Home অঁভোগ অন্দরে অরণ্যের ছোঁয়া

অন্দরে অরণ্যের ছোঁয়া

1313
0
SHARE

‘এতটুকু যখন এর অঙ্কুর বেরিয়েছিল, শিশুর প্রথম প্রলাপটুকুর মতো, তখনই এটা বলাইয়ের চোখে পড়েছে। তারপর থেকে বলাই প্রতিদিন নিজের হাতে একটু একটু জল দিয়েছে। সকালে বিকেলে ক্রমাগত ব্যগ্র হয়ে দেখেছে কতটুকু বাড়ল। শিমুলগাছ বাড়েও দ্রæত, কিন্তু বলাইয়ের আগ্রহের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। যখন হাত দুয়েক উঁচু হয়েছে তখন ওর পত্রসমৃদ্ধি দেখে ভাবলে এ একটা আশ্চর্য গাছ, শিশুর প্রথম বুদ্ধির আভাস দেখবা মাত্র মা যেমন মনে করেÑ আশ্চর্য শিশু।’

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [বলাই]

ছোট্ট শিশু বলাইয়ের মতো গাছের প্রতি এমন স্নেহ-ভালোবাসা আমাদের হৃদয়ে থাকলেও দালান-কোঠায় ছেয়ে যাওয়া এই কর্মব্যস্ত শহরে সেই ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ ক্রমশই যেন কমে যাচ্ছে। শখের গাছ লাগানো বা শৌখিন বাগান গড়ে তোলার মতো জায়গা পাওয়া দুষ্কর এই শহরের বুকে। তবে এমন কিছু গাছ রয়েছে যা ঘরের পরিবেশে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে এগুলোকে বলা হয় ইনডোর প্ল্যান্ট। অন্দরে অরণ্যের ছোঁয়ায় এনে দেবে ইনডোর প্ল্যান্ট। তাই এখন ইচ্ছে থাকলে ইনডোর প্ল্যান্টের মাধ্যমে ঘরের অভ্যন্তরে গড়ে তোলা যায় ছোট্ট বাগান কিংবা ঘরের কোণে কোণে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে সবুজের সমারোহ। এসব গাছ অক্সিজেনের পাশাপাশি ঘরের মধ্যে থাকা দূষিত বাতাসও দূর করবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক কিছু ইনডোর প্ল্যান্টের কথা …

ড্রাগন টি

ড্রাগন টি খুব সহজে যতœ এবং পরিচর্যা করা যায়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন পড়ে না। বাড়ির ভেতরে বিভিন্ন তাপমাত্রায় বেড়ে ওঠার আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে এই গাছটির। আলোর প্রয়োজন থাকলেও সূর্যের আলোর প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন নিয়মিত পানি দিলেই এই গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে।

মানি প্ল্যান্ট

মানি প্ল্যান্ট গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতকালের আবহাওয়াসহ প্রায় সবধরনের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম। অক্সিজেন তৈরির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতরের বায়ু দূষণ কমাতে সাহায্য করে। বাড়ির ভেতরে বাইরে, ছায়া-রোদে এ-গাছ বেড়ে ওঠে। শুধু জলেও এই গাছ বড়ো হতে পারে। ঘর-বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই গাছ লাগানো যেতে পারে। বাড়ির গেট বা ছাদে, ঘরের ফ্রিজের উপর এ-গাছ রাখা যায়। ঘরের ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য যন্ত্র যেমন অফিসের ফটোকপি ও প্রিন্টার হতে ওজন ও ক্ষতিকারক সিএফসি গ্যাস নির্গত হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। গবেষকদের মতে, বাসাবাড়ি এবং অফিস রুমে মানি প্ল্যান্ট রাখলে এটি ক্ষতিকারক সিএফসি এবং ওজন গ্যাস শুষে নেয় এবং ওইসব ক্ষতিকারক গ্যাস থেকে আমাদের রক্ষা করে।

চাইনিজ এভারগ্রিন

এই গাছ কম আলো, কম জলেও বাঁচে বলে বাড়ির ভেতরে যেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না, সেখানেও বেঁচে থাকে। এই গাছকে এয়ার পিউরিফায়ার নামেও ডাকা হয়।

