল্টোদিকে হলুদ দোতলা বাড়িটি। সামনে বিশাল খেলার মাঠ। আনিস আরো জেনে এসেছে, ক্যাপ্টেন সাহেবেরা তিন বোন দুই ভাই, তবে মা মারা গিয়েছেন বছর তিনেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায়, মিনা যদি ওই বাড়িতে যায়, মিনা হবে ওই সংসারের ছোট বউ। বড়ো ভাই বিয়ে করেছেন পাইকগাছায় সেখানেই বড়ো ভাই থাকেন, ঘের আর চিংড়ি ব্যবসা আছে তার।

শিরিন জানতে চেয়েছিল, মিনাকে কথাগুলো বলা হয়েছে কিনা। এবং বড়ো ভাই জানিয়েছিল তোদের সাথে কথা না বলে আগেই মিনাকে বলাটা ঠিক হবে না, ভেবেই আমরা কেউ-ই বলিনি, বলেছি তোদের মা’কেও, মা, তখুনি জানিয়েছিল তোর সঙ্গে কথা বলতে। এবং হামিদকে যেন বলা হয়। হামিদ যখন অফিসে ঠিক তখুনি শ্বশুরের মোবাইলটি পেয়ে বলেছিলÑ আমি আমার মালিকের রুমে আছি পরে কথা বলব, কথা রেখেছিল হামিদ প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে, মোবাইলে জেনে নিয়েছিল মিনার বিয়ের যাবতীয় কথা, এমনকি ছেলে তো আর্মির ক্যাপ্টেন শোনামাত্রই সম্মতি দিয়েছিল, বিয়েটা হলে মন্দ হয় না, শ্বশুর জানতে চেয়েছিলেন, তুমি ও শিরিন কবে ডুমুরিয়ায় আসতে পারবে। সে প্রশ্নের উত্তর না-দিয়ে জামাই জানিয়েছিল, এখন অফিসের কাজকর্ম নিয়ে খুবই ব্যস্ত। যেহেতু কয়েক কোটি টাকার জামা, প্যান্ট, শীতের জ্যাকেট, পায়ের হাতের মোজা, ইউরোপ আমেরিকাসহ জার্মানিতে যাবে সেই সকল তো আছেই, আরো আছে টাকা পয়সার হিসাব। এবং কোম্পানির মালিকদের ভেতরে একটি অন্তর্দ্ব›দ্ব কখন যে কি হয়, বলা যায় না, তবে মালিকেরা আমাকে খুব পছন্দ করে খুব তাড়াতাড়ি প্রধান হিসাব রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নাকি পাঠাবে চিটাগাং অফিসে।

 

কথা হয়ত আরো বলা যেত তার আগেই মোবাইলের ব্যালান্স শেষ হয়ে যাওয়ায় কথা আর এগুতে না পারলেও শ্বশুর হাবিবুর রহমানই মোবাইল করে জানালেন, আমি আর তোমার শাশুড়ি আগামী সপ্তাহে ঢাকায় আসছি। থাকব দুই রাত তোমাদের আরিচপুরে। আর মেরাদিয়ায় তোমার ফুপুশাশুড়ি ঝরনার বাসায়। ঝরনার শরীরটাও নাকি খুব ভালো নয়, ওকে দেখতে যাব, ওর আবার খুব গুলশা মাছ পছন্দ, যেমন পছন্দ আমার শিরিনের গলদা চিংড়ি।

আজকাল নাকি ঢাকায় চলাফেরা দায় হয়ে পড়েছে। রাস্তায় রাস্তায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় জ্যামে আটকে থাকতে হয়। দিন কয়েক আগে তোমার চাচাশ্বশুর আর ইউসুফ ভাই খুলনা থেকে ট্রেনের টিকিট না পেয়ে শেষে এক বাসে উঠেছিল সকাল সাড়ে নয়টায়, ভাই নাকি ঢাকায় মিরপুরের ওর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছিল রাত ১টায়। তাই ভাবছি, ট্রেনে যাওয়াটাই ভালো, যদিও কালোবাজারিতে টিকিট কিনতে গেলে দু’একশ টাকা বেশি গুণতে হয়। তবু ভালো, রাস্তার জ্যামে দৌলতদিয়া ঘাটেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে না থাকার চেয়ে দু-একশ টাকা বেশি দেওয়াই ভালো, কি বলো হামিদ ?

আবদুল হামিদ মনোযোগ দিয়ে শ্বশুরের সব কথাই শুনলেন, পরে বললেন, সুন্দরবন এক্সপ্রেস টঙ্গীতে দাঁড়াবে না, দাঁড়াবে গিয়ে বিমানবন্দর ইস্টিশনে, তবে খুলনা থেকে ঢাকায় ট্রেনে আসতে দশ ঘণ্টার মতোই লাগে, তারচে আপনি যশোর থেকে বিমানে ঢাকায় এসে একটি সিএনজি নিয়ে আরিচপুর চলে আসবেন। ঝরনা ফুপুর জন্যে গুলশা আর শিরিনের জন্যে চিংড়ি বিমানে নিয়ে এলে, নষ্ট হবে না। জামাইয়ের প্রস্তাবে চিংড়ি ঘেরের মালিক হাবিবুর রহমান মনে মনে রাজি হলেও হামিদকে জানালেন দেখি, তোমার শাশুড়ি কি বলে, শিরিনের মায়ের আবার খুব ভয়, যদি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে, এই তো দুদিন আগেই ঢাকার এক প্রাইভেট বিমান কোম্পানির এক বিমান নেপালের কাঠমুন্ডুতে দুর্ঘটনায় পড়ে মাঝখান থেকে অনেকগুলো লোকের প্রাণ গেল, তবু আমি আনিসের মায়ের সঙ্গে কথা বলে নেই, ও যদি উড়োজাহাজে যেতে চায় যাবে, আর তা না হলে ট্রেনে। তবে বাসে নয়। হাবিব সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে শেষে বললেন, তোমাকে জানাবো যাবার আগে শিরিনকে বলোÑ ও ওর মায়ের কাছে যে-নেকলেসটি বানানোর কথা বলেছিল, সেটি বানানো হয়ে গেছে। আসবার সময় নিয়ে আসব। তুমি যদি সময় পাও একদিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে আমাদের পাড়ার আর্মির সুবেদার আজিজ গাজীর সাথে দেখা করে জেনে নিও, মিনাকে যে ছেলেটি বিয়ে করতে চায় ছেলেটি কেমন স্বভাব চরিত্রের। আজিজ গাজী তোমার শাশুড়ির দিককার আত্মীয়, তোমাকে চেনে। আমি ওর মোবাইল নম্বরটি ম্যাসেজ করে দিচ্ছি। তুমি অবশ্যই যোগাযোগ করবে গাজীর সঙ্গে।

