Home প্রবন্ধ/নিবন্ধ ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতা -ইকবাল খোরশেদ

ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতা -ইকবাল খোরশেদ

1535
0
SHARE

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

 

পর্ব-৯

এক.

অশোকের কালনির্ণয়

সম্রাট অশোক [খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩/২৬৯-২৩২] প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে অশোকের স্থান সবচেয়ে উজ্জ্বল। তাঁর কৃতিত্বপূর্ণ জীবন তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ইতিহাসবিদ এইচ জি ওয়েলস্ তাঁর ঙঁঃ ড়ভ ঐরংঃড়ৎু গ্রন্থে অশোককে সবচেয়ে মহত্তম শাসক বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিশাল সম্রাজ্যের অধিশ্বর বলে নয়, একজন মহান মানুষ হিসেবে বিস্ময়কর প্রতিভার সংযোজন ঘটিয়ে দেশ শাসন করার জন্য ওয়েলস্ তাঁকে এই সম্মান দিয়েছেন।

সম্রাট অশোক এবং তাঁর রাজত্বকাল সম্পর্কে জানার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায়। একদিকে যেমন যথেষ্ট সাহিত্যিক উপদান রয়েছে অন্যদিকে তেমনি পাওয়া যায় প্রতœতাত্তি¡ক উপাদানও।  তবে অশোকের রাজত্বকাল ও জীবনী বিশ্লেষণে ইতিহাসবিদগণ সাহিত্যিক উপদানগুলোকে কম গুরুত্ব দিয়েছেন। বৌদ্ধগ্রন্থ ‘দিব্যবদান’ এবং সিংহলীগ্রন্থ ‘দ্বীপবংশ’ ও ‘মহাবংশ’ থেকে অশোকের প্রথম জীবন ও তাঁর ধর্মপ্রচার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই গ্রন্থগুলো অশোকের রাজত্বকালের অনেক পরে রচিত বলে এর ঐতিহাসিক মূল্য অতটা দেওয়া যায় না। অশোকের শাসন ও জীবন বিশ্লেষণে পÐিতগণ তাঁর শিলালিপিগুলোকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। বেশ কিছু পাথরখÐ এবং পাথরে তৈরি স্তম্ভে অশোকের রাজত্বকালের অনেক ঘটনা উৎকীর্ণ রয়েছে। এগুলো থেকে সম্রাট অশোকের জীবন ও রাজত্বকাল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। অশোকের আগে আর কোনো ভারতীয় শাসক এমন বিশদভাবে তাঁর রাজত্বকালের ঘটনাবলি শিলালেখে উৎকীর্ণ করে যাননি।

অশোকের এই শিলালেখগুলো ‘অশোকের অনুশাসন’ নামে সমধিক পরিচিত। ইতিহাসবিদগণ অশোকের শিলালেখগুলোকে প্রধানত দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এক. পর্বত বা পারথখÐের উপর উৎকীর্ণ লিপি, যেগুলোকে সাধারণভাবে গিরিশাসন যা শিলালেখ বলা হয়ে থাকে। দুই. পাথরস্তম্ভের গায়ে উৎকীর্ণ লিপি যেগুলোকে স্তম্ভলেখ বলা হয়ে থাকে।

শিলালেখগুলোকে আবার তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে : ক. প্রধান গিরিশাসন বা প্রধান শিলালেখ ; খ. অপ্রধান শিলালেখ বা ক্ষুদ্র        গিরিশাসন ; গ. গুহালেখ।

একইভাবে অশোক স্তম্ভলেখগুলোকেও তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে : ক. প্রধান স্তম্ভলেখ ; খ. অপ্রধান বা ক্ষুদ্রস্তম্ভলেখ এবং গ. সাধারণ স্তম্ভলেখ।

নয়টি স্থানে অশোকের প্রধান শিলালেখগুলো পাওয়া গেছে। সে-স্থানগুলো হলো  : ১. অন্ধ্র প্রদেশের কর্ণুল জেলায় অবস্থিত এড়ড়গুড়ি অঞ্চলে। এখানে ১৪টি গিরিশাসন পাথরের গায়ে বিক্ষিপ্তভাবে উৎকীর্ণ আছে। সবগুলোতে ব্রাহ্মীলিপি ব্যবহৃত।

২. উত্তর প্রদেশে দেরাদুন জেলার কালসী অঞ্চলে চতুর্দশ প্রধান গিরিশাসন পাওয়া গেছে। এর লিপিও ছিল ব্রাহ্মী।