পিস লিলি

সাপের ফনার মতো দেখতে এই ফুল গাছটির নাম পিস লিলি। দেখতে খুব সুন্দর এই গাছটি পালন করতে খুব বেশি পরিচর্যা করতে হয় না। যেকোনো বাড়ি উজ্জ্বল করে তুলতে পারে এর দারুণ ফুল। কম তাপমাত্রা এমন কি পুরো ছায়াময় স্থানেও এ গাছ বাঁচতে পারে বলে ঘরের ভেতরেও রাখা যায়। ঘরের  ভেতর বাতাসের বিষাক্ত পদার্থ কমিয়ে দিতে পারে এই গাছ। চমৎকার একটি বায়ু পরিশোধক গাছ এটি। অল্প আলোতেই এ-গাছ বেড়ে ওঠে। সরাসরি সূর্যের আলোতে না রাখাই ভালো। এছাড়াও হলুদ পাতা বুঝিয়ে দেবে সে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রোদ পাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিমাণে পানি দিলেই যথেষ্ট। এ-গাছ আপনি বাড়ির ছাদে, কিচেনের ফাঁকা জায়গা, ঘরের ফাঁকা জায়গা বা কোণে, ছায়া আছে এমন জায়গায় রাখতে পারেন পিস লিলি। গ্রীষ্মকাল জুড়ে ফুল ফোটে লিলি গাছে। এর সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। এই গাছটির ঘরের দুর্গন্ধ দূর করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। তাই এই ফুলগাছটি বাড়িতে রাখলে সর্বদা সুগন্ধে আচ্ছন্ন থাকতে পারবেন।

স্পাইডার প্ল্যান্ট

সরু সরু পাতার এই গাছ খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে ওঠে। স্পাইডার প্ল্যান্ট বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে নিতে পারে। এই গাছ প্রচুর পরিমাণে কার্বনমনোক্সাইড শোষণ করতে পারে বলে রান্নাঘরে এ-গাছ রাখলে ভালো। একটা স্পাইডার প্ল্যান্ট প্রায় ২০০ বর্গ মিটার জায়গার বাতাস পরিশুদ্ধ করে তুলতে পারে। আপনি চাইলেই খুব সহজে অল্প পরিশ্রম, অল্প খরচে এবং পরিচর্যায় আপনার ঘরের টবে এই গাছ লাগাতে পারেন। মোটামুটি উজ্জ্বল ও সরাসরি আলোর বিপরীতে এই গাছ ভালো বাড়তে পারে।

স্নেক প্ল্যান্ট

বেডরুমে রাখার জন্য সব থেকে আদর্শ গাছ এটি। অফিস কিংবা রেস্টুরেন্টে এ-গাছটি প্রতিনিয়ত দেখা যায়। এ-গাছ সহজে মরে না। বিশেষ আলো বা পানিরও প্রয়োজন পড়ে না। মাঝে মাঝে পানি দিলেই চলে। শুকনা স্থানে এই গাছ হয়ে থাকে। অল্প আলোতেও বেঁচে থাকতে পারে। ঘরের ভেতরের বাতাসে থাকা বিষক্ত রাসায়নিক গ্যাস দূর করে স্নেক প্ল্যান্ট।

 

বস্টন ফার্ন

ফ্রিলের মতো এই গাছ বাড়ি ঠান্ডা রাখেতে সাহায্য করে। বায়ু দূষণকারী গ্যাস শোষণ করার সঙ্গে সঙ্গে এই গাছ প্রচুর জলীয় বাষ্প বাতাসে ছাড়ে। তাই গরমকালে এই গাছ পরিবেশকে ঠান্ডা রাখে। বস্টন ফার্ন ঠান্ডা ভেজা আর্দ্র স্থানে জন্মাতে পারে। এই গাছের জন্য সূর্যালোকের প্রয়োজন নেই।

 

ফিকাস

আকৃতি ও গঠনের দিক থেকে ফিকাস গাছটি অনেকেরই পছন্দ। ঘরের বাতাস দ্রæত এবং খুব ভালো পরিষ্কার করতে পারে এ-গাছ। বিশেষত, বাতাসের টক্সিন শুষে নেয় এবং টাটকা বাতাসের জোগান দিতে পারে। কোন পাত্রে এই গাছ লাগানো হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে এর বৃদ্ধি। এরা সাধারণত ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এ-গাছের বৃদ্ধির জন্য খুব একটা আলো বা পানির প্রয়োজন হয় না। তবে ঘরে যদি ছোট বাচ্চা বা পোষ্য থাকে, তাদের থেকে গাছটিকে একটু দূরে রাখতে হবে। কারণ এ-গাছের পাতা শরীরে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে।

ইংলিশ আইভি

এই গাছের পাতা বিষাক্ত কিন্তু আর সব হাউজ প্ল্যান্টের মতো এই গাছও  বায়ু দূষণকারী গ্যাস শোষণ করার সঙ্গে সঙ্গে সিন্থেটিক মেটেরিয়াল থেকে যে দূষণ ছড়ায় তাও কমাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন রঙের ইংলিশ আইভি বাজারে পাওয়া যায়। শীতকালে এই গাছ দ্রুত বাড়ে।

 

