1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
মোট আক্রান্ত

১৬২,৪১৭

সুস্থ

৭২,৬২৫

মৃত্যু

২,০৫২

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • চট্টগ্রাম ৮,০৩৫
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৩২৩
  • কুমিল্লা ৩,৮৬৪
  • ঢাকা ৩,৩১৭
  • বগুড়া ৩,৩০৭
  • গাজীপুর ৩,২৭০
  • সিলেট ২,৭৩৪
  • কক্সবাজার ২,৫০৬
  • ফরিদপুর ২,৪৪৪
  • নোয়াখালী ২,২৬৪
  • মুন্সিগঞ্জ ১,৯৪৪
  • ময়মনসিংহ ১,৮৮৯
  • খুলনা ১,৭৮৬
  • বরিশাল ১,৫৫৭
  • নরসিংদী ১,২৮০
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • কিশোরগঞ্জ ১,০৮৩
  • চাঁদপুর ১,০৩৫
  • রংপুর ৯৮৩
  • লক্ষ্মীপুর ৯৭৪
  • সুনামগঞ্জ ৯৫৯
  • মাদারীপুর ৮৩২
  • গোপালগঞ্জ ৭৯৯
  • ফেনী ৭৮৬
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৭৩৩
  • দিনাজপুর ৬৭৫
  • টাঙ্গাইল ৬৬৯
  • শরীয়তপুর ৬৬৮
  • পটুয়াখালী ৬৩১
  • সিরাজগঞ্জ ৬২৭
  • হবিগঞ্জ ৬০৫
  • মানিকগঞ্জ ৬০৩
  • রাজবাড়ী ৫৬৩
  • নওগাঁ ৫৫৯
  • যশোর ৫৫৫
  • জামালপুর ৫৪২
  • কুষ্টিয়া ৫৩৫
  • নেত্রকোণা ৫৩৪
  • জয়পুরহাট ৪৫৪
  • পাবনা ৪৪৭
  • মৌলভীবাজার ৪১৪
  • নীলফামারী ৩৫৩
  • বান্দরবান ৩১২
  • ভোলা ৩০৩
  • গাইবান্ধা ২৮৮
  • রাঙ্গামাটি ২৫৬
  • শেরপুর ২৪৯
  • বরগুনা ২৪৬
  • নাটোর ২৪৪
  • খাগড়াছড়ি ২৩৭
  • পিরোজপুর ২১৪
  • চুয়াডাঙ্গা ২১২
  • ঠাকুরগাঁও ২০৬
  • ঝালকাঠি ১৯৩
  • বাগেরহাট ১৬৬
  • ঝিনাইদহ ১৬৫
  • সাতক্ষীরা ১৫৯
  • নড়াইল ১৫৩
  • কুড়িগ্রাম ১৪৯
  • পঞ্চগড় ১৪৬
  • লালমনিরহাট ১২৬
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১০১
  • মাগুরা ৯৭
  • মেহেরপুর ৫৯
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

নীরমহলের নির্মল বাতাস -ইকবাল খোরশেদ

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১৮
  • ১৭৮২ বার ভিউ করা হয়েছে

গত বছরের ডিসেম্বরে আগরতলা গিয়েছিলাম একটি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশনের জন্য। সঙ্গী ছিলেন আবৃত্তিশিল্পী কাজী মাহতাব সুমন, মনির হোসেন ও মনির হোসেনপুত্র ছোট্ট শান বাবু। সকালে কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ‘মহানগর প্রভাতী’তে উঠলাম সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। ১১টায় আখাউড়া স্টেশনে পৌঁছে নাস্তা করে বর্ডারের উদ্দেশে যাত্রাÑ ইমিগ্রেশন শেষ করে যখন আগরতলা শহরে ঢুকি তখন দুপুর একটা। এই প্রথম আমার আগরতলা ভ্রমণ। আগরতলা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী। এ-রাজ্যের উত্তরে, দক্ষিণে এবং পশ্চিমে বাংলাদেশের সীমান্ত, পূর্ব দিকে আছে ভারতের মিজোরাম আর আসাম রাজ্য। ছোট্ট ছিমছাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, গোছানো শহর। গগণচুম্বী বড়ো বড়ো দালানকোঠা নেইÑ নেই আলোর ঝলকানি, রাস্তায় যানজট নেই, গাড়ির হর্নের কান ঝালাপালা শব্দ নেই। দেখেই বেশ ভালো লাগল। মনে মনে ভাবলাম, একটা ভুল হয়ে গেলÑ অমিয়া [আমার একমাত্র মেয়ে] এবং ওর মা রূপাকেও সঙ্গে নিয়ে আসলেই পারতাম। দু’দিন বেড়িয়ে যেতে পারত। পরক্ষণেই ভাবলামÑ কাছেই তো, আবার আসা যাবে কোনো একদিন।