 

মিস গোমেজের মনটা আজ কয়েকদিন থেকেই খারাপ। আগে প্রায়দিনই সিডনি থেকে আলফ্রেড এলিনার সাথে কথা বলত, কবে কখন দেখা হবে ঢাকায় গেলে, কোন কোন হোটেলে দুই-এক রাত… পরের কথায় এলিনা যেতে না দিলেও ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন মনে মনে, বিয়ের আগে যদি আসে তবে এদিক সেদিক দুই একবার যাওয়া যেতে পারে বিশেষত তার পিতামহের বাড়ি বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে বান্দুরায়, অথবা বরিশালের গৌরনদীতে। গৌরনদীতে যাবো ছোট পিসির বাড়িতে পিসেমশাই আবার থানার দারোগা। গত বছরের বড়োদিনের তিনদিন আগে পিসি, পিসে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে এসে উঠেছিলেন আমাদের এই তেজগাঁওয়ের বাড়িতে। আমরা সপরিবারে প্রভুর জন্মদিন পালন করেছিলেম, রমনার বড়ো গির্জায়, বড়ো গির্জার প্রার্থনা শেষে পিসি পরিচয় করিয়ে দিলেন তাদেরই গৌরনদীর তাদের শ্বশুরবাড়ির এক তরুণের সাথেÑ পিসি জানিয়েছিলেন আলফ্রেড তাদের দূর সম্পর্কের দেবর, তবে আলফ্রেড বুয়েটের আর্কিটেকচারাল বিভাগে মাত্র কিছুদিন আগে প্রভাষকের চাকরি পেয়েছে। ও অচিরেই অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে, ওর মামা থাকেন সিডনিতে। পিসি কথা না বাড়ালেও এলিনাই কথা বাড়িয়ে শুধু জানিয়েছিল, আমাদের বাড়িটা হলিক্রস কলেজের চারটি বাড়ির পরেই তিনতলা বাড়িটি, সুযোগ সময় পেলে আসবেন, বাড়িটির ডিজাইন কেমন করেছেন, আপনার মতোই আর একজন স্থপতি। আলফ্রেড উৎসাহ দেখিয়ে তখুনি বলেছিল, যেতে পারি, যেকোনো ছুটির দিন যদি সময় হাতে থাকে, তবে মোবাইল নম্বরটি যদি দেন, যাবার আগে আপনাকে জানিয়ে যাব। আলফ্রেড কথার ফাঁকে ফাঁকে জেনে নিয়েছিল এলিনার পড়ালেখা কোথায়। বুদ্ধিমতী এলিনা জানিয়েছিল স্কুল, কলেজ হলিক্রসে, পরেরটুকু একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে বাংলায় এবং ইংরেজি দুটোতেই পড়ালেখা শেষ করে একটি গার্মেন্টস কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেছি মাত্র কিছুদিন আগে।

আপনি যে বাংলায় পাশ করেছেন, আমিও তাই অনুমান করেছিলাম। এলিনা জানতে চাইল কেমন করে ? ওই যে, আর্কিটেক্ট না বলে যখনই ‘স্থপতি’ বলেছেন তখুনি আমার মনে হয়েছে। কথা হয়ত আরো এগুতো কিন্তু শীতের রাত বড়োদিনের উৎসবে আরো কয়েক বাড়িতে নিমন্ত্রণ, সেখানে পানাহারসহ রাতভর নাচানাচি শুরু হবে রাত ১২ টার পর থেকে, তবে আমি আলফ্রেড রাত এগারোটার পরেই ফিরে যাব ল²ীবাজারের বাসায়। মা মারা যাবার পর থেকেই বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়েই গৌরনদী থেকে বান্দুরায় মাসির বাড়ি থেকে ল²ীবাজারে নিয়ে এসেছি। আলফ্রেড হয়ত আরো কিছু কথা মনে মনে ঠিক করার আগেই এলিনা জানিয়ে দিলÑ আমরা অল্পক্ষণের ভেতরেই ফিরে যাব, এলিনার কথা শেষ না হতেই, আলফ্রেড শুধু বিনয়ের ভঙ্গিমায় জানালেনÑ আপনার মোবাইল নম্বরÑ যেন এই কথার জন্যেই অপেক্ষায় ছিলেন মিস এলিনা গোমেজ পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির উন্নত নাসা আর বক্ষের বক্ষবন্ধনীতে পোশাকের ঔজ্জ্বলতায় নতুন হিলহীন জুতায় বড়োদিনের গির্জার প্রার্থনার কক্ষের আলো আঁধারিতে যেভাবে তিনি নিজেকে উপস্থাপন উদ্ভাসিত করেছিলেন, সেটি তিনি না জানলেও জেনেছিলেন তরুণ আর্কিটেক্ট, বুয়েটের তরুণ শিক্ষক আলফ্রেড রোজারিও।

