1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন

৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

মোট আক্রান্ত

২৫৫,০৬০

সুস্থ

১৪৬,৬০৬

মৃত্যু

৩,৩৬৫

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৫২,২৯৮
  • চট্টগ্রাম ১৪,৭৪৬
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৯৮২
  • কুমিল্লা ৫,৬৭৯
  • বগুড়া ৫,০৯৪
  • ফরিদপুর ৪,৮১১
  • খুলনা ৪,৫৫৩
  • সিলেট ৪,৪৭৫
  • গাজীপুর ৪,৩২৭
  • কক্সবাজার ৩,৪৭৩
  • নোয়াখালী ৩,৩৪৬
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,১২৬
  • ময়মনসিংহ ২,৮২৮
  • বরিশাল ২,৪৭৯
  • কিশোরগঞ্জ ২,০৯১
  • যশোর ২,০২২
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১,৯৫১
  • দিনাজপুর ১,৯২৯
  • চাঁদপুর ১,৮৭৫
  • কুষ্টিয়া ১,৮৪১
  • গোপালগঞ্জ ১,৭৯৩
  • টাঙ্গাইল ১,৭৯৩
  • রংপুর ১,৭৯২
  • নরসিংদী ১,৭৫৬
  • সুনামগঞ্জ ১,৫৫০
  • সিরাজগঞ্জ ১,৫৩৯
  • লক্ষ্মীপুর ১,৪৭২
  • ফেনী ১,৩৬০
  • রাজবাড়ী ১,৩৫১
  • হবিগঞ্জ ১,২২৬
  • মাদারীপুর ১,২২৪
  • শরীয়তপুর ১,১৩৯
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • পটুয়াখালী ১,০৬৬
  • ঝিনাইদহ ১,০৫২
  • মৌলভীবাজার ১,০৪৬
  • জামালপুর ৯৮২
  • নওগাঁ ৯৬০
  • মানিকগঞ্জ ৯০৬
  • পাবনা ৮৫২
  • নড়াইল ৮৫১
  • জয়পুরহাট ৭৮২
  • সাতক্ষীরা ৭৮০
  • চুয়াডাঙ্গা ৭৫৯
  • পিরোজপুর ৭৩৯
  • গাইবান্ধা ৬৯৮
  • নীলফামারী ৬৮০
  • বরগুনা ৬৫৭
  • রাঙ্গামাটি ৬৫৭
  • নেত্রকোণা ৬৪৭
  • বাগেরহাট ৬৩৭
  • বান্দরবান ৫৮২
  • ভোলা ৫৫৭
  • কুড়িগ্রাম ৫৫৩
  • নাটোর ৫৪৪
  • খাগড়াছড়ি ৫৩২
  • মাগুরা ৫২৫
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫১৭
  • ঝালকাঠি ৪৯৩
  • ঠাকুরগাঁও ৪৩৭
  • লালমনিরহাট ৪৩৬
  • পঞ্চগড় ৩৬১
  • শেরপুর ৩২৬
  • মেহেরপুর ২১৯
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

পৈশাচিক প্রেম : ডেভিড হারবার্ট লরেন্স – অনুবাদ : কাজী দিশু

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১৮
  • ১৭২৫ বার ভিউ করা হয়েছে

বিশাল ড্রইংরুমের সুদৃশ্য সোফায় বসেছিল ডেভিড মায়ার। বাড়িটা নোরার। স্কচ হুইস্কির দ্রবগুণে তখন মায়ারের বেশ একটা আমেজ এসেছে। ফুরফুরে মেজাজ, মনে তার ফুর্তি ফুর্তি ভাব। নোরার কারণে মায়ার হাতের মুঠোয় যেন চাঁদ পেয়েছে, যা কোনোদিনই সে আশা করেনি। পামগাছে আচ্ছাদিত রাজপ্রাসাদের মতো অট্টালিকা,

নৌবিহারের জন্যে রাজহাঁসের ন্যায় যন্ত্রচালিত সৌখিন বজরা, ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছে হলে অত্যাধুনিক হাওয়া গাড়ি।

মূল্যবান পোশাক, ঝি-চাকর নয়ন জুড়ানো গাছ-গাছড়া লাগান ফল-ফুলের বাগানÑ অর্থাৎ ঐশ্বর্য, বৈভব ও বিলাসের যা যা কিছু একদিন সে মনে মনে চেয়েছিল, এখন সবই সে পেয়েছে। বরঞ্চ বেশি পরিমাণেই পেয়েছে।

বাড়ির সামনে বাগানে নোরা ছবি আঁকছিল। প্রচুর ধনদৌলতের মালকিন নারীর এই এক বাতিক না কি বিকার ? ছবি আঁকাÑ গুরুগম্ভীর ভাষায় চারুকলা সম্পর্কে নোরার কোনো ধারণাই নেই। সবটাই ভড়ং। স্থান, ড্রইং, পরিপ্রেক্ষিত, রঙের ব্যবহার, সব বিষয়ে অজ্ঞ হয়েও, Ñ অন্তসারশূন্য অহং সর্বস্ব এই রমণী কেবল নিজের অহমিকা জাহিরের জন্যেÑ প্রতিমাসে ছবি আঁকা সামগ্রী কেনাকটায় কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা খরচ করে আসছে। মায়ার মনে মনে এইসব কথা ভাবছিল।

নোরার আশেপাশে চাকর-বাকরেরা ঘোরাঘুরি করছে। নানা কাজে তারা ব্যস্ত, হুকুম তামিলের অপেক্ষায়। হঠাৎ মায়ারকে ডাক দিল নোরা।

Ñ কোথায় তুমি,… ডেভিড ?

Ñ আমি এখানে বারান্দায়। কেন ?

Ñ বড্ড চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। এককাপ চা দেবে, জলদি ?

মুখখিস্তি করে মায়ার অসন্তুষ্ট হয়ে জবাব দেয়Ñ ‘দেখো নোরা তোমার আশেপাশে কম করে হলেও এক হালিরও বেশি কাজের মানুষ ঘোরাফেরা করছে। তাদের কাউকে চায়ের কথা না বলে আমাকে হুকুম করছ কেন ? আমার পেছনে লাগতে তোমার বুঝি খুব মজা লাগে ?’

‘চুপ, গাঁইয়াদের মতো কথায় কথায় খিস্তিÑ ভদ্রভাষায় কথা বলতে শেখোনি ?’ ফিরে তাকাল নোরা। রসিকতা করে বললÑ ‘মজার কথা বলছিলে না ? তোমরা যেমন খিস্তি করো… সেটা আমরাও পারি,Ñ থাক, মুখ খারাপ করব না এখানে, ঝি-চাকরেরা কে কোথায় শুনে ফেলবে আর বলবে এই বয়সেও মহিলার কত রস ! হ্যাঁ কাজের লোকদের কথা বলছিলে না ? আমি তো জানি ওরা আমার চারপাশে রয়েছে। তবুও আমি ইচ্ছে করেই তোমায় চা আনতে বলেছি।’ হাসলো নোরা, গলা নামিয়ে বলল : ‘তোমার হাতের ছোঁয়া আর ঠ্যালার স্বাদই যে আলাদা।’

