Home কাভার গার্ল সকাল বেলার পাখি

সকাল বেলার পাখি

1479
0
SHARE

কথায় বলে ভোরের সূর্য দেখলেই বোঝা যায় সারাদিন কেমন যাবে ? তেমনি বলা যায় অরিঘœ অর্ঘ, উনাইশা তিজান খান এবং আরুবা আফসান জারা ভবিষ্যতে যার যার জায়গায় অনেক বড়ো হবেন এমন আশা করা যায়। এই তিন শিশুশিল্পীর মধ্যে এমন কিছু গুণ আছে যা তাঁদের বড়ো হওয়ার স্বপ্ন ও সম্ভাবনার জানান দেয়। ইতোমধ্যে তাঁরা তাঁদের কাজ দিয়ে সে-কথা প্রমাণ করে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। অমিত সম্ভাবনাময় এই তিন শিশুশিল্পীর সঙ্গে কথা বলে তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা লিখেছেন প্রশান্ত অধিকারী

উনাইশা তিজান খান
ভাবা যায় মাত্র ৬ মাস বয়সের একটি শিশু অভিনেত্রী দিলারা জামানের সঙ্গে চ্যানেল আইয়ের ‘ক্ষুদে গানরাজ’-এর টিজারে অংশ নেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেছে তাঁর মিডিয়ায় পথচলা। এখন দিন দিন বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের পরিধিও বাড়ছে। বাড়ছে বোধ ও মেধার চর্চা। মাত্র নয় বছর বয়সেই নিজস্ব একটি চিন্তার জগত তৈরি করেছেন। বাবা-মায়ের পূর্ণ স্বাধীনতায় বড়ো হলেও তাঁদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ ঘটাননি। উল্টো তার চিন্তা ও চর্চা দেখে বাবা-মা রীতিমতো বিস্মিত, আপ্লুত। সে যেন অন্যরকম এক ভালোলাগার গল্পকথন। মঞ্চ, টেলিভিশন ও বেতার নাটকে নিয়মিত অভিনয় করছেন। বিজ্ঞাপন ও উপস্থাপনা করছেন। পড়াশোনায় অসুবিধা হবে দেখে অনেক কাজ থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে। এসব তো আছেইÑ এরই মাঝে একজন ভবিষ্যৎ শক্তিমান সাহিত্যিক হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে এরই মাঝে।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আগ্রহ থাকলেও লেখালেখির ক্ষেত্রে শিশুদের আগ্রহ অনেক কম। কিন্তু উনাইশা ব্যতিক্রম। তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি লেখালেখিতেও বেশি আগ্রহী। ইতোমধ্যে ১২টি গল্প লিখেছেন, যা আগামী বইমেলায় প্রকাশ হবে। তার এক একটি গল্পের এক একটি বিষয়। কাজের হিসেবে অনেক কাজ করেছেন উনাইশা। ‘ক্রিং ক্রিং বেবি জিংক’সহ বেশ কিছু বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি মানুনুর রশীদের পরিচালনায় চিত্রনায়ক রিয়াজের সঙ্গে ‘উত্তরণ’, ‘বাবা কোথায়’, এসএ টিভিতে তৌকির আহমেদ ও বিপাশা হায়াতের সঙ্গে টেলিফিল্ম ‘সোনালি মেঘের ভেলা’, গাজী টিভিতে ক্রাইম ফিকশনের ১৫-২০ পর্ব, তৌকির আহমেদের পরিচালনায় ‘মধ্যপ্রহর’, দীপ্ত টিভির ৪০০ পর্বের ধারাবাহিক ‘অপরাজিতা’, দুরন্ত টিভির শিশুতোষ ধারাবাহিক ‘গল্পদেশে ঘুমের দেশে’ ইত্যাদি নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করে প্রতিভার সৌরভ ছড়িয়েছেন। তানিম রহমান অংশুর পরিচালনায় ভৌতিক টেলিফিল্ম ‘আলো’তে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে রীতিমতো আলো ছড়িয়েছেন।
পৌনে ২ বছর বয়সে ব্র্যাকের একটি বিজ্ঞাপনে দাদুর সঙ্গে গল্প কথায় প্রথম সংলাপ দিয়েছেন। লেখালেখি আর অভিনয়ের পাশাপাশি গাজী টিভির শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘সাইকেলের ডানা’ উপস্থাপনা করেছেন। এই শিশু বয়সেও তার বোধ ও চিন্তাশক্তি এতটাই প্রখর যে, অভিনয় করতে গেলে যদি কোথাও ভালো না হয়, সে-শট পুনরায় নেওয়ার কথা বলে পুরো ইউনিটের সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর এই কাজ নিয়ে উনাইশার সরল স্বীকারোক্তিÑ ‘হ্যাঁ, এটা ঠিক কখনো কখনো কষ্ট হয়, আবার কখনো কখনো ভালোও লাগে।’ উচ্চারণের ব্যাপারে এতটাই সচেতন যে, শুটিংয়ে ইউনিটে কেউ ভুল উচ্চারণ করলে তার কানে লাগে এবং সেটা শুধরে দেন।
উনাইশা রাজধানীর ওয়াইডবিøউসি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। স্কুলে অনেক বন্ধু থাকলেও প্রিয় বন্ধু দুইজন ফারিয়া ও সুষ্মিতা। বাবা তারেক খান জিটিভির অনুষ্ঠান প্রযোজক এবং মা জ্যোৎস্না আক্তার শারমিন গৃহিণী। স্কুলে ভর্তির আগেই নৃত্যাঞ্চলে নাচে এবং বাসায় শিক্ষক রেখে গানের চর্চা শুরু। মাঝখানে শুটিংয়ের ব্যস্ততার কারণে এগুলো স্থগিত থাকলেও ভবিষ্যতে গান শেখার ইচ্ছা। আট বছর বয়সে ছড়ায় ছন্দে ‘চাঁদের দেশে’ শিশুতোষ নাটক লিখে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। শুধু নাটক লেখাই নয়, ‘ফেরা’, ‘মন ভালো চশমা’, ‘চম্পাবতী’ নামে তিনটি মঞ্চ নাটকে এবং ২টি বেতার নাটকে অভিনয়ও করেছে। ইতোমধ্যে চলচ্চিত্র ও শিশুতোষ নাট্যকর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছে। বাবাদিবসে ভোরের কাগজে তার প্রথম গল্প ছাপা হয় ‘আমার বাবা’ নামে। তার লেখা একটি গল্পের নাম ‘তৃতীয় নয়ন’। এ-গল্পের কাহিনি এক চিত্রকরকে নিয়ে। চিত্রকর সুশ্রী মানুষের ছবি আঁকে, আঁকার পরে ছবিতে যে লোককে দেখা যায়, সে হয়ে যায় বিশ্রি। লোক চিত্রকরকে বলে, ‘চিত্রকর তুমি আমার ছবি বিশ্রী করে আঁক কেন ?’ তখন চিত্রকর জবাব দেয়, ‘আমি ছবি আঁকতে আঁকতে এতটাই মগ্ন থাকি যে, তাতে তোমার ভেতরের চেহারাটাই বেরিয়ে আসে।’ এমনই লেখক সত্তার অধিকারী উনাইশা ইতিহাস হতে চায়। ইতিহাস পড়তে তার খুব ভালো লাগে। এই বয়সে তাঁর পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস পড়া হয়ে গেছে। শিশু রূপকথা ও স্বাধীনতা এবং শব্দদূষণসহ এমন বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে উপজীব্য করে তার গল্পের কাহিনি গড়ে ওঠে। ইতোমধ্যে আলফা তারকা পুরস্কার ২০১৭ পেয়েছেন উনাইশা।