আগরতলা থেকে ফিরে এসে ওদের বললাম, ওরাও সানন্দে রাজি, যাবে আগরতলা। যাওয়ার জন্য উপযুক্ত দিন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনজনের একই সময়ে ছুটি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকে জানা গেল, ২৭ তারিখ থেকে ৫ মে পর্যন্ত সাপ্তাহিক ছুটি, বৌদ্ধপূর্ণিমা, মে-দিবস, ও শব-ই-বরাত মিলে বেশ একটা লম্বা ছুটি পাওয়া যাবে স্কুলে, মাঝে ৩০ এপ্রিল এবং ৩ মে খোলা। ভাবলাম এই সুযোগÑ ৩০ এপ্রিল বা ৩ মে যেকোনো একদিন ছুটি নিলেই তিন-চার দিনের জন্য আগরতলা থেকে ঘুরে আসা যায়। ভারতীয় ভিসা আমাদের তিন জনেরই আছে এক বছরের। অমিয়া ও রূপার পাসপোর্ট খুলে দেখা গেল, ওদের পাসপোর্টের মেয়াদ আছে চার মাস ; ছয় মাস মেয়াদ না থাকলে ইমিগ্রেশন হয় না। তড়িঘড়ি করে পাসপোর্ট রিনিউ করার জন্য দেওয়া হলোÑ জানা গেল পাওয়া যাবে ২৩ এপ্রিল। সিদ্ধান্ত হলো আমরা ৩০ এপ্রিল যাব। এবার ট্রেনের টিকিট করার পালা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ৩০ এপ্রিল ১ মে, ২ মে, ৩ মে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা সিলেটগামী যে-সব ট্রেন আখাউড়া বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থামে সে-সব কোনো ট্রেনেই কোনো শ্রেণির কোনো টিকিট নেই। এখন কী করাÑ মন খারাপ হয়ে গেল অমিয়ার, সেইসঙ্গে আমারও, রূপারটা বোঝা গেল না। একজন বলল, কমলাপুর থেকে আখাউড়া পর্যন্তÑ বিআরটিসি বাস সার্ভিস আছেÑ এসি বাস। খোঁজ নিয়ে জানা গেলÑ বিআরটিসি সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছেÑ তবে অন্যান্য বাস আছেÑ কমলাপুর থেকেই ছাড়ে, প্রতি কুড়ি মিনিট অন্তর অন্তর। ঠিক হলো, বাসেই যাব ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত। অনুজপ্রতিম আবৃত্তিশিল্পী আহসান উল্লাহ তমাল, ও প্রায় নিয়মিত আগরতলা যাতায়াত করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য। শুনে বলল, বাসে যেতে পারেন তবে রাস্তা ভালো নয় ; আড়াই ঘণ্টার যাত্রা ৫ থেকে ৭ ঘণ্টাও লেগে যেতে পারে। শুনে প্রমাদ গুণলাম।

এরই মাঝে আগরতলার বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব অমিত ভৌমিক আমন্ত্রণ জানালেন তার ‘ত্রিপুরা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ’র অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য ৩০ এপ্রিলে। ভাবলাম বাহ, বেশ হয়Ñ কী করে যেন দিন তারিখ মিলে গেল। কুমিল্লা থেকে কাজী মাহতাব সুমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মনির হোসেনও যাবেন ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। এতো দেখছি ‘মেঘ না চাইতেই জল’। খবরটা বাসায় বলার পর ওরাও বেশ খুশি হলো। আমরা যখন এমন খুশি বিধাতা তখন ক্রুরহাসি হাসছিলেন। কেন ? বলছি সে-কথাও।

বাংলাদেশ পাসপোর্ট অফিসের নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট রেডি হলে মুঠোফোনে বার্তা আসে। রূপা ও অমিয়ার পাসপোর্ট দেওয়ার কথা ২৩ এপ্রিল, নিয়মানুযায়ী ২২ এপ্রিল বার্তা আসার কথাÑ কিন্তু বার্তা এলো না। ভাবলাম কোনো কারণে হয়ত একদিন দেরি হচ্ছেÑ ২৩ তারিখ নিশ্চয়ই বার্তা আসবে। না, এলো না। ২৪ তারিখে আমি গেলাম আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে। খবর নিয়ে জানতে পারলাম পাসপোর্ট দুটি প্রিন্টে আছেÑ কবে দেবে তা তারা বলতে পারছে নাÑ হায়রে বাংলাদেশ ! আমার পরিচয় দিয়ে পরিচালকের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তাড়াতাড়ি যেন পাসপোর্ট পাই সে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেন। ২৫ তারিখে বার্তা এলো না, ২৬ তারিখ সন্ধ্যা নাগাদও না। ২৭, ২৮ তারিখ সাপ্তাহিক আর ২৯ তারিখে  বৌদ্ধপূর্ণিমার মোট তিনদিন ছুটি, টানা । মাঝখানে ৩০ তারিখ খোলা তারপর আবার ১ তারিখ পয়লা মে’র ছুটি। যাওয়া বোধ হয় হলো না এবার ! ২৬ তারিখ বৃহস্পতিবার পড়ন্তবেলায় কিছুটা মন খারাপ করে বসে আছিÑ সহকর্মী কাজী ইসরাইল পিরু বললেন, পাসপোর্ট ডেলিভারি ¯িøপের নিচে একটা নাম্বার আছেÑ ওই নাম্বারে মেসেজ পাঠালে আপনাকে ফিরতি মেসেজে জানিয়ে দেবে, পাসপোর্ট রেডি হয়েছে কি না ! পাঠালাম মেসেজ। কয়েক মিনিট পর ফিরতি মেসেজ এলো পাসপোর্ট রেডি। কিন্তু তখন তো সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছেÑ পাঁচটায় পাসপোর্ট অফিস ছুটি হয়ে যায়।

