Home কাভার গার্ল মহাসাগর তীরে আনন্দনগর লস এঞ্জেলেস -শেখ নেছারুদ্দীন আহমদ

মহাসাগর তীরে আনন্দনগর লস এঞ্জেলেস -শেখ নেছারুদ্দীন আহমদ

1060
0
SHARE

মনুষ্যপ্রজাতির বিনোদনের প্রধান মাধ্যম

চলচ্চিত্র শিল্পের সূচনা, উন্নয়ন এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য হলিউড বিশ শতকের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অপ্রতিদ্ব›দ্বী। বৈচিত্র্যপূর্ণ আনন্দদানের উৎস ডিজনিল্যান্ডের উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণ এক অনন্য বৈজ্ঞানিক কল্পরাজ্য, যার অনুকরণে পৃথিবীর প্রায় সব বড়ো শহরে অনুরূপ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানই আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে। হলিউডের নাম জানে না এমন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বিরল। কিন্তু হলিউড আমেরিকার কোন অঙ্গরাজ্যে সে খোঁজ হয়ত অনেকেই রাখেন না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমেরিকায় সরকারিভাবে আমন্ত্রিত হন। হলিউড সিনেমার বিশেষ সমঝদার সোওরাওয়ার্দী সাহেব এই সুযোগে হলিউড দর্শনে গমন করায় অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হন। ছাত্রাবস্থায় এই নাম সতত উচ্চারিত হওয়ায় তৎকালেই হলিউড সম্পর্কে আমার কিছু আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

কন্যা-জামাতার কাছ থেকে আকস্মিক আমন্ত্রণ এলো তাদের বাসস্থান ডালাসে আসার পথে ঢাকা থেকে সরাসরি লস এঞ্জেলেসে আসবার। ওখানকার বিখ্যাত অনেক কিছুই আজও দেখা হয়নি। ওখানে হোটেল রিজার্ভ করা থাকবে এবং পূর্বাহ্নেই ওরা সবাই লস এঞ্জেলেসে পৌঁছে এয়ারপোর্টে আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে। আনন্দঘন অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণ সানন্দে গ্রহণ করা হলো। এমিরেটস এয়ার ওয়েজে দুবাইয়ে চার ঘণ্টার বিরতি। বিমান বন্দরে ফ্রি ওয়াইফাই। ভাইবারে ঢাকা এবং ডালাসে মেয়েদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা বিফল হলো। তারাও যে বহুবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারলাম। ফজিলাতুন্নেসা মহিলা কলেজের অত্যাধুনিক স্মার্ট প্রিন্সিপালের সহায়তায় ছবিসহ মেসেজ পাঠিয়ে মেয়েদেরকে আশ্বস্থ করলাম।

যখন লস এঞ্জেলেসে অবতরণ করলাম দেখি দুপুর গড়িয়েছে মাত্র। শীতের শুরু। কিন্তু এখানে শীতের মাত্রা ঢাকার শীতকালের সমকক্ষ বলে মনে হলো। অবশ্য তফাতটা পরে টের পেয়েছি।

মেরিয়ট হোটেলে থাকার ব্যবস্থা। একটা এলাকাজুড়ে শ্রেণিবদ্ধভাবে অনেকগুলো দোতলা বিল্ডিং। গবৎরড়ঃ ঠরষষধমবও বলা যেতে পারে। প্রত্যেকটি তলা আবার ডুপ্লেক্স। নিচের স্তরে রান্নাঘর, খাবার ঘর এবং একটা বেডরুম ; ওপরের স্তরে আর একটা বেডরুম। নিচের বেডরুমে আমাদের দুজনের থাকার ব্যবস্থা, ওপরের টায় মেয়ে-জামাই এবং নাতিন। আগেই খাবার ব্যবস্থা করা আছে। স্নানপর্ব এবং আহারাদির পর দীর্ঘ ভ্রমণ-ক্লান্ত শরীরে শয্যাগ্রহণ এবং অচিরেই শ্রান্তিক্লান্তির সুপ্তিভুবনে নিমজ্জিত হলাম। কতক্ষণ নিদ্রাচ্ছন্ন ছিলাম জানি না ; গভীর রাতে নৈশাহারের জন্য মেয়ের ডাকাডাকিতে বিছানা ছাড়তে হলো।