রোজারিওকে সেই শুভদিনের শুভক্ষণে শুধু যে এলিনা গোমেজ মন দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছিলেন, বলা যাবে না, বলা যাবে সেই মন দেবার আগেই তাকে দিতে হয়েছিল মোবাইলের নম্বরটি। এলিনা ইচ্ছাকৃতভাবেই রোজারিওকে বলেনি নম্বর দিতে। রোজারিওর সেই আলো আঁধারিতে আরো ভালো লেগেছিল, এলিনা উপযাচক হয়ে তার নম্বরটি নিতে চায়নি বলে। মনে মনে ভেবেছিল মেয়েটির পার্সোনালিটি আছে, মুগ্ধ করেছে আজকের তার সাজপোশাক। কোথায়ও কোনো অমার্জিত আভরণ নেই তার সমস্ত শরীর জুড়ে, এমনকি শরীরে যে সুগন্ধি লাগিয়ে এসেছে সেটির গন্ধ উৎকট নয়। আমরা এখন ধরে নিতে পারি, আলফ্রেড আর এখন নিজের ভেতরে নেই, সে এখন বিলীন হতে চায় এলিনার মধ্য হৃদয়ে, হৃদয় কোমলে। আমরা পুনরায় বিবেচনায় আনতে পারি এলিনার হৃদয় আসলে বুয়েটের তরুণ ভূপতি ইতোমধ্যে আসন পেতেছেন, প্রভু যিশুর ইচ্ছায় মা মেরির কল্যাণে। তেজগাঁয়ে নিজেদের বাড়ির তিনতলায়, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের প্রচÐ শীতে সমস্ত শরীরে অনুভূতি জেগেছিল উষ্ণতারÑ বাসায় ফিরে আসার পরেই।

সেই উষ্ণতার কথা আজ আবার মনে করিয়ে দিল সিডনি প্রবাসী রোজারিও। এলিনার ব্যক্তিত্ব সেই প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেই বড়ো দিনের রাতে প্রার্থনা শেষে, যখন ল²ীবাজারের দিকে রোজারিও পা বাড়িয়েছিল শুধু শুনেছিল এলিনার শেষ একটি কথা, আবার দেখা হবে। এই আবার দেখা হবে, কথাটি বার বার যখন কানে ভেসে আসে তখুনি রোজারিওর অনিচ্ছা সত্তে¡ও তার মোবাইলটির নম্বর কেঁদে উঠেছিল এলিনার মোবাইলে। একটু আগে প্রচÐ শীতের রাতেও তিনতলার ছাদেও কেঁদে উঠেছিল। তাই এলিনাকে শুনতে হয়েছিল, Ñ ‘যদি দুই-একরাত’ আর তখুনি আরো উষ্ণ হয়েছিল এলিনা, নিজের গলার স্বরটাকে মধ্যলয়ে রেখে বলেছিল, ভূপতি আপনার কাছ থেকে একথা আমি শুনতে চাইনি, শুনতে চাই ঢাকায় ফিরবেন কবে। রোজারিওর তখুনি মনে পড়েছিল, মেয়েটির ব্যক্তিত্বের কথা তার উচ্চতাসহ উন্নত নাসা ও বক্ষের সঙ্গে মায়াময় মুখটির সঙ্গে মাথার ঘন কেশের সঙ্গে লাল টুকটুকে জুটি ক্লিপের এখনো চোখের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, সিডনির অজস্র সুশ্রী সুন্দরীদের চেয়েও অধিক সুন্দর সেই ক্লিপের রং, সেই বড়োদিনের স্মৃতি। ইতোমধ্যে সেই সুশ্রী সুন্দরীদের দু’-চারজন যে রোজারিওর মনের দুয়ারে হানা দিলেও, প্রবেশ করতে পারেনি দরজা বন্ধ জেনে, সুশ্রীরা গিয়েছে তাদের নিজস্ব নিয়মের ভুবনে। স্থপতি বা ভূপতি রোজারিও যে ভুবনে এখন নিজেকে পাঠিয়ে দিয়েছে, বহুদূরের ঢাকা শহরের তেজগাঁয়ের হলিক্রস কলেজের তিন-চারটি বাড়ির পরের একটি তিনতলা বাড়িতে। সিগারেট ধরাতে গিয়ে রোজারিওর মনে পড়ল আগামী পরশু যেতে হবে তার সেই আত্মীয়ের বাড়িতে। যিনি একদা এই শহরেই ছিলেন। আগামীকালকে সিডনির বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে জমা দিতে হবে, বাংলাদেশের স্থাপত্যের উপর একটি পেপার।

 