৩০ এপ্রিল সকালে কাজী মাহতাব সুমন আর মনির হোসেন আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা করল। আমরা ছুটলাম আগারগাঁওয়ে পাসপোর্ট অফিসে। ওরা যোগাযোগ করল আমার সঙ্গে। আমি ওদের জানালাম আজ তো যেতে পারলাম না। আজ পাসপোর্ট তুলব, ডলার অ্যান্ড্রোস করব। আগামীকাল সকালে যাত্রা করব বাসে। মনির জানাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবৃত্তিকর্মী বশির দুলাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমাদের বর্ডারে পৌঁছে দেবে। দুপুর নাগাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুলাল ফোন করল। বলল, ভাই আপনি কোনো অবস্থাতেই বাসে আসবেন না, যেভাবেই পারেন ট্রেনে আসেনÑ যদি অন্য কোনো ট্রেনের টিকিট না পান তবে ‘তিতাস কমিউটারে’ আসেনÑ সাড়ে নয়টায় ছাড়ে কমলাপুর থেকে, লোকাল ট্রেন হলেও সময় মেপে চলে। তিন ঘণ্টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছে যাবেন। আবার টিকিটের খোঁজে পাভেলকে [আনন্দভুবনের অফিসকর্মী] পাঠালাম। অনেক চেষ্টা করল আহসান উল্লাহ তমালও, কিন্তু ট্রেনের টিকিট মিলল না ; কালোবাজারীদের কাছেও না। এদিকে কদিন ধরে বজ্রসহ ধুম বৃষ্টি হচ্ছে সারাদেশে। বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটছে প্রতিদিনÑ এমন বিরূপ আবহাওয়া থাকলে যাব কেমন করে ! তা ছাড়া বাংলাদেশ এবং ত্রিপুরার দূরত্ব সামান্য তাই আবহাওয়া দুদেশে একইরকম থাকে। ওখানে গিয়ে যদি দেখি বৃষ্টিবাদল হচ্ছে, তা হলে তো বেড়ানোর আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।