পরদিন প্রাতরাশের পর স্থানীয়ভাবে চারদিকটা ঘুরে দেখলাম। রাস্তাগুলো উপরে উঠছে। আবার নিচে নেমে যাচ্ছে। আসলে লস এঞ্জেলেস শহরটা পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। তরুশ্রেণিশোভিত সুপরিকল্পিত পরিচ্ছন্ন শহরটি উপর থেকে দেখলে ছবির মতো মনে হয়।

এমন শহরে বাস করার সৌভাগ্য অধিকাংশ আমেরিকাবাসীরই হয় না। আমরা প্রথমে গেলাম ব্যাংকে। তারপর সুপারস্টোরে কিছু কেনাকাটা সেরে হোটেলে ফিরে এলাম। তারপর লাঞ্চ সেরে বিশ্রাম।

রাতের আঁধারে গ্রিফিত অবজারভেটরি

সন্ধ্যার পর গ্রিফিত অবজারভেটরি [এৎরভভরঃয ড়নংবৎাধঃড়ৎু]  দেখতে গেলাম। অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। জনসাধারণকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার উদ্দেশ্যে গ্রিফিত সাহেব স্বীয় বদান্যতায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৫ সালে। পরে এখানে অনেক সংযোজন বিয়োজন হয়েছে। হলিউড পাহাড়ের দক্ষিণমুখী ঢালের এই অবস্থান থেকে দক্ষিণপূর্বে ঝলমলে আলোকোজ্জ্বল লস এঞ্জেলেস শহর, দক্ষিণে ঐড়ষষুড়িড়ফ ঝরমহ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের অন্তহীন বিস্তার দৃষ্টি সীমানায় চলে আসে। প্রবেশ পথের একপাশ দিয়ে গভীর খাদের প্রান্ত ঘেষে মহাকাশ দর্শনের জন্য অনেকগুলো পাবলিক টেলিস্কোপ। উৎসাহী ব্যক্তি বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা দীর্ঘসময় ধরে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে রহস্যময় মহাকাশ দর্শন করছে। টিকেট দেখিয়ে প্রবেশের পর প্রথমে দৃষ্টিপথে এলো বিশালাকৃতির দীর্ঘ পেÐুলামÑ নাম ফোকল্ট পেন্ডুলাম [ঋড়ঁপধঁষঃ চবহফঁষঁস]। এটার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন পরিদৃশ্যমান হচ্ছে। স্যামুয়েল অছিন টেলিস্কোপ, রিফ্রক্টিং টেলিস্কোপ, সোলার টেলিস্কোপ ইত্যাদি উন্নতমানের টেলিস্কোপে সৌরজগৎ, নক্ষত্রপুঞ্জ, ছায়াপথ, চাঁদের ক্ষয় বৃদ্ধি, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, সূর্য-পৃথিবী-চন্দ্রের ঘূর্ণন, দিনরাত্রির বিবর্তন, শীত-বসন্ত-গ্রীষ্ম-বর্ষা মৌসুমের বিবর্তন ইত্যাদি বৈজ্ঞানিকভাবে নানা আঙ্গিকে দেখানো হয়েছে। গ্রিফিথ অবজারভেটরি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য এক আদর্শ ল্যাবরেটরি। মহাকাশের রহস্য উদঘাটনে বৈজ্ঞানিক সাফল্য সত্যিই চাঞ্চল্যকর।

শহর ঘুরে তারকালয়ে

পরদিন লস এঞ্জেলেস শহর ভ্রমণ। লস এঞ্জেলেস দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর। প্রশান্ত মহাসাগর তীরের তিনদিকে পর্বত ঘেরা এই এলাকা চুমাশ [ঈযঁসধংয] ও টংভা [ঞড়হমাধ] এবং অন্যান্য আদিবাসীদের বাসভূমি ছিল। ১৫৪২ সালে স্পেনের নাবিক রডরিগুয়েজ ক্যাব্রিলো [জড়ফৎরমঁবু ঈধনৎরষষড়] এই অঞ্চল অধিকার করায় এটি মেক্সিকো রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। মেক্সিকোর গভর্নর ফেলিপে ডি নেভে [ঋবষষরঢ়ব উব ঘবাব] ১৮২১ সালে লস এঞ্জেলেস শহরের পত্তন করেন। ১৮৪৮ সালে মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধশেষে লস এঞ্জেলেসসহ পুরো ক্যালিফোর্নিয়া আমেরিকার অধীনে চলে আসে। ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া হওয়ায় বসবাসের জন্য আমেরিকাবাসীদের বিশেষ আকর্ষণের এই শহর অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চলচ্চিত্র শিল্প এবং টেলিভিশনের বাণিজ্যিক প্রসার ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে লস এঞ্জেলেস অগ্রগামী। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া আমেরিকার শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি। তিনটি বিখ্যাত উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহেড, ডগলাস এয়ারক্রাফট কো এবং হিউজেস এয়ারক্রাফট-এর অবস্থানও লস এঞ্জেলেসে। অক্সিডেন্টাল পেট্রোলিয়ামসহ আরো অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ের কেন্দ্র এই শহর।

