Home বিশেষ রচনা লোকনৃত্যকলা

লোকনৃত্যকলা

1510
0
SHARE

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

বাংলাদেশে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এই তিন ধারার লোকনৃত্য প্রচলিত। এর মধ্যে ধর্মীয় নাচের সংখ্যাই বেশি। এর কারণ এ-সব নাচের উদ্ভব হয়েছে প্রাচীন ও মধ্যযুগে, যখন লোকসমাজে ধর্মীয় প্রভাব ছিল বেশ বিস্তৃত। কীর্তননাচ, ব্রতনাচ, বাউলনাচ, গম্ভীরানাচ, জারিনাচ, ফকিরনাচ ইত্যাদির উৎসে বিভিন্ন ধর্মবোধ ও আচার-সংস্কার জড়িয়ে আছে। ঢালিনাচ ও লাঠিনাচে সামাজিক উপযোগ এবং ছোকরানাচ, ঘাটুনাচ ও খেমটানাচে সাংস্কৃতিক বিনোদনের প্রেরণা প্রধান। কোনো কোনো নাচে হিন্দু ও ইসলাম এ-দুটি ধর্মের বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সেগুলোতে প্রধানত এই দুই ধর্মের লোকেরাই অংশগ্রহণ করে এবং তারাই উপভোগ করে। আবার কতক নাচ সমাজের সব শ্রেণির মানুষই উপভোগ করে। যেমন কীর্তননাচে হিন্দু এবং জারিনাচে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরাই প্রধানত অংশগ্রহণ করে। কিন্তু লাঠিনাচ ও ঢালিনাচে কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদ নেই। আবার ছোকরানাচ, ঘাটুনাচ ও লেটোনাচের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মুসলমান সমাজ হলেও রসোপভোগ ও চিত্তবিনোদনের জন্য এর দ্বার সকলের জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশে অধুনা প্রচলিত কয়েকটি জনপ্রিয় নাচ সম্পর্কে আমরা কিছু তথ্য তুলে ধরছি :

অবতারনাচ : অবতারনাচ বাংলাদেশের ফরিদপুর অঞ্চলে প্রচলিত। চড়ক ও গম্ভীরা উৎসবে মন্ত্রপূত মুখোশ পরে এ-নাচ পরিবেশন করা হয়। এটি বৈচিত্র্যময় ভাবভঙ্গিসমৃদ্ধ একটি নৃত্যকলাÑ সাঙ্কেতিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে হিন্দুধর্মের দশ অবতারের রূপ ফুটিয়ে তোলাই এ-নাচের উদ্দেশ্য।

 

কালীনৃত্য :  কালীর কৃষ্ণবর্ণ মুখমÐল ও রক্তবর্ণ প্রসারিত জিহŸার মুখোশ পরে এবং এক হাতে খড়গ ও অপর হাতে নরমুÐ নিয়ে কালীনৃত্য করা হয়। এতে প্রধান বাদ্যযন্ত্র থাকে ঢাক। এ নাচে বীররস ও বীভৎসরসের প্রাধান্য থাকে।

খেমটানাচ : খেমটানাচ খেমটা তালের সঙ্গে পরিবেশিত হয়। এর সঙ্গে গানও থাকে। খেমটা নাচ-গানের প্রধান বিষয় রাধাকৃষ্ণের প্রেম। ঢোল, কাঁসি ও করতাল বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত। খেমটানাচের কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষ নেই। যেকোনো সামাজিক ও লৌকিক অনুষ্ঠানে এর আয়োজন হতে পারে। এক সময় বিয়ের আসরে খেমটানাচের বিশেষ আকর্ষণ ছিল। হিন্দুদের পূজোৎসবেও এর প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। মূলত মেয়েরাই এ-নাচের শিল্পী। কোনো কোনো অঞ্চলে হিজড়া শ্রেণির লোকেরাও দল গঠন করে নাচ দেখায়। বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত এ-নাচটির ক্ষীণ ধারা তারাই ধরে রেখেছে। পায়ের জটিল গতিভঙ্গি ও চোখমুখের সূ² ক্রিয়া খেমটানাচের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মুসলিম সমাজেও এক সময় খেমটানাচের প্রচলন ছিল। বগুড়া জেলা থেকে সংগৃহীত একটি মেয়েলি গীতে খেমটার কথা পাওয়া যায়। এতে কোমর দুলিয়ে নাচার উল্লেøখ আছে। বিনোদনমূলক এ-নাচকে শহরের বাইজি নাচের গ্রামীণ সংস্করণ বলা হয়।