যাক, পরদিন [১ মে ২০১৮] সকাল আটটায় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালাম। আগের দিন পর্যন্ত ঝড়বৃষ্টি হলেও এদিন প্রকৃতি আমাদের সহায়তা করল, মেঘমুক্ত ঝকঝকে আকাশ। স্টেশনে পৌঁছে দেখি ‘তিতাস কমিউটার’ ট্রেনের টিকিট কাউন্টারে অন্তত পাঁচশ’ লোক দাঁড়িয়ে আছে টিকিটের জন্য। এই ব্যুহভেদ করে টিকিট কাটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। স্টেশনের একজন তিনটি টিকিট কিনে দিল কিছু বকশিশের বিনিময়ে। দুইটি আসনসমেত, একটি আসনবিহীন। কামরা নম্বর ‘ঝ’, আসন নম্বর ৬৫-৬৬। ভাবলাম পাশাপাশি আসন হবে নিশ্চয়ই। দু’জনের আসনে ঠেসেঠুসে তিনজন বসে যাওয়া যাবে। সাড়ে নয়টার গাড়ি প্ল্যাপফর্মে ঢুকল সাড়ে দশটায়। হুড়োহুড়ি করে লোক উঠে পড়ল, আমরাও উঠলাম। আসনে বসতে গিয়ে দেখি বিধি বাম, একটি আসন জানালার পাশে অন্যটি বিপরীত দিকে করিডোরের পাশে। জানালার পাশে যে আসন সেটির আবার পেছনে হেলনা দেওয়ার তক্তা নেইÑ ভেঙে গেছে, আমি আর অমিয়া সেটাতে বসলাম। বিপরীত দিকের করিডোরের পাশেরটায় বসল রূপা। গাড়ি ছাড়লÑ কিছু যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকলেও খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না। গাড়ি বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে অনেক যাত্রী উঠল, গাড়িতে আর তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রূপা যে আসনে বসে আছে, সে-আসনটি দুই পাশ থেকে মাঝের দিকে ঢালু। বসতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল বেচারির, আবার বামপাশ থেকে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের চাপও তাকে সামলাতে হচ্ছিল। এরই মাঝে গাড়ি পৌঁছে গেছে টঙ্গী। ওরকম ভিড়ের মধ্যে আরো যাত্রী উঠল গাড়িতে। দেখলাম বোরকার সঙ্গে হাত-মোজা পা-মোজা পরা কয়েকজন নারী ওপরের লাগেজ-ক্যারিয়ার ধরে ঝুলে থাকা যাত্রীদের পেটে কনই মেরে, বগলের তলা দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে ওই অসম্ভব ভিড়ের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নিলÑ আমি যুগপৎ বিস্মিত ও হতবাক ! দুজন কিশোরী ও দুটি ৭-৮ বছরের শিশুসহ এক দম্পতি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গা-ঘেঁসে। শিশুগুলো কাঁদছে, ভিড়ে গরমে মানুষের ঠাসা খেয়ে। কারুরই কিছু করার নেই। সড়কপথ খারাপ, ট্রেনে নামমাত্র ভাড়ায় যাওয়া যায় বলে নরসিংদী, ঘোড়াশাল, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকেরা ট্রেনে যাতায়াত করে। এ-ট্রেনে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাড়া মাত্র ৬০ টাকা, নরসিংদী আসার পর গাড়ি মোটামুটি ফাঁকা, দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশই নেমে গেছে। আমরা টঙ্গীতে থাকাকালীনই আমার মুঠোফোনে একটা ক্ষুদে বার্তা এলোÑ উত্তম ০১৭… । পাঠিয়েছে বশির দুলাল। বুঝতে না পেরে দুলালকে কল করলাম। দুলাল জানালো, তাঁর স্ত্রীর আকস্মিক অসুস্থতার কারণে তাকে হঠাৎই ঢাকা চলে আসতে হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উত্তম আমাদের সঙ্গে থাকবে। বেলা দুইটা নাগাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে পৌঁছালো ‘তিতাস কমিউটার’। নেমেই উত্তমকে ফোন করলাম, এক মিনিটের মধ্যে মেরুন রঙের শাট পরা সুদর্শন চৌকশ তিতাস গ্যাস ফিল্ড স্কুলের শিক্ষক, আবৃত্তিকর্মী উত্তম কুমার দাস আমাদের সামনে হাজির হলো হাসিমুখে। অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে উত্তম আমাদের সঙ্গ দিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্ন ভোজন করালো। তারপর একটা সিএনজি অটোরিকশায় করে বর্ডারে নিয়ে গেল। কাস্টমস ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে ফেলল উত্তম পনের মিনিটে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল সেখানকার কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন অফিসারদের সঙ্গে। যেন ফেরার সময় তারা আমাকে সহযোগিতা করেন। একেবারে জিরো পয়েন্টে পৌঁছে দিয়ে উত্তম বিদায় নিল। আমাদের ঢাকায় ফেরার জন্য ৪ মে তারিখের টিকিট কেটে মনির হোসেন উত্তমের কাছে রেখে গিয়েছিল। অনেক সাধাসাধির পরও উত্তম টিকিটের টাকা বা তার বর্ডার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরে যাওয়ার খরচাটা নিল না। উল্টো খাওয়া দাওয়াসহ অন্যান্য খরচাপাতি সে-ই সানন্দে করতে চাইল, অনেকটা করলও।

আগরতলা শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে তিন তারকা মানের ‘হোটেল ওয়েলকাম প্যালেসে’ আমাদের জন্য রুম বুক করে রেখেছিলেন অমিত ভৌমিক। ভারতীয় ইমিগ্রেশন শেষ করে আমরা যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন বিকাল পাঁচটা। আমাদের পৌঁছার খবর পেয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সুমন আর মনির এসে হাজির। ওদের আজ বাংলাদেশে ফিরে যাবার কথা ছিল, কিন্তু আমাদের জন্য রয়ে গেল। ওরা খবর দিল, সন্ধ্যায় অমিত ভৌমিক আসবেন স্ত্রী আবৃত্তিকার শাওলী রায় এবং একমাত্র কন্যা আরাত্রিকাকে নিয়ে, তারা আরো খবর জানালো, বাংলাদেশের ‘৭১ টেলিভিশন’র সাংবাদিক শিল্পী মহলানবীশ অবস্থান করছেন আগরতলায়Ñ মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছেন তিনি। আমাদের যাবার খবর পেয়ে তিনিও আসবেন সন্ধ্যায়।

সন্ধ্যায় একে একে সবাই এলেন। আমরা পাশেই বিগ বাজার সংলগ্ন একটি অভিজাত ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিলামÑ স্যুপ, স্ন্যাকস, চা-কফিসহ। বলাই বাহুল্য, সান্ধ্যভোজনের খরচ দিলেন সদাহ্যাসোজ্জ্বল অমিত ভৌমিক। প্রায় তিন ঘণ্টার আড্ডা শেষে আসর ভাঙল। অমিয়া আর আরাত্রিকা মুহূর্তে বন্ধু হয়ে গেল। ছাড়তেই চায় না একে অন্যেকে। অবশেষে যে-যার ডেরায় ফিরে গেল। সুমন-মনির পরদিন সকালে বাংলাদেশে চলে যাবে। এরই মাঝে অমিত ভৌমিক ‘নিউজ ভ্যানগার্ড’ চ্যানেলে ‘কথায় সুরে জমজমাট সকাল’ অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশনের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। শর্বাণী দাস দত্তের মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় ‘কথায় সুরে জমজমাট সকাল’ অনুষ্ঠানে সেদিন সকালে আমি আবৃত্তি করলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বুদ্ধদেব বসু ও শামসুর রাহমানের মোট পাঁচটি কবিতা। অনুষ্ঠানে মেঘালয়ের সংগীতশিল্পী রাজশ্রী নাথ গান পরিবেশন করেন। রাজশ্রী নাথ যে-ক’টি গান করলেন তার মধ্যে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটিও ছিল। বুঝলাম, ভারতজুড়ে বাংলাভাষীদের মধ্যে এ-গানটি খুব জনপ্রিয়। একটা কথা বলে রাখি, আবৃত্তিকার হিসেবে আমার দুর্বলতা হলো, আমি কবিতা স্মৃতি থেকে বলতে পারি না। সঙ্গে কোনো বই নিয়ে যাইনি। শুনে চিন্তামুক্ত করলেন অমিতদা ; সকালে শাওলী বৌদির কাছ থেকে চারটি কবিতার সংকলন নিয়ে হোটেলে হাজির হলেন। তার স্কুটারে চাপিয়ে আমাকে নিয়ে গেলেন ‘নিউজ ভ্যানগার্ড’ স্টুডিওতে। পুরো দেড় ঘণ্টা সময় সেখানে বসে রইলেন, অনুষ্ঠান শেষে আমাকে পুনরায় হোটেলে পৌঁছে দেবেন বলেÑ অথচ দূরত্ব মাত্র তিন মিনিটের।