শহরের ভবনগুলো বেশি উঁচু উঁচু নয়। একতলা-দোতলা ভবনের সংখ্যাই বেশি। গগনচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা হাতে গোনা। ভবনগুলো একটির সাথে অন্যটির ব্যবধান রাখা, দেওয়ালে দেওয়াল লাগানো নয়। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর দিকে ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। স্থাপত্যে, অলঙ্করণে শহরের বিশিষ্ট বিল্ডিং ‘চাইনিজ থিয়েটার’ এবং ‘ক্যাথেড্রাল অব আওয়ার লেডি’। শুধু বহিরাঙ্গই দেখা হলো। চিত্তবিনোদন এবং অবসর যাপনের অনেক পার্ক, তবে ম্যাক আর্থার পার্ক অন্য পার্ক থেকে স্বতন্ত্র, পরিকল্পনায়, বৈচিত্র্যে, সৌন্দর্য বিন্যাসে।

শহর কেন্দ্রের বাইরে আবাসিক এলাকাগুলো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে। দেশের অন্যান্য শহরের আবাসিক ভবনগুলো অনেকটা একই ধাঁচের। কিন্তু লস এঞ্জেলেসে প্রত্যেকটি বাড়ি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতর। বিখ্যাত নায়ক নায়িকাদের বসবাস প্রধানত পশ্চিম লস এঞ্জেলেসের তিনটি এলাকায়Ñ বেভারলি হিলস, সানটা মনিকা এবং ওয়েস্ট হলিউডে। আমরা ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম বেভারলি হিলস-এ। বড়ো বড়ো সব বাড়ি। বৃক্ষের বিন্যাসে, বাগানে মন মাতানো রং-বেরঙের ফুলের মোহনীয়তায়, বাসভবনের অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর মনোহারিত্বে যেন স্বপ্নালোকের আনন্দধাম সৃষ্টি হয়েছে।

কোনো একটি নম্বরে যোগাযোগ করলে একজন সিনেমার নায়কনায়িকার সাথে সাক্ষাৎ হতে পারে। লতিফ যোগাযোগ করে সাড়াও পেয়ে গেল। যিনি দেখা করতে ইচ্ছুক তার নাম আমরা কোনোদিন শুনিনি। হয়ত ছোটখাট কোনো পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন। আমরা আর অগ্রসর হলাম না।

সীমান্তহীন মহাসাগর তীরে

বিকালে প্রশান্ত মহাসাগর তীরের লং বিচ-এ উপস্থিত হলাম। শীতের বিকাল। লোকজন একদম নেই বললেই চলে। বালুকাবেলায় সমুদ্রঝড়ের দাপাদাপি। চোখমুখ ঢেকে রাখতে হচ্ছে। একটা সেতুর মতো র‌্যাম্প পাওয়া গেল সেটার ওপর দিয়ে একদম সমুদ্রজলের কাছেই চলে এলাম। কিন্তু তীব্র শীত আর সামুদ্রিক ঝড়ে স্থির হয়ে দাঁড়ানো কষ্টকর। তবুও কিছুক্ষণের জন্য হলেও মহাসমুদ্র দেখতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যার তল নেই, পার নেই। দৃষ্টিসীমানা ছাড়িয়ে যার বিস্তার। অন্তহীন এই জলরাশির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে এক অভাবনীয় অনুভূতিতে মন ছেয়ে যায়।

 

স্বপ্নযাদুর হলিউডে

বিশ শতকের গোড়ার দিকে অস্ট্রেলিয়া প্রথম চলচ্চিত্র তৈরি করে। কাছাকাছি সময়ে পৃথিবীর অনেক দেশ চলচ্চিত্র তৈরির নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে থাকে। প্রাথমিক সব ছবি ছিল নির্বাক। নিউ ইয়র্কের টমাস এডিসনের কোম্পানি অনেক অগ্রগামী হয়ে পেটেন্ট লাভ করে। এ-যুগের আর একজন পথিকৃৎ ডি. ডবিøউ গ্রিফিত [উড. এৎরভভরঃয]। এরা লস এঞ্জেলেসের অনুকূল আবহাওয়া, সূর্যকরোজ্জ্বল দিনের দীর্ঘতা, প্রচুর খোলা জায়গা এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য বিবেচনায় চলচ্চিত্র তৈরি করতে লস এঞ্জেলেসে চলে আসেন। এখানেই প্রথম সবাক চলচ্চিত্র তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে।