অরিঘœ অর্ঘ
নালন্দা বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিঘœ অর্ঘ’র জন্ম ২০০৮ সালের ১১ জুলাই ঢাকায়। বাবা বাবু সরকার সংগীতশিল্পী এবং মা বর্ষা আহমেদ সংবাদ উপস্থাপক ও নাট্যশিল্পী। মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় ‘স্বপ্নডানা’ নাটকে মায়ের সঙ্গে প্রথম অভিনয় করেন, সেই থেকে শুরু তাঁর অভিনয়জীবন। অনিমেষ আইচের ‘শেকল’ টেলিছবিতে বিপাশা হায়াতের সঙ্গে অভিনয় করেন। এতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য আরটিভি লাক্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৬ অর্জন করেন। বেতারে বেশ কয়েকটি নাটকে কণ্ঠ দিলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যোগাযোগ’ এবং ইকবাল খোরশেদের ‘ঘাসফড়িং মন’ ধারাবাহিক দুটি উল্লেখযোগ্য। বেতারে তিন বছরে ছড়া পড়ে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন অর্ঘ। নাটকের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছেন তিনি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : লাইফবয়, ডানো, সুফি নুডলস, পেপসোডেন্ট ইত্যাদি।
এ ছাড়া দীপ্ত টিভির প্রতিদিনের ধারাবাহিক ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘শেষ থেকে শুরু’তে অভিনয় করেছেন। বাবার হাত ধরে সংগীত আর মায়ের হাত ধরে অভিনয়জগতে পা রাখেন অর্ঘ। সব ধরনের গান গাইলেও বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানই বেশি গেয়ে থাকেন। দুরন্ত, চটপটে অর্ঘ গান গাইতে যেমন পারদর্শী তেমনি পারেন তবলা বাজাতেও। ভারতে বিশেষ আমন্ত্রণে এ-বছর গান গাইতে গিয়েছিলেন বাবার সঙ্গে। আবার এ-বছরই ত্রিপুরায় গান গাইতে যাওয়ার বিশেষ আমন্ত্রণ আছে। স্কুলে তার প্রিয় বন্ধু মেঘদূত, রাতুল, তাসিন ও হিরা।
অভিনয়ের জন্য আরটিভি লাক্স অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার ভালোলাগা ব্যক্ত করে অর্ঘ বলেন, ‘অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পর যখন স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম তখন আমার ওই বন্ধুরা অ্যাওয়ার্ড ধরার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। দুরন্তপনায় যদি অ্যাওয়ার্ড থাকে তাও হয়ত অর্ঘ অনায়াসেই পেয়ে যাবেন। এত এত দিকে যার মেধা ও মননের প্রকাশ, যে-কাজ করে এত পরিচিতি তার কোনোটাই তিনি হতে চান না। অর্ঘ হতে চান ক্রিকেটার। কলাবাগান মাঠে নিয়মিত প্রাকটিস করেন। এত গুণ আর দুরন্তপনা নিয়ে বেড়ে ওঠা অর্ঘ ভবিষতে ক্রিকেট রাজ্যের কেমন রাজা হবেন, সেটা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো এক যুগ।