আগের দিনের ভ্রমণের ধকলে অমিয়া বোধ হয় একটু বেশিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, ঘুম থেকে উঠল বেলা করে। নাস্তা করে আমরা বেরুলাম কিছু কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। আগেই বলেছি, হোটেল ওয়েলকাম প্যালেস একেবারে আগরতলা শহরের মাঝখানে। চৌরাস্তার মুখে। এটিকে বলে ‘পোস্টাফিস’ চৌরাস্তা। এই গোলচক্করের একপাশে পুলিশ স্টেশন, এক পাশে কংগ্রেসের কার্যালয়, কংগ্রেস কার্যালয়ের পাশে ভারতের অন্যতম চেইন শপ বিগ বাজার ও প্যান্টালুন, অন্য পাশে হোটেল ওয়েলকাম প্যালেস। ওয়েলকাম প্যালেসের পাশে হকার্স মার্কেট। তার থেকে কয়েক গজ এগিয়ে গেলে সূর্য চৌমুহনী। সূর্য চৌমুহনীর ওখানে শ্রীলেদার্স’র শো-রুম। শ্রীলেদার্স’র জুতো-স্যান্ডেল আমাদের তিনজনের পছন্দের শীর্ষে। আমরা কলকাতা গেলে শ্রীলেদার্স থেকে দুই/তিন জোড়া করে জুতা-স্যান্ডেল কিনে আনি। টেকসই জুতোগুলো মূল্যসাশ্রয়ী। কলকাতা শ্রীলেদার্স থেকে ৬০০ রুপিতে কেনা একজোড়া জুতা আমি গত তিন বছর ধরে পরছি। সেই লোভে প্রথমেই গিয়ে ঢুকি শ্রীলেদার্সে। কিন্তু ঢুকেই ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যাই। কলকাতার তুলনায় আগরতলা শ্রীলেদার্স নিতান্তই শ্রীহীনÑ প্রায় কিছুই নেই বললে চলে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ট্রেনে দুদিন লাগে ত্রিপুরা পৌঁছাতেÑ সম্ভবত সে-কারণে খুব বেশি পণ্য তারা সংগ্রহ করতে পারে না। আমি জুতা-স্যান্ডেল কিছুই পেলাম না পছন্দ করার মতো। অমিয়ারও একই অবস্থা, রূপা কোনোরকমে এক জোড়া কিনতে পারল। শ্রীলেদার্স থেকে বেরিয়ে হকার্স মার্কেটে একটু ঢু মেরে আমরা গিয়ে ঢুকলাম বিগ বাজারে। এখানে সবই আছে তবে সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটানো কঠিন। প্রায় পুরোটা দিন বিগ বাজারে কেটে গেলÑ কেনা হলো কেবল কিছু টয়লেটট্রিজ পণ্য। বিশাল শপিং মলের এ-মাথা থেকে ওমাথা, একতলা দোতলা ঘুরে যখন সেখান থেকে বের হলাম, তখন আমরা পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত। ঘাড়ির কাঁটায় বেলা তিনটা। সামান্য হেঁটে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য গেলাম ‘আদি শঙ্কর’-এ। ‘আদি শঙ্কর’ এখানকার খুব নামকরা বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্ট। সিরামিক্সের বাসনে কলা পাতায় খেতে দেয়। খুব যতœ করে বালতিতে বয়ে এনে ভাত-ডাল বেড়ে খাওয়ায়। নামে আদি শঙ্কর হলেও দামে একেবারে আধুনিক। তিনজন খেলাম প্রায় এক হাজার রুপি খরচ করেÑ ভাত, আলু-করলা ভাজা, ডাল, মুরগি আর খাসির মাংস। তবে মুরগি আর খাসির মাংস এত পরিমাণে ছিল যে, অনেকটই ফেলে আসতে হলো। পরিমাণের ধারণা ছিল না বলে আমরা বুঝতে পারিনি যতটা দেবে ততটা আমরা খেতে পারব কি-না। সেখান থেকে বের হয়ে খবর নিয়ে জানলাম ত্রিপুরার রাজপ্রাসাদ বর্তমান জাদুঘরে দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারে চারটা পর্যন্ত। পাঁচটায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাই আর যাওয়া হলো না রাজপ্রাসাদ পরিদর্শনে। ফিরে গেলাম হোটেলে। সন্ধ্যার কিছু পরে অমিতদা, শাওলী বৌদি আর আরাত্রিকা এলোÑ উদ্দেশ্য আমাদের নৈশভোজনে নিয়ে যাবেন স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে। ওয়েলকাম প্যালেসের যে-রেস্টুরেন্ট আছে সেখানে এক কাপ রং-চায়ের দাম চল্লিশ রুপি, দুধ-চা হলে ৬০ রুপি, বুঝুন অবস্থা। নেহাৎ না ঠেকলে অথবা বিনা কষ্টের অঢেল উপার্জন থাকলেই কেবল সেখানে খাওয়া চলে। যাক, কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে আমরা গেলাম ভোজনে। ভোজন শেষে আমার সঙ্গে থাকা ‘কবিতা ও আবৃত্তির কথা’ বইটি উপহার দিলাম শাওলী বৌদিকে। অমিতদা তার ৩০-এ এপ্রিলের অনুষ্ঠানের স্মারক ও উত্তরীয় তুলে দিলেন আমার হাতে আর গলায়। অমিয়া আর আরাত্রিকা গল্পে মেতে উঠল। পরদিন সকালে আমাদের যাওয়ার কথা মেলাঘরে ত্রিপুরার রাজার গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কেন্দ্র ‘নীরমহল’ এবং সিপাহী জোলা চিড়িয়াখানা দেখার জন্য। আগেই গাড়ি ঠিক করে রেখেছেন অমিতদা। সকাল নয়টায় বেরিয়ে পড়তে হবে। নৈশভোজ শেষ করতে করতে রাত প্রায় বারোটা। অমিয়া আরাত্রিকা কেউ কাউকে ছাড়তে চায় না। বললাম, কাল আপনারাও চলুন আমাদের সঙ্গে, কিন্তু বললেই তো হয় নাÑ কাজকর্ম আছে, অফিস আছে, আরাত্রিকার স্কুল আছেÑ ওদের তো আর শব-ই-বরাতের ছুটি নেই। শেষে ঠিক হলো আরাত্রিকা আমাদের সঙ্গে যাবে, যদি তার ক্লাস টিচার ছুটি দেয়।

