Home বেড়ানো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও আনন্দ আয়োজন -ফরিক আলমগীর

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও আনন্দ আয়োজন -ফরিক আলমগীর

1085
0
SHARE

আমি আমার ধারাবাহিক লেখা ‘আমেরিকা দর্শনে’ তুলে ধরেছিলাম সম্প্রতি আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত ঢালিউড মিউজিক অ্যান্ড ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডের তারকাসমৃদ্ধ জমজমাট অনুষ্ঠানের খবর। এবার আমার নিবন্ধে আরো কয়েকটি বিশেষ অনুষ্ঠানের খবর তুলে ধরতে চাই। গেল এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে আমি মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত দীর্ঘ এক মাস আমেরিকায় অবস্থান করি। তখন ফ্লোরিডার নাসা থেকে মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ হয়েছিল। দেশপ্রেমের আবেগে আপ্লুত বাঙালির সঙ্গে সেই আনন্দ উচ্ছ¡াস ভাগাভাগি করার দুর্লভ সৌভাগ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ১৪ মে নিউ ইয়র্কের খাবারবাড়ি পালকী হলে আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সুযোগ্য সভাপতি সিদ্দিক ভাইসহ বিভিন্ন স্টেটের নেতৃবর্গ সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা, কবিতা আর গানে সেদিন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সফল উৎক্ষেপণের আনন্দ-উৎসব উদ্যাপন করা হয়। আমি বঙ্গবন্ধুর ওপর কয়েকটি গান গেয়ে সেই সন্ধ্যাটি মাতিয়ে দিয়েছিলাম। এছাড়া মহান মেদিবস, মাদিবস, জামাইকা, ব্রæকলেন, কুইন্স প্যালেসে অনুষ্ঠিত বৈশখি মেলা, এমনকি সফরের শেষ পর্যায়ে বৃহত্তর নর্থবেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত অভিষেক এবং পুনর্মিলনী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটে। তবে আমি সে-সব অনুষ্ঠানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরার আগে প্রবাসের কয়েকজন প্রিয় মুখ যারা আমাদের কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। এর পূর্বে হারিয়েছি কবি শহীদ কাদরী, বাচিক শিল্পী কাজী আরিফ, কমিউনিটি নেতা দীন মোহাম্মদ রানা, মঞ্জু বিশ্বাস, বাংলাদেশের ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রির পথিকৃৎ ডিসকোখ্যাত শাহীন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বন্ধু কবির এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, লস এঞ্জেলেস প্রবাসী মঞ্জুর আহমেদ। আর সম্প্রতি হারিয়েছি প্রবাসের দুজন অত্যন্ত পরিচিত প্রিয় মুখ। একজন প্রবীণ রাজনীতিক ও সাংবাদিক নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে পরিচিত নিকটজন মুক্তিযোদ্ধা গজনফর আলী চৌধুরী অন্যজন আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় পার্টির সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুব আলী বুলু। ২০ এপ্রিল ২০১৮ গজনফর আলী চৌধুরী মৌলভীবাজার জেলার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ বেলায় মুক্তিযোদ্ধা এই প্রবীণ রাজনীতিক ও সাংবাদিক তার জন্মস্থান মৌলভী বাজারে বসবাস করছিলেন। আর আমার বন্ধু মাহবুব আলম বুলু মৃত্যুবরণ করেন ২৮ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। স্থানীয় সময় ১২টায় তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। নীলফামারীর কীর্তি সন্তান মাহবুব আলী ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নটং আইল্যান্ড জুইশ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। দুই সপ্তাহ ধরে তাকে হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। মৃত্যুর পর ২৯ এপ্রিল বাদ জোহর জামাইকা মুসলিম সেন্টারে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পার্টির যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতাকর্মীরা ছাড়াও অসংখ্য মানুষ তার জানাজায় অংশ নেয়। নিউ ইয়র্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি কনসাল জেনারেল শাহেদুল ইসলাম জানাজায় শরিক হয়ে প্রবাসীদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদান করেন। মাহবুব আলী বুলুর মরদেহ এমিরেটস এয়ারলাইন্স যোগে রাতে ঢাকায় পাঠানো হয় এবং নীলফামারীতে মরহুমের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করার কথা হয়। মৃত্যুকালে মরহুম তাঁর তিন ছেলে, স্ত্রী, মাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার অসুস্থতার সময় আমি নিউ ইয়র্কে ছিলাম। ব্যস্ততার জন্যে অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে যাওয়ার সময় হয়নি। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় জামাইকা থেকেও বন্ধুর জানাজায় শরিক হতে না পারা। এ বিষয়টি আমাকে অনেকদিন ভাবাবে, কাঁদাবে।

