Home বেড়ানো সেন্টমার্টিনের সবুজ-গালিচায় একদিন

সেন্টমার্টিনের সবুজ-গালিচায় একদিন

1930
0
SHARE

এসে গেছে শীত। ভ্রমণপিপাসুরা এই সময়টাতে ভ্রমণ করে থাকেন। দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ালেও হয়ত দেশের অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সেন্ট মার্টিন ও কুয়াকাটায় যাওয়া হয়নি। যারা এবারে ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা ইচ্ছে করলে এ-দুটি স্থানে ঘুরে আসতে পারেন। আপনাদের সুবিধার্থে এই দুটি স্থানের বর্ণনা দিচ্ছেন শেখ সেলিম…

সেন্টমার্টিন : সেন্টমার্টিন হলো সাগরের বুকে ক্ষুদ্র একটি দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যারা সেন্টমার্টিনে ঘুরতে যেতে চান তারা এক যাত্রায় অনেক কিছু উপভোগ করতে পারবেন। এই যেমন প্রথমে কক্সবাজার। কক্সবাজারে রয়েছে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। এখানে একটা দিন থেকে আপনি দেখতে পারেন হিমছড়ি, ইনানী বিচসহ বড়ো বড়ো পাহাড় সেই সঙ্গে ঘুরে আসতে পারেন রামুর বৌদ্ধ মন্দির থেকে। এসব জায়গায় অনায়াসে একদিনেই ঘুরে আসতে পারেন। পরের দিনের পরিকল্পনায় রাখুন সেন্টমার্টিন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের দৈর্ঘ্য ৭.৩ কিলোমিটার দ্বীপের আয়তন ৮ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিকভাবে এটি তিন অংশে বিভক্ত। উত্তরাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’, কেউ কেউ উত্তরপাড়াও বলে থাকেন। এটি ২১৩৪ মিটার দীর্ঘ ও ১৪০২ মিটার প্রশস্ত দক্ষিণ অংশকে বলে দক্ষিণপাড়া। এটির দৈর্ঘ্য ১৯২৯ মিটার। এটি সংকীর্ণ অঞ্চল। এই দুই অংশকে যক্ত করেছে যা মধ্যপাড়া নামে পরিচিত।

এখানে মূল দ্বীপ ছাড়াও কয়েকটি ১০০-৫০০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে যা ছেড়াদিয়া বা ছেড়াদ্বীপ নামে পরিচিত। জোয়ারের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে এর নাম ছেড়াদ্বীপ।

সেন্টমার্টিন থেকে যতদূর চোখ যায় শুধু নীল আর নীল, আকাশ আর সমুদ্রের নীল সেখানে আলিঙ্গন করছে। চোখ জুড়ানো এই সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে থাকতেই পারবেন না। অনিন্দ্যসুন্দর প্রবাল, দ্বীপটি অগভীর দীর্ঘ সমুদ্রতট, সামুদ্রিক প্রবাল, সাগরের ঢেউয়ের ছন্দ, প্রচুর দখিনা হাওয়া, সারি সারি নারকেল গাছ, দেখে মনে হবে আপনাকে সবুজ-গালিচা সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য নারকেল গাছগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সাগর তীরে রয়েছে মাছ ধরার অসংখ্য নৌকা ও ট্রলার, বালি, পাথর, প্রবাল কিংবা নানা জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে সেন্টমার্টিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য একটি অনুপম অবকাশ কেন্দ্র। এর স্বচ্ছ পানিতে দেখতে পাবেন কচ্ছপ, জেলি ফিশ, হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছ যা এই দ্বীপটিকে করেছে লাস্যময়ী।

টেকনাফ থেকে ট্রলারে কিংবা জাহাজে যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এখানে মোট জনসংখ্যা প্রায় আট হাজার। দ্বীপের অধিবাসীদের প্রায় সবারই মূল পেশা মাছ শিকার। তবে ইদানীং পর্যটন শিল্পের বিকাশের কারণে অনেকেই রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল কিংবা গ্রোসারি শপের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। এখানকার মানুষ নিতান্তই সহজ-সরল। এখানে পর্যটকদের জন্য ভালো মানের হোটেলের পাশাপাশি স্বল্প খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

