Home কাভার গার্ল লোকজ বাংলার নিদর্শন সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর

লোকজ বাংলার নিদর্শন সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর

1374
0
SHARE

ইট-কাঠের চার দেয়াল আর ধুলোময় বন্দি শহরের প্রাত্যহিক কোলাহল থেকে মাঝে মাঝে ছুটে পালাতে কে না চায় ! কিন্তু চাইলেই তো আর সবসময় পালানো যায় না। নানা সীমাবদ্ধতায় আমাদের জীবন বন্দি। পয়লা বৈশাখ আসন্ন, বৈশাখের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁও জাতীয় জাদুঘর থেকে। এতে একঘেয়েমী দূর হওয়ার পাশাপাশি ইতিহাস ঐতিহ্যের সান্নিধ্য পাবেন খুব কাছ থেকে। এতে আপনার রিফ্রেশমেন্টের সঙ্গে পরিবারের ছোট শিশুদের অনেক কিছু স্বচক্ষে দেখা এবং শেখা হয়ে যাবে। যা তাদের ভবিষ্যৎজীবনে অনেক কাজে আসবে। সোনারগাঁও জাদুঘর ঘুরে এসে প্রতিবেদনটি

লিখেছেন শেখ সেলিম…

 

ঢাকার কাছাকাছি পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জায়গার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর। সাপ্তাহিক যেকোনো ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও থেকে। এছাড়াও বৈশাখের ছুটিতে সপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন দেশের এই মনোরম স্থান থেকে। কেননা, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বরাবরের মতো এবারও থাকছে নানা কর্মসূচি।

স্থাপত্যশৈলীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নান্দনিক ও নৈসর্গিক পরিবেশে ঘেরা বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁও। প্রাচীন সুবর্ণ গ্রাম থেকে সোনারগাঁও নামের উদ্ভব বলে কোনো কোনো পÐিত মনে করেন। অন্য ধারণামতে বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈশা খাঁর স্ত্রী সোনাবিবি’র নামানুসারে সোনারগাঁও নামকরণ করা হয়েছে। আনুমানিক ১২৮১ খ্রিষ্টাব্দে এ-অঞ্চলে মুসলিম আধিপত্যের সূচনা হয়। মধ্যযুগে এটি মুসলিম সুলতানদের রাজধানী ছিল। ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে দিলি­র সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সোনারগাঁও ছিল পূর্ববঙ্গের রাজধানী। সোনারগাঁও-এর আরেকটি নাম ছিল পানাম। পানাম নগরের ভবনগুলো ছোট লাল ইট দ্বারা তৈরি। দীর্ঘ একটি সড়কের উভয় পাশে দৃষ্টিনন্দন ভবন স্থাপত্যের মাধ্যমে পানামনগর গড়ে উঠেছিল। উভয় পাশে মোট ৫২টি পুরনো বাড়ি এই ক্ষুদ্র নগরীর মূল আকর্ষণ। পানাম শহরের ঠাকুরবাড়ি ভবন ও ঈশা খাঁ’র তোরণকে একত্রে নিয়ে মোট প্রায় ষোল হেক্টর স্থানজুড়ে লোকশিল্প ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের অবস্থান। এখানে একটি জাদুঘর, একটি লোকজ মঞ্চ, সেমিনার কক্ষ ও কারুশিল্প গ্রাম রয়েছে। এখানকার জাদুঘরে প্রায় সাড়ে চারহাজার নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। প্রতি শুক্রবার থেকে বুধবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পযর্ন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তবে শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত জুমার নামাজের জন্য জাদুঘর বন্ধ থাকে। এছাড়া এখানে প্রত্যেক বছর শীতকালে মাসব্যাপী লোকশিল্প মেলা হয়ে থাকে। যেখানে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক আশাক থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সকল প্রকার জিনিসপত্র পাওয়া যায়। লোক ও কারুশিল্প যাদুঘর এলাকার ভেতরে কৃত্রিম লেকে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে।

