Home বিশেষ রচনা চলে গেলেন অভিনেতা টেলি সামাদ -ফকির আলমগীর

চলে গেলেন অভিনেতা টেলি সামাদ -ফকির আলমগীর

610
0
SHARE

অবশেষে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে, ভক্ত অনুরাগীদের কাঁদিয়ে পরপারে চলে গেলেন দেশীয় চলচ্চিত্রের অনন্যসাধারণ এক অভিনেতা টেলি সামান। গেল ৬ এপ্রিল শনিবার ১টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। ৬ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করলেও ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা টেলি সামাদ দীর্ঘদিন ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তার বাইপাস সার্জারি হয়। তারপর ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। তারপর থেকে কখনো স্কয়ার হাসপাতাল কখনো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৬ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারি তার মৃত্যুসংবাদ। তখন আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য গঠিত জুরি বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ছবি দেখছিলাম। ছবি দেখা শেষ করে আমরা টেলি সামাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন করি। মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকেই ভাবছিলাম অনেক কথা। বিশেষ করে অভিনয়ের কথা। কথা দিয়ে মানুষের মুখে কত সহজেই হাসি ফোটানো যায়Ñ তার প্রমাণ অনেকবার দিয়েছেন টেলি সামাদ। সংলাপ যেমনই হোক, তার অভিনয়, উপস্থাপনায় পেত ভিন্ন মাত্রা। অভিনয় ছাড়াও কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও দর্শক শ্রোতার মাঝে সাড়া জাগিয়েছিলেন তিনি। ব্যাঙ্গাত্মক ও হাস্যরসের কথা দিয়ে সাজানো তার গল্পগুলো হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন চলচ্চিত্রের সরস বিষয়।

