1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন

৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

মোট আক্রান্ত

২৫২,৪৪৯

সুস্থ

১৪৫,৫৮৬

মৃত্যু

৩,৩৩৩

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৫২,২৯৮
  • চট্টগ্রাম ১৪,৭৪৬
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৯৮২
  • কুমিল্লা ৫,৬৭৯
  • বগুড়া ৫,০৯৪
  • ফরিদপুর ৪,৮১১
  • খুলনা ৪,৫৫৩
  • সিলেট ৪,৪৭৫
  • গাজীপুর ৪,৩২৭
  • কক্সবাজার ৩,৪৭৩
  • নোয়াখালী ৩,৩৪৬
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,১২৬
  • ময়মনসিংহ ২,৮২৮
  • বরিশাল ২,৪৭৯
  • কিশোরগঞ্জ ২,০৯১
  • যশোর ২,০২২
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১,৯৫১
  • দিনাজপুর ১,৯২৯
  • চাঁদপুর ১,৮৭৫
  • কুষ্টিয়া ১,৮৪১
  • গোপালগঞ্জ ১,৭৯৩
  • টাঙ্গাইল ১,৭৯৩
  • রংপুর ১,৭৯২
  • নরসিংদী ১,৭৫৬
  • সুনামগঞ্জ ১,৫৫০
  • সিরাজগঞ্জ ১,৫৩৯
  • লক্ষ্মীপুর ১,৪৭২
  • ফেনী ১,৩৬০
  • রাজবাড়ী ১,৩৫১
  • হবিগঞ্জ ১,২২৬
  • মাদারীপুর ১,২২৪
  • শরীয়তপুর ১,১৩৯
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • পটুয়াখালী ১,০৬৬
  • ঝিনাইদহ ১,০৫২
  • মৌলভীবাজার ১,০৪৬
  • জামালপুর ৯৮২
  • নওগাঁ ৯৬০
  • মানিকগঞ্জ ৯০৬
  • পাবনা ৮৫২
  • নড়াইল ৮৫১
  • জয়পুরহাট ৭৮২
  • সাতক্ষীরা ৭৮০
  • চুয়াডাঙ্গা ৭৫৯
  • পিরোজপুর ৭৩৯
  • গাইবান্ধা ৬৯৮
  • নীলফামারী ৬৮০
  • বরগুনা ৬৫৭
  • রাঙ্গামাটি ৬৫৭
  • নেত্রকোণা ৬৪৭
  • বাগেরহাট ৬৩৭
  • বান্দরবান ৫৮২
  • ভোলা ৫৫৭
  • কুড়িগ্রাম ৫৫৩
  • নাটোর ৫৪৪
  • খাগড়াছড়ি ৫৩২
  • মাগুরা ৫২৫
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫১৭
  • ঝালকাঠি ৪৯৩
  • ঠাকুরগাঁও ৪৩৭
  • লালমনিরহাট ৪৩৬
  • পঞ্চগড় ৩৬১
  • শেরপুর ৩২৬
  • মেহেরপুর ২১৯
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

উটকো -মাহমুদা আখতার

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১৮
  • ১৯৭১ বার ভিউ করা হয়েছে

কাক্সিক্ষত সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে বাসা থেকে বের হতে পেরেছে স্বস্তি। আত্মগøানিতে ভুগছে এমনিতেই। ঢাকার রাস্তার জ্যাম ঠেলে গন্তব্যে কখন যে পৌঁছাবে, সে ভাবনা না-ভাবাই বরং অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক। নইলে ভর দুপুরে বাড়তি দুশ্চিন্তা মানসিক অশান্তি বাড়াবে বই কমাবে তো আর না। পারিজাত এরমধ্যে কয়েকবার মুঠোফোনে স্বস্তিকে খুঁজেছে।

 

এ-সময় ফোনে কথা বলা আর না-বলা সমান কথা বিধায় স্বস্তি ফোন ধরেনি। পরে রাস্তায় বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের হাঁটা পথটুকু পেরুতে গিয়ে মনে হয়েছে, নাহ্, এটা অন্যায় হয়ে যাচ্ছে। স্বস্তি যে আসছে, এটা জানিয়ে রাখা দরকার। তা হলে অপরপক্ষের অপেক্ষার ডালে ফুল ফুটবে। পারিজাতসহ দলের সবাই আশ্বস্ত হবে। নইলে সকলে ভাববে, স্বস্তি বোধহয় আসবেই নাÑ তাই ফোন ধরছে না।