৩. পাকিস্তানের পেশোয়ার জেলায় অবস্থিত শাহবাজগড়ী অঞ্চলে ১৪টি প্রধান গিরিশাসন পাওয়া গেছে। এগুলো খরোষ্ঠী লিপিতে প্রাকৃত ভাষায় লিখিত।

৪. পাকিস্তানের হাজারা জেলার মানসেহরা অঞ্চলে একইভাবে খরোষ্ঠী লিপি ও প্রাকৃত ভাষায় লিখিত চতুর্দশ প্রধান গিরিশাসন পাওয়া গেছে।

৫. আফগানিস্তানের কান্দাহার থেকে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ প্রধান গিরিশাসনের অংশবিশেষ উদ্ধার করা গেছে। এগুলো গ্রিক ভাষায় লেখা।

৬. গুজরাট প্রদেশে জুনাগড়ের নিকটবর্তী পর্বত গিরনারে চতুর্দশ প্রধান গিরিশাসন উৎকীর্ণ রয়েছে। এর লিপি ব্রাহ্মী।

৭. মহারাষ্ট্রের থানা জেলার অন্তর্গত সোপারা অঞ্চলে অষ্টম ও নবম প্রধান গিরিশাসনের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে।

৮. প্রাচীন কালিঙ্গ নামে পরিচিত বর্তমান উড়িষ্যার ধৌলি নামক অঞ্চলে চতুর্দশ প্রধান গিরিশাসন পাওয়া গেছে। তবে এখানে একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ অনুশাসন তিনটি অনুপস্থিত ছিল।

৯. উড়িষ্যার জৌগরা অঞ্চলে ধৌলির অনুরূপ গিরিশাসন পাওয়া গেছে। অশোক কলিঙ্গ জয়ের পর কলিঙ্গবাসীর উদ্দেশে এদুটি গিরিশাসন প্রচার করেছিলেন বলে এগুলো কলিঙ্গলেখ নামে পরিচিত।

অশোকের অপ্রধান বা ক্ষুদ্র শিলালিপিগুলো মোট দশটি স্থানে পাওয়া গিয়েছে। স্থানগুলো হলো :

(১) উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলার আহরৌরা অঞ্চল ; (২) কর্ণাটকের রায়চূড় অঞ্চলে অবস্থিত গবীমঠ অঞ্চল ; (৩) মধ্য প্রদেশের দাতিয়া জেলায় অবস্থিত গুজররা অঞ্চল, (৪) মধ্য প্রদেশের সীহোর জেলার পানগুড়াড়িয়াঁ অঞ্চল, (৫) কর্ণাটকের রায়চূড় জেলার মাস্কি অঞ্চল. (৬) দিল্লির সন্নিকটে বাহাপুর অঞ্চল, (৭) বিহারের রোটাস জেলার সহস্রাম অঞ্চল, (৮) কর্ণাটকের রায়চূড় জেলার পাল্কিকুÐ অঞ্চল, (৯) মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর জেলার রূপনাথ অঞ্চল এবং (১০) রাজস্থানের রায়পুর জেলার বৈরাট অঞ্চল।

এই দশটি স্থান ছাড়াও অশোকের অপ্রধান লেখটি আরো সাতটি স্থানে পাওয়া গেছে। তবে ওই স্থানগুলোতে লেখটির নিচে দ্বিতীয় অপ্রধান গিরিশাসন সংযুক্তি অবস্থায় দেখা যায়। স্থান সাতটি হলো : (১) অন্ধ্র প্রদেশের কর্ণুল জেলায় অস্থিত এড়ড়গুড়ি অঞ্চল, (২) কর্ণাটকের বেল্লারি জেলার নিট্টর অঞ্চল (৩) কর্ণাটকের চিতলদুর্গ জেলার ব্রহ্মগিরি অঞ্চল, (৪) কর্ণাটকের বেল্লারি জেলায় অবস্থিত উডেগোঁলাম অঞ্চল, (৫) কর্ণাটকের চিতলদুর্গ জেলার জটিঙ্গ রামেশ্বর অঞ্চল, (৬) অন্ধ্রপ্রদেশের কর্ণুল জেলার রাজুলমÐগিরি অঞ্চল এবং (৭) কর্ণাটকের চিতলদুর্গ জেলার সিদ্ধাপুরা অঞ্চল।