একটা রাস্তা দিয়ে হলিউডের দিকে যাচ্ছি। রাস্তাটার নাম ওয়াক অব ফেম [ডধষশ ড়ভ ঋধসব] পায়ের নিচের প্রতিটি টাইলসে একজন করে বিখ্যাত সিনেমার নায়ক বা নায়িকার নাম খচিত। আমরা প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে গেলাম হলিউডে। আহা সেই হলিউড ! কতবার কতভাবে এই নাম কানে এসেছে। তরুণ বয়স থেকে এ-পর্যন্ত হলিউডের অনেক সিনেমাও দেখা হয়েছে। প্রবেশের পর কিছুক্ষণ শুধু হাঁটাহাঁটি করলাম। একটা অলীক কল্পনা ছিল, এখানে বিখ্যাত নায়ক-নায়িকারা দর্শকের মাঝে হাঁটাহাঁটি করে বেড়ান। কিন্তু সেসব কিছু নেই। এখানে আছে অনেক মজার প্রদর্শনীর সমাহার। সকাল থেকে বৃষ্টি, সাথে আছে শীতের তীব্রতা। ঝিরঝির বৃষ্টি চলছেই, মাঝে মাঝে গতি বৃদ্ধি হয়ে ঝমঝম করে নামছে। ভিজে যাচ্ছে কাপড়-জুতা, যদিও ওভারকোট-রেনকোট আছে। আবহাওয়ার কারণে হয়ত বহির্ভাগের প্রদর্শন বিশেষত পথ-দৃশ্য বতিল করা হয়েছে।

আমরা প্রথমে গেলাম ফিল্ম মেকিং [ঋরষস গধশরহম] বা চলচ্চিত্র নির্মাণের কলাকৌশল দেখতে। স্টুডিওতে ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রবিদ্যুৎ, বন্যা-মহাপ্লাবন, ভূমিকম্প ইত্যাদি কৃত্রিমভাবে তৈরির কৌশল দেখানো হলো।

পরের প্রদর্শনীটি এক অন্ধকার জঙ্গলাকীর্ণ রাস্তায় দানবের ভয় দেখানোর দৃশ্য। কিছু ভয় পাওয়ার ব্যাপার তো আছেই। দুর্বলচিত্ত মানুষের এ-শোতে না যাওয়াই ভালো।

এর পরেরটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। জলদস্যুদের দ্বারা দ্বীপদেশ থেকে নারী অপহরণ, আকাশযানের আগমন এবং উদ্ধার এবং সবশেষে এক ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে নায়িকার ফিরে আসা। জীবন্ত অভিনয় ! অভিভূত হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর, উত্তেজনাপূর্ণ।

পেট শো [চবঃ ংযড়]ি-তে কুকুর, বিড়াল এবং মুরগি মানুষের মতো করে অভিনয় দেখালো। ভারি কৌতূহলোদ্দীপক। এইসব প্রাণীরা মানুষের মতো হাসছে, খেলছে, আড্ডা দিচ্ছে, গল্পস্বল্প করছে, তর্কাকর্তি করছে। ঝগড়া বেঁধে যাচ্ছে, তুমুল ঝগড়া যা হাতাহাতি-মারামারিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। আবার তারা ভালোবাসা দিয়ে একে অপরকে আদর করছে, আলিঙ্গন করছে।