মিনার বিয়ের কথা বলার জন্যে হাবিব সাহেব তার স্ত্রীসহ যশোর থেকে উড়োজাহাজেই ঢাকা এলেন, ঢাকায় আসার ঘণ্টা খানেক আগেই শিরিনকে জানিয়েছিলেন, Ñহামিদ মোবাইল ধরছে না। বোধহয় ব্যস্ত আছে, অথবা চার্জ নাও থাকতে পারে, Ñ তুই যদি পারিস এয়ারপোর্টে চলে আসিস, ভালোই হবে। শিরিন বাবার কথা রাখতে যাবার আগেই, হামিদের অফিস থেকে খবর এলো, হিসাব রক্ষক হামিদ সাহেব হঠাৎ অ্যাপেনডিক্সের ব্যথায় কষ্ট পাওয়ায় কোম্পানির মালিকদের একজন বাদশা মিয়া হামিদ সাহেবকে গাজীপুরের হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। যশোর এয়ারপোর্ট থেকে যখন হাবিব সাহেব তার কন্যাকে ঢাকা এয়ারপোর্টে আসতে বলেছিলেন, তার আগে যদি স্বামীর অসুস্থতার কথা শিরিন জানতো,Ñ কিন্তু তিনি যেন হঠাৎ করেই মাকড়সার জালে আটকে গেলেন। ঢাকা এয়ারপোর্টে তার যাওয়া ঠিক হবে কি হবে না,  নাকি গাজীপুর হাসপাতালে তাকে স্বামীর কাছে আগে যেতে হবেÑ কোনোটাই তার বোধে আসছিল না, যেন তিনি মাকড়সার সেই জালের ভেতরে দোদুল্যমানতার মাঝখানে আটকে ছিলেন কিছুটা সময়। পরক্ষণেই স্থির করলেন যশোর এয়ারপোর্টে যদি মা-বাবা থাকেন বলে দেই, ঢাকা এয়ারপোর্টে যাওয়া হবে না, চিন্তাকে অগ্রসর হতে না দিয়ে হাবিব সাহেবকে পেতে চাইল মোবাইলে, মোবাইলের ভেতরের ভদ্রমহিলা জানিয়ে দিলেন দেওয়া সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে বিমান যশোর, ফরিদপুর ছেড়ে যমুনা নদী হয়তো পাড়ি দিচ্ছে কিনা আল্লাই জানেন, বরং গাজীপুর হাসপাতালে স্বামীর কাছে যাওয়া অনেক ভালো। শিরিনের দুই চিন্তার মাঝখানে অফিসের একটি মোবাইল জানিয়ে দিল, হাসপাতালে ডাক্তার বলেছেন, অ্যাপেন্ডিক্সের অপারেশন আরো একমাস পরে অবশ্যই করতে হবে, এখনো অ্যাপেন্ডিক্স পুরোপুরি ম্যাচুউর হয়নি, ম্যাচুউরড হলেই। ডাক্তার আরো বলেছেন, তবু এক সপ্তাহ আমাদের কেয়ারে থাকতে হবে, দুইশো তিন নম্বর বেডে।

পাশের বাড়ির খালাম্মাকে, যিনি এই বাড়ির মালিক, তাকে শিরিন জানালেন অনেকগুলো কথা। তার ভেতরে হামিদের কথা, খুলনা থেকে মা-বাবা আসছেন ঢাকায়, উঠবেন এখানে, এবং শেষ কথা যেটি জানালেন, Ñআমাকে হাজার তিনেক টাকা দিতে হবে খালাম্মা। মাসের শেষ। শিরিনকে আর কথা এগুতে না দিয়ে বাড়ির মালিক দুই হাজার টাকা এনে দিয়ে শুধু জানতে চাইলেন, গাজীপুরের সরকারি হাসপাতালটি তুমি চেন কিনা ? শিরিন জানিয়ে দিলÑ সে শুধু টঙ্গী স্টেশন আর ঢাকা এয়ারপোর্ট এই তার চেনাজানার ভেতরে, তবে এই প্রায় এক বছর আপনার বাড়িতে ভাড়া আছি, হামিদ একদিন ইস্টিশন আর একদিন এয়ারপোর্ট দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার পথে দু’জনে চাইনিজ খেয়ে বাসায় ফিরেছিলাম, বেশ একটু গভীর রাতে। শিরিন আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলেন না, বাড়ির খালাম্মা তার নিজের ছোট ভাইটাকে শিরিনের সাথে পাঠিয়ে দিলেন গাজীপুরের হাসপাতালের দিকে। তবু শিরিনকে বলতেই হলো, ঘরের চাবি মা-বাবা এলে দেবেন, উনারাও এই প্রথম আসছেন আপনার বাড়িতে।

 