যাতায়াত : ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফের বাসে চড়ে টেকনাফ গিয়ে সেখান থেকে সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে একাধিক ট্রান্সপোর্ট রয়েছে টেকনাফ যাওয়ার। সার্ভিসগুলো হচ্ছে সেন্টমার্টিন পরিবহন, এস আলম পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন প্রভৃতি। অনেকে আবার কক্সবাজার ঘুরেও যেতে পারেন সেন্টমার্টিনে। কক্সবাজার থেকে প্যাকেজে যেতে পারেন স্বপ্নের সেন্টমার্টিনে। সেখানে লোকাল বাস বা মাইক্রো/জিপ ভাড়া করে টেকনাফ হয়ে সেন্টমার্টিন আসতে পারেন। টেকনাফ থেকে পাঁচ কিলোমিটার আগে জেটি ঘাটে নেমে ট্রলার বা সি-ট্রাকে করে সেন্টমার্টিন আসতে হয়। সি-ট্রাকের মধ্যে কুতুবদিয়া, কেয়ারি সিন্দাবাদ ঈগল, সুন্দরবন উল্লেখযোগ্য। আপ-ডাউন ভাড়া পড়বে ৫৫০-৮০০ টাকা। জেটি ঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ৯ থেকে ৯.৩০ মিনিটে সি-ট্রাক ছেড়ে যায়। ফেরত আসে বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে তিনটায়।

বিশ্রাম : সেন্টমার্টিনে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি উন্নতমানের হোটেল ও কটেজ রয়েছে। এখানে যারা রাত যাপন করার উদ্দেশ্যে যাবেন তারা অবশ্যই আগে বুকিং দিয়ে যাবেন তা না হলে থাকার জন্য ভালো জায়গা নাও পেতে পারেন। এখানে থাকার জন্য বøু মেরিন রিসোর্ট, সেন্টমার্টিন, প্রিন্স হ্যাভেন, সীমানা পেরিয়ে, লাবিবা বিলাশ, পর্যটন হোটেল অবকাশ প্রভৃতি বেশ ভালো। এছাড়া আপনি থাকতে পারেন সমুদ্র বিলাস, বিচ ক্যাম্প হোটেল সাগর পাড়, মেরিন পার্ক, হোটেল স্বপ্ন প্রবাল প্রভৃতি রিসোর্টে।

আহার : এখানে বেশকিছু ভালোমানের খাবার হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হোটেল আল্লার দান, বাজার বিচ, বিচ পয়েন্ট, কেয়ারি, মারজান রেস্তোরাঁ, হাজী সেলিম পার্ক, সেন্টমার্টিন টুরিস্ট পার্ক, রিয়েল রেস্তোরাঁ প্রভৃতি।

সতর্ক : খুব সাবধানে প্রবাল দ্বীপে পা ফেলতে হবে। না-হলে পা কেটে যেতে পারে। ভাটার সময় বিচে নামবেন না। বিচের বালু বা পানিতে কোনো প্রকার ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।

 

নারকেল ও ঝাউয়ের মিতা কুয়াকাটা

Kuakata-770x430

কুয়াকাটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা ‘সাগর কন্যা’ হিসেবে পরিচিত।

অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগর সৈকত কুয়াকাটা প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। সমুদ্র সৈকতের পাশেই একশত পঞ্চাশ একরের বেশি জমিতে অবস্থিত নারিকেল বাগান যা ‘নারিকেল কুঞ্জ’ নামেই পরিচিত। ১৯৬০ সালে ১৬৭ একর খাস জমি লিজ নিয়ে ফয়েজ মিয়া ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’ নামে এ-বাগান করেন। সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে ঝাউ বাগান। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে বন বিভাগ ১৫ হেক্টর জমিতে সি বিচ সংলগ্ন ঝাউ বাগান গড়ে তোলেন। এর পরেই রয়েছে আরেক বিশাল বনাঞ্চল চরগঙ্গামতি। বনের মধ্যে রয়েছে ছৈলা, কেওড়া ও কড়াই বাগান। বিশাল এই বাগানের মাঝে রয়েছে একটি নয়নাভিরাম লেক। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে লেম্বুর চরে বন বিভাগের একটি বাগান রয়েছে। বনে রয়েছে কড়াই, গেওয়া, ছৈলা ও কেওড়া গাছ। যা দেখে পর্যটকেরা হারিয়ে যাবেন অন্যভুবনে। আন্ধারমানিক নদীর মোহনার পূর্ব দিকে লেম্বুর চর আর পশ্চিম দিকে রয়েছে ফাতরার চরের বিশাল বনাঞ্চল। ভৌগোলিক ভাবে বরগুনা জেলায় বাগানটির অবস্থান থাকলেও কুয়াকাটায় আগত পর্যটকেরা বিনোদনের জন্য সেখানে ট্রলারযোগে যাতায়াত করেন। কুয়াকাটা সৈকতের ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে শুটকিপলি­। অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী শীত মৌসুমে বিভিন্ন মাছ শুকিয়ে শুটকি তৈরি করে। এখানে পর্যটকেরা দেখতে পাবেন জেলেদের ইলিশ শিকারে সাগরে ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি করা জীবন জীবিকার যুদ্ধ। দেখতে পাবেন বেড় জালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারের অনন্য দৃশ্য। পর্যটকদের থাকা খাওয়ার সুবিধার্থে গড়ে উঠেছে পর্যটন কর্পোরেশনের পর্যটন হলিডে হোমস ও রেস্তোরাঁ, জেলা পরিষদ ও এলজিইডির অত্যাধুনিক ডাক বাংলো। এছাড়াও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক আবাসিক ও খাবার হোটেল গড়ে উঠেছে। সরকারি উদ্যোগে নির্মিত রাখাইন কালচারাল একাডেমি, রাখাইন মহিলা মার্কেটসহ ঐতিহ্যবাহী কুয়া ও বৌদ্ধ মন্দির।

অবস্থান : ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার, বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার।

ইতিহাস : কুয়াকাটা নামের পেছনে রয়েছে আরকানিদের এদেশে আগমনের সঙ্গে জড়িত ইতিহাস। কুয়া শব্দটি এসেছে কুপ থেকে। ধারণা করা হয় ১৮ শতকে মুঘল শাসকদের দ্বারা বার্মা থেকে বিতাড়িত হয়ে আরকানিরা এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে। তখন এখানে পানির অভাব পূরণ করতে তারা প্রচুর কুয়া বা কুপ খনন করেছিলনে, সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয় কুয়াকাটা।

যাত্রা : ঢাকা থেকে কুয়াাকাটা যাওয়ার সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ মাধ্যম হলো সদরঘাট থেকে লঞ্চে পটুয়াখালি। সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা। ঢাকা থেকে পটুয়াখালি রুটে চলাচল করে এমভি দ্বীপরাজ,  সৈকত প্রভৃতি লঞ্চ। এসব লঞ্চে প্রথম শ্রেণির দ্বৈত কেবিনের ভাড়া ৮৫০-১০০০ টাকা। পটুয়াখালি বাস স্টেশন থেকে প্রতি ঘণ্টায় কুয়াকাটার বাস ছাড়ে। ভাড়া ৬০-৭০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে লঞ্চে বরিশাল এসে সেখান থেকেও বাস যোগে কুয়াকাটা যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে বরিশাল ও পটুয়াখালির লঞ্চগুলো ছেড়ে যায় প্রতিদিন সন্ধ্যায়। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসও চলে কুয়াকাটার পথে। কমলাপুর বিআরটিসি বাস স্টেশন থেকে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ছাড়ে সরকারি পরিবহন সংস্থার বাস। আর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে কুয়াকাটার পথে চলে সাকুরা, সুরভী, দ্রুতি ইত্যাদি পরিবহনের বাস। ভাড়া ৪৫০-৫০০ টাকা। হ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here