দেখা হলো চতুর্মাত্রিক [৪উ] শর্টফিল্ম। দেখার সময় মনে হয় আমি এই অভিনয়ের ভিতর ঢুকে গেছি চরিত্রের একজন হয়ে। অভিশপ্ত রাজকুমারী ফিয়োনা সূর্যাস্তের পর রাক্ষসীর রূপ ধারণ করতেন। তাকে ড্রাগনদ্বারা পাহারায় এক প্রাসাদে বন্দি রাখা হয়। লর্ড ফারকোয়াড তাকে শেরেক নামক দৈত্যের সাহায্যে উদ্ধার করেন। শুধু প্রেমাস্পদের চুম্বনই ফিয়োনাকে দিবারাত্র সর্বক্ষণের মানুষে রূপান্তরিত করতে পারে। লর্ড ফাবকোয়াড প্রেমের অভিনয় করে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তার প্রেমের প্রদর্শন ছিল প্রবঞ্চনার নামান্তর ; উদ্দেশ্য অন্যরকম স্বার্থসিদ্ধিÑ রাজা হওয়ার উপায়। শেরেক একথা ফিয়োনাকে যথাসময়ে জানিয়ে দেয় এবং নিজের অকৃত্রিম প্রেমের কথাও বলতে ভোলে না। আরো অনেক ঘটনার শেষে ফিয়োনা শেরেককেই বিয়ে করে।

বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজপ্রাসাদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকা কিছু ভবন এবং ভবনের বহির্ভাগ দেখা গেল। এগুলো ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র শুটিং-এ ব্যবহার করা হয়।

দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। কিন্তু বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এক প্রদর্শন শেষ করে অন্য প্রদর্শনে যেতে অপ্রত্যাশিত বিরক্তিকর বৃষ্টির বাধা পেরিয়ে যেতে হচ্ছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আরো কিছু আকর্ষণীয় প্রদর্শনে আর যাওয়া হবে না। হোটেলে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম।

হলিউডের অনেক কিছু দেখা হলো। মহাকবি লংফেলোর অণুকরণে বলতে ইচ্ছে হলো এই কি সেই হলিউড যা আমার কল্পনায় ছিল !

 

কল্পকাহিনির ডিজনিল্যান্ডে

এবার ডিজনিল্যান্ডে। রূপকথার কল্পকাহিনি বৈজ্ঞানিকভাবে দেখানোর স্বপ্ন দেখেন ওয়াল্টার ডিজনি। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা শেষে ১৯৫৫ সালে ডিজনিল্যান্ডের রূপদান করে তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন।

প্রথমে আমরা ত্রিমাত্রিক [৩উ] একটা শর্টফিল্ম দেখলাম। মহাকাশ ভ্রমণের ছবি। আমাদের সিটগুলো চলতে থাকলো ভ্রমণের সাথি হয়ে। সে এক উত্তেজনাপূর্ণ অনুভূতি। দেখা হলো চাঁদ-সুরুজের দেশ, ছায়াপথের তারকাপুঞ্জ, গ্রহ-উপগ্রহের প্রদক্ষিণ-ঘূর্ণন। সবশেষে সিটটা দড়াম করে পড়ে গেল। আমরা এখন মহাকাশ ঘুরে এসে পূর্ব অবস্থানে।

পরেরটা পিটারপ্যানের সঙ্গে ভ্রমণ [ঋষুরহম রিঃয চবঃবৎ চধহ]। আমাদের বাহন উড়ে চলছে। পাহাড়-জঙ্গল পার হয়ে, দৈত্য-দানবের খপ্পর এড়িয়ে পৌঁছে গেলাম চন্দ্রালোক থেকে দূরে তারকাপুঞ্জের মাঝে এক পরীর রাজ্যে। অপরূপাদের নাচ দেখে, গান শুনে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।

সমুদ্রতলের জাহাজ ভ্রমণ [ঝঁনসধৎরহব ঠড়ুধমব] আরও চাঞ্চল্যকর। সিঁড়ি বেয়ে আমরা জাহাজে উঠলাম। সিঁড়ি সরিয়ে নেওয়া হলো এবং জাহাজের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জাহাজের ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলেন, [মনে হয় রেকর্ডকৃত]’ আমরা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি, মেরুদেশের তুষার শৈলের তলদেশ পার হয়ে আরো গভীরে প্রবেশ করছি যে গভীরতায় মানুষ আগে কোনোদিন যায়নি।’

স্বচ্ছ কাচের জানালার ভিতর দিয়ে চারদিকের দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। চোখে পড়ছে সমুদ্র তলের গাছপালা [ঝবধ বিবফ], প্রবাল প্রাচীর, রহস্যাবৃত গুহা, সামুদ্রিক কচ্ছপ, দীর্ঘদেহী জলচর সাপের চলাফেরা, বৃহদাকৃতির সামুদ্রিক মাছ, যুযুৎসু চিংড়ি ইত্যাদি। আরো গভীরে দেখা হলো অদ্ভুত জন্তু-জানোয়ার, ইচ্ছানুসারে রং-বদলানো প্রাণী, দৈত্যাকৃতি অক্টোপাস, মৎস্যকন্যা [গবৎসধরফ]। জাহাজ চলে গেল হারানো মহাদেশের [খড়ংঃ ঈড়হঃরহবহঃ, অঃষধহঃড়] পাশ দিয়ে।