হোটেলে ফেরার এক ঘণ্টার মধ্যে অমিতদা ফোনে জানালেন সকালে দেখা হচ্ছে। আরাত্রিকা তো যাচ্ছেই দাদাও যাবেন আমাদের সঙ্গে চিড়িয়াখানা আর নীরমহল দর্শনেÑ আমরা তো মহাখুশি।

সকাল নয়টায় অমিতদা আর আরাত্রিকা এলো। আমরাও তৈরি হয়েছিলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম সিপাহী জোলা ইকো পার্কে। সেখানে পৌঁছে চা খাবোÑ ইকো পার্কের সামনের দোকানগুলোতে চা নেই। আবার কিছুটা পেছনে গেলাম আমরা, গ্রামের একটি দোকানে চা খেলাম। সদ্য গাছ থেকে পাড়া একটি কচি শশা খেল রূপা। তারপর ঢুকলাম চিড়িয়াখানায়। প্রায় দেড়ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে দেখতে পেলাম দুটি সিংহ, একটি চিতাবাঘ, কিছু চশমা বানরÑ দুর্লভ এই বানর নাকি কেবল সিপাহী জোলাতেই আছে ; দুর্লভ ইমু পাখিসহ আরো কিছু পাখি আর একটা উল্লুক। সিপাহী জোলা থেকে বেরিয়ে আমরা যাত্রা করলাম মেলাঘরের উদ্দেশেÑ সেখানে রুদ্র সাগরের মাঝখানে ত্রিপুরারাজের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কেন্দ্র নীরমহল দর্শনে। ঘণ্টাখানেক পর আমরা পৌঁছালাম মেলাঘর। মেলাঘরে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে আমার একটা বিশেষ অনুভূতি হলো। এই সেই মেলাঘরÑ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের দুই নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার্স ছিল এখানে। মেজর হায়দার, সাফায়াত জামিল, রুমি, বাদল, আলম, স্বপন, বদি, গাজী প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং সেন্টার। সেই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি আমি। মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম মেলাঘরবাসীকে, ত্রিপুরা রাজ্যসরকারকে, তৎকালীন ভারত সরকার এবং সরকারপ্রধান ইন্দিরা গান্ধীকে।