পানাম নগরী সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর হতে আধা-কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি ‘হারানো নগরী’ নামেও পরিচিত। পানাম নগরীর নির্মাণশৈলী অপূর্ব এবং এর নগর পরিকল্পনা দুর্বোধ্য ও সুরক্ষিত। এটি মূলত বঙ্গ অঞ্চলের তাঁত ব্যবসায়ীদের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও আবাসস্থল ছিল। এ-স্থান হতে ব্যবসায়ীগণ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁত ব্যবসা পরিচালনা করতেন। বাংলার মসলিনসহ অন্যান্য তাঁত শিল্পের প্রচার প্রসার ও ব্যবসায়ের তীর্থস্থান এ পানাম নগরী। প্রায় চারশত বছর আগে হতে পানাম নগরী স্থাপন শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ধাপে ধাপে মোঘল নির্মাণশৈলীর সঙ্গে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে প্রায় চারশত বছরের পর্যায়ক্রমিক স্থাপন পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়ায় পানাম নগরী বর্তমান রূপ লাভ করে। পানাম নগরীতে মূলত ব্যবসায়ী ও জমিদারেরা বসবাস করতেন। এর পাশাপাশি রাজাদের, আমির ওমরাদের জন্য পানাম নগরী ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছিল নিপুণ কারুকাজ খচিত পাকা ইমারতরাজি। পানাম ও তার আশপাশকে ঘিরে পঞ্চদশ শতক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ জনজীবন ছিল। এখানে সরু রাস্তার দুই ধারে গড়ে উঠেছিল অট্টালিকা, সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুরঘর, গোসলখানা, কূপ, নাচঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাকশাল, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ, প্রসস্থ দেয়াল, প্রমোদালয় ইত্যাদি। পানাম নগরীতে দেখা যায় ৪০০ বছরের পুরনো মঠবাড়ি। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খীরাজ খাল। এ খাল পানামের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো ছুঁয়ে পূর্বদিকে মেনিখালি নদ হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। ৫ মিটার প্রসস্থ ও ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি সড়কের দুই পাশে একতলা, দোতলা ও তিনতলা দালান রয়েছে পানামে।

 

কীভাবে যাবেন

গুলিস্তান থেকে মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত বাস আছে। সার্ভিস অনুযায়ী জনপ্রতি ভাড়া ৩০ থেকে ৪৫ টাকা। স্পেশাল বাসগুলো ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে যায় তাই ভাড়া একটু বেশি হলেও সময় কম লাগে । মোগড়াপাড়া থেকে সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর পর্যন্ত অটোরিকশায় জনপ্রতি ভাড়া ১০ টাকা আর সরাসরি পানাম সিটি গেলে ১৫টাকা। সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে জনপ্রতি টিকেট ৩০ টাকা।

ইতিহাস

সোনারগাঁ জাদুঘরের পুরাতন ভবন

আবহমান গ্রাম বাংলার লোকসাংস্কৃতিক ধারাকে বিকশিত করার উদ্যোগে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ১২ মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক পানাম নগরীর একটি পুরনো বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’। পরে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ১৫০ বিঘা আয়তনের কমপ্লেক্সে খোলা আকাশের নিচে বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশে গ্রামীণ রূপকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শৈল্পিক কর্মকাÐের পরিচয় তুলে ধরতে শিল্পী জয়নুল আবেদিন এই জাদুঘর উন্মুক্ত পরিবেশে গড়ে তোলার প্রয়াস নেন এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্সটি প্রায় ১০০ বছর পুরাতন সর্দার বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়।

 

বিবরণ

সোনারগাঁও-এ বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এলাকায় রয়েছে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরটি। এখানে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের অবহেলিত গ্রাম-বাংলার নিরক্ষর শিল্পীদের হস্তশিল্প, জনজীবনের নিত্য ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী। এসব শিল্প-সামগ্রীতে তৎকালীন প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের রূপচিত্র প্রস্ফুটিত হয়।

সর্দার বাড়িতে মোট ১০টি গ্যালারি রয়েছে। গ্যালারিগুলোতে কাঠ খোদাই, কারুশিল্প, পটচিত্র ও মুখোশ, আদিবাসী জীবনভিত্তিক নিদর্শন, গ্রামীণ লোকজীবনের পরিবেশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও পোড়ামাটির নিদর্শন, তামা-কাসা-পিতলের নিদর্শন, লোহার তৈরি নিদর্শন, লোকজ অলঙ্কারসহ রয়েছে বহু কিছু। ভবনটির সামান্য পূর্বে রয়েছে লোকজ স্থাপত্যকলায় সমৃদ্ধ আধুনিক এক ইমারতে প্রতিষ্ঠিত জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘর। এই ভবনটিতে মাত্র দু’টি গ্যালারি। এই দুইটি গ্যালারির মধ্যে একটি গ্যালারি কাঠের তৈরি, যা প্রাচীন ও আধুনিক কালের নিদর্শনসমৃদ্ধ। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য কাঠ এবং কাঠ থেকে বিভিন্ন কারুপণ্য তৈরি এবং সর্বশেষ বিক্রির সামগ্রিক প্রক্রিয়া, অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে সুন্দর মডেল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই দুটি ভবনের বাইরে রয়েছে পাঠাগার, ডকুমেন্টেশন সেন্টার, সেমিনার হল, ক্যান্টিন, কারুমঞ্চ, গ্রামীণ উদ্যান ও বিভিন্ন রকমের বৃক্ষ, মনোরম লেক, লেকের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নৌ বিহার, মৎস্য শিকারের সুন্দর ব্যবস্থা ও পঙ্খীরাজ নৌকা। হ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here