বাদশা মিয়া, এলিনা গোমেজ এবং জনাকয়েক হাসপাতালে সন্ধ্যার পর পরই হামিদকে দেখতে এসে দেখতে পেলেন, শিরিন বেগম চোখ মুছছেন, যদিও বাদশা, এলিনা এবং হামিদের সহকর্মীরা আগে কোনোদিনই মিসেস হামিদকে দেখেননি, এলিনা অনুমানে ধরে নিয়েছিলেন, এই সুশ্রী ভদ্র মহিলা হামিদেরই স্ত্রী হবেন। সেই বিশ্বাসেই তিনি শিরিনকে জানালেন, আমরা হামিদের সঙ্গে একই গার্মেন্টেসে কাজ করি। আর উনি হলেন বাদশা মিয়া, আমাদের ব্যবস্থপনা পরিচালক। শিরিন বাদশা মিয়ার নামই শোনেনি এমনকি এলিনাসহ অন্য কারো। তবু চোখ মুছতে মুছতে তাকে দিতে হলো সালাম। এবং একই সঙ্গে বাদশা মিয়ার মুখের দিকে তাকিয়েই শিরিনের মনে এলো, এই লোকটির মুখের আদল অনেকটাই আমার কলেজ জীবনের সেই দ্বিতীয় মুখটির মতো, আশ্চর্য মানুষের চেহারায় এত মিল হতে পারে স্বপ্নেও ভাবিনি কোনোদিন, শুনেছিলেম সেই দ্বিতীয় মুখের ছেলেটা রাজাকার হয়েছিল এবং তিনি নিহত হয়েছিলেন মুক্তিদের হাতে। হাতে, শব্দটা শিরিনের মনে আসতেই একটি গোলাপের সুগন্ধ পেলেন সেই ২০৩ নম্বর রুমের ভেতরে। এবং পরক্ষণেই মনে পড়ল দ্বিতীয় মুখ আমাকেÑ আমাদেরকে বাঁচিয়েছিল সেই দুর্যোগের দিনে। শেষবার শিরিন ভাবলেন, আজ যদি প্রথম মুখটি দেখতে পারতেন, তা না, তাকে দেখতে হলো সেই দ্বিতীয় মুখসহ অনেকেগুলো অন্য পুরুষের মুখ এবং একজন ধিঙ্গি মেয়েকে, যার উচ্চতা আমার চেয়েও বেশি। তবে দেখতে বেশ মিষ্টি। তখুনি নার্স এসে জানালেন ভিজিটিং আওয়ার অনেক আগে শেষ হয়েছে। বাদশা, এলিনার বুঝতে অসুবিধে হলো না নার্সের কথার মর্মার্থ। তখুনি এলিনাকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বাদশা মিয়া জানালেন শিরিনের হাতের অবস্থা কীরকম, একটু জেনে আসুন, জানা গেল সত্যকথাটিই, মাসের শেষ। হাসপাতালে এনেছে কিছু টাকা অন্যের কাছ থেকে ধার নিয়ে। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য বলেই মনে করলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কোম্পানির অন্যান্য সহকর্মীদের দেখিয়ে এলিনার হাতে তুলে দিলেন একটি প্যাকেট। কেউ জানল না, এমনকি এলিনাও। বাদশা মিয়া শিরিনকে কাছে ডেকে প্রায় কানের কাছে মুখ এনে জানালেন, মাত্র কুড়ি হাজার টাকা আছে। হাসপাতাল থেকে রিলিজ হবার আগে জানালেÑ এলিনা এসে আরিচপুরে আপনাকে আর হামিদকে নামিয়ে দেবে। ওষুধপত্র যা লাগবে কোম্পানিই দেবে, এবং পরবর্তীসময়ে একটু চুপ থেকে বাদশা মিয়া এলিনাকে জানালেন, বউমাকে আরিচপুরে নামিয়ে দেবে অফিসের মাইক্রোবাসে। মাইক্রোতে তুমি থাকবে। বউমা পৌঁছানোর পরে তুমি চলে যাবে তেজগাঁ তোমাদের বাড়িতে। বাদশা মিয়া আর দেরি না করে জানিয়ে দিলেন। হামিদ খুবই ভালো হিসাব রক্ষক, অচিরেই প্রমোশন দিয়ে চিটাগাং ফ্যাক্টরিতে প্রধান হিসাব রক্ষক করে পাঠিয়ে দেব, সঙ্গে বউমাও যাবে। অন্য সহকর্মীদের বাদশা মিয়া জানালেন, মাইক্রোতে কাছাকাছি যারা থাকেন ড্রপ নিন, আর ততক্ষণ এলিনা এখানেই থাকবে। রাত দশটার ভেতরেই যেন মাইক্রো চলে আসে হাসপাতালে।

বাদশা মিয়ার সাথে একে একে সকল সহকর্মীই নেমে গিয়ে উঠলেন মাইক্রোতে। বাদশা মিয়া তার পাজেরোতে উঠে ভাবলেন, আজ রাত কাটাবেন মোহাম্মদপুরে তার বড়ো বউয়ের সাথে। বউ আগেই জানিয়েছিল, সে হয়ত আর বেশিদিন বাঁচবে না, তার বোধহয় কোনো কঠিন অসুখই হয়েছে, আমি কোটি কোটি টাকার মালিক বাদশা মিয়া, পড়েছি ফাঁদে। আমার ডানে মোহাম্মদপুর বায়ে বনানী কোন দিকে যাব। কি হবে আমার কোটি কোটি টাকা দিয়ে। যদি … বাদশা মিয়ার চোখ ভিজে এল, অনেকদিন পর তিনি অনুভব করলেন প্রথম স্ত্রী-ই তার ল²ী। দ্বিতীয়টা অপয়া, দ্বিতীয়টিকে যেদিন ঘরে এনেছিলেন, সেদিনের পরেরÑপরেরদিন ফ্যাক্টরির মেশিন ঘরে আগুন লেগে অপারেটর মারা গিয়েছিলÑ পুলিশকে ম্যানেজ করতে গিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিল, আরো নিল ফ্যাক্টরির শ্রমিকনেতা। শ্রমিক নেতা লাখ দুয়েক টাকা হাতালেও হয়ত তার ভাগে পড়েছিল হাজার পঁচিশেক। শ্রমিক নেত্রী তাকেই ম্যানেজ যখন কিছুতেই করতে পারছিলেন না, তখুনি বাদশা মিয়ার ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা গিয়ে নেত্রীকে জানিয়েছিলেন, ম্যাডাম আপনি যদি এই জামগড়া, আশুলিয়া থাকতে চান তাহলে এই রেখে দিন, আর যদি নিতে বা রাখতে না চান, তাহলে হয়ত আপনাকে অনেকেই দেখবে কাল পরশুর ভেতরে তুরাগ নদীর স্রোতে ভেসে চলেছেন দক্ষিণ থেকে উত্তরে। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ পাশ দিয়ে আমাদের এখন আর দরকার নেই, ছিল সেই পাকিস্তান আমলে টঙ্গির শিল্পাঞ্চলে। বিহারিদের কলকারখানায় শ্রমিক ছিল বাঙালি। ন্যায্য টাকাও দিত না, সেই কথাই বলেছিল কাজী জাফর, তিনি এমএ, বিএ পাশ ছিলেন দেখতেও ছিলেন সুন্দর, তখন আমি ক্লাশ ফোর-ফাইভে পড়তাম আরিচপুর প্রাইমারি স্কুলে। আমার আব্বা ছিলেন বিখ্যাত শ্রমিক নেতার ডান হাত, উচ্চশিক্ষিত কাজী জাফর আহমেদের। সেই জাফর ভাই এই বাংলাদেশ হবার পরে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। আপনি ম্যাডাম, অতবড়ো শ্রমিক নেত্রী হননি। নেত্রী মনে মনে হাসলেন, নেতার ভাষণ শুনে, শুধু বলতে পারলেন না, আমিও এমএ পাশ করেছি, তবে জাফর সাহেব মৃত্যুর কয়েক বছর আগে জনগণ তাকে উপাধি দিয়েছিল, চিনি চোর জাফর। আশুলিয়া জামগড়ার স্থানীয় নেত্রীর মনের ভেতরে কথাগুলো গুমরিয়ে মরলেও বলতে পারলেন না, শুধু নাকি বলেছিলেন, ঠিক আছে, প্যাকেটটা রেখে যান।