ব্যাম্বো প্ল্যাম

ব্যাম্বো প্ল্যাম টিকিয়ে রাখতে বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে না। কয়েকদিন পর পর কিছু সময়ের জন্য সূর্যের আলোতে গাছটি রাখতে হয়। এতে গাছ খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। এই গাছ ৮ থেকে ১২ ফুট লম্বা হয়ে থাকে। প্রচুর পরিমাণ বাতাস পরিশোধন করতে পারে। ঝোপযুক্ত গাছটি ঘরের মধ্যে থাকা বিষাক্ত পদার্থ দূর করে।

 

জিজি প্ল্যান্ট

জিজি প্ল্যান্টের গাঢ় সবুজ বর্ণের পাতা এক অনন্য প্রশান্তি এনে দেবে মুহূর্তেই। এটি এমনই কষ্ট সহিষ্ণু গাছ যাকে বলে একেবারে কৈ মাছের প্রাণ। অযতœ আর অবহেলায়ও এর জীবন ধারণে কোনো সমস্যা হয় না বললেই চলে। প্রতিকূল পরিবেশে ঘরের শোভা বর্ধনকারী এই গাছ খুব সহজেই মানিয়ে নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই গাছের খুব একটা পানির প্রয়োজন হয় না তবে টবের মাটি বেশি শুকিয়ে গেলে অল্প পানি দিলেই চলে। খুব অল্প আলোতেও এই গাছ ভালো থাকে তাই ঘরের ভিতরে যেকোনো স্থানে এটি স্থাপন করা যায়। ঘরের বায়ু দূষণমুক্ত রাখাসহ এলার্জির প্রভাব মুক্ত রাখার মতো উপকারি গুণগুলো এটির গ্রহণ যোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক।

অ্যালোভেরা

বাংলায় এর নাম ঘৃতকুমারি। ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে এবং অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে এর তুলনা নেই। দেখতে সুন্দর ও ভেষজ গুণসম্পন্ন অ্যালোভেরা গাছ ঘর সাজাতে বেশ জনপ্রিয়। অ্যালোভেরা গাছের সঠিক বৃদ্ধির জন্য একে আলোযুক্ত স্থানে রাখা প্রয়োজন এবং প্রতি দুই সপ্তাহে একবার পানি দেওয়াই যথেষ্ট। শোবার ঘরে, জানালার পাশে বা ঝুল বারান্দায় এই গাছের টব রাখতে পারেন।

 

ক্যাকটাস

ক্যাকটাসের জন্ম আমেরিকায়। এটি মরুভূমির গাছ। ঘরের ভেতরেই ক্যাকটাস রাখা যায়। নিয়মিত একটু পানি দেওয়া ছাড়া তেমন যতেœর প্রয়োজন হয় না। ক্যাকটাস ঘর বা অফিস সাজিয়ে রাখার মতো গাছ। কাঁটাযুক্ত শরীর নিয়েও তার অসামান্য সৌন্দর্য দিয়ে ঘরের শোভা বাড়িয়ে দেবে। ক্যাকটাস আলো পছন্দ করে, তাই বেশি আলো আছে তেমন জানালার কাছেই রাখা হয়।

 

ঘরের গাছের যতেœ

*          গাছ লাগানোর টবে অবশ্যই ছিদ্র থাকতে হবে, না হলে গাছ মরে যাবে।

*          প্লাস্টিকের টবে মাটি বা সিরামিকের টবের তুলনায় কম পানি লাগে।

*          সরাসরি ফ্যান বা এসির বাতাস লাগে এমন জায়গায় গাছ রাখা যাবে না।

*          রাতে ঘুমানোর সময় মাথার কাছে গাছ না-রাখাই ভালো।

*          দুই বা এক মাস পর পর গাছের মাটি খুঁচিয়ে জৈব সার দিলে গাছ দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

 

শুধু গাছের গোড়ায় পানি দিলেই হবে না। গাছের পাতায় সপ্তাহে ৩ দিন পানি স্প্রে করতে হবে। এর ফলে গাছের পাতায় ধুলোবালি জমবে না এবং গাছগুলোর মধ্যে সতেজ ভাব থাকবে। স্প্রে-যন্ত্র বিভিন্ন নার্সারিতে পাওয়া যায়, দামও কম। গাছে অনেক সময় বিভিন্ন পোকা হতে পারে। এজন্য যখন যে-গাছ কিনবেন, নার্সারি থেকে সেটা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে-শুনে কিনবেন। যেমন কী ধরনের পোকার আক্রমণ হতে পারে ? ছত্রাক বা অন্য কোনো কিছুর সংক্রমণ হলে কী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে ? ওষুধগুলো গাছ কেনার সময়েই নার্সারি থেকে কিনে রাখা ভালো। আলো বাতাসের চলাচল একদমই নেই এমন জায়গায় গাছ রাখবেন না। গাছের ডালপালা যদি বেশি ছড়িয়ে পড়তে থাকে তা হলে সেগুলো ছেটে দিন। হ

গ্রন্থনা : তৃষা আক্তার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here