এবার নীরমহল দেখার পালা। নীর অর্থ জল, মহল অর্থ ভবনÑ নীরমহল অর্থ জলের মধ্যে ভবন। মেলাঘরের একপ্রান্তে রুদ্রসাগর নামে পাঁচ দশমিক তিন বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল জলাশয়ের মাঝখানে ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক বাহাদুর এই ভবনটি নির্মাণ করেন। ইংল্যান্ডের ‘মার্টিন অ্যান্ড বার্ন’ কোম্পানি ১৯৩০ সালে এই প্রাসাদ নির্মাণের কাজ শুরু করে এবং শেষ করে ১৯৩৮ সালে। প্রাসাদের দুটি অংশÑ মূল অংশ পশ্চিমপাশে এবং তার পাশে নিরাপত্তাবাহিনীর দুর্গ। মূল অংশ আবার দুভাগে বিভক্তÑ বাহিরমহল ও অন্দরমহল। বাইরের দিকে বিশ্রামঘর, খাজাঞ্চিখানা, নাচঘর, ও দরবার হল। এছাড়াও দাবা খেলার জন্য একটি আলাদা ঘর। রানি ও অন্যদের জন্য অন্দরমহলে রয়েছে পাঁচটি ঘর। এছাড়াও রান্না ঘর, দাসিদের জন্য থাকবার ঘর তো রয়েছেই। মহলের ভেতরে একটি বাগানও আছে। মূল মহলটি এমনভাবে বানানো যে, রাজা-রানি নৌভ্রমণ শেষ করে নৌকা থেকে সরাসরি অন্দরমহলের সিঁড়িতে পা রাখতে পারতেন। বাইরের দিকে আছে দুটি ঘাটÑ প্রহরীদের গোসল করা এবং যাতায়াতের জন্য। রাজা-রানির বেড়ানোর জন্য ঘাটে সবসময় নৌকা বাঁধা থাকত। মহারাজা কিশোর মানিক বাহাদুর মাত্র সাত বছর নীরমহলে অবকাশ যাপন করতে পেরেছিলেন। বর্তমানে ভবনটি ত্রিপুরার তথ্য সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে সংরক্ষিত। প্রতিদিন শত শত লোক এটি দেখতে আসে। নীরমহলে উঠে বারান্দায় দাঁড়ানো মাত্র শীতল বাতাসে আমাদের দেহ-মন প্রশান্তিতে ভরে উঠল। বুঝলাম, রাজা কিশোর মানিক বাহাদুর কেন গ্রীষ্মকালীন অবকাশের জন্য রুদ্রসাগরের মাঝখানে এই ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন এখন থেকে প্রায় শত বছর আগে। এখানে ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের একটি অতিথিশালাও আছে, নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে পর্যটকেরা সেখানে রাত্রি যাপন করতে পারেন।

নীরমহল দেখা শেষÑ এবার ফেরার পালা। রুদ্রসাগর থেকে মেলাঘর বাজারে পৌঁছাতে-না-পৌঁছাতেই ঝুম বৃষ্টি। এরই মাঝে আমরা মেলাঘর বাজারে নেমে একটি রেস্টুরেন্টে ভাত-মাছ-সবজি-ডাল দিয়ে পেটভরে খেলাম, ছয়জন, মাত্র ছয়শ’ রুপিতে। ঘণ্টাখানেক পরে বৃষ্টি ধরে এলো। আবার যাত্রা শুরু। টুুকটাক কথাবার্তায় জানতে পারি, আমাদের গাড়ির চালক দেবুর পূর্বপুরুষেরা চাঁদপুরের মানুষ। তিনি আমার কাছে দুর্বোদ্ধ নোয়াখালির ভাষা শুনতে চাইলেন, আমি বললাম, ‘হেদিনগা মুয়াহানজোইন্না হ্যাতারে দেকচি ডুলাত করি ডুল্লার হাগ ব্যাচে।’ তিনি এবং অমিতদা এর বিন্দুবিসর্গ কিছুই বুঝতে পারল না। শেষে আমিই আবার প্রমিত বাংলায় অনুবাদ করে শোনালামÑ ‘সেদিন ঘোর সন্ধ্যাবেলায় তাকে দেখেছি ডালায় ভরে লালশাক বিক্রি করছে।’ এমন নানারকম গল্পগুজবের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে আমাদের গাড়ি এসে থামল বিশ্রামগঞ্জে। এই সেই বিশ্রামগঞ্জ, এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য একটি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে উঠেছিল। সেখানে কবি সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে লুলু [বর্তমান মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল] ও টুলুু সেবিকা হিসেবে কাজ করতেন। বিশ্রামগঞ্জে আমরা মিষ্টি, ডালপুরি আর চা খেলাম। অনেক দিন পরে আসল রসগোল্লার স্বাদ পেলাম।  রাতে আমি অমিতদা, শাওলী বৌদিদের নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করলাম। আবারো দীর্ঘ আড্ডা এবং নৈশভোজ। আলাপে আলাপে জানা গেলÑ অমিতদা’র মায়ের বাড়ি ছিল নোয়াখালির চৌমহনীতে। নোয়াখালির মানুষ দেখলে তিনি খুব খুশি হন। মূলত আগরতলায় বাঙালি যারা আছেন, এরা প্রায় সবাই বাংলাদেশের চাঁদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট নোয়াখালির মানুষ। ১৯৪৭ সাল থেকে এরা বাংলাদেশ ছেড়ে আগরতলায় অভিবাসী হতে শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত।