সম্রাট অশোকের গুহালেখ পাওয়া গেছে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : বিহারের গয়া শহরের নিকট অবস্থিত বরাবর পাহাড়ে। এখানে ৪টি গুহার গায়ে লিপি খোদাই করা আছে। এর তিনটিতে রয়েছে অশোকের লিপি। অশোকের এই স্তম্ভলেখগুলোর ছয়টি বিভিন্ন স্থানে একত্রে পাওয়া গেছে। তবে হরিয়ানার আম্বল জেলার তোপরাতে এই ছয়টির সঙ্গে আরো একটি অনুশাসন সংযুক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে সুলতান ফিরোজ শাহ্ তুঘলক ওই স্তম্ভটি তোপরা থেকে তুলে এনে দিল্লিতে প্রতিস্থাপন করেছিলেন। তোপরা ছাড়াও এলাহাবাদ, মিরাট, লৌরিয়া, অররাজ, লৌরিয়ানন্দনগড় এবং রামপূর্বা অঞ্চলে অশোকের অনুশাসনগুলো পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে এলাহাবাদে প্রাপ্ত স্তম্ভলিপির খুব খ্যাতি আছে। অশোকের এই স্তম্ভের গায়েই খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে গুপ্তসম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ উৎকীর্ণ করেছিলেন রাজপ্রশস্তি।

অশোকের অনুশাসনগুলোর ভাষা ছিল প্রাকৃত। তবে সীমিতভাবে গ্রিক ও আরামীয় ভাষার ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লিপি হলো ব্রাহ্মী। ভারত ও নেপালে পাওয়া শিলা ও স্তম্ভলিপিতে ব্রাহ্মীলিপির বহুল ব্যবহার ছিল। আফগানিস্তানে পাওয়া গিয়েছে গ্রিকলিপির অনুশাসন এবং পাকিস্তানে প্রাপ্ত লিপিতে রয়েছে খরোষ্ঠী ভাষার ব্যবহার।

 

দুই.

অশোকের সিংহাসন লাভ ও অভিষেক

অশোকের সিংহাসন লাভ ও অভিষেককাল নির্ণয় করার ব্যাপারে ঐতিহাসিকমহলে মতভেদ আছে। বৌদ্ধগ্রন্ত ‘দ্বীপবংশ’ অনুসারে বুদ্ধদেবের পরিনির্বাণের ২১৪ বছর পরে অশোক সিংহাসনে আরোহণ করেন। এবং চার বছর পর তার অভিষেক সম্পন্ন হয়। মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ অব্দে মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি এবং তার পুত্র বিন্দুসার [২৪+২৭] মোট ৫১ বছর রাজত্ব করেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে অশোক খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এর চার বছর পরে অভিষেক সম্পন্ন হওয়া সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। ‘দিব্যবদন’ ও সিংহলীয় উপাখ্যানগুলোতে অশোক এবং তার ভাইদের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে অশোক রাধাগুপ্ত নামে এক আমত্যের সহায়তায় তার বিমাতৃয় ৯৮ জন ভাইকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। এই কারণে অনেকে তাঁকে ‘চÐাশোক’ বলে অভিহিত করেন। রাধাগুপ্ত পরবর্তীসময়ে অশোকের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ ড. স্মিথ অশোকের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ব্যাপারে একমত নন। কেননা, তার রাজত্বের অষ্টাদশ বছর পর্যন্ত তাঁর ভাইবোনদের জীবিত থাকার উল্লেখ আছে। এ-সংক্রান্ত উল্লেখ ড. স্মিথ পেয়েছিলেন অশোকের পঞ্চম শিলালিপি থেকে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেখানে শুধু তাঁর ভাইদের প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণের উল্লেখ আছে। এ থেকে এটা প্রমাণ হয় না যে, তাঁর ভাইয়েরা জীবিত ছিলেন। অপর দিকে তার ভাইয়েরা জীবিত ছিলেন না- এমন নির্দেশনাও পাওয়া যায় না। বৌদ্ধগ্রন্থ ‘দ্বীপবংশ’র সূত্রানুসারে বুদ্ধদেবের পরিনির্বাণের ২১৪ বছর পর অশোক সিংহাসনে বসেছিলেন, সেই অনুযায়ী অশোকের সিংহাসন আরোহণ হয়েছিল ২৭৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এবং তার অভিষেক হয়েছিল ২৬৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। সুতরাং এ-কথা প্রমাণিত যে, কারণ যাই থাকুক না কেন, অশোকের রাজত্বকালের প্রথম চার বছর এখনও রহস্যাবৃতই থেকে গেছে। হ [চলবে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here