নোরার বয়স যদিও চল্লিশের কাছাকাছি, দেখতেও অসুন্দরী নয়, তবুও মায়ারের মনে হলো, হাসলে নোরাকে কেমন যেন বুড়ি বুড়ি দেখায়। ওর মুখে অশ্লীল খিস্তি খেউড়ের কোনো মজা নেই। বটে, ভেবেচিন্তে চা আনতে বলেছ, শুধু পীড়িতের টানে ? কিন্তু, রাতে বিছানায় তো তার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। না ডাকলে এখন তো কাছে আসো না ; বিরক্ত হও। বল আঃ ঘুমুতে দাও।… তুই ডাক্তার দেখা, শরীর গরম করবার জন্যে ওষুধ খা।

Ñ কথা না বাড়িয়ে যা বললাম করো। যাও চা-টা এনে দাও। ফিরে গিয়ে নোরা ছবি আঁকায় মন দিল। মুখে যাই বলুক, নোরা ভালো করেই জানে, ডেভিড শেষ পর্যন্ত চা এনে দেবেই। অতএব এ নিয়ে আর কথা বলা নি®প্রয়োজন।

মায়ারও জানে নোরার মেজাজ-মর্জির বা খামখেয়ালির পরিমাপ। আদেশ না মানলে নোরা অন্য উপায়ে শোধ নেবে। নিজের চোখেই তো দেখেছে কত সামান্য তুচ্ছ কারণে অথবা বিনা কারণে এবাড়ির ঝি-চাকরের কারো কারো কীভাবে চাকরি চলে গেছে। অর্থের অহংকারে প্রচÐ মেজাজী মেয়ে নোরা। সেজন্যেই সময় নষ্ট না করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো মায়ার।

সে যেন নোরার আসামি, স্বামী নয়, শুধুই আমোদ প্রমোদের খেলনা। বিছানায় শাঁসালো মক্কেল ! কেনা গোলাম, পুরুষ রক্ষিতা… মেয়ে মহলে যে অশ্লীল খিস্তি চাউর আছেÑ ‘যে বেটার নেই রমণ ক্ষমতা সে বেটার মরণ মরণ’, নোরার কাছে এখন এই খেউড়টাই হয়েছে বেদবাক্য। মায়ারের ভাবনায় এসব কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল।

বহুগামিতার দোষে পুরুষদেরই সাধারণত অভিযুক্ত করা হয়। অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতিতে মেয়েমানুষেরও পরপুরুষে ছোঁক ছোঁকানি কম নয়, নোরা তার উজ্জ্বল উদাহরণ।Ñ এক খাবার মেযন বেশিদিন মুখে রোচে না, তেমনি পুরানো পুরুষসঙ্গ বেশিদিন ভালো লাগে না বিলাসী ধনী ঘরের বৌ-মাগিদের। মায়ারের শরীরটা জানা হয়ে গেছে নোরার। অবশ্য ডেভিড মায়ারও কোনো ভালো মানুষ নয়। টাকা পয়সার লোভ সবারই কমবেশি আছে, কিন্তু মায়ারের অর্থলিপ্সা তাকে পিশাচের পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে।

নোরা বাধ্য হয়েই নিশ্চুপÑ সাধ আছে, সাধ্য নেই।… পুরুষ পাল্টাবার চেষ্টা করত সেÑ যদি সুযোগ সুবিধা থাকত। কোনো কোনো মেয়ে এমনটা করেও থাকে। নোরার মতো বল্গাহীন দেহগত চাহিদা যাদের তাদের জন্যে আসবাবপত্রের মতো পুরুষ বদলানো স্বাভাবিক ঘটনা।

এতে কোনো সন্দেহ নেই, ডেভিড মায়ার নোরার কাছে পুরনো হয়ে গেছে।

এখন সে নোরার কাছ থেকে হিসাব করে সপ্তাহের খরচ পায়। বাড়তি দেনা যদি কোনো সপ্তাহে মেটাতে হয়, Ñ নোরা কড়ায়-গÐায় তার মাসুল মায়ারের কাছ থেকে আদায় করে নেয়। কিন্তু বাড়িতে শোবার ঘরের মেথরের কাজ করতে করতে, নোরার নর্দমায় বুরুষ ঠেলতেÑ দেহদেয়ালে পেরেক ঠোকা হাতুড়ি ঠুকতে, ঢেঁকিতে মেয়েদের শরীরের ধান কুটতে পুরুষের যে প্রাণান্তকর পরিশ্রম আর গায়ের রক্ত পানি হয়, অজস্র প্রাণবীজ পতনের ফলে অকালমৃত্যু ত্বরান্বিত হয়Ñ তার পারিশ্রমিকের মূল্য কত তা কী নোরা জানে ? তার আসল মজুরি কী দেয় মেয়েরা ? কখনো দেয় না।Ñ বাঘিনীদের যত আদর সোহাগ রাতে, বিছানায় অথবা জঙ্গলে।… অন্য সময়, কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরালে পাজি।

বর্তমানে মায়ারের অবস্থা, Ñ পাঁচ বছর হলো ওদের বিয়ে হয়েছে, কিন্তু এখনও একজোড়া জুতো কিনতে হলে স্ত্রীর অনুমতি নিতে হয়। কৈফিয়ৎ দিতে হয়। অথচ নোরার টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই। চার লক্ষেরও বেশি ডলার ব্যাঙ্কে জমা আছে। ক্যাশ বন্ড, সার্টিফিকেট এবং আরও আয় করবার অনেক উৎস ওর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন জায়গায়।

ডেভিড নোরার চেয়ে বছর দশেকের ছোট। চমৎকার নীরোগ স্বাস্থ্য। উত্তরাধিকার সূত্রে এই বিশাল সম্পত্তির মালিক হবে সেÑ অবশ্য নোরা যদি মারা যায়। সব অপমান, অনাচার, অত্যাচার সেই আশাতেই মায়ার সয়ে যাচ্ছে।

বাগানে যে গাছের তলায় ছবি আঁকছিল নোরাÑ চায়ের ট্রেটা সেখানে নিয়ে গেল মায়ার।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নোরা বিদ্রƒপ মেশানো স্বরে বললে : ‘বেশ, বেশ, এই সুবোধ বালকের মতো ব্যবহার, এই কাজে লজ্জা বা রাগ করা অনুচিৎ’, চোখে মুখে তার ছেনালির আভাস।

আশেপাশের চাকর চাকরানিরা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে ডেভিডের দুরবস্থা। Ñ ইচ্ছে করছিল স্কার্ট তুলে এই মুহূর্তেই নোরার ফর্সা নিতম্বদেশ চাবকে লাল করে দেয়। এক ঘুষিতে নোরার মুখের ভূগোল বদলিয়ে দেবার সংকল্প জাগে তার মনে। বাস্তবে সে কিছুই করতে পারে না। নিজেকে দমন করে অতিকষ্টে। দাঁত বের করে হাসতে হয় তাকেÑ ক্রীতদাসের হাসি।

‘Ñ যাই তাহলে ?’