আরুবা আফসান জারা
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুশিল্পী আরুবা আফসান জারা ধানমন্ডির স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। জারার জন্ম ২০০৬ সালের ১৬ মার্চ, ঢাকা। বাবা এ এস জুবেল ব্যবসায়ী। মা খাদিজা খাতুন লিপি। একমাত্র ছোটভাই আরাবি আবতাহি জারিব প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। জারা অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘হৃদয়ে-৭১’, দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘মাদার’, তৃতীয় ‘রান আউট’, চতুর্থ ‘প্রার্থনা’ এবং পঞ্চম ‘আয়নাবাজি’। অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় পরিচালিত ‘প্রার্থনা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন জারা। জারা গান শেখেন ছায়ানটে আর নাচ শেখেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস [ঢাকা]-এর ধানমন্ডি শাখায় এবং ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে। লেখাপড়ার পাশাপাশি নাচ-গান যেমন শিখছেন তেমনি সময় পেলেই গল্প লেখা, ড্রইং কিংবা খেলায় মনোনিবেশ করছেন জারা। স্বভাবে শান্তশিষ্ট মিষ্টি চেহারার জারাকে চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেন তারই এক মডেলিং শিক্ষক। এজন্য তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ধন্যবাদ জানাতে ভোলেন না জারা।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে জারা বলেন, পুরস্কার পেলে তো ভালোই লাগে। ভবিষ্যতে কী হবেন তা এখনও ঠিক করেননি জারা। তবে এতকিছু করার পেছনে মা যে তাঁকে সাহায্য করেন এবং বাবা যে তাকে উৎসাহ দেন এজন্য বাবা-মা’র দায়িত্বের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল।
মেয়ের এ-অর্জনে মা লিপি আপ্লুত, অভিভূত হলেও গণমাধ্যমে তেমন সাড়া মেলেনি বলে একটু কষ্টও আছে ভেতরে ভেতরে। তবে আনন্দভুবনে মেয়ের সঙ্গে এসে তাঁর সেই কষ্টের খানিকটা লাঘব হয়েছে। এ-ব্যাপারে তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে পত্রিকাগুলো এমন আয়োজন করলে তাতে শিশুরা উৎসাহিত হয়। আমি মা হিসেবে যেমন দায়িত্ব পালন করি সন্তানের জন্য তেমনি গণমাধ্যমে যদি তাঁদের দায়িত্ব পালন করে তবেই শিশুরা আরো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here