Home বেড়ানো ভ্রমণ

ভ্রমণ

713
0
SHARE

ইউরোপের দিনগুলো

বেলায়েত হোসেন

কমার্জ ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেই অনুভব করেছিলাম খুবই সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত একটি ব্যাংক। নানা নিরাপত্তা পেরিয়ে লিফ্টে পঞ্চমতলায় উঠে আরো একটি সিকিউরিটি ডোর পেরিয়ে যেতে হলো কোণের সেমিনার রুমে। একটি আদর্শ সেমিনার হলে যা যা থাকা উচিত এখানেও তাই তাই আছে। টানা পাঁচদিন এখানে আমাদের সেমিনার চলবে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের ওপর, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত। বিভিন্ন দেশের ব্যাংকারেরা এখানে এসেছেন। আয়োজক ব্যাংক যেমন চেষ্টা করছে এ-আয়োজনকে অর্থবোধক করতে তেমনি আমরা যারা অংশ নিচ্ছি, আমাদেরও ভাবনার অন্ত নেই ।

কমার্জ ব্যাংক কতটা আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও কর্মীবান্ধব তার একটা ফিরিস্তি দিচ্ছিÑ ঝকঝকে তকতকে আধুনিক বহুতল বিশিষ্ট অফিস, শুরু হবে সকাল ১০টায়। তার আগে অফিস কার্ড পাঞ্চ করে নীচতলায় সারিবদ্ধভাবে কফি পান করে চলে যান সোজা যার যার ডেস্কে। সে যে তলায়ই হোক। আর এ কফিশপটি উধাও হয়ে যাবে ঘড়ির কাঁটা এগারোটায় পৌঁছনো মাত্র। আবার তার দেখা মিলবে যথারীতি পরদিন সকালে, কেবল ছুটির দিন ছাড়া। দুপুরে বিল্ডিংয়ের চারতলায় ব্যাংককর্মীদের জন্য রয়েছে মধ্যাহ্ন ভোজনের সুশোভন ব্যবস্থা। বিশাল ফ্লোরের অর্ধেকটাজুড়ে উচ্চ অবস্থানে রাখা প্রায় ৫০/৬০ রকমের খাবারের সমাহার। নামমাত্রমূল্যে বাসনা অনুযায়ী নির্ধারিত ট্রেতে প্লেট, পেয়ালা, গøাসে করে খাবার নিয়ে নাও। তারপর হল ঘরের অন্যধারে সুসজ্জিত চেয়ার টেবিলে বসে আহার সেরে নাও। এই যে  নৈমিত্তিক জরুরি চাহিদা পূরণ, এতে কর্মীদের কাজের স্পৃহা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আলাপে জেনেছিলাম, এ কেবল এ-ব্যাংকেই নয় ইউরোপের নানা ব্যাংকে এ-সুবিধা আছে। আর কাজ সম্পাদন করার অন্যান্য সুবিধাদি তো রয়েছেই।

সেমিনার শেষে প্রায় প্রতিদিনই ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর বা শহরের আশেপাশে ভ্রমণ। প্রথম দিনেই ঠিক হলো প্রোগ্রাম সিডিউল, প্রতিদিন সেমিনার শেষে থাকছে নগর কি নগরের বাইরে ভ্রমণ। প্রথম দিনের সেমিনার ও মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে সবাই বেলা দুটোর দিকে হোটেলে ফিরে যাই। ঠিক হয় বিকেল চারটায় সবাই মিলিত হব হোটেল লবিতে। আজকের পরিকল্পনা পদব্রজে নগরভ্রমণ। এবারের গাইড থাকছে মিস রোঞ্জা। স্বাস্থ্যবতী, সপ্রতিভ, কালচে সোনালি চুলে কালো প্যান্ট-ট্রাউজার তার ওপর কালো জ্যাকেটে বেশ দক্ষ বলে মনে হলো প্রথম দেখাতেই। কারণ, কালক্ষেপণ না করে প্রারম্ভেই বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন আমাদের পরিভ্রমণ পরিধি। আর সঙ্গে কমার্জ ব্যাংকের মিস ক্রিস্টিন এবং মিস সোনিয়া তো আছেনই, তা ছাড়াও আছেন মিস্টার আলেকঞ্জান্ডার।

উইলেহল্ম-লিউসনার রোডের অ্যাডিনা থেকে বেরিয়ে বাঁয়ের পথ ধরলাম মিস রোঞ্জার নির্দেশ অনুসারে। ইতোমধ্যে এ-পথ বেশ চেনা হয়ে গেছে গতকালের ঘোরাফেরা, মাইনের পারে বেড়ানো এবং কমার্জ ব্যাংকের সেমিনারেও এই পথেই যেতে হয়েছিল। তারপর আবার বাঁয়ে মোড় নিয়ে কিছুদূর এগিয়ে ডানে ওপারে গেলেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বিশাল অপেরা হাউজ। তারই লাগোয়া অত্যাধুনিক ট্রাম স্টেশন। মিনিট তিন-চার পরপর আসছে যাচ্ছে এ মুখে আর ও মুখে একের পর এক ট্রাম। দ্রুতবেগে উঠছে নামছে নানা বর্ণের নানা পরিধানের যাত্রীগণ। দেখতে বেশ লাগছিল, মনও টানছিল শহরময় ঘুরে বেড়াতে। মনে মনে ঠিক করলাম, এ-ক’দিনের কোনো একসময়ে বেরিয়ে পড়তেই হবে।