কল করতে গিয়ে দেখে টাকা নেই। রাস্তার পাশের দোকানের সারির কোনো একটাতে ঢুকে মুঠোফোন নম্বর লিখে টাকা দিয়ে নেমে এসেছে, পিছন থেকে ডাক এলÑ আপা, নম্বরটা ঠিক আছে কি না, একটু মিলায়ে নেন। চালশে হয়ে গেছে বলে চট করে কিছু পড়তে স্বস্তির সমস্যা হয়। এমনিতেই দেরির ওপর দেরি, তার ওপর আবার এখন পুনরায় বারান্দায় উঠে, ব্যাগ ঘেঁটে চশমা বের করে চোখে পরে নিয়ে নম্বর মিলিয়ে দেখতে গেলে আরও সময় নষ্ট হবে। তাই আগপাছ না-ভেবে গলা চড়িয়ে বলে ওঠে, আপনি বলুন নম্বরটা, আমি শুনছি। দোকানদার বলতে থাকে ০১… স্বস্তির কেন যেন একবার মনেও হয়, কাজটা কি ঠিক হচ্ছে ? আজকাল কতরকম ঝুট-ঝামেলায় যে পড়ে মানুষ। তার পরও একদিকে মানসিক তাড়া, অন্যদিকে ঝোলা ব্যাগ হাতড়ে চশমা পরার আলসেমিতে কোনোদিকে খেয়াল না করে মুঠোফোন নম্বর মিলিয়ে হাঁটা দেয়।

শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে কোনোদিকে না তাকিয়েই যেকোনো একটা বাসে চড়ে বসে। ৩০ সেকেন্ড না পেরুতেই বাসটাকে পিচগলা রাস্তা যেন আটকে ধরে। সদ্য গোসল করে বেরিয়েও চুলছাড়া থাকায় কুলকুল করে ঘামতে থাকে স্বস্তি। উপায়হীন হয়ে ‘কী করা যায়’ ভাবতে গিয়েই মনে পড়ে পারিজাতকে একটা ফোন করা যেতে পারে। ব্যাগ খুলে ফোন খুঁজে হাতে নিয়েই দেখে ফোনটা বাজছে। অপরিচিত নম্বর। পারিজাত অনেক সময় অন্যকে দিয়ে ফোন করিয়ে স্বস্তির অবস্থান বা কর্মপরিকল্পনা জানতে চায়। তাই নিশ্চিত মনে স্বস্তি ফোনে কান পাতে।

: জ্বি…

: আচ্ছা, এটা কি ০১…?

: হ্যাঁÑ

: আচ্ছা, আপনি কি এখন শঙ্করে ?

: জ্বি…।

: আপনি কি সবুজ রঙের পোশাক পরে আছেন ?

: হ্যাঁ !

: দেখুন, আপনার ফোন নম্বরটা আমি চুরি করেছি বা জোগাড় করেছিÑ যাই বলুন ; বলতে পারেন।

: কার কাছ থেকে ?

: সেটা বলা যাবে না।

স্বস্তি চুপ। স্বস্তির গা ঘেঁষে কলেজ-পড়–য়া মেয়ে বসে আছে। রাস্তার এত কোলাহলের মধ্যে অপরপক্ষের বয়স বোঝা দায়। তাছাড়া স্বস্তি একটু দ্বিধাবোধও করছে। পরিচিত কেউ ওকে বাজিয়ে দেখছে না তো ? এমন তো নয় যে, ফোনে কথা বলছে যে, সে এই বাসেই বা রাস্তার ধারেই আছে। ওকে ফাঁদে ফেলে মজা লুটছে ? স্বস্তিকে বোকা বানাচ্ছে ?

: হ্যালোÑ হ্যালো, কথা বলছেন না কেন ?