‘Ñ আচ্ছা বেশ যাও’, Ñ নোরার হাসিমুখ হঠাৎই গম্ভীর হয়ে যায়।

‘মাঝে মাঝে তোমার কোনো কোনো আচরণ বা অঙ্গভঙ্গি আদৌ আমার ভালো লাগে না। এসব আমি পছন্দ করি না। একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলছি আমি যা আদেশ করব, সঙ্গে সঙ্গে তুমি তা পালন করবে। ঝগড়া-ঝাটি, কূটতর্ক আমি মোটেই ভালোবাসি না। তুমি যে আমার প্রথম স্বামী নও, Ñ একথা তুমি ভালোভাবেই জানো। এবং তুমি যে আমার সর্বশেষ স্বামী হয়ে থাকবে সারাজীবন, সে আশ্বাসও এই মুহূর্তে তোমাকে আমি দিতে পারছি না। তোমার ব্যবহার, চালচলন, আনুগত্যের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। আরও নির্ভর করছে রাতে বিছানায় তুমি আমাকে সুখ দিতে পারো কি-না তার উপর।’

বিশ্রী হাসি নোরার চোখে, মুখে : ডেভিড মনে মনে ভাবতে লাগল বেঁচে থাকলে নোরার মা-ও তার এই কুৎসিত হাসি সহ্য করতে পারত না। আর সে তো ভাড়াটে স্বামী মাত্র।

পাঁচ বছরের তিক্ত বিক্ষুব্ধ দাম্পত্যজীবনে এর আগেও নোরা তাকে এইভাবে ভয় দেখিয়েছে। বিগত চার বছরে প্রায় প্রতিমাসেই নোরা তাকে তালাকের হুমকি দিয়েছে। স্বামী তার কাছে জীবনসঙ্গী নয়, বিনোদনের সাথিÑ একটা অস্থাবর খেলনা মাত্র। শিশুরা যেমন কাঠি লজেন্স চুষে চুষে ছিবড়ে হয়ে গেলে কাঠিটা ফেলে দেয়, নতুন একটা লজেন্স কেনেÑ নোরাও সেই প্রকৃতির নানা সাইজের বিভিন্ন কোম্পানির কাঠি লজেন্স খাবার জন্য উদগ্রীব। এতে করে মুখের স্বাদ বদল হয়।

নোরা জানে ভাটাপড়া যৌবনের টানে যাদের বশে রাখা যাবে না, ধন সম্পদের টোপ দিয়েই তাকে গেঁথে রাখতে হয়। তাই এই বিবাহ বিচ্ছেদের হুমকিটা একটা চতুর চতুর খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।Ñ তালাকের হুমকি দিয়েই কাজ সারতে হবে। সত্যিকারের দরকার পড়লে, আর হাম্বিতম্বি নয়Ñ মুখের ওপর স্পষ্ট করে বলে দিবে ‘তোমার চাকরি খতম’ এখন থেকে তোমার নিজের রাস্তা তুমি নিজেই দেখ।

কথাটা ডেভিডের অজানা নয়। তাই তার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা বৌয়ের মন জুগিয়ে চলাÑ যেন মেশিনটা বিগড়ে না যায়। টুকিটাকি ফাইফরমাস সে খাটে। রাতে বিছনায় নোরা যখন কামজ্বরে আক্রান্ত হয়, তখন ওঝা সেজে তাকতুক ঝাড়ফুকেও সে অনায়াসে নিপুণ পারদর্শিতা অর্জন করেছে। এছাড়াও চাকর-বাকরের কাজও অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে মায়ারকে করতে হয়। ‘সবুরে মেওয়া ফলে’Ñ এই প্রবাদ বাক্যে আস্থা রেখে, কল্পনা করে একদিন তারও দিন আসবে। পৃথিবীতে কেউ অমর নয়। নোরাও নয়।

নোরা যেভাবে মুটিয়ে যাচ্ছে,Ñ মেদ আর চর্বির স্তূপ হয়ে উঠছেÑ সে কারণে হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা ধরা পড়েছে। ওর বুক দুটো যেন দুটো প্রকাÐ ডাব আর নিতম্ব দেখলে মনে হয় বিরাটকায় দুটো চাল-কুমড়ো।

মায়ার ওর শেষ যাত্রার অপেক্ষায় আছে।

একদিন একটা ঘটনা ঘটল।

এডওয়ার্ড বার্টন নামে এক সুশ্রী যুবককে নোরা বাড়িতেই নিমন্ত্রণ করে আনল। ডেভিড মায়ারও পাঁচ বছর আগে নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে প্রথম এসেছিল এই একই ঠিকানায়। এ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। তখন নোরার স্বামীর নাম স্টুয়ার্ড পাওয়েল। আর নোরার পরিচয়Ñ মিসেস নোরা পাওয়েল। মায়ারের স্পষ্ট মনে আছে তাকে দেখাচ্ছিল মাস্তানের মতো আর মিস্টার স্টুয়ার্ড যেন একটা বাচ্চা ছেলে। ছিনতাইকারী মায়ার এসেছে স্টুয়ার্ডের খেলনা কেড়ে নিতে। তাকে নিয়ে নোরার ছেনালি, বেলেল্লাপনা, ফষ্টিনষ্টির আদিখ্যেতা চরমে উঠেছিল। গা ঢলাঢলি, রংঢং, মুখে লাগামহীন খিস্তি-খেউড়, অশ্লীল ইয়ার্কি, বেশামাল পীরিতে গদ গদ ভাবÑ নোরার সবকিছুই ছিল যেন এক ফাজিল নবীনা লাস্যময়ী যুবতীর মতো আচরণ। প্রথম প্রেমের যেন নতুন বাঁধভাঙা জোয়ার। সপ্তাহ দুয়েক এভাবেই কাটল। নিমন্ত্রণÑ একসঙ্গে বেরিয়ে পড়া- নির্জনে পরস্পরকে নিবিড় করে কাছে টানাÑ প্রেমের সাবান পানির বুদবুদ ওড়ানো, রক্তে আদিম উপক্ষার রসাত্মক মাদকতা। স্টুয়ার্ড সেখানে ব্রাত্য, অবহেলিত, আবর্জনার মতো পরিত্যক্ত। তালাকনামার কাগজে স্টুয়ার্ড পাওয়েলকে সই করতে হলো : ষোলো দিনের মাথায়। পাওয়েলকে ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ছুঁড়ে ফেলে কিঞ্চিৎ টাকা-পয়সা দিয়ে অনায়াসে নোরা তাঁকে অবহেলায় বিদায় করল। নোরার নবীন নায়ক ডেভিড মায়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলো। অসহায় আর বিমূঢ় অবস্থায় স্টুয়ার্ড দেখল কীভাবে প্রচুর ঐশ্বর্য তার হাতের মুঠোর থেকে গলে বেরিয়ে গেল !

এবার মায়ারের পালা। এইভাবেই, একজন আসবে, একজন চলে যাবে, এ খেলা চলতেই থাকবে। নোরার অতৃপ্ত তৃষ্ণা যতদিন না মিটবে। একজন অবশ্য পাবে সব ধন-সম্পদÑ শেষের বেলায়।

এরকম একটা কিছু ঘটবে সেই প্রত্যাশায় বা আশঙ্কায় অপেক্ষা করছে মায়ার বিগত চার বছর ধরে। সে এসেছিল স্টুয়ার্ড পাওয়েলকে বিতাড়িত করে। এবার তাকে হঠাবে এডওয়ার্ড বার্টন। পথ সেই একইÑ উকিলের নোটিশ তার কাছে আসবেÑ আসবে আদালতের কাগজ। নোরার কাছ থেকে অবশ্য খয়রাত পাওয়া যাবে, যদি ভালো ছেলের মতো সবকিছু মেনে নেওয়া হয় তা না হলে দাঁড়াতে হবে বিচারকের সামনেÑ কাঠগড়ায়।

খুব বেশি হলে সপ্তাহ খানেক সময় তার হাতে আছে। ডেভিড মনে মনে হিসাব করে। এরই মধ্যে যা কিছু করার করে ফেলতে হবে। কী করবে সে ?