 

শিরিনকে রাত দশটার আগেই এলিনা পৌঁছে দিল আরিচপুরের বাসায়। যাবার সময় বলে গেল যতদিন হামিদ হাসপাতাল থেকে বাসায় না ফিরে আসে, ততদিন আপনাকে হাসপাতাল থেকে মাইক্রোতে বাসায় নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কাল আবার দেখা হবে। শিরিনকে তবু ভদ্রতার খাতিরে বলতে হয়েছিল, আপা একটু বসুন চা… এলিনা জানিয়েছিলেন আর একদিন, শিরিন নিজের বাসার দিকে তাকিয়ে দেখলেন ঘরে আলো জ্বলছে। নিশ্চিত হলেন মা-বাবা এসেছেন। হামিদের শ্বশুর-শাশুড়ি অসুস্থতার কথা শুনলেন, শেষে বললেন আগামীকাল আমরা তিনজনই যাব গাজীপুর হাসপাতালে। শিরিন জানাল, যেতে একটু কষ্ট হলেও ফেরার সময় হামিদের কোম্পানির গাড়ি পৌঁছে দেবে আমাদের। সেই গাড়িতে আজকে যিনি ছিলেন কালকেও তিনি আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে যাবেন, এই বাড়িতে। হাবিবুর রহমান, মিসেস রহমান আশ্বস্ত হলেন, দিন কয়েক পরেই জামাই হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবে আরিচপুরের বাসায়। সে রাতে শিরিন রান্না না করে বাইরের হোটেল থেকে বাড়িওয়ালির ভাইকে দিয়ে খাবার আনালেন ভালো হোটেল থেকে এবং সেই রাতেই দুই হাজার টাকা বাড়িওয়ালিকে ফেরত দিয়ে এলেন, সঙ্গে যে ছেলেটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে প্রায় জোর করেই একশ টাকা দিলেন, আর তিনজনের ফ্রাইড রাইচ আনবার জন্যে দিল শ-পাঁচেক টাকা। রাতের আহার শেষে মা-মেয়ে, বাবা বসলেন মিনার বিয়ের কথা নিয়ে। এমনকি খুলনার খালিশপুরের মহসিন কলেজের বিপরীতে ক্যাপ্টেনের পৈত্রিক বাড়ির প্রসঙ্গ এল এবং হবু জামাইয়েরা কয় ভাইবোন, শেষে শিরিন জানতে চাইল, মিনাকে বিয়েতে কয় ভরি সোনার গয়না দেওয়া হবে, বাবা জানালেন, তুই আমি আনিস এবং তোর মা মিলে ঠিক করব কী কী বিয়েতে দেওয়া যায়। আনিস আগামী শনিবার ঢাকায় আসবে চিংড়ি এক্সপোর্টের বিষয়টি ফয়সালা করতে, এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোতে। সেখানেও নাকি দান দক্ষিণার ব্যাপার আছে। তবে খুব বেশি লাগবে না, ওই অফিসের এক কর্মকর্তা, পাইকগাছায় ওর বাড়ি, আনিসের পরিচিত, তারপরেও। সে রাত্রে আর বেশি কথা এগোয় না, সে রাত্রে মা আর মেয়ে একত্রে ঘুমালেও শিরিনের চোখে কিছুতেই ঘুম এল না, এল কলেজ জীবনের প্রথম মুখটির কথা।

আনিস দিন কয়েক পরে ঢাকায় এসে উঠলেন তার এক বন্ধুর বাসায়, শন্তিনগরে। রাতে বাবাকে জানিয়ে দিল আগামী কালকে এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট অফিসে যাবে না, যাবে দিলকুশার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যারা মাছ সবজি বিদেশে পাঠায় তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে হবে চিংড়ির দাম, টনপ্রতি তারা কত দিতে পারবেন, যদি দরদামে মিলে যায় তাহলে আর এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট ব্যুরোতে না গেলেও চলবে। আনিসের কথা বাবার সাথে শেষ হবার পরে মা এবং শিরিনের সাথে কিছুটা কথা হলো, শিরিন জানাল হামিদ গাজীপুরের একটি হাসপাতালে। স্বভাবতই আমরা নিশ্চিত হতে পারি, আনিস আসবে শিরিনের বাসায়। এবং দুই ভাইবোন মিলে যাবে হামিদকে দেখতে। যদি বাবা-মা যেতে চান নিয়ে যাবে শিরিন। তবে আনিস যদি আগামী কালকে আসে ভালো হয়। বাসায় এলে আনিসকে শিরিন বলবে, তোমার সঙ্গে আমি মতিঝিল বেড়াতে যাব, দুইভাইবোন অনেকদিন একসাথে কোথাও যাইনি। এখানে বলে রাখা যেতে পারে, শিরিনের মনের একটি গোপন ইচ্ছের কথা। দুইভাইবোন একত্রে বেড়ানোর চেয়ে তার মনের গভীরে গেঁথে আছে, পাইকগাছার সেই অফিসারের কথা, যদি সেই অফিসার তার প্রথম জীবনের প্রথম মুখটি হয় তাহলে সেই মুখটি দেখে অন্তত নিজেকে শান্ত¡না দিতে পারবে, তার বহুদিনের ইচ্ছে আজ পূরণ হলো।