অপেরা হাউজের ঠিক উল্টোদিকে মাঠের কোণটায় ‘ইউরো ভাস্কর্য’ এবং তার পেছনে বহুতল বিশিষ্ট ইউরো সেন্ট্রাল ব্যাংক। তার আশপাশে সমান তালে বেড়ে উঠছে আরো নানা অট্টালিকা। ফ্রাঙ্কফুর্টের এই  ইউরো সেন্ট্রাল ব্যাংক ১৯৯৮ সালের ১ জুন গঠিত হয়, যা ইউরো জোনের মধ্যে আর্থিক নীতি পরিচালনা করে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৯ সদস্যের রাষ্ট্রগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। চারিদিকে হলুদ তারকায় সজ্জিত নীল রঙের ইউরো প্রতীকই নির্দেশ করছে এ ভাস্কর্যে। পথ চলতে গিয়ে যে-কারোই দৃষ্টি কেড়ে নেয় বর্ণিল এ প্রতীকটি। ডানে এসব রেখে আমরা মাঠ বরাবর এগিয়ে যাই গ্যালুসেনলেজ রোড বাঁয়ে রেখে। এদিক দিয়ে হাঁটতে গিয়ে বারবার চোখ যাচ্ছিল আমার ইংলিশ থিয়েটার বিল্ডিংটায় এবং তার হোর্ডিংয়ের ছবিগুলোতে। কারণ, এই রোডেই ইংলিশ থিয়েটার আর তার পাশেই আমাদের সেমিনার চলছিল কমার্জ ব্যাংকে। যেখানে সকালে এসেছিলাম এবং এ-ক’দিনও আসতে হবে। ইংলিশ থিয়েটারের ব্যাপারেও প্রচণ্ড উৎসাহ কাজ করছিল। অন্তত একটি থিয়েটার দেখতে যেতেই হবে সময় বের করে।

মাঠটি ধরে যত এগুচ্ছিলাম নানা বৃক্ষ, গাছপালা, ফুলের সমারোহ দেখছিলাম প্রাণভরে। প্রধান সড়কের নামানুসারে এর নাম দেওয়া হয়েছে গালুস্যানলেজ পার্ক। ফাঁকে ফাঁকে আছে এখানে ওখানে জার্মানির বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য। একটু এগুতেই কাছাকাছি দেখতে পাই সবুজাভ একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি। সটান দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির মাথায় টুপি, একহাতে কলম অপর হাতে বগলদাবা অবস্থায় নোটবুক আর কাঁধ থেকে পেছন ঘুরে বাঁ-হাতের ওপর দিয়ে ঝুলে আছে রাজকীয় চাপকান। প্রায় ১০ ফুট পাথরের বেদীর ওপর গড়া এ মূর্তিটি জার্মান লেখক ‘ফার্দিনান্দ ভন শিলার’র। ভাস্কর্যটির পাদদেশের পাথরে ইংরেজিতে লেখা ‘শিলার’। গাইড মিস রোঞ্জা জানালেন পুরো নাম ‘ফার্দিনান্দ ভন শিলার’ এবং ইনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান জর্মান কবি, নাট্যকার, ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক। যাঁর জন্ম ১৭৫৯ সালে জার্মানিতে এবং মৃত্যু ১৮০৫ সালে। ১৮৬২ সালে জর্মান ভাস্কর জোহানস ডেলম্যান এটি নির্মাণ করেন। আর একটু এগুলেই চোখে পড়ে আর একটি ভাস্কর্য জ্যাকব গুয়েলেতলেত-এর। গাইডের কথায় জানা যায়, জার্মানিকে শত্রæমুক্ত করতে ও আধুনিকায়নে তাঁর অভূতপূর্ব অবদান রয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে নির্দেশনামূলক তাঁর লেখা প্রচুর পুস্তকাদি রয়েছে। গুয়েলেতলেত জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন ১৭৪৬ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি, আর মৃত্যুবরণ করেন ১৮১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। এ ভাস্কর্যটি একটু অন্যরকমে গড়া। আবক্ষ মূর্তি সর্বোচ্চে আর মধ্যবর্তী অবস্থান ঘিরে দণ্ডায়মান নারী পুরুষের মূর্তি। তেমনি সবুজাভ ব্রোঞ্জে গড়া। পার্কের ভেতর দিয়ে বিকেলের এই মৃদুুমন্দ হাওয়ার ভেতর দিয়ে চলতে গিয়ে আরও অনেক ভাস্কর্য দেখতে পাই। আমার মনে হচ্ছিল, ইতিহাসকে ওরা কতটা মর্যাদার সঙ্গে ধরে রাখে, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় অতীতের ঐতিহ্য। সে সঙ্গে দেশের বীর, জ্ঞানী-গুণীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান।

পুরো পার্ক পেরিয়ে সদলবলে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়াই একসময় টাউনুস্যানলেজ রোডের ধারে আদি অপেরা হাউজের কাছে। পুরানো জমিদার বাড়ির ধাঁচে গড়া তিনতলা বিল্ডিংয়ের সামনেই বিশালা এক ফোয়ারা। তার সামনে চতুর্দিক ঘিরে বিস্তৃত চত্বর। আগুন্তুকদের বসবার জায়গা এখানে ওখানে। এককালে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের জমজমাট নাটক, অপেরা প্রদর্শন হতো এখানে। এখন অ্যাডিনা হোটেলের কাছাকাছি ট্রাম স্টেশনের সঙ্গে যে আধুনিক অপেরা হাউজ গড়ে উঠেছে, সেখানেই উপচে পড়ে বেশি মানুষ। তবে এখানে এখনো সন্ধ্যা হলেই প্রচুর লোকের সমাগম হয়। মনে হচ্ছিল ঢুকে দেখিই না, কেমন এদের নাটক বা পালা ! দলবদ্ধ যাত্রায় এ বড়ো দুষ্কর ! অতএব এগিয়ে যাই, পা মেলাই দলযাত্রায়। গাইড খুব তাড়া করছিল আরও অনেক দেখবার আছে যে ! [চলবে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here