বিশেষভাবে কিছু ভাবতে হলো না। ভাগ্যদেবী অকস্মাৎ মায়ারের প্রতি সদয় হলেন। বর্তমান অবস্থায় করণীয় কাজ তার সামনে নিজেই এসে হাজির হলো। Ñ ‘উত্তরাঞ্চলের কোনো এক জেলখানা ভেঙে পালিয়েছে সাতজন দুর্ধর্ষ কয়েদি। হঠাৎই খবরের কাগজ খুলতে প্রথম পাতাতেই বড়ো অক্ষরে খবরটা তার নজরে আসে। সাতজনই অতি হিংস্র এবং জঘন্য মারাত্মক স্বভাবের লোক। এদের মধ্যে পাঁচজন আবার এক বা একাধিক নরহত্যা ও ডাকাতি মামলায় দÐাজ্ঞাপ্রাপ্ত যাবজ্জীবন মেয়াদি কারাবাসী আসামি।

বাড়ির চাকর নেলসনকে ডেকে পাঠালেন মায়ারÑ খবরটা পড়ার পর তার আর ত্বর সইছিল না। কাগজের খবরের কথাটা তাকে শুনিয়ে সে নেলসনকে বললে : ‘এ সম্বন্ধে আর কোনো বার্তা বা সরকারি ঘোষণা শুনেছ তুমি ?’

‘জি, হ্যাঁ। পুলিশ ঘণ্টাখানেক আগেই ঢাকঢোল পিটিয়ে অনেক কথা বলে গেছে। তাদের ধারণা ওরা এদিকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। প্রত্যেকেই মারাত্মক এবং সাংঘাতিক অপরাধী। আশ্রয় আর খাবারের অভাবের কারণে ওরা না কি আরও ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।’

ছোট্ট একটা নদী এ বাড়িটার গজ পঞ্চাশ দূর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। সেটা বাদ দিলে তিন দিকেই রয়েছে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলে অবশ্য রক্তলোলুপ জন্তু জানোয়ার নেই। “পুলিশের বিশ্বাস যদি এ অঞ্চলে তারা এসে থাকে গা-ঢাকা দিতে, তবে এই জঙ্গলটাই হবে তাদের উত্তম আশ্রয়স্থল” এক নিঃশ্বাসে নেলসন কথাগুলো বললে।

বাবুর্চি নেলসনকে বিদায় দিয়েÑ তখুনি ভাবনাটা এলো তার মাথায়।Ñ জেল পলাতক খুনে আসামিÑ ডাকাত, দুর্দান্ত বেপরোয়া, এই এলাকায়Ñ টুকরা টুকরা শব্দগুলো তার মাথায় খেলা করতে লাগল। Ñ মায়ার তার নিজস্ব পরিকল্পনা রঙে-রসে সাজিয়ে মূর্তমান করতে সচেষ্ট হলো।

বিকেলে সুইমিংপুল থেকে ফিরে এলো নোরা। বার্টনও তার সঙ্গে ছিল। যেন একটা দ্বিপদ পা চাটা পোষা কুকুর। চটকাচটকি, আলিঙ্গন, চুমু খাওয়া, গা ঢলাঢলি আরও নানা রকম ফষ্টিনষ্টি করতে করতে ওরা এগিয়ে আসছে। সবকিছুই ঘটছে মায়ারের চোখের সামনে। এতসব কুৎসিত অনাচার দেখেও ডেভিডের কিন্তু একটু হিংসে বা রাগ হলো না। বরঞ্চ তার ঠোঁটে আর চোখে দেখা গেল বিদ্রƒপ মেশানো মিষ্টি হাসির ঝিলিক। সে এখন সম্পূর্ণ ভারমুক্ত, কারণ, কী করতে হবে সেই বুদ্ধি মায়ারের মাথায় এসে গেছে।

এরপর কী কী ঘটবেÑ সেটাই মায়ার মনে মনে ভাবল।

নোরাকে নিয়ে একসময় পাওয়েলের চোখের সামনেই ওদের শোবার ঘরে ঢুকেছিল ডেভিড। আদরে, সোহাগে, চুম্বনে চুম্বনে, রতি-মত্ততায় নোরাকে বিহŸল করেছিল।Ñ শোনা কথা, মিথুন ও গর্ভধারণের পর স্ত্রী মাকড়সা নাকি খেয়ে ফেলে পুরুষ মাকড়সাকে। প্রথম প্রথম নোরার সঙ্গে রমণের সময় ডেভিড মায়ার হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল কেন মেয়েদের রক্তচোষা বাঘিনী বলা হয়। মেয়েমানুষের শরীরে যে এত উন্মাদনা, এত সুখ, সে আগে জানা ছিল না ডেভিডের : এই কথার উত্তরে ভেসে এসেছিল নোরার বৃষ্টিভেজা কামনামদির কণ্ঠÑ ‘কি বলছো তুমি, আমার চাইতে তোমার শরীরে বেশি সুখ, কখনোই নয়, তুমি আমার সাত রাজার ধন। যার জীবনের একমাত্র মহানব্রত মেয়েদের সুখ দেওয়াÑ ধন্য সেই পুরুষ ;  তোমাকে পেয়ে আমি চিরকৃতজ্ঞ ঈশ্বরের কাছে। সার্থক তোমার প্রেম-ভালোবাসাÑ হে কামদেব। মুখ তোমার ফুলের চন্দনে ভরে যাক। গ্রীষ্মের প্রচÐ দাবদাহে তুমি দক্ষিণ সমুদ্রের শীতল মলয় অথবা হিমবাহের মতো দারুণ শীতে তুমি জ্বলন্ত সূর্যের উত্তাপ। আমি মিনতি করছি সব সময় আমাকে তোমার স্পর্শে, আদরে সোহাগে এইভাবে স্বর্গসুখ দিও।’

একটা মায়াবী নেশাÑ উন্মত্ত মাদকতার মধ্যে কেটেছিল সপ্তাহ দু’য়েক। বিত্তবৈভবের হীরকদ্যুতি ডেভিড মায়ারের চোখে মাখিয়ে ছিল সেনালি অঞ্জন। সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিকই হবে সে : ভবিষ্যতে, Ñ এরকম আশ্বাসই তাকে দিয়েছিল নোরা। অতঃপর বিবাহ। প্রথম বছরটা বেশ সুখেই কেটেছিল। আস্তে আস্তে নিম্নচাপÑ ঈশান কোণে মেঘ, ক্রমশই সেটা কালবোশেখি ঝড়ে পরিণত হলো।

এডওয়ার্ড বার্টন, তার উত্তরাধিকারীÑ তারও পরিণতি মায়ার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ভবিষ্যতে আর একজন আসবে রাজপুত্রের বেশে।

বার্টনের ডাকে চিন্তার সূত্রগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। একপাত্র হুইস্কি বাড়িয়ে ধরেছে সে : ‘চলবে না কি ? হাসি মুখে জিজ্ঞেস করে বার্টন।