পরদিন আমাদের ঢাকায় ফেরার কথা। দুপুর সাড়ে বারোটায় আখাউড়া থেকে চট্টলা এক্সপ্রেসে উঠব আমরা। একটু সময় হাতে নিয়েই সকালে বেরিয়ে পড়ি আমরা। ইমিগ্রেশন, কাস্টমস পেরিয়ে সকাল সাড়ে দশটায় আখাউড়া পৌঁছে যাই। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। মনির হোসেনের অনুরোধে সঙ্গ দেওয়ার জন্য চলে এলেন ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ বাবু। এসেই আমাদের সকালের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তারপর স্টেশনে ভিআইপি বিশ্রাম কক্ষ খুলিয়ে সেখানে বসার ব্যবস্থা করলেন। কুলি ঠিক করে দিলেন আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য। আমাদের কামরা হলো ‘ড’, কুলি কিছুতেই বুঝতে পারছিল না ‘ড’ না কি ‘ঢ’, তাকে বোঝানোর জন্য বললাম ‘ডাবের ড’। দুপুর পৌনে একটায় ঘোষণা এলোÑ অল্প কিছুক্ষণেরে মধ্যেই চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ আখাউড়া স্টেশনে পৌঁছবে আর তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। প্রমাদ গুণলাম, শেষ যাত্রার প্রাক্কালে বোধ হয় গাড়িতে উঠতে গিয়ে বৃষ্টিস্নান করতে হবে। আশ্চর্য ব্যাপার ! গাড়ি স্টেশনে ঢুকল আর বৃষ্টিও থেমে গেলÑ বুঝলাম প্রকৃতি বেশ সদয় আমাদের প্রতি। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল অন্য জায়গায়Ñ আমাদের কামরা ‘ড’। কিন্তু সেটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সব কামরার দরজার পাশে লেখা রয়েছে ‘গ’। ডাবের ‘ড’ কোনোটাতেই লেখা নেই। এবার উপায় ? আমরা একবার সামনে একবার পেছনে দৌড়াদৌড়ি করছি, খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটি হলো ‘ড’ চক দিয়ে লিখেছিল রেল কর্তৃপক্ষ, বৃষ্টির তোড়ে সেটি মুছে গেছেÑ শেষে আমাদের কুলি কেমন করে যেন ডাবের ‘ড’ আবিষ্কার করল, জানার অবকাশ পাইনি। তখন গাড়ি প্রায় ছেড়ে দেয় দেয়। ও জানলা দিয়ে লাগেজগুলো গলিয়ে দিল। প্রচÐ ভিড়, আমরা কোনোরকমে ঠেলেঠুলে ভিড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গাড়িতে উঠলাম আর অমনি গাড়ির পরিচালক হুঁইসেল বাজালেন। গাড়ির বেশ ক’টি জানালা ভাঙা ছিল, বৃষ্টির পানি ঢুকে সব আসন ভিজে গেছেÑ এর মাঝেই সবাই বসে আছে। আমরা আমাদের আসন খুঁজছি, চারটি আসন ছিল আমাদেরÑ ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮ ; দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা আমাদের কামরার দরজা থেকে সামনে এগেুতে দিচ্ছে না কিছুতেই। তারা বলছে, সামনে কোথায় যাবেনÑ জায়গা নেই। শেষে যে ভদ্রলোক জানলা দিয়ে আমাদের ব্যাগগুলো নিয়েছিলেন, তিনি আসনের উপর উঠে গলা বাড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, এই যেÑ এখানে আপনাদের সিট, ব্যাগগুলোও আছে আমার কাছে। সম্ভবত তিনি আমাদের প্ল্যাটফর্মে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেছিলেন। কোনোরকমে গিয়ে আমরা আসনে বসলাম। এরই মাঝে ফোন বেজে উঠল। পর্দায় ভেসে উঠল মনির হোসেনের নাম্বার। মনির বলল, আমরা আপনাদের অপেক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছিÑ আবার বৃষ্টি শুরু হলো। কুড়ি মিনিট পরে গাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাল। মনির আর দুলাল বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের জন্যÑ অমিয়া জানলা দিয়ে দেখতে পেয়ে ডাক দিল। দৌড়ে এসে মনির একটি মিষ্টির প্যাকেট দিল অমিয়ার হাতে। বলল, খেয়ে জানাবে কেমন স্বাদ।

সত্যিই খুব সুস্বাদু ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘আদর্শ মিষ্টান্ন ভাÐার’র ছানামুখী।

রেল-কষ্ট ছাড়া আমাদের আগরতলা ভ্রমণ বেশ আনন্দদায়কই ছিলÑ সুমন, মনির, দুলাল, উত্তম, বিশ্বজিৎ, অমিত ভৌমিক, শাওলী রায় আর আরাত্রিকার আন্তরিক আতিথিয়তার কথা কোনোদিন ভুলবার নয়। হ

লেখক : সাংবাদিক, আবৃত্তিশিল্পী, নাট্যকার, গবেষক

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY Justin Shirajul