: ইচ্ছে করছে না।

: আচ্ছা ঠিক আছে, রেখে দিচ্ছি। এই আচরণটাও অপ্রত্যাশিত। আর তাই নম্বরটা বøক করতে গিয়েও স্বস্তি করে না। ততক্ষণে জ্যাম পাতলা হয়ে এসে থেমে থাকা বাস চলতে শুরু করেছে। পারিজাতও আবার ফোন করেছে। তাই উটকো বিষয় নিয়ে ভাববার অবকাশ আর মেলে না। পরবর্তী দু’ঘণ্টা দলের সঙ্গে থেকে, কণ্ঠসহযাত্রী হয়ে, বাংলাদেশ বেতারের স্টুডিও আর আঙিনা চষে বেড়িয়ে স্বস্তি বেমালুম ভুলে যায় অস্বস্তিকর ফোন কলের কথা। বাণীবদ্ধকরণ শেষে দলসমেত হৈহৈ রৈরৈ করতে করতে বেতার ভবনকে বিদায় জানায়।

পরদিন দুপুর পৌনে একটার দিকে আবার অন্য একটি অপরিচিত নম্বর স্বস্তির ফোনের পর্দায় ভাসতে থাকে।

: জ্বি ?

: ভালো আছেন ?

: আছি।

: চিনতে পেরেছেন ? গতকালের আমি। অন্য নম্বর থেকে ফোন করেছি।

: জ্বি না…

: আচ্ছা, আপনি কি শিক্ষকতা করেন ?

: বলতে পারেন।

: তার মানে ?

: একসময় করতাম। এখনও আবৃত্তির ক্লাস নিই।

: ওÑ ছায়ানটে ?

: না। কিন্তু কে আপনি ? আমি দুঃখিত, আপনাকে চিনতে পারছি না। দয়া করে বলবেন, কে আপনি ?

: আপনাকে আমি শঙ্কর দিয়ে যাতায়াত করতে দেখেছি। আপনি শাড়ি খুব সুন্দর করে পরেন। আমার মা-খালারাও শাড়ি পরে। কিন্তু এত যতœ করে পরে না। তাই দেখতে ভালোও লাগে না। আপনাকে দেখলেই টিচার-টিচার মনে হয়।

: অতীব সত্যি কথাÑ স্বস্তি মনে মনে বলে। কিন্তু মুখে বলে, আমি এখন রাখব। আমার ভাতিজির স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। ওকে নিতে এসেছি আমি।

: আচ্ছা ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই।

এবার সত্যি সত্যি স্বস্তির ভাবনার জগতকে দখল করে বসে অচেনা কণ্ঠ। কোনো দাবি-দাওয়া নেই, নেই কোনো উদ্ধত আচরণ বরং বিনয়ের অবতার যেন। কেÑ সে ? কেন করছে ফোন ? আবার, বলামাত্রই রেখে দিচ্ছে ! শুদ্ধ বাংলায় স্পষ্ট উচ্চারণে যথেষ্ট সম্মান বজায় রেখে কথা বলছে। কী চায় তা হলে ? কোনো আবৃত্তি দলের সদস্য কি ? স্বস্তির ভক্ত, এমন কেউ কি নাম-পরিচয় গোপন রেখে স্বস্তিকে যাচাই করে দেখছে ? যদি তাই হয়, তা হলেই বা কেন ? আবার শঙ্কর-ছায়ানট-শাড়ি শব্দগুলো প্রমাণ করে, অচেনাকণ্ঠ স্বস্তিকে নিয়মিতই দেখে। আচ্ছা, পাড়ার কেউ নয় তো ? দেখা যাক। স্বস্তি দুটো নম্বরই ‘কে’ আর ‘অচেনা কণ্ঠ’ নামে মুঠোফোনে তালিকাভুক্ত করে। দিনের পর দিন গড়ায়। কয়েকদিন পার হওয়ার পর আবার এক দুপুরবেলায় দ্বিতীয় নম্বর থেকে ফোন করে অচেনা কণ্ঠÑ

: জ্বি ?

: আপু, ভালো ছিলেন ? মাকে নিয়ে গ্রামে এসেছি তো, তাই কয়েকদিন ফোন করতে পারিনি।

: জ্বি, ভালো আছি।

: কী করছেন ?

: বিটিভি দেখছিলাম।

: আচ্ছা, আপনি কি আমার কাজিনের জন্য টিউটর ঠিক করে দিতে পারবেন ?

: মানে !

: নাÑ খালামণি আমাকেই পড়াতে বলেছিল। ও এত চঞ্চল ! আমি ওকে সামলাতে পারব না। বাব্বাহ্ ! যা দুষ্ট ু! দিন না একজন টিউটর খুঁজে।

: আপনার খালা থাকেন কোথায় ?