গম্ভীরানাচ : গম্ভীরা পূজা ও উৎসব এবং গম্ভীরা গানের সঙ্গে গম্ভীরা নাচ পরিবেশিত হয়। অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলায় এ-নাচের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানে এর প্রচলন নেই বললেই চলে। রাজশাহী জেলায় মুসলিম সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় গম্ভীরা নাচ-গানের বিস্তর         রূপান্তর ঘটেছে। দুজন নট নানা-নাতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিকতা ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্যা নৃত্যগীতের মাধ্যমে তুলে ধরে। এতে গদ্যেপদ্যে সংলাপও থাকে। আসরে দোহাররা ধুয়া গায় বাদ্যকরেরা বাদ্য বাজায়। হারমোনিয়াম, বাঁশি, ঢোল, জুড়ি এর প্রধান বাদ্যযন্ত্র। সংলাপ, নাচ-গান ও বাদ্য সহযোগে গম্ভীরানাচ লোকনাট্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। দোহারেরা যখন ধুয়া গায় তখন নানা-নাতি উভয়ে সরল ভঙ্গিতে হাত-পা নেড়ে ও কোমর দুলিয়ে নাচে। নাতির পায়ে থাকে ঘুঙুর। এ-নাচে তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই, তবে মালদহের গম্ভীরানাচে মুখোশের ব্যবহার আছে।

ঘাটুনাচ : ঘাটুগানের সঙ্গে পরিবেশিত হয় ঘাটুনাচ। এর কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উপলক্ষ নেই, লোকমনোরঞ্জনই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। নটীবেশী এক বা একাধিক কিশোর এর প্রধান আকর্ষণ। প্রধানত রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা নিয়ে গান রচনা করা হয় এবং একজন মূল গায়েন গান গায়, আর ঘাটুরা তার সঙ্গে নাচে। নরনারীর লৌকিক প্রেমের গানও আছে। ঢোল,  মন্দিরা, বাঁশি ও সারিন্দা বাদ্যযন্ত্রের কাজ করে। বর্তমানে হারমোনিয়ম ব্যবহার করা হয়। এ-নাচ দীর্ঘ রাত ধরে চলে। কখনো কখনো তা অশ্লীলতার পর্যায়েও পৌঁছে যায়। এ-কারণে লোকালয়ের বাইরে ঘাটুর আসর বসে। প্রধানত মুসলমানরাই ঘাটুর দল গঠন করে এবং নাচগান পরিবেশন ও উপভোগ করে। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোণা শহরের আধুনিক মঞ্চেও ঘাটুনাচ পরিবেশিত হয়।