জঙ্গল ভ্রমণে [ঔড়হমষব ঈৎঁরংব] এশিয়া আফ্রিকার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চললো আমাদের বাহন। দেখা হলো এশিয়ার সিংহ, বাঘ, হরিণ, নদীর কুমির এবং আফ্রিকার হাতি, জলহস্তি, জেব্রা, জিরাফ ইত্যাদি। দেখা গেল বৃক্ষপত্রের পোশাকাবৃত আদিবাসী আফ্রিকান তীর ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে। গেরিলা পরিবার সন্তানদের নিয়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর গাছের ডালে ঝুলন্ত বানরের দল আনন্দ-আহ্লাদের খেলায় মত্ত।

একটা খোলা ট্রেনে চড়া হলো। টয়ট্রেনের মতো। দারুণ উত্তেজনাকর। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা যেতে লাগল মধ্যযুগের রাজপ্রাসাদ এবং ঘরবাড়ি। কিছু কিছু ইউরোপিয়ান রাজন্যবর্গ এবং সামন্তশাসকের নিদর্শনবাহী আবার কিছু মধ্য এশিয়ার সুলতানি ঐতিহ্যের ধারক। বিস্ময় বিমুগ্ধতায় দেখার মতো।

ভিতরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো অনেক ফায়ারওয়ার্কস [ঋরৎব ড়িৎশং]। আরো অনেক প্রদর্শনী যেমন টারজান ট্রি হাউজ, সিন্ডেরেলা প্রাসাদ, ঘুমন্ত সুন্দরী [ঝষববঢ়রহম ইবধঁঃু]. ভুতুড়ে বাড়ি [ঐধঁহঃবফ গধহংরড়হ], ক্যারিবিয়ানের জলদস্যু [চরৎধঃবং ড়ভ ঈধৎরনবধহ ] ইত্যাদি আর দেখা হলো না। ওয়াল্টার ডিজনির অত্যন্ত আনন্দদায়ক স্বপ্নীল নিশীথ কুজকাওয়াজ [ঘরমযঃ চধৎধফব] কোনো কারণে আজ বন্ধ। রাস্তায় রাস্তায় অনেক মুক্ত মঞ্চের অভিনয় দেখানো হচ্ছে যার মধ্যে ‘এলিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড’ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

এখন অনেক রাত। হোটেলে ফিরতে হবে। ডিজনিল্যান্ডের মোহনীয় সব প্রদর্শনী মনের ওপর স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে, যা সহজে মুছে যাবে না।

গাড়িতে ফেরার পথে পুরা ক্যালিফোর্নিয়ার ছবিটা মনের পর্দায় ভেসে উঠল। চওড়া প্রাচীরের মতো আমেরিকার পশ্চিমপ্রান্ত জুড়ে বিস্তৃত ভূখÐ ক্যালিফোর্নিয়া, স্টেট সমূহের মধ্যে আয়তনে তৃতীয় [আলাস্কা ও নিউ ইয়র্কের পর], লোক সংখ্যা এবং অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে প্রথম। স্টেটের রাজধানী এক অখ্যাত শহর ‘সারকামেন্টো’। প্রধান শহর লস এঞ্জেলেস দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়। ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল পর্বতময় ও বনভূমি। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর রাজ্যে পেট্রোল ও স্বর্ণভাÐার সবার উপরে। চলচ্চিত্রশিল্প, ইন্টারনেট ও পিসি [চঈ]-র সূচনা ও বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণে সর্বাগ্রগণ্য। বিশ্বের বিখ্যাত সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তিনটি ক্যালিফোর্নিয়ায়, শেভরন, অ্যাপল এবং ম্যাক্কেনস। প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে ৫৩৮টি ইলেকটোরাল ভোটের ৫৫টিই ক্যালিফোর্নিয়ায়। রাজনৈতিক দিক দিয়েও তাই ক্যালিফোর্নিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৪৭ সালের মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধের শেষে সন্ধি-চুক্তির শর্তে মেক্সিকো ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যটি আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করে [১৮৪৮]। তখন কি মেক্সিকোর শাসকশ্রেণি উপলব্ধি করতে পেরেছিল কি রতœভাÐার তারা হারিয়ে ফেললো ! হ

লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here