: এই তো, চেয়ারম্যান গলিতে।

মুখের ওপর ‘না’ বলতে স্বস্তির যেন গলায় বাধে। যেহেতু অচেনা কণ্ঠ কোনো অশোভন আচরণ করছে না, অসময়ে ফোন করছে না, তাই কোন অজুহাত দেখিয়ে স্বস্তি নেতিবাচক আচরণ করবে, ভেবে পায় না। তবে কণ্ঠস্বরের বয়স স্বস্তির চেয়ে যথেষ্ট কম মনে হওয়া সত্তে¡ও, ইচ্ছা করেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে ঠান্ডা স্বরে বিনা সম্বোধনে পরোক্ষভাবে কথা চালিয়ে যায় স্বস্তি।

: আচ্ছা আপু, আপনি কিন্তু আমাকে দেখেছেন।

: কোথায় ?

: কেন, রাস্তায় ?

: দেখিনি, মানে খেয়াল করিনি আরকি।

: প্রথমদিন একটা মিথ্যা কথা বলেছিলাম। স্যরি। আপনি যে দোকান থেকে ফ্লেক্সি লোড করেছিলেন না ; সেখান থেকেই নম্বরটা সংগ্রহ করেছি।

: দেখুন, সেদিন বাংলাদেশ বেতারে আমাদের দলের একটা দলীয় অনুষ্ঠানে বাণীবদ্ধকরণ ছিল। আমার সমস্ত মনোযোগ ছিল সেদিকে। তাই অন্য কিছু খেয়াল করার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমার ছিল না।

: আপনি সত্যি দেখেননি আমাকে !

স্বস্তির প্রায় ঠোঁটের আগায় চলে আসে ‘কেন, আপনি কি দেখবার মতো কেউ ?’ জোর করে কথাগুলো গিলে ফেলে। উদ্দেশ্য যাই থাক, অচেনা কণ্ঠ ‘আপনি’ এবং ‘আপু’ বলছে। তাই স্বস্তির আগ বাড়িয়ে অনাগ্রহ কিংবা আগ্রহÑ কোনোটাই প্রকাশ করা ঠিক হবে না।

: দেখুনÑ বলেছি তো, তাড়া থাকায় সেদিন কোনোদিকে তাকানোর মতো মানসিক অবস্থা ছিল না আমার !

: আচ্ছাÑ ঠিক আছে। আমার মনে হয়েছিল, আপনি আমাকে দেখেছেন।

: হতে পারে। হয়ত অবচেতন মনে তাকিয়েছি কিন্তু দেখিনি। সব দেখাই তো আর দেখা নয়।

: ও আচ্ছা। তাই তো। ঠিক আছে, দেখা তো হবেই। একই এলাকায় যেহেতু থাকি।

: একই এলাকায় মানে ? কোথায় ?

: পুলপাড় ঠিক একই এলাকা বলা যায় কি ? ওটা তো অন্য রাস্তায়।

: তারপরও ; একেবারে কাছেই তো। যাই হোক, আমাদের ফেসবুকেও দেখা হতে পারে।

: আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই।

: কেন !

: আমাকে টানে না ; তাই।

: ওÑও ! আচ্ছাÑ চলবে। ফোনে কথা বললেও চলবে। এই যে, এখন যেমন বলছি।

: কী করা হয় ?

: তিতুমীর কলেজে পড়ি। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। পাশাপাশি টেলিফিল্ম বানানোর চেষ্টা চলছে। একটা সংক্ষিপ্ততম টেলিফিল্ম বানানো হয়ে গেছে এর মধ্যেÑ নাম ‘তুমি আর আমি’ আপনি ফেসবুকে শাহ্রিয়ার লিখে সার্চ করলেই দেখতে পাবেন আমাকে আর আমার টেলিফিল্ম, বিশ্বের স্বল্পদৈর্ঘ্য : তুমি আর আমি।

: দুঃখিত, আমি কোনো আগ্রহ বোধ করছি না।

: না করলে নাই। তবে প্লিজ আমার কাজিনের জন্য প্রাইভেট টিউটর একটু খুঁজে দেখবেন।

: বয়স কত ওর ?