ছোকরানাচ : ছোকরানাচ আলকাপ গানের সঙ্গে পরিবেশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ-মালদহ জেলায় বহুকাল থেকেই এর প্রচলন। আমবাগান বা খোলা মাঠে বাঁশের ঘের দেওয়া চাঁদোয়া খাটানো মঞ্চে ছোকরানাচ পরিবেশিত হয়। এর প্রধান পরিচালককে বলা হয় সরকার। সরকার, গায়ক, বাদক, দোহার, নট-নটী ও সং মিলে এর একটি বড়ো দল থাকে। বাজনাদারেরা মঞ্চের পাশে থেকে গান ও নাচে তাল সঙ্গত করে। অন্যরা সাজঘরে থাকে এবং প্রয়োজনমতো মঞ্চে প্রবেশ করে   স্ব-স্ব ভূমিকা পালন করে। নটীবেশী একটি ছোকরা নাচে অংশ নেয়। ঘাটুনাচের ঘাটু হয় কম বয়সী একটি সুন্দর বালক, কিন্তু আলকাপের ছোকরা হয় তরুণ যুবক। নারীর সাজসজ্জায় ভূষিত হয়ে সে যখন মঞ্চে প্রবেশ করে তখন তাকে পূর্ণ যুবতীর মতোই দেখায়। লঘু রঙ্গরসের আলকাপ গান ও নাচের কোনো কোনো অংশ বেশ অশ্লীল হয়। এজন্য গভীর রাতে ছোকরা নাচের আসর বসে এবং এর দর্শক হয় সাধারণত প্রাপ্ত বয়স্করা। রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কাহিনি, পৌরাণিক ঘটনা এবং সামাজিক বিষয় এ নাচের বিষয়বস্তু। দেহের ভঙ্গিসর্বস্ব স্নায়ু উত্তেজনাকর এ-নাচ সাধারণ দর্শকের কাছে খুবই উপভোগ্য হয়।

ছৌ-নাচ : পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া-বাঁকুড়া অঞ্চলে প্রচলিত এক প্রকার মুখোশ নৃত্য ছৌ বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধনাচ ; ঢাল, তলোয়ার ও লাঠি নিয়ে এ-নাচ অনুষ্ঠিত হয়। রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা অবলম্বনে ছৌ-নাচের পালা রচিত হয়। পালার দেব, দানব, পশু প্রভৃতি চরিত্রানুযায়ী মুখোশ ও পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহৃত। এ-নাচে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয় বলে শিল্পীদের সবল স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হয়। এতে মুখোশ ও অলঙ্কার পরে পুরুষরাই নারীচরিত্রে নাচ করে। ছৌ-নাচ শিবের গাজন উপলক্ষে বৈশাখ মাসে বেশ ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়। তবে বর্তমানে উপলক্ষ ছাড়াও যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে প্রদর্শন করতে দেখা যায়। বাগদী ও ভূঁইয়া স¤প্রদায়ের অন্ত্যজ শ্রেণির লোকদের মধ্যে এ-নাচের প্রচলন বেশি। বীররসের এ-নাচে মাথা, গ্রীবা, হাত বুক পা প্রভৃতি অঙ্গের কাজ ও ব্যবহার বেশি। এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিভিন্ন কৌশলের মধ্যমে বীরভাব, শান্তভাব বা ক্রোধভাব ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে এ নাচে পায়ের কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পী কখনো একক, কখনো সমবেতভাবে লম্ফঝম্ফ দেয়, ঘুরপাক খায়, হাঁটু গেড়ে বসে, আবার হঠাৎ উঠে প্রতিপক্ষের দিকে তেড়ে যায়। ছৌ-নাচের আসরটি হয় বৃত্তাকার অঙ্গনে। বৃত্তের মধ্যে বাজনদারেরা থাকে এবং চরিত্রের গমনাগমনের জন্য একটা সরু পথ থাকে। দর্শক থাকে বৃত্তের বাইরে। ধামসা, ঢোল ও সানাই  ছৌ-নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র। ছৌ-নাচ শুরু হয় গণেশের বন্দনা দিয়ে ; পরে চরিত্রের আগমন উপলক্ষে দুই চরণের সংক্ষিপ্ত গীত গাওয়া হয়। ছৌ-নাচে গান অপেক্ষা নাচ ও বাদ্যের অংশই বেশি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে ছৌ-নাচ গ্রাম থেকে প্রথমে শহরে এবং পরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রসার লাভ করে।