একদিন পরে হাসপাতালে শিরিন, আনিস, বাবা, মা গিয়ে দেখলেন হামিদ বারান্দায় কথা বলছে একটি মেয়ের সাথে। আনিসরা যখন হামিদের কাছাকাছিÑ তখুনি, মেয়েটি দ্রæত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন, শিরিন ভেবেছিল নার্সদের কেউ হবে, জিজ্ঞাসাও করেছিল, হামিদ সত্য কথা বলেছিল। আমাদের এমডি সাহেবের এক আত্মীয়া। আমাদের ফ্যাক্টরির পাশের ফ্যাক্টরিতে কাজ করে হয়ত এমডি সাহেরে নিকট থেকে শুনেছিল আমি অসুস্থ, তাই দেখতে এসেছিল। কথাটি সম্পূর্ণ সত্য। তারচেয়ে আরো গভীরতর সত্য এই মেয়েটি সেই মেয়েটি যিনি একদিন বৃষ্টিভেজা দিনে আবদুল্লাপুরে একইসঙ্গে বাসে উঠেছিল, আরেকদিন উঠেছিল হামিদের ফুলপ্যান্টের পেছন ধরে।

মেয়েটির নাম আমরা জানি এমনকি হামিদ হয়ত জানে। উৎসাহী মেয়েটি হয়ত হামিদের ফ্যাক্টরিতে গিয়ে জেনে এসেছে এলিনা গোমেজের নিকট থেকে, হয়ত সত্য করেই বলেছে, সে হামিদের খুবই পরিচিত। এবং এও হয়ত বলেছে বাদশা মিয়া আমার আত্মীয়। সবশেষে জানতে চেয়েছিল হামিদ এখন কোথায়, আবদুল্লাপুর বাসস্ট্যান্ডে আগে দেখা হতো, তাই ভাবলাম, উনি কি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন নাকি ? এলিনাই জানিয়েছিল হামিদ এখন গাজীপুরের একটি হাসপাতালে অসুস্থ। মেয়েটি শেষবারের মতো এলিনার নিকট থেকে হাসপাতালের কত নম্বর বেডে আছে জেনেই জামগড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দৌড়ে এসেছিল, হামিদের বেড নম্বরের কাছে। তখন হামিদ একটু একটু করে হাঁটছিলেন হাসপাতালের দোতলার বারান্দায়। সেদিন হয়ত মেয়েটি কুড়ি পঁচিশ মিনিট হামিদের পাশে ছিলেন, হয়ত আরো একটু বেশি সময়ও হতে পারেÑ ঠিক তখুনি আনিস, শ্বশুর, শাশুড়ি এবং শিরিনকে আসতে দেখলো আবদুল হামিদ। হামিদের ভালো লাগলেও লাগেনি শিরিনের, একবার ইচ্ছে হয়েছিল জানতে মেয়েটি কে। সেই প্রশ্নের দিকে যাবার আগেই হাবিব সাহেব জানতে চাইলেন হামিদের নিকট থেকে, শরীর এখন কেমন ? মৃদু স্বরে জামাই শ্বশুর, শাশুড়ি, আনিস এবং শিরিনকে জানাল ইচ্ছে করলে ডাক্তার আজ-কালের ভেতরেই ছেড়ে দিতে পারে, আনিস জানাল, সে কি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবে ! হামিদের উত্তর পাবার আগেই মা এবং শিরিন জানাল যদি আজকেই ছেড়ে দ্যায় তা হলে ভালোই হলোÑ

সেই রাতেই হামিদকে কিছু ওষুধপত্র দিয়ে রাত দশটার বেশ অনেক আগেই এলিনা গোমেজের গাড়ি পৌঁছে গেল আরিচপুরে শিরিনের বাসায়। আর রাত এগারোটার দিকে বাড়িতে ফিরতে-না-ফিরতেই এলিনার মোবাইল কেঁদে উঠল, Ñ বাদশা মিয়া জানতে চাইলেন হামিদের খবরাখবরÑ অথচ, এলিনা ভেবেছিল সিডনি থেকে এসেছে, বাদশা মিয়া আরো জানতে চাইল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে কবেÑ আমার বড়ো বউ রাবেয়া সুলতানা জানতে চেয়েছিল, এলিনা জানালেন আজকেই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু থাকবার কথা তো ছিল সপ্তাহ খানেক, বাদশা মিয়ার প্রশ্নের উত্তরে এলিনা জানিয়েছিলেন, হাসপাতালে না থাকলেও চলবে প্রচুর ওষুধ লিখে দিয়েছে, পানি বেশি করে খেতে হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক কথা আর না বাড়িয়ে শুভরাত্রি বলে শেষ করেছিলেন তার কথা।