চলচ্চিত্রে একের পর এক গান পরিবেশনের পূর্বে তিনি প্রভাবিত হন আমাদের পপসংগীতে। তাই অভিনেতা টেলি সামাদের সঙ্গে আমার এবং ফিরোজ সাঁইয়ের বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি। টেলি সামাদ আমাদের গাওয়া গানগুলো মঞ্চে পরিবেশন করতে শুরু করেন। ‘ড্যাগেরও ভেতরে’, মানুষ ও কানাইয়া’, ‘স্কুল খুইলাছে’, ‘সাধের লাউ’, ‘স্যামরিপিতি, ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’, ‘নানি গো নানি’সহ অনেক জনপ্রিয় গান সমানতালে মঞ্চে পরিবেশন শুরু করেন। মানুষও বানাইয়া’র প্যারোডি করেন ‘দিওয়ানা বানাইয়া খাইবা আমায় গিল্লা’ ইত্যাদি গানগুলো চলচ্চিত্রে যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছে তেমনি কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে মিলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। গান গাওয়ার জন্যে বিশেষ করে পপ গান গাওয়ার জন্যে মঞ্চে ও টেলিভিশনে তার কদর বেড়ে যায়। কখনো কখনো দেশের বাইরেও তিনি আমাদের সফরসঙ্গী হয়েছেন। এমনি করে তাকে নিয়ে আমার স্মৃতিকাব্যে ভেসে ওঠে অনেক কথা। আমরা তখন দেশে বিদেশে অনেক কমেডিয়ানের সঙ্গে অনুষ্ঠান করলেও, টেলি সামাদ তার আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে আমাদের অনেক কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। আমি এবং ফিরোজ সাঁই যখন সাঁই-ফকির পপ শিল্পীগোষ্ঠী গঠন করি তখন টেলি সামাদ আমাদের সমর্থন জুগিয়েছিলেন। আমার এবং ফিরোজ সাঁইর পক্ষ নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি অনেক ফাইট করেছেন। ১৯৯৫ সালে যখন ফিরোজ সাঁই মারা যান, তখন টেলি সামাদকে আমি কাঁদতে দেখেছি। আজ আমি দু’জনকে হারিয়ে বেদনায় ভারাক্রান্ত। তাই দীর্ঘদিনের বন্ধুসহ শিল্পীকে বিদায় জানাতে ৭ এপ্রিল আমিও ছুটে গিয়েছিলাম বিএফডিসিতে তার তৃতীয় নামাজে জানাজায়। তার পূর্বে আরটিভির আমন্ত্রণে তারকালাপ অনুষ্ঠানে বন্ধু, অভিনেতা, শিল্পী টেলি সামাদ স্মরণে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। যাহোক এফসিডিতে টেলি সামাদকে বিদায় জানালেন তথ্যমন্ত্রীসহ সতীর্থ শিল্পীরা। জানাজার পর তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে টেলি সামাদের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জানাজায় তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, তথ্যসচিব আবদুল মালেক, চিত্রনায়ক ফারুক এমপি, পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নায়ক উজ্জ্বল, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, আলীরাজ, সাইফুদ্দিন আহমেদ, ফরিদ আলী, ড্যানি সিডাক, অমিত হাসান, জায়েদ খান, সম্রাট, অভিনেত্রী অঞ্জনা, নাসরিন, জেসমিন, নাসিরুদ্দিন দিলু, নাদের খান, পরিচালক মুশফিকুর রহমান গুলজার, মনতাজুর রহমান আকবর, হলি, খসরু, নোমান রবিন, কিরণসহ আরো অনেকে। তারপর শ্রদ্ধ, ভালোবাসা ও চোখের জলে এফডিসি থেকে সহকর্মী ও ভক্তরা চিরবিদায় জানালেন অভিনেতা টেলি সামাদকে। লাশবাহী গাড়িটি ছুটে চলে মুন্সিগঞ্জ শহরের পূর্ব নয়াগাওয়ে সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তার বাবা-মা। তার পূর্বে ইয়াদউদ্দিন আহমেদ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তার শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর বাবা মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। আসলে এই তো জীবন। সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। যে এফডিসিতে তিনি কাজ করেছেন, টেলি সামাদ পরিচিতি পেয়েছেন, সবাইকে হাসিয়েছেন, আনন্দ দিয়েছিলেন আজ সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। আর মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁও গ্রামটিতে বেদনায় বিদির্ণ করে তিনি বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। আজ কোথাও নেই তিনি, নেই রাজাবাবার, এফডিসি কিংবা মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁওয়ে। তবুও তিনি আছেন, থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। স্মৃতি হিসেবে রেখে গেলেন দুই স্ত্রী রেখা সামাদ, ও নিগার সুলতানা। দুই মেয়ে কাকলী আর সায়মা দুই ছেলে সুমন আর দিগন্ত। গোটা পরিবারের কাছে আমার প্রত্যাশা ক্ষুদ্র স্বার্থ আর বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে যেন তারা টেলি সামাদের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখেন।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা টেলি সামাদের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁও এলাকায়। পুরো নাম আবদুস সামাদ। সাংস্কৃতিক পরিমÐলে বেড়ে ওঠা তার বড়ো ভাই বিখ্যাত চারুশিল্পী আবদুল হাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। সংগীতেও রয়েছে এই গুণী অভিনেতার পারদর্শিতা। ‘মনা পাগলা’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ‘কার বউ’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে পা রাখেন। তবে তিনি দর্শকের কাছে যে-ছবিটির মাধ্যমে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা পান সেটি হলো ‘পায়ে চলার পথ’। এরপর অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের বাইরে ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে তিনি গানও গেয়েছেন। বিটিভির ক্যামেরাম্যান মোস্তফা মামুন আবদুস সামাদ থেকে প্রথম অংশটি বাদ দিয়ে তার নাম রাখেন টেলি সামাদ। কারণ চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি টেলিভিশনেও অনেক কাজ করেছেন। এফডিসি আর টেলিভিশন ভবন দুটোই তার কাছে বেশ আপন ছিল। চারুশিল্পী হওয়াতে পাশাপাশি গান জানার কারণে টেলিভিশনের অনেক ম্যাগাজিন, নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। তাই টেলিভিশন খ্যাত টেলি সামাদ তার এই জনপ্রিয় নামেই অভিনয় জীবন শুরু করেন। চার দশকে প্রায় ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই অভিনেতা। টেলি সামাদ একসময় বাংলা চলচ্চিত্রে রবিউল, খান জয়নুল, হাসমত, আশীষ কুমার লৌহ, আনিস, লালু শেষের দিকে দিলদারসহ অনেক গুণী কৌতুক অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এ অভিনেতা দক্ষ অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশে বিদেশে একাধিকবার পুরস্কৃত হলেও তার কপালে জোটেনি জাতীয় চলচ্চিত্রি পুরস্কার। তার আক্ষেপ ছিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে কৌতুক অভিনেতার ক্যাটাগরি বাদ দেওয়া নিয়ে। আর কষ্ট ছিল বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতা অভিনেত্রীদের পদভারে মুখরিত বিএফডিসিতে তার মতো জনপ্রিয় অভিনেতার অনুপস্থিতি। জীবনের শেষ দিকে তাকে কাজে লাগানো যায়নি। চলচ্চিত্র নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাদের মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হতো না। মনণোত্তর পুরস্কারের দেশে তাকে জীবিতকালে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়নি। যাহোক, টেলি সামাদ অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছেÑ নয়নমণি, মাটির ঘর, দিলদার আলী, অশিক্ষিত, ফকির মজনু শাহ, মধুমিতা, মিন্টু আমার নাম, নদের চাঁদ, দিন যায় কথা থাকে, নওজোয়ান, ভাত দে, সখিনার যুদ্ধ, সোহাগ, পৃথিবী, কথা দিলাম, শেষ উত্তর, হারানো মানিক, চন্দ্রলেখা, লাভ ইন সিঙ্গাপুর, গোলাপী এখন ট্রেনে, মনা পাগলা, সুজন সখী, লাইলী মজনু ইত্যাদি।

বলা যায়, তার অভিনীত প্রতিটি চলচ্চিত্রই ছিল ব্যবসাসফল। ২০১৫ সালে তার অভিনীত সর্বশেষ ছবি মুক্তি পায় ‘জিরোডিগ্রি’। তারপর থেকে আর তাকে চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি। অথচ অসংখ্য চলচ্চিত্র, নাটকে, মঞ্চে নানা ধরনের চরিত্রে তার দুর্দান্ত অভিনয় দর্শকের মনে দারুণভবে দাগ কাটে। নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শককে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতেন টেলি সামাদ। একসময় কমেডিয়ান বললেই চলে আসত তার নাম, সমানতালে অভিনয় করেছেন চলচ্চিত্রে এবং টেলিভিশনে। পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা। সারাজীবন যে মানুষটি সবাইকে হাসিয়েছেন, আনন্দ দিয়েছেন, জীবন সায়াহ্নে এসে সেই কৌতুক সম্রাটের মুখ থেকে সেই হাসি নিভে গিয়েছিল। স্লান হয়ে গিয়েছিল তার আনন্দ উচ্ছ্বল, হাস্যউজ্জ্বল মুখখানি। অন্যদিকে জীবনের শেষ দিকে এসে টেলি সামাদ বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সময় কেটেছে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে। যাওয়ার সময়, সুযোগ হয়নি দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বিএফডিসিতে। এ কষ্ট তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন।

লেখক : গণসংগীতশিল্পী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here