Home প্রবন্ধ/নিবন্ধ ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতা : ইকবাল খোরশেদ

ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতা : ইকবাল খোরশেদ

1161
0
SHARE

পর্ব-৮

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

আট.

বিন্দুসার [৩০০-২৭৩ খ্রিষ্টপূর্ব] : চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন তাঁর পুত্র বিন্দুসার। জৈনগ্রন্থ ‘পরিশিষ্ট পার্বণ’ মতে বিন্দুসার ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের স্ত্রী দুর্ধরার গর্ভজাত সন্তান। বিভিন্ন গ্রিক সূত্র থেকে জানা যায় বিন্দুসারের অপর নাম ছিল ‘অমিত্রঘাত’। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের অভাবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতো বিন্দুসারের রাজত্বকাল সম্পর্কে জানারও যথেষ্ট সুযোগ আমাদের নেই। তবে  অনেকে ঐতিহাসিকই একমত যে চানক্য কিছুকাল বিন্দুসারের মন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন। বিন্দুসারের রাজত্বকাল সম্পর্কে পুরাণ ও বৌদ্ধসূত্রের মধ্যে সামান্য মতভেদ রয়েছে। পুরাণের মতে বিন্দুসার ২৫ বছর রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। বৌদ্ধসূত্র মতে বিন্দুসার ক্ষমতায় ছিলেন ২৭ বছর। মৌর্য শাসনকাল সম্পর্কে পÐিতগণ বৌদ্ধ সূত্রগুলোর ওপরই বেশি আস্থাশীল। এসব তথ্য বিচার বিশ্লেষণ করে বিন্দুসারের শাসনকালকে ৩০০ থেকে ২৭৩ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত মনে করা হয়। বিন্দুসারের মন্ত্রী হিসেবে চানক্যের দায়িত্ব পালনের কথা পরবর্তীকালে লিখিত কিছু সাহিত্যিক উপাদান থেকেও জানা যায়। তিব্বতীয় ঐতিহাসিক ও লামা তারনাথের ভাষ্যেও এর সমর্থন আছে। তারনাথের ভাষ্যমতে এ-সময় চানক্য ১৬টি শহরের অভিজাত ও রাজাদের ধ্বংস করেছিলেন। তাঁর মতে চানক্যের সহায়তায় বিন্দুসারের রাজ্যসীমা পূর্ব থেকে পশ্চিম সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তারনাথের বক্তব্য থেকে ভিনসেন্ট স্মিথ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, বিন্দুসার দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন। তিনি মনে করেন, চন্দ্রগুপ্ত উত্তর ভারত জয় করেছিলেন এবং গ্রিকদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন।

ফলে তাঁর পক্ষে দাক্ষিণাত্য জয় করা সম্ভব হয়নি। আবার বিন্দুসারের পরবর্তী শাসক দাক্ষিণাত্যের তামিলনাড়–র তিলেভেলী জেলা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এ-কারণেই স্মিথের মতে অশোকের পূর্বে বিন্দুসারই দাক্ষিণাত্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলেন।

তারনাথের সাক্ষ্য এবং তাঁর অনুসরণে লেখা স্মিথের বক্তব্য গ্রহণ করতে পারেননি ড. হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী ; তিনি তাঁর ‘চড়ষরঃরপধষ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ অহপরবহঃ ওহফরধ’ গ্রন্থে উপর্যুক্ত সূত্রের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে তারনাথ সমকালীন নন। বহুকাল পরে তিনি তাঁর গ্রন্থ লিখেছেন বলে একে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বলা যাবে না। অন্যদিকে গ্রিক সূত্রগুলো বিন্দুসারের রাজ্য জয় সম্পর্কে  কোনো তথ্য প্রদান করেনি। কলিঙ্গ ও মহীশূরে পাওয়া শিলালিপিগুলোতে চন্দ্রগুপ্ত ও অশোকের নাম পাওয়া গেলেও সেখানে বিন্দুসার অনুপস্থিত। রায় চৌধুরীর সিদ্ধান্ত হচ্ছে তারনাথের বর্ণনা করা বিন্দুসারের যুদ্ধ জয় আসলে আঞ্চলিক রাজাদের বিদ্রোহ দমন। আগেই বলা হয়েছে, বিন্দুসারের মন্ত্রী হিসেবে চানক্য ১৬টি শহরের অভিজাত ও রাজাদের ধ্বংস করেছিলেন। এই ঘটনা মূলত ১৬জন বিদ্রোহী রাজাকে দমন করারই নামান্তর। এদিক বিবেচনায় বিন্দুসারের কৃতিত্ব হচ্ছে বিদ্রোহ দমন করে পিতৃরাজ্যের সীমা অক্ষুণœ রাখা। বৌদ্ধগ্রন্থ ‘দিব্যবদান’ থেকে জানা যায় বিন্দুসার যুবরাজ অশোককে তক্ষশীলার বিদ্রোহী প্রজাদের দমন করতে পাঠিয়েছিলেন। এই সূত্রের তথ্যানুযায়ী অশোক সসৈন্যে তক্ষশীলায় পৌঁছার পর জানতে পারেন প্রজারা বিন্দুসারের বিরুদ্ধে নয়, অত্যাচারী সামন্তদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আধুনিক পÐিতগণ তারনাথ প্রদর্শিত বিন্দুসারের রাজ্যবিস্তারের সীমাকে মেনে নেননি। তাঁদের মতে বঙ্গোপসাগর থেকে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিম সমুদ্র পর্যন্ত চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময়কালেই মৌর্যসাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল। ফলে বিন্দুসারের পক্ষে নতুন করে এই রাজ্য জয়ের কোনো সুযোগ ছিল না। এই মতের সমর্থনে হেমচন্দ্র রায় চৌধরীও বলেছেন, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলেই দাক্ষিণাত্য মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল।

বিন্দুসার পিতৃরাজ্য রক্ষা করা ছাড়াও বিদেশি শক্তিগুলোর সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তিনি সিরিয়ার গ্রিক রাজা প্রথম এন্টিওকাসের কাছে পত্র পাঠিয়ে কিছু মিষ্টি, মদ, শুকনো ডুমুর এবং একজন গ্রিক দার্শনিক পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন। এন্টিওকাস গ্রিক দার্শনিক ছাড়াও অন্যান্য দ্রব্য পাঠিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এন্টিওকাস বিন্দুসারের দরবারে ডাইমাকোস নামে একজন দূত পাঠিয়েছিলেন এবং ডাইমাকোস পাটলিপুত্রে পৌঁছার পূর্বেই বিন্দুসার মারা গিয়েছিলেন। বিন্দুসারের আমলে পেট্রোক্লেস নামের গ্রিক নাবিকের নাম পাওয়া যায়। তিনি ভারত মহাসাগর অভিযান করেছিলেন।

বেশিরভাগ ঐতিহাসিক মৌর্য-সাম্রাজ্যের ঐক্য অক্ষুণœ রাখার কৃতিত্ব দিয়েছেন বিন্দুসারকে। এ ছাড়াও দার্শনিক চিন্তাবিদ ও আজীবিক সন্ন্যাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা দানের জন্যও তাঁর খ্যাতি ছিল। হ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here