: এই তো পাঁচ-ছয়ের মাঝামাঝি।… এই পর্যায়ে ফোনের লাইন কেটে যায়। আর স্বস্তি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ভারি আশ্চর্যের বিষয় তো ! এ কেমন গোলকধাঁধায় পড়েছে ও ! এড়াতেও পারছে না, আবার জড়াতেও না ! মুঠোফোনের এই যুগে এ ধরনের কল আগেও অনেক এসেছে। কিন্তু কারও অত্যধিক আগ্রহ, কারও আঞ্চলিক উচ্চারণ, কারও বোকার মতো কথাবার্তা, কারও সরাসরি প্রস্তাব, আবার কারও ভয় দেখানো কোনোটাকেই তোয়াক্কা না-করে প্রথমবার কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পেরেই স্বস্তি ফোন কল কেটে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটাকে বø্যাকলিস্টে পাঠিয়ে দিয়েছে। এর বেলায় কেন পারছে না ! সমস্যাটা কোথায় ?

ভাবতে ভাবতেই পুনরায় একই নম্বর ডাকতে থাকে এবং স্বস্তি যথারীতি ফোন ধরে প্রতিউত্তরও করেÑ

: জ্বিÑ

: ব্যালেন্স শেষ হয়ে গিয়েছিল। কথা শেষ হয়নি, তাই টাকা ভরে আবার ফোন করলাম।

: ওÑ আচ্ছা। বলার মতো কোনো কথাই আসলে স্বস্তি খুঁজে পায় না। কেননা প্রতিমুহূর্তেই সন্দেহের দোলায় দুলছে ও। ওর কেবলই মনে হচ্ছে, পরিচিত কেউ ওর সঙ্গে অলক্ষ্যে খেলছে। তাই এমন কিছুই ও বলবে না, যাতে অপরপক্ষ ওকে ফাঁদে ফেলতে পারে।

: আপু, আপনাকে কিন্তু আমি প্রায়ই দেখি। এত সুন্দর করে শাড়ি পরেন ! এজন্যই ভেবেছিলাম, ছায়ানটে চাকরি করেন কি না। তা ছাড়া হেঁটে আসা-যাওয়া করতে দেখি তো। আচ্ছা, সেদিন আপনি সত্যি আমাকে দেখেননি ?

: বললাম তো, খেয়াল করিনি। এক কথা কয়বার বলব ? আপনি কে, যে আমাকে দেখতে হবে ? আশ্চর্য, নিজের ওপর এত আত্মবিশ্বাস কেন ? Ñ আবারও মনে মনেই বলে কথাগুলো। যতক্ষণ না অপরপক্ষ সভ্যতার সীমা অতিক্রম করছে, ততক্ষণ স্বস্তিও একচুল বাড়তি কথা বলবে না বা ভাববে না। তাছাড়া, কেউ কারও সঙ্গে কথা বললেই একচেটিয়াভাবে মাত্র একটাই সম্পর্ক তৈরি করতে চাওয়ার কথা ভাবতে থাকে কেন সবাই ? ব্যতিক্রমী উদাহরণ তো স্বস্তির জীবনেই আছে।