মগজের সমস্ত পরিকল্পনা মুলতবি রেখে, ডেভিড বাস্তব জগতে ফিরে আসে।

মায়ার বার্টনের বাড়ানো হুইস্কির গøাসে চুমুক দিতে দিতে বললো: ‘শোনো এডওয়ার্ড নোরাকে বিয়ে করবার পর থেকেই এই গত পাঁচ বছরে হুইস্কির নেশাটা বিশ্রীভাবে আমাকে পেয়ে বসেছে। প্রতিরাতে কম করে হলেও ছ’সাত পেগ আমার চাই-ই, না হলে ঘুম আসতে চায় না।’

বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে গম্ভীরভাবে শ্লেষাত্মক স্বরে বার্টন বললেÑ ‘আর বেশিদিন এই বিলাস চলবে বলে তো আমার মনে হচ্ছে না।’

এডওয়ার্ডের বিষাক্ত কথার শলাকা যেন মায়ারের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল। তার মাথায় রক্ত চড়ে উঠল। একটা বেশ কড়া জবাব দেবার জন্যে সে তৈরি হচ্ছিল, Ñ দু’টি সারমেয় যেন লড়াইয়ের মুখোমুখি। হঠাৎই দোরগোরায় বাবুর্চি নেলসন এসে হাজির হওয়ায় মায়ারের মুখের কথা মুখেই থেকে গেল।

নেলসন খুব কাছে এসে গলার স্বর নামিয়ে বললে : ‘মি. মায়ার এসময় আপনাকে বিরক্ত করা ঠিক না জেনেও আমাকে আসতে হয়েছে সেই ফেরারি খুনীদের কারণে। রেনবো জংশনের কাছে ওরা গুলি করে একজনকে হত্যা করেছে। কুড়ি-পঁচিশ মিনিট আগে খুনটা হয়েছে। এটা তারা করেছে টাকা আর সাহায্যের জন্যেÑ নগর শেরিফের লোকেরা একথা ঢাক পিটিয়ে প্রচার করছে। তাদের ছবিও ছাপা হয়েছে আজকের সান্ধ্য দৈনিকে। দেখে তো ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করে। দেখুন কী ভয়ঙ্কর চেহারা এক একজনের। কথাটা বলতে বলতে নেলসন ভাঁজ করা সান্ধ্য দৈনিকটি খুলে ধরল মায়ারের চোখের সামনে।

সাতটি কয়েদির আবক্ষ ছবিÑ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠাতেই। প্রত্যেকেরই বয়স, দৈহিক বিবরণ, অপরাধের ফিরিস্তি ইত্যাদির বৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। মায়ার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটি বিবরণ পড়তে শুরু করল।

‘সত্যি সত্যিই ওরা এ-বাড়ির জঙ্গলের কাছাকাছি কোথাও আস্তানা নিয়েছে কি না’Ñ শঙ্কামিশ্রিত কণ্ঠে একথা বললে নেলসন।

‘Ñ আপনাকে একথা জানানো দরকার মনে করেই ছুটে এসেছি।’

‘Ñ অবশ্যই, খুবই সঠিক কাজ করেছো। এখন থেকেই সব ব্যাপারেই আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে, সাবধানে থাকতে হবেÑ বুঝেছো নেলসন। কী কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার আমি ভেবে দেখছি, তুমি এখন যাও।’

নেলসন বিদায় নেওয়ার পর ; Ñ মায়ার ঘড়িতে চোখ বুলালো Ñ রাত সাড়ে আটটা।

এই বাড়ি থেকে রেইনবো রেলওয়ে জংশন সাত মাইল দূরে। এটা অবশ্য মায়ারের অনুমান। অনায়াসেই যেকোনো লোক সোজা পথ ছেড়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সেদিকে যদি বেশ জোরে ছোটে তাহলে দু-আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই সে রেইনবো জংশনে পৌঁছে যাবে। মস্তিস্কে যে নকশা মায়ার এঁকেছে তার ছক মিলিয়ে : সে ভেবে দেখল তার জন্য মধ্যরাতই সঠিক সময়। সে সময়ে চাকর-বাকরেরাও ঘুমোবে। বার্টনও বিদায় নেবে।

ডাক এলো নৈশভোজের। নোরার মনোযোগ পরিপূর্ণভাবে বার্টনের প্রতি, Ñ বার্টনই তার ধ্যান-জ্ঞান।Ñ জিনিসটা মায়ারের দৃষ্টিতে প্রখর হয়ে উঠল। সে যেন কেউ না, অবাঞ্ছিত, অপাঙক্তেও। ঠিক পাঁচ বছর আগে যেমনটি ঘটেছিল স্টুয়ার্ড পাওয়েলের জীবনে।

Ñ নাম তার ডেভিড মায়ার, সে স্টুয়ার্ড পাওয়েল নয় ; Ñ শয়তানের মতো নির্ভুলÑ ইবলিসের মগজে যত প্রকার পাপ, অপরাধ আর বীভৎস পরিকল্পনা থাকা সম্ভব, নোরার তরে তার কোনোটারই বাস্তব প্রয়োগ বাদ দেবে না সে। অন্যমনস্ক হয়ে মনে মনে হাসতে গিয়ে মায়ার বেশ জোরেই হেসে ফেলল। এডওয়ার্ড আর নোরা অবাক হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বিরক্তিভরা চোখে তাকাল ওর দিকে।

‘কী ব্যাপার ? বিচ্ছিরিভাবে হাসলে কেন ?’ নোরা গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে : ‘কোনোরকম ফাজলামি বা ইয়ার্কির কথা কি আমি বলেছি ?’

মায়ার অনুতপ্ত সুরে জবাব দিলো : ‘দুঃখিত নোরা, ও কিছু নয়’ বলেই নিজেকে সামলে নিয়ে খাবার প্লেটে চোখ নামিয়ে নিল, Ñ আরও বললে : ‘ব্যক্তিগত একটা মজার কথা মনে পড়ে গেলÑ তাই হঠাৎ হেসে ফেলেছি।’

এবার নোরা তার কথার কোনো জবাব দিল না। শুধু বিরক্তিভরা মুখটা ঘুরিয়ে বার্টনের দিকে ঘাড় ফেরালো।

নৈশভোজের শেষে নেলসন তিনজনের সামনে সমাপ্তি স্মারক হিসেবে তিন গøাস ফেনায়িত ব্র্যান্ডি রেখে গেল।

এদিকে মায়ার একাগ্র চিত্তে প্রতিভাবান গণিতবিদ এবং প্রকৃত শিল্পীর মতো চিন্তার জাল বুনে চলেছে ; Ñ নিজ্ঝুম রাতÑ জেলপলাতক নৃশংস খুনীÑ যারা ইতোমধ্যে একজনকে হত্যা করেছে। Ñ আরও একাধিক খুনের ঘটনা ঘটাও বিচিত্র নয়। ঠিক সময়ে সুদক্ষ কারিগরের মতো লোহা গরম থাকতেই হাতুড়ির মোক্ষম কোপ মারতে হয়। Ñ যাইনি, পিশাচী বশীকরণের যত তন্ত্র-মন্ত্র আছে তার সবটাই এখন তার করায়াত্তে। Ñ মায়ারের মুখে বিদ্রƒপাত্মক হাসি।

ডেভিড মায়ার মনে মনে সমস্ত পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেছে, Ñ যা করবার আজ রাতেই করতে হবে।