১৯৯০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা মাহবুব আলী বুলু প্রবাসীদের নিয়ে বৃহত্তর রংপুর জনকল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংগঠনটির সভাপতিও ছিলেন তিনি। এই সংগঠনের উদ্যোগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম তিনি লোকসংগীত সম্মেলনের আয়োজন করেন। এছাড়া ম্যানহাটনে ডাউন টাউন বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায়ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে আমি যখন উত্তর আমেরিকা সফর করি অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা, তখন ওয়াশিংটন ডিসি এবং মিশিগানে দুটি ফোবানা সম্মেলনে আমি আমার মেজো ছেলে মাশুক আলমগীর রাজীবসহ যোগদান করি। একদিকে নিউ ইয়র্কে তখন আলমগীর খান আলমের মেলা কনসার্টের আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল অন্যদিকে রংপুরবাসী মাহবুব আলী বুলু ও বর্ষণের নেতৃত্বে লোকসংগীত সম্মেলনের আয়োজন করে। দুটি অনুষ্ঠানেই আমার অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ ছিল। এক্ষেত্রে আমার বন্ধু বুলু, রহমান, লাতু, আলী ইমাম প্রমুখ আমাকে সহযোগিতা করে। বন্ধু বুলুর আয়োজনে লোকসংগীত উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ভারত থেকে লোকসংগীত গবেষক সুখবিলাস দা, লন্ডন থেকে শিল্পী হেমাংশু গোস্বামী, বাংলাদেশ থেকে লোকসংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র মোস্তফা জামান আব্বাসী, সুযোগ্য কন্যা ফেরদৌসী রহমান ও বিশিষ্ট লেখিকা আসমা আব্বাসী অংশ নেন। এছাড়া মেলা কনসার্টে অংশগ্রহণকারী, নৃত্যশিল্পী চাঁদনী ও রিচি সোলায়মান অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠানস্থলজুড়ে বন্ধু বুলুর আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতায় আমি সন্ধ্যায় সফলতার সঙ্গে লোকসংগীত পরিবেশন করি। আমার সঙ্গে স্থানীয় যন্ত্রশিল্পীসহ সফরসঙ্গী আমার ছেলে রাজীব পরিবেশনায় সহযোগিতা করে। কেবল লোকসংগীত উৎসব নয়, মাহবুব আলী বন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় সেই নীলফামারীতে সত্তর দশকে। এই তো সেদিন নীলফামারীতে বৃহত্তর রংপুর বিভাগ গণসংগীত উৎসবে গিয়েও তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। প্রচুর বৃষ্টি ছিল তখন নীলফামারীতে। প্রধান অতিথি ছিলেন নীলফামারীর কৃতিসন্তান মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। খোলামাঠে অনুষ্ঠান না হয়ে, বৈরি আবহাওয়ার জন্যে মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। বুলু সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠানস্থলে ছায়ারমতো আমার সঙ্গে ছিল। তাছাড়া গতবার অর্থাৎ ২০১৭ ঈদ-উল আজহার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের জনপ্রিয় [ইবষষড়ুরহড়] হলে শোটাইম মিউজিকের কর্ণধার আলমগীর খান আলম আয়োজন করে বাংলাদেশ কনভেনশনের।

ঈদের আমেজে তিনদিনব্যাপী এই জমজমাট বাংলাদেশ কনভেনশনের শুভ উদ্বোধন করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আবদুস সালাম। ওর সঙ্গে ছিলাম আমরা তিন বন্ধু মাহবুব আলী বুলু, গিয়াস আহমেদ ও আমি। আমরা বেলুন উড়িয়ে সে-উৎসবের উদ্বোধন করেছিলাম। সদা হাস্যোজ্জ্বল বুলুকে দেখেছিলাম সপরিবারে সেদিন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই উৎসবে বুলু প্রতিদিনই উপস্থিত থেকে সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করেছেন। সবার সঙ্গে ছবি তুলেছেন। ভাবির সঙ্গে দুই ছেলে রাজা, রাসেলের সঙ্গে পুত্রবধূদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে আলাপ করে মনে হয়েছে আমি যেন তাদের পরিবারের সদস্য। সে সময়ে আমার মনে পড়লো ২০০৪ সালে ব্রæকলেনে বুলুর বাসায় কয়েকদিন অবস্থানের কথা। ব্যবসায়ী বুলু আমাকে নিয়ে প্রায় প্রতিদিন ক্যানেল স্ট্রিটে তার ঘড়ি ও অন্যান্য পণ্যের দোকানে যেতেন। আজও আমার হাতে তার দেওয়া ঘড়ি উপহারের নিদর্শন হিসেবে জ্বলজ্বল করছে। প্রবাসে পেশাজীবনে একজন ব্যবসায়ী হলেও তিনি ছিলেন শতভাগ হৃদয়বান মানুষ। ক্যানেল স্ট্রিট কি ডাউনটাউন ব্যবসায়ীদের কাছে তিনি ছিলেন অতি আপনজন, সবার বিপদে আপদে তিনি এগিয়ে যেতেন। আজ তিনি নেই তার পদচারণায় মুখরিত হবে না তার চেনা ভুবন, ক্যানেল স্ট্রিট, ডাউনটাউন, জ্যাকসন হাইটস, ব্রæকলেন, জামাইকা কিংবা প্রবাসী বাঙালিদের আনন্দ আড্ডা। হ [চলবে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here