জারিনাচ :  জারিগানের সঙ্গে যে-নাচ পরিবেশিত হয় তাকে জারিনাচ বলে। মুসলমান সমাজে, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এ-নাচের প্রচলন বেশি। মহররম উপলক্ষে বছরে একবার জারিনাচের আয়োজন করা হয়। এ-কারণে জারিনাচে ধর্মীয় আবেগ সংযুক্ত হয়েছে। জারিনাচের মৌলিক আবেদন করুণ রস এবং এটি দলবদ্ধ নৃত্য। আশুরাকে কেন্দ্র করে গ্রামের আট-দশ জন তরুণ যুবক মিলে এই দল গঠন করে। দলের প্রধানকে বলা হয় ওস্তাদ এবং অন্যরা দোহার নামে পরিচিত। জারিয়ালেরা নিত্য ব্যবহার্য পোশাক পরে এবং হাতে ও মাথায় লাল রুমাল বাঁধে। কোনো কোনো অঞ্চলে পায়ে নূপুরও পরে। ওস্তাদ চটি বাজায় এবং কোনো কোনো অঞ্চলে দোহারেরা বাঁশের তৈরি ঝার্ণি বাজায়। এগুলো তালবাদ্যের কাজ করে। কোথাও হাততালি দিয়ে তাল রক্ষা করা হয়। জারি নাচ বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করা হয়। মূল গায়েন বা ওস্তাদ বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গান গায়, আর দোহাররা নেচে নেচে ধুয়া গায়। গানের ভাবের সঙ্গে নাচের কোনো সম্পর্ক থাকে না, কেবল গানের ছন্দে হাত-পা নেড়ে ও মাথা দুলিয়ে শোক প্রকাশ করা হয়। মহররমের চাঁদ দেখার রাত থেকে জারি নাচ শুরু হয়। এ-সময় জারির দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ-গান করে এবং গৃহস্থেরা তাদের অর্থ বা জিনিসপত্র কিংবা চিড়ামুড়ি উপহার দেয়। আশুরার দিন স্থানীয় কৃত্রিম কারবালায় সকল দলের সমাবেশে নাচ-গান জমে ওঠে।

ডাকনাচ : ডাকনাচ হলো পুরুষের যুদ্ধনৃত্য। ঢাকার মানিকগঞ্জে এখনও এর প্রচলন আছে। এ-নাচের মাধ্যমে সঙ্গীদের যুদ্ধে আহবান করা হয়। শত্রæ হানা দিয়েছে এরূপ ভাব দেখিয়ে সরকার বা দলপতি উচ্চৈঃস্বরে একটানা কণ্ঠধ্বনি করে। কম্পনসহ এ-ডাক ধীর গ্রাম থেকে উচ্চ গ্রামে চড়ে। তার ডাক শুনে সহযোদ্ধারা চারদিক থেকে এসে জড়ো হয়। নাচের এ-অংশটিকে বলা হয় ডাক। দ্বিতীয় অংশে লাঠি নিয়ে যুদ্ধের নানা কলাকৌশল দেখানো হয়। ঢোল ডাকনাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র।

ঢালিনাচ : ঢালিনাচ পুরুষের দ্বৈত যুদ্ধের অভিনয় বিশেষ। বেতের ঘন বুনটে তৈরি ঢাল এবং বাঁশের  তৈরি শক্ত লাঠি এর প্রধান উপকরণ। ঢোল ও কাঁসি নাচের তাল রক্ষা করে। ঢালিনাচের মূল লক্ষ্য  দৈহিক শক্তির প্রকাশ ও নানা আঙ্গিকে যুদ্ধের কৌশল দেখানো। নাচের শুরুতে দুই প্রতিদ্ব›দ্বী মুখোমুখি হয়ে ঢোল-কাঁসি বাদ্যের তালে তালে কিছুক্ষণ পাঁয়তারা করে, আর হাবভাবে বীরত্ব প্রকাশ করে। পরে তারা আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ শুরু করে। কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বা হাঁটু ভেঙে বসে তারা সুযোগমতো আক্রমণ চালায়। ঘাত-প্রতিঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে না-পৌঁছা পর্যন্ত এ-নাচ চলতে থাকে। লৌকিক মেলা উৎসবে ঢালিনাচের আয়োজন করা হয়। যশোর ও খুলনা জেলায় এর প্রচলন বেশি।