রাত এগারোটার সময় এডওয়ার্ড বিদায় নিল। মায়ার নিজেই তাকে দরজায় পৌঁছে দিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো বললে : ‘আবার এসো বার্টন’Ñ সঙ্গে সঙ্গে তার পিঠ চাপড়ে দিল। ‘যখন সময় হয় তুমি এসো। সবসময়ই এ-বাড়ির দরজা তোমার জন্যে খোলা থাকবে।’

এডওয়ার্ডের চেয়ে ডেভিডের এই আচরণে নোরাই বেশি অবাক হলো। তার জীবনে এই ধরনের অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। অথচ দু’জনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। নোরার গালে বিদায় চুম্বন আর মায়ারের সঙ্গে করমর্দন করে নিজের গাড়িতে চড়ে বসলো এডওয়ার্ড বার্টন।

বার্টন চলে যাবার পর, নিজের বিস্ময় কাটিয়ে নিয়ে নোরা স্বামীর মুখোমুখি হয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললে : ‘চমৎকার ! অতি চমৎকার অভিনয় দেখালে তুমি। একেবারে রঙ্গমঞ্চের নায়কÑ তোমার এই বিশেষ প্রতিভার বিষয়ে তো গত পাঁচ বছরে আমি কিছুই জানতে পারিনি। কী ব্যাপার ?’

Ñ এতে অভিনয়ের কী দেখলে তুমি ?

Ñ আমাকে কী বোকা পেয়েছ ? আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সোজা না। সাত ঘাটের পানি খাওয়া মেয়েমানুষ আমি। সে যাই হোক, আজ থেকে তুমি আর আমার ঘরে শুবে না। স্টাডি অর্থাৎ পড়ার ঘরে তুমি শোবার ব্যবস্থা করবে।

Ñ কি কারণে, হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত ?

Ñ না এটা কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়, আর কারণটাও বুঝবার মতো তোমার যথেষ্ট বুদ্ধি আছে।

Ñ হায় খোদা ! তা হলে কি তুমি আমাকে তালাক দেবে ? এটাই আমার বিদায় নেবার পূর্বাভাস ?

Ñ একদম খাঁটি কথা, ঠিকই বলেছ তুমি। মনস্থির করে ফেলেছি। আমার শেষ কথা কাল সকালেই তুমি জানতে পারবে। কথা শেষ করে দ্রæত পা ফেলে নোরা তার শোবার ঘরে ঢুকে মায়ারের মুখের ওপর সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

একমনে পড়ার ঘরে মদ খাচ্ছে ডেভিড। এমন সময় নেলসন এলো। ‘Ñ আপনার কিছু দারকার আছে মি. মায়ার ?’

Ñ একজনকে আমি খুন করতে চাই, হ্যাঁ আজ রাতেই ; অবশ্য কথাটা মায়ার মনে মনে বললে। ‘না নেলসন, আর কিছুর প্রয়োজন আমার নেই।’ প্রকাশ্যে এই কথা বলে মায়ার নেলসনকে বিদায় দেয়।

‘শুভরাত্রি মি. ডেভিড মায়ার’ নেলসন যাবার আগে কেতাদুরস্তভাবে বিদায় সম্ভাষণ জানায়।

ডেভিড পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ; Ñ তার মাথা এবং সমস্ত শরীর স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মতো কাজ করছে। এখন এই প্রকাÐ বাড়িতে নোরা আর সে ছাড়া তৃতীয় কোনো লোক নেই। চাকর-বাকরদের থাকার জায়গা বাড়ির বাইরে কিছুটা দূরে। সারাদিনের কাজকর্ম সেরে, সেখানে তারা ফিরে যায়। আবার সকাল হলেই ফিরে আসে।

সময় : রাত সাড়ে এগারোটা।

উঠে পড়লো মায়ার, অবশ্য তার আগে পর পর দুগøাস মদ্যপান করে নিল।

নিস্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা বাড়িটা। অসহ্য এই নীরবতা। কিন্তু দিনের বেলায় Ñ না, না দিনে নয় রাতেও এই ঘণ্টাখানেক আগেও কতই না মুখর ছিল এই প্রাসাদসম বাড়িটা। নোরা একাই যথেষ্ট। সেই মাতিয়ে রেখেছিল গোটা বাড়িটাকে। পাশের ঘর থেকে মায়ার তার শিকারের রাইফেলটা দেয়াল থেকে পেড়ে নিয়ে এলো। জৈবিকভাবে তার সত্তার সঙ্গে মিশে রয়েছে রাইফেল চালানো বা ‘শিকার’। Ñ ব্যাপারটা তার কাছে সহজসাধ্য। সুনিপুণ শিকারি সে। বুলস-আই, ক্রাকশর্ট নির্ভুল লক্ষ্য। নোরা একদিন তার প্রেমে পড়েছিল এই গুণের জন্যেই। বন্দুকের সঙ্গে গান ব্যাগটাও পকেটে পুরে পিছনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো মায়ার।

চারদিকে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত ত্রয়োদশী চাঁদের আলোÑ মায়াবী রাত। আকাশে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের অস্পষ্ট ঝিকিমিকি। সামনে নদীটাকে দেখাচ্ছে গলিত রুপোর চকচকে পাতের মতো। জঙ্গলের আশপাশটাও বেশ পরিষ্কার নজরে পড়ছে।

ঢং-ঢং-ঢং ঘড়িতে সময়-ধ্বনি জানিয়ে দেয় এখন রাত বারোটা। এটাই সঠিক সময়। এখনই নোরাকে ঘুম থেকে তুলতে হবে। কিন্তু নোরাকে ডাকবার আগে মাথা নিচু করে মায়ার মাটি থেকে একট জংধরা কাঁটাতারের খানিকটা টুকরা হাতে তুলে নিল। মায়ার লক্ষ্য করেছিল তারটা কয়েকদিন ধরেই সেখানে পড়ে রয়েছে। ফাঁকিবাজ ছোকরা মালিটা কবে সেটা তুলে ফেলে দেয় বাইরেÑ এই অপেক্ষায় ছিল সে। তারপর হবে তার সঙ্গে বোঝাপড়া। এখন অবশ্য সে মনে মনে ধন্যবাদ জানাল ছোকরাটাকে, একইসঙ্গে নিজেকেও। কেননা মালি যদি সঠিক কর্তব্য করত, তা হলে এই ধরনের খানিকটা তার সে কোথায় পেত ? খুবই প্রয়োজন সাত-আট হাত লম্বা এই ধরনের এই রকম একটা শক্ত তার। ডেভিডের হাতে অব্যশ চামড়ার দস্তানা পরা থাকায় তারে আঙুলের কোনো ছাপ পড়ার সম্ভাবনা নেই।

পরিকল্পনা মাফিক এখন শুধু নিখুঁতভাবে কাজটা করতে হবে।

Ñ ‘নোরা’। বেশ জোরে গলা তুলে সে নোরার শোবার ঘরের জানালার কাছে গিয়ে ডাক দিল। সেকেন্ড কয়েক চুপচাপ কোনো সাড়-শব্দ নেই। আবার মায়ার সজোরে ডাকলো : ‘নোরা।           নো-রা। জলদি নিচে এসো।’ উৎকণ্ঠা আর ভয়ার্ত মায়ারের কণ্ঠস্বর। ভেঙে যায় নোরার সুখনিদ্রা। জানালা থেকেই মায়ার তার স্থূলদেহী বৌয়ের নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পায়। খানিক পরেই জানালা খুলে বেশ বিরক্তি এবং বিস্ময়ের সঙ্গে নোরা বললে : ‘কী হয়েছে ?’