কথা শেষ হবার কিছুটা পরেই শুরু হলো বৃষ্টির মান-অভিমান, আষাঢ়ের বৃষ্টির চরিত্র বোঝাটা বেশ কষ্টকর, একটু পরে হয়ত বেশি জোরে নামতে পারে, আবার নাও নামতে পারে তাদের বাড়ির তিন তলার ছাদে। এলিনা তখুনি স্থির করলেন ছাদে গিয়ে ভিজবে যতক্ষণ বৃষ্টি না ছাড়ে। তবে, বৃষ্টিতে সারাক্ষণের সাথি মোবাইল সাথে নেওয়া যাবে না, নিজের ঘরের টেবিলের উপর রেখেই মন ভারি করে সেদিনের সেই রাতে কতক্ষণ যে এলিনা ভিজেছিল, সে-কথা আমাদের জানার কথা নয়। তবে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে সেরাতে ভেবেছিল শরীর এবং মাথাটা তার ভার লাগছে, যদি এখন কারো একটি হাত মাথায়-কপালে থাকত, কিন্তু সেরাতে জ্বর এলেও এলিনার মাথায় কেউই হাত রাখেনি, এমনকি সিডনি থেকে আসেনি মোবাইল। তবে ঢাকা থেকে একটি নতুন নম্বর দেখতে পেয়েছিল এলিনা জুলাই মাসের উনিশ তারিখের রাত প্রায় দুটোর দিকে। নতুন নম্বর দেখে কৌতূহল হলেও কলব্যাক করেনি সেই মাঝরাতে। জুলাইয়ের কুড়ি তারিখে, বাদশা মিয়াকে এলিনা জানিয়ে দিয়েছিল তার শরীর খারাপ তাকে ডাক্তার বলেছেন এক সপ্তাহ বিশ্রামে থাকতে। বাদশা মিয়া হয়ত কিছু বলতে চেয়েছিল তার আগেই মোবাইলটাকে বন্ধ করে যেতে হয়েছিল প্রকৃতির ডাকে। সেই ডাক থেকে ফিরে এসে মোবাইল অন করতে-না-করতেই চোখের উপর ভেসে উঠল একটি নতুন নম্বর Ñ ধরবে কি ধরবে না, কিছুটা দ্বিধাদ্ব›েদ্ব থেকে কৌতূহলবশত ধরতেই হলো। আর তখুনি যে-শব্দটি, যে-বাক্যটি মিস এলিনা গোমেজ শুনলেন, সেটি ছিল তার কাছে অভাবিত,

Ñ কেমন আছেন ?

Ñ কবে এলে।

Ñ গতরাতে এসেই তোমাকে রিং করেছিলাম হয়ত তুমি নতুন নম্বর দেখে ধরোনি, যদিও রাত গভীর হয়েছিল।

Ñ এলিনা আনন্দেই, নাকি ভেজা কণ্ঠে, নাকি কেঁদে বলেছিল আর চাকরি করব না, এক সপ্তাহ রেস্টে থাকবÑ তার পর ছেড়ে দেব। Ñআবদুল হামিদকেও রেস্টে থাকতে হলো কয়েকদিন। হাবিবুর রহমান আর মিসেস রহমান খুলনায় ফিরে যাবেন আগামী কাল-পরশু। খবর এসেছে চিংড়ির ঘেরে মড়ক লেগেছে। মিনার বিয়ের বিষয়টি গত কয়েক রাতেই শ্বশুর-শাশুড়ি, আনিস, শিরিন যা কিছু বলেছে, তারই কিছু কথা জানাল শিরিন তার স্বামীকে এবং সেইসঙ্গে জানাল, আনিসের সঙ্গে কালকে বেড়াতে যাবে ঢাকায়, ফিরতে সময় লাগবে, মা-বাবা থাকবেন, খাবার-দাবারের অসুবিধে হবে না। দীর্ঘদিন পরে আজ হামিদ খুশি হয়েছিল বেচারিকে ভাই আনিস সঙ্গে নিয়ে যাবে, এ তো খুশির কথা। শিরিনকে সে এখনো দুটি জায়গা বাদে কোথায়ও নিয়ে যেতে পারেনি। লালবাগ কেল্লা আর তারা মসজিদ দেখার অনেক দিনের শখ। হামিদের সম্মতি পেতে দেরি হয়নি, সঙ্গে দিয়েছিল বেশ কিছু টাকা। হাসপাতাল থেকে রিলিজ হবার রাতে এলিনা তার হাতে দিয়েছিল সেই টাকাÑ শিরিনের হাতে তুলে দিয়ে হামিদ জানাল, এবার লালবাগ কেল্লা তারা মসজিদ, আহসান মঞ্জিল, পারলে জাদুঘরও দেখে এসো।

আনিস মতিঝিলের এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট অফিসে এসে একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, গাজী সাহেব কোন ফ্লোরে বসেন, জানা গেল, তিন তলার পূর্বদিকে গেলেই দেখতে পাবেন বিশাল নেমপ্লেট। শিরিনের মনের আশা পূর্ণ হলেও তিনি বলতে পারলেন না, তুমিই ছিলে আমার জীবনের ভালোবাসার প্রথম একটি মুখ। যে মুখের স্বপ্ন আমি এখনো দেখি।

মতিঝিল থেকে বাসায় ফিরে এসে সে রাত্রে শিরিনের খুব কাঁদতে ইচ্ছে করলেও তিনি কেন যে কাঁদতে পারলেন না, আষাঢ় শ্রাবণের অজস্র বৃষ্টি ধারায়, সে কথা এখনো আমরা কেউ জানিনে। হ

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY LatestNews