ধামাইলনাচ : ধামাইল বা ধামালি মূলত নারীদের আচারকেন্দ্রিক নাচ। বাংলাদেশের সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলায় হিন্দু মেয়েরা ব্রত, পালা-পার্বণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এবং জন্ম, বিয়ে প্রভৃতি সামাজিক উৎসবে ঘটা করে গানসহ ধামাইল নাচ করে থাকে। বাড়ির খোলা আঙ্গিনায় বিশ-পঁচিশ জন নারী গোল হয়ে দাঁড়িয়ে এরূপ কৃত্যানুষ্ঠান প্রদর্শন করে। নাচের পদক্ষেপে বিশিষ্টতা আছেÑ সামনে মাথা নিচু করে ও উপরে মাথা তুলে ঝুঁকে পর্যায়ক্রমে করতালি দিয়ে নাচ করা হয়। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় করতালিকে ‘থাপরি’ বলে। করতালির সাথে সমতা রেখে সামনে ও পেছনে পদক্ষেপ বদল করে বৃত্তাকার ঘূর্ণনে নাচতে হয়। ধামাইল নাচের সময় পেছনের পায়ের সম্মুখভাগমাত্র মাটি স্পর্শ করে, গোড়ালি থাকে উপরে ; এভাবে পর্যায়ক্রমে ডান ও বাম পায়ের বদল করতে হয়। ধামালি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক আদিরসাত্মক গান।

পুতুলনাচ : পুতুলের অভিনয়সমৃদ্ধ নাচকে পুতুলনাচ বলা হয়। কাঠ-কাপড়-শোলা দিয়ে বানানো ও বসন-ভূষণে সজ্জিত এক বা একাধিক পুতুল নিয়ে এক শ্রেণির পেশাদার শিল্পী এরূপ নৃত্যাভিনয় দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। তারা হাতে বাঁধা সুতার সাহায্যে পুতুলের নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজেদের মনেরই বিভিন্ন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। বাজনদার ঢোল, মাদল, কাঁসি ও বাঁশি বাজায় এবং শিল্পী গান গায় ও পুতুল নাচিয়ে সে-গানের ভাব ফুটিয়ে তোলে। বাংলায় পতুলনাচের ইতিহাস কত প্রাচীন তা সঠিক জানা যায় না, তবে পনেরো শতকে রচিত ইউসুফ-জুলেখা কাব্যে এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন পুতুলনাচ চিত্তবিনোদনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল। বাংলায় পুতুলনাচের তিনটি ধারা প্রচলিত : ডাঙের পুতুল [জড়ফ চঁঢ়ঢ়বঃ], সুতাটানা পুতুল [ঝঃৎরহম চঁঢ়ঢ়বঃ] এবং দস্তানা পুতুল [এষড়াব চঁঢ়ঢ়বঃ] প্রথম দুটি ক্ষেত্রে নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে পালাগান পরিবেশন করা হয়। সাধারণত রাধাকৃষ্ণ ও রামসীতার পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে এসব পালা রচিত হয়। সমসাময়িক সামাজিক ঘটনা নিয়েও পালা রচিত হয়। ধর্ম ও নীতিশিক্ষা এসব পালার মুখ্য উদ্দেশ্য, সেইসঙ্গে আনন্দ বিনোদনের উপাদান তো থাকেই। পালার ফাঁকে ফাঁকে ‘সখি-পুতুলে’র একক নাচ দেখানো হয় বাড়তি আনন্দ দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় ডাঙের পুতুল এবং নদীয়া জেলায় সুতাটানা পুতুলের নাচ আজও প্রচলিত।