‘Ñ জলদি, জলদি, নিচে নেমে এসো। আসো দেখে যাও কী ভয়ঙ্কর কাÐ ঘটেছে।’ কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে নিচে নেমে এলো নোরা। চুইংগাম তার মুখে। গরু ছাগলের জাবর কাটার মতো যতক্ষণ সে জেগে থাকে, কিছু না কিছু একটা চিবুতে থাকে। তার এই স্বভাব মায়ারের খুবই বিশ্রী লাগে।

‘কোথায় ? কী হয়েছে ?’ চারদিক অন্ধকার, তার মাঝেই নোরা জানতে চায় কী হয়েছে।

‘Ñ কোথায়, কো-থায় তুমি ?’

‘Ñ এই তো পেছনের বারান্দায়।’

এতক্ষণে ডেভিড তার কর্তব্য স্থির করে ফেলেছে। কাঁটাতারের টুকরাটা বেশ করে পাকিয়ে দু’হাত বাগিয়ে ধরেছে। Ñ বারান্দায় প্রবেশ করবার সঙ্গে সঙ্গে ওঁৎ পেতে থাকা ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো বিদ্যুৎগতিতে নোরার গলায় কাঁটাতারের ফাঁস প্রচÐ শক্তিতে শক্ত করে প্যাঁচ কষে টেনে দিল ডেভিড মায়ার। নোরার নরম গলায় কাঁটাতারে ফাঁসটা আঁটোসাটো হয়ে জড়িয়ে যায়। মোক্ষম প্যাঁচ। সূচালো কাঁটাগুলো গলার মাংসে বিঁধে গেল গভীরভাবে। বৃথাই আত্মরক্ষার চেষ্টা করলো নোরাÑ একটু বাতাসের জন্যে বেচারী ব্যাকুল হয়ে উঠল। এরই মধ্যে মায়ার আরো কয়েকটা জোরালো পাক দিয়ে ফেলেছে তারের ফাঁসে। নোরার অবস্থা শোচনীয়Ñ ছটফট করতে লাগলো। অক্ষিকোটর থেকে তার চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে। রক্তাপ্লুত নোরা যখন চোখ ফেরালো মায়ারের দিকে, সেই নীরব দৃষ্টির ভয়াবহ ভাষা পড়বার মতো ক্ষমতা মায়ারের ছিল না। তবুও সে নিজের কাজ একাগ্রচিত্তে করেই চলল। ক্ষতস্থানগুলো থেকে রক্তের ফোয়ারা বইতে লাগল। নোরার মুখে কোনো কথা নেই। বেরিয়ে এলো জিভ আর তার সঙ্গে চিবানো চুইংগামের টুকরা। নোরার ভারি নধর দেহটা ধপাস করে মোমপালিশ করা বারান্দার মেঝেতে আছড়ে পড়লো। খাবি-খেলো কয়েকবার। ঠিক যেন ট্যাটাবিদ্ধ বড়ো আকারের মাছ ডাঙায় ছুঁড়ে ফেলার পর তার আস্ফালন। অতঃপর নিষ্পন্দ-নিথর হয়ে পড়ে রইল নোরার শরীর।

আর দেরি না করে নদী-পারের ঘন-জঙ্গল লক্ষ্য করে মায়ার এলোপাথাড়ি গুলি করতে লাগলো। Ñ যতক্ষণ না রাইফেলের ম্যাগাজিন শেষ হয়। চাকর-বাকরেরা গুলির আওয়াজে ছুটে আসছে দেখে মায়ার নিজেও বাড়ির ভেতর চলে এলো। হলঘরের টেলিফোনের রিসিভার তুলে খুবই তৎপরতার সাথে স্থানীয় থানায় ফোন করলো।

‘হ্যালো ? হ্যালো ? আপনি কি পুলিশ ইন্সপেক্টার বলছেন ? আমার নাম ডেভিড মায়ার। হাঁ, ঠিকই ধরেছেনÑ নোরা আমার স্ত্রী। এখানে মানে আমার বাড়িতে একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে। ভয়ঙ্কর মারাত্মক ব্যাপার, নোরাকে খুন করা হয়েছেÑ হ্যাঁ, আমার স্ত্রী নোরা। সেই জেলপালানো দুর্ধর্ষ পাষÐ কয়েদিদের দলই আমার স্ত্রীকে খুন করেছে। কী বললেন ? না, সেসময় নোরার কাছাকাছি আমি ছিলাম না। ওর চিৎকার শুনে আমার স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি সর্বনাশÑ যা ঘটবার ঘটে গেছে। খুনিরা পালাচ্ছিল। বন্দুকের ম্যাগাজিন খালি করে গুলি ছুঁড়লাম আমি। কারো গায়ে লেগেছে কি না তা আমি জানি না। কেননা যথেষ্ট দূরত্ব আর অন্ধকার ছিল। কী বললেন ? সত্যিই সত্যিই তারা সেই জেলপালানো ফেরারি আসামির দল কি না ? হ্যাঁ অবশ্যই, এতে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। না, না, আমার ভুল হয়নি, শতভাগ নিশ্চিত আমি। নিশ্চয়ই আপনি এখনই এসে পড়বেন ? ঠিক আছে জনাব, ফোন ছাড়ছি। সালাম, শুভরাত্রি।’

মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে রিসিভারটা ক্রেডেলে রাখলো ডেভিড। লক্ষ্যের দিকে তার ধারালো বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা খুবই ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে। Ñ কোনো ত্রæটি-বিচ্যুতি নজরে পড়ছে না। শেষ পর্যন্ত দেখা যাক কি হয়।

হঠাৎই হলঘরে নেলসন প্রবেশ করলো। তার চোখ মুখ উ™£ান্তÑ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখমÐল, ঠোঁট দুটো কাঁপছে, আতঙ্কে চোখ বিস্ফারিত। পাগলের প্রলাপের মতো সে বলতে লাগলÑ ‘মিস্টার মায়ার, মিস্টার মায়ারÑ মানে আমি, সরকারি ঘোষণায় বলছে মিস্টার এডওয়ার্ড বার্টনÑ’

‘Ñ ওঃ আস্তে কথা বলো নেলসন।’ মায়ার ধমকে ওঠে : ‘সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলো কী বলতে চাও তুমি ? হয়েছেটা কী?’

‘Ñ হুজুর সরকারি বেতার ঘোষণায় বারবার বলছে যেÑ মানে আমি নিজের কানেই দু’বার শুনেছি, Ñ জেলপলাতক আসামিরা মিস্টার এডওয়ার্ড বার্টনকে রাস্তায় হত্যা করেছে। সময়টা রাত এগারোটা পঁচিশ।’

ভাষাহীন, লাশের চোখের মতো মায়ারের দৃষ্টি। সে যেন অন্য মানুষে পরিণত হয়েছে। নেলসন বেশ জোর গলায় বলেই চলেছে : ‘হ্যাঁ স্যার, এই বাড়ি থেকে বিদায় নেবার কুড়ি মিনিটের মাথায় তাকে খুন করা হয়। সকলেরই ধারণা খুনটা করেছে ওই কয়েদির দল। খুনের জায়গাটা এখান থেকে আট-ন’ মাইল দূরেÑ অর্থাৎ রাস্তাটা যেখানে মোড় নিয়েছে, সেখানে। একটা ভালো খবর আছে স্যার, খুনটা করে ওরা পালাতে পারেনি। সবকটি দুর্বৃত্তই ধরা পড়েছে। সবকটা শয়তান পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। তাহলে, খুনি চিনতে আপনার ভুল হয়নি তো স্যার ?’