১৪ বছর আগে টাঙ্গাইলে আবৃত্তির ক্লাস নিতে গিয়ে বছর পাঁচেকের টুসটুসে একটি ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয় স্বস্তির। স্বচ্ছ নামের ছেলেটি যেন অফুরন্ত প্রাণের ভাÐার। চোখে-মুখে সারাক্ষণ খুশি উপচে পড়ছে। এরকম ছাত্র কার না কাম্য ? তাই শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে ধাবিত হলেও স্বচ্ছ অনিয়মিতভাবে নিয়মিত কথা বলে স্বস্তির সঙ্গে মাঝে-মধ্যে ঠাট্টা করতেও ছাড়ে না। একবার ফোন করলে বাংলা বানান-উচ্চারণ-শব্দ চয়ন-আবৃত্তি-বিতর্ক-গণিত-অলিম্পিয়াড-বিজ্ঞানমেলা-কবিতা লেখাÑ একমাত্র বড়োবোনের কর্মকাÐ মা’র প্রবণতাÑ বিশ্ব পরিস্থিতি কাউকে চোখে লাগা, মনে ধরাÑ এরকম হেন বিষয় নেই যে, কথা হয় না। ছেলেটি বয়স অনুপাতে অনেক বেশি গভীর এবং দূরবর্তী চিন্তার অধিকারী। ১৩-১৪ বছর বয়সে যেসব কবিতা বা অন্যান্য লেখা লিখেছে, পড়লে মনে হয় যেন চল্লিশোর্ধ কারও লেখা। অথচ সামনাসামনি বা ফোনে কথা বলার সময় এতটাই প্রাণোচ্ছল এবং স্বতঃস্ফূর্ত যে, মনেই হয় না অসম বয়সী দুজন কথা বলছে কিংবা সম্পর্কটা ছাত্র আর শিক্ষকের। স্বচ্ছর মা কলেজ শিক্ষক। বাবা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। বোন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। স্বচ্ছর মা যখন স্বস্তির সঙ্গে কথা বলেন ফোনে কিংবা ঢাকায় এলে যখন দেখা হয়, তখন তিনি যারপরনাই উচ্ছ¡াস প্রকাশ করেন স্বস্তির সঙ্গে এই বন্ধুসুলভ আচরণে। ফোনটা বেশিরভাগ স্বচ্ছই করেÑ কেমন আছো আপু ? কী করছ ? এভাবে শুরু হয়ে চলতে থাকে ম্যারাথন আড্ডা অসম বয়সী, অসম সম্পর্কের দুই মেরুর দুই ভক্তের। নিজের মুঠোফোন নেই। কখনও বাবা, কখনও মার মুঠো ফোন ব্যবহার করেও সে কথা মনে পড়তেই জীবনকে সরলভাবে দেখতে চায় স্বস্তি। অকপটে বিশ্বাস ক’রে অচেনা কণ্ঠের খালাতো ভাইয়ের জন্য সত্যি সত্যি গৃহশিক্ষকের খোঁজ করে একাধিক স্থানে, বিশ্বস্ততার সঙ্গে। কারও সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে। আবার কারও সঙ্গে সরাসরি কথা বলে। যদিও শেষ পর্যন্ত কেউই রাজি হয় না। নেহায়েত দায়ে না পড়লে গৃহশিক্ষকতা করবে কেন কেউ ? বিশেষ করে শিশুদের এবং তাদের অভিভাবকদের তুষ্ট করা এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করার মতোই কষ্টসাধ্য। একসময় স্বস্তিকেও টানা পাঁচ বছর গৃহশিক্ষকতা করতে হয়েছিল। চাকরি পেয়ে সেই যে ছেড়েছে, এখন ভুলেও ছায়া মাড়াতে চায় না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতার প্রস্তাব দেয়া ছাড়াও, সেধে বাসায় এসে আবৃত্তি শিখতে চেয়েছে এবং এখনও চাচ্ছে অনেকেই। কিন্তু স্বস্তি নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করতে চায় না বলে এককথায় সবাইকে ফিরিয়ে দেয়। বিশেষ প্রয়োজনে, বিকল্প হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে ফোনে আবৃত্তি শেখায়।

স্বস্তি মনে করে, গৃহশিক্ষকতা করা মানে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে নিজের মাথা এবং স্বাধীনতা বিক্রি করে দেওয়া। আর তাই গৃহশিক্ষক না পেলেও গøানিবোধ করে না ও। এর মধ্যে অচেনা কণ্ঠ বার ছয়েক ফোন করে কিন্তু ইচ্ছা করেই স্বস্তি ফোন ধরে না। সপ্তাহ পার হয়ে যায়। একদিন শেষবেলায় হঠাৎ ওর মনে হয়, আচ্ছা, কোনো গৃহশিক্ষক যে যোগাড় করতে পারেনি, সেটা জানিয়ে দেওয়াই মঙ্গল নয় কি ? যেচে ফোন করবে, কি করবে নাÑ দ্ব›েদ্ব ভুগে একবার কল করতে নিয়েও কেটে দেয়। হঠাৎ স্বচ্ছর কথা মনে পড়ে ওর। মাত্র গতকাল রাতেই ওর সঙ্গে কথা হয়েছেÑ

: আপু, তুমি এখন বৃদ্ধ না প্রৌঢ় ?

: মহিলা।

: হাফ সেঞ্চুরি করেছ ?

: নাহ্, এখনও করতে পারিনি। বছর তিনেক লাগবে।

: হি-হি-হি। আচ্ছা, গণিতে কখনও ডাব্বা মেরেছিলে তুমি ?

: হ্যাঁÑ এ-এ। একবার, না-না তিনবার। আমাদের স্কুলে ৪০-এ পাশ ধরা হতো।

: সবচেয়ে কম কত পেয়েছিলে ?

: দুই পেয়েছিলাম একবার। সেই খাতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ ক’রে যখন আপাকে দেখাতে