নারী-পুরুষ দুটি পুতুলের নাচ দস্তানা পুতুলনাচ। মেদিনীপুর ও বর্ধমানের কাহার শ্রেণির কিছু লোক এ-ধরনের নাচ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। একজন শিল্পী দুহাতে দুটি পুতুল নিয়ে নিজেই গান করে আর পুতুল নাচায়। হাল্কা বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ ও কৌতুকরস সৃষ্টি করে দর্শককে আনন্দ দেওয়াই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। এতে পৌরাণিক বিষয় থাকলেও লৌকিক দিকটাই প্রাধান্য পায় ; কোনো ধর্মীয় আবেদন থাকে না। অতীতে সম্পন্ন গৃহস্থঘরে অন্নপ্রাসন, বিয়ে ইত্যাদি উৎসব অনুষ্ঠানে এ-ধরনের পুতুলনাচের আয়োজন করা হতো। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ এবং কুমিল্লায় পুতুলনাচের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বিভাগোত্তর কালে শিল্পীদের অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ-শিল্পের চর্চা ব্যাহত হয়। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দু-একটি পরিবার পুতুলনাচ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে এবং এর আধুনিকায়নেরও চেষ্টাও চলছে।

ফকিরনাচ : মাদার পীরের উরস উপলক্ষে পরিবেশিত নাচকে মাদার নাচ বলে অভিহিত করা হয়। পীরের অনুসারী ফকিরেরা এর আয়োজন করে থাকে। তারা ঢিলেঢালা পোশাক পরে এবং লম্বা বাবরি চুল রাখে। তাদের কেউ গৃহী, কেউ বা ভিক্ষোপজীবী। চৈত্রসংক্রান্তীতে তারা পীরের দরগায় জড়ো হয় এবং মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে মাজার আলোকিত ও সুরভিত করে। পীরের নামে একটি বাঁশ লাল কাপড়ে জড়িয়ে তার মাথায় চামর বা পরচুলা বাঁধা হয়। এটি মাদার পীরের প্রতীক। একজন ভক্ত বাঁশটি ঘাড়ে নেয়, অন্যরা তার সঙ্গী হয়। তাদের পায়ে থাকে ঘুঙুর। আসরে একটি অগ্নিকুÐে মাংস  পোড়ানো হয় পীরের প্রসাদরূপে। পরে ভক্তরা এর চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচে। তারা বাদ্যের তালে তালে পা ফেলে এগিয়ে যায় আর মাথা দোলায়। তাদের এই পা-ফেলা ও মাথা নাড়ার ভঙ্গিই এ-নাচের প্রধান  বৈশিষ্ট্য। এতে পা ও মাথা ছাড়া দেহের অন্য কোনো অঙ্গের তেমন ক্রিয়া নেই। ফকিরনাচের মূল উদ্দেশ্য ভক্তিভাব ফুটিয়ে তোলা। পাকিস্তানের খটকনাচের ভাব ও ভঙ্গির সঙ্গে ফকিরনাচের সাদৃশ্য আছে।

বাউলনাচ : বাউলনাচ বাউলদের ধর্মাচারের একটি অঙ্গবিশেষ। বাউল একটি লৌকিক ধর্মমত। এর গানগুলো তত্ত¡ভিত্তিক। বাউলরা এই গান গাওয়ার সময় আবেগে আত্মহারা হয়ে নাচে এবং অধ্যাত্মরস উপভোগ করে। তাদের ডান হাতে থাকে একতারা এবং কোমরে বাঁধা থাকে বাঁয়া নামক একটি বাদ্যযন্ত্র। কেউ কেউ পায়ে ঘুঙুরও পরে। বাউল নিজেই বাদ্য বাজিয়ে গানের সুর ও নাচের তাল রক্ষা করে। বাউলনাচ মূলত পুরুষের একক নাচ, তবে কখনও কখনও দ্বৈত নাচ এবং আখড়ায় দলবদ্ধ নাচও হয়ে থাকে। বাউলনাচে মুদ্রা ও অঙ্গভঙ্গির কোনো স্থান নেই। হাত-পায়ের কিছু ভঙ্গি ও গতি আছে। একতারাটি কখনও কানের কাছে ধরে, কখনো ঊর্ধ্বে প্রসারিত করে তারা নাচে। বাউলের বিচিত্র পদচালনা ও গতিবিধিতে এ-নাচের প্রকৃত সৌন্দর্য ও মাধুর্য নিহিত। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ও যশোর এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও বীরভূমে এ-নাচের প্রচলন বেশি।