নেলসন কী বকে গেল তার একবর্ণও না বুঝলেওÑ একথা ঠিকই বুঝতে পারলো ; যখন সে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছিল, নেলসন তার সব কথা শুনেছে।

নেশাগ্রস্ত মাতালের মতো সে আস্ত আস্ত এগিয়ে যায় পেছনের দরজার দিকে। বারান্দায়। নোরার মৃতদেহ যেখানে পড়ে আছেÑ তার দুরবস্থা দেখে নোরার মৃতমুখ যেন ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের হাসি হাসছে!

Ñ হায়রে পিশাচী-প্রেম !Ñ হায়রে বিধ্বংসী মরণ !Ñ হায়রে মিথুনবিলাসী অঙ্কশায়িনী !

ডেভিড হারবার্ট লরেন্স

[১৮৮৫-১৯৩০]

তাঁর মা ছিলেন গোঁড়া

নিষ্ঠাবতী

ক্যাথলিক ও স্কুল শিক্ষিকা, বাবা কয়লা খনির শ্রমিক এবং মদ্যপ। ডি এইচ লরেন্সের জন্ম ১৮৮৫ সালে। শৈশব থেকেই তিনি অসুখী। অত্যাচারী বাবা কট্টর ক্যাথলিক ধর্মের সমর্থক মায়ের কারণে নারকীয়-অস্বস্তিকর পরিবেশে তিনি মানুষ হন।

বিংশ শতাব্দীর শিল্প উন্নত সমাজের ঘোর বিরোধী ডি এইচ লরেন্স ছিলেন আদিম ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী।

নিদারুণ আর্থিক অনটন ও য²া রোগাক্রান্ত হওয়া সত্তে¡ও তিনি পৃথিবীর প্রায় সবকটি মহাদেশই ভ্রমণ করেছেন।

নাটক ছাড়া, সাহিত্যের প্রতিটি শাখা অর্থাৎ কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনি রচনায় তিনি অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। মূলত কবি ও ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার হিসেবেই লরেন্স বিশ্বখ্যাত। স্বল্পায়ু জীবনে লিখেছেন প্রচুর কিন্তু কখনই দারিদ্র্যের কবল থেকে তিনি মুক্তি পাননি। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে রাজরোগের কারণে ১৯৩০ সালে তিনি দেহ ত্যাগ করেন।

ডি এইচ লরেন্সের জীবদ্দশায় তাঁর রচিত সাহিত্যকর্ম প্রসঙ্গে বিরূপ সমালোচনা ও তুমুল বিতর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছিল। লেখায় অপরিমিত যৌনতা এবং অশ্লীলতার উপস্থিতির দোষে লরেন্স অভিযুক্ত হয়েছিলেন। সে-কারণেই তাঁর রচিত উপন্যাসÑ ‘লেডি চ্যাটারলিস লাভ’ বহু বছর নিষিদ্ধ ছিল। লরেন্সের মৃত্যুর প্রায় দু’যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর উপন্যাসটি প্রকাশের আইনগত অনুমতি দেওয়া হয়।

ডি এইচ লরেন্স রচিত সাহিত্য সম্পর্কে যতই নেতিবাচক সমালোচনা করা হোক না কেনÑ তাঁর মতো প্রতিভা সবদেশে সর্বকালেই দুর্লভ। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মতো সংস্কার প্রধান দেশে লরেন্সের ন্যায় অনুসন্ধিৎসু চিত্ত বিগত কয়েকশ’ বছরে দেখা গেছে কিনা তা গবেষণার বিষয়।

ডেভিড হারবার্ট লরেন্স নমস্য : এই কারণে যে, বলিষ্ঠ কাব্য প্রতিভা ও সুনিপুণ লিপি কৌশলে প্রখর ক্ষমতাধর হয়েও আপাত খ্যাতির পথ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে সত্যের অপ্রিয় অšে¦ষণে নেমেছিলেন। এবং তাঁর দার্শনিক মতামত হেসে উড়িয়ে দেওয়া বাতুলতা। লরেন্সের মনস্তত্তে¡র মানবীয় সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হচ্ছে শরীর। কারিগরি সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদা ভুলে গিয়ে মানুষ জগৎকে করে তুলেছে দুঃস্থ ও দুর্নীতিময়।

সঙ্গত কারণেই ডি এইচ লরেন্সের যৌন-বোধ ও বোধি অন্যান্য সাহিত্য রথী- মহারথীদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। তিনি যাজকের নিষ্ঠায়, সন্তের মতো যৌন দেবতার উপাসনায় নিবেদিত। যৌনতা তাঁর কাছে কেবল জৈবিক তাগিদ ছিল না, Ñ লরেন্সের মতে যৌনতা হচ্ছে নর-নারীর স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত, পবিত্র প্রবৃত্তি, জন্মগত আবেগ ও অধিকার এবং মুক্তি আস্বাদÑ যা ঈশ্বর সমতুল্য।

খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক মিডলটন মারি লিখেছেন : খধৎিবহপব বয়ঁধষ ংবী রিঃয এড়ফ. ঞযব ংবীঁধষ ঁহরড়হ ড়ভ ঃড়ি নড়ফরবং, সধষব ধহফ ভবসধষব রং হড়ঃ ধ ংরহভঁষ ড়ৎফবধষ ড়ভ ংঁভভবৎরহম- নঁঃ ধহ বীঢ়বৎরবহপব ড়ভ ষরনবৎধঃরড়হ, ধ ঢ়ৎরসধষ বীঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ বপংঃধংু, খধৎিবহপব’ং ধঃঃরঃঁফব ঃড়ধিৎফং ংবী ধিং ঁহয়ঁবংঃরড়হধনষু সড়ৎধষ.

বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের সঙ্গে একবিংশ শতকের প্রথম দু’দশকের ফারাকটা সমুদ্র সমান। যে যন্ত্রসভ্যতা বা প্রযুক্তির প্রতি ডি এইচ লরেন্সের ছিল প্রবল অনীহা, সেই যন্ত্রসভ্যতার অনিবার্য প্রসার গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করেছেÑ করবে। কিন্তু সাহিত্যরস আর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠা একেবারেই ভিন্ন বস্তু।

‘চিরায়ত সাহিত্য ঘরানা’Ñ লরেন্সের সৃজনশীল সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য : Ñ যার একটা নিজস্ব মূল্য আছে, দৈনন্দিন বাজারি দরদামের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। জীবিতকালে লেখার মাধ্যমে লরেন্স প্রচলিত নৈতিকতা বা নীতিভ্রষ্ট হয়েছিলেন কি না তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ক্ষণিকের তরেও তিনি সত্যভ্রষ্ট হননি। সে জন্যেই সাতশো বছরেরও বেশি প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে ডেভিড হারবার্ট লরেন্সের কাব্য ও কথাশিল্প রসবিচারে নিঃসন্দেহে ধ্রæপদী সাহিত্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। হ

[মূল গল্পের নাম : ঞযব জধাধমব-খড়াব] হ

লেখক : কথাসাহিত্যিক

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY LatestNews