লাঠিনাচ : লাঠিনাচ মহররম উপলক্ষে পরিবেশিত হয়। যুবকেরা লাঠি হাতে নিয়ে দলবদ্ধভাবে নাচে। লাঠিনাচের তাল ও ছন্দ রক্ষা করা হয় ঢোল ও কাঁসির সাহায্যে। লাঠিয়ালরা আঁটসাঁট পোশাক পরে, কোথাও পায়ে ঘুঙুর বা মেকুর পরে। বাঁশের তৈরি তিন-চার হাত লম্বা লাঠি এ-নাচের প্রধান উপকরণ। তবে তলোয়ার, ছোরা এবং থালাও ব্যবহার করা হয়। লাঠিনাচ প্রকৃতপক্ষে আধা নাচ, আধা খেলা। লাঠি-তলোয়ার নিয়ে কৃত্রিম যুদ্ধের ভঙ্গিতে নেচেখেলে বীরত্ব প্রকাশ করা হয়। এতে লাঠি ঘুরানোর বিভিন্ন কৌশল আছে। লাঠিয়াল হাতের লাঠি সামনে, পাশে, দু’পায়ের মাঝে এবং মাথার ওপরে দ্রুত ঘুরিয়ে থাকে। বাদ্যের তালে তালে হাতের এরূপ কুশলী ঘূর্ণনে এবং পদবিক্ষেপে নাচের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

লাঠিনাচে দুজন ব্যক্তি লাঠির আঘাত-প্রত্যাঘাত হেনে দ্বৈত যুদ্ধের রূপকে নাচ দেখায়। লাঠিনাচে ঢুলির বিরাট ভূমিকা থাকে। ঢুলির তাল অনুযায়ী নাচের তাল, গতি ও ছন্দ পরিচালিত হয়। এ-নাচ আরম্ভ পাঁয়তারা, লড়াই, বিরতি প্রভৃতি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। লাঠিনাচ প্রধানত ধীর লয়ে শুরু হয় এবং দ্রুত লয়ে শেষ হয়। মহররমের চাঁদের দশ দিন ধরে লাঠিয়াল দল গৃহস্থের বাড়ির উঠানে, রাস্তার মোড়ে এবং শেষ দিন কৃত্রিম কারবালায় লাঠিখেলা ও নাচ প্রদর্শন করে।

লেটোনাচ : লেটো গান ও অভিনয়ের অংশরূপে পরিবেশিত হয়। বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চলে এর প্রচলন আছে। এ ক্ষেত্রেও নটীবেশে একটি সুন্দর বালক নাচ-গান করে। কবির লড়াইয়ের ফাঁকে ফাঁকে দর্শককে বাড়তি আনন্দ দেওয়ার জন্যই লেটো নাচ-গানের ব্যবস্থা রাখা হয়। এটি একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল।  কাজী নজরুল ইসলাম স্বয়ং কিশোর বয়সে লেটো রচনা ও নাচগানে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

হুদুমানাচ : রংপুরের রাজবংশী কৃষকরমণীদের মধ্যে প্রচলিত। ‘হুদুমা দেও’র পূজা উপলক্ষে এ-নাচের আয়োজন করা হয়। হুদুমা হচ্ছে বৃষ্টির দেবতা। অনাবৃষ্টি দেখা দিলে কৃষকরমণীরা রাতের বেলা দল বেঁধে মাঠে যায় এবং হুদুমা দেও’র পূজাশেষে নগ্ন হয়ে নৃত্যগীত করে। বলা বাহুল্য, এ সময় কোনো পুরুষ উপস্থিত থাকে না। প্রজননের সঙ্গে এ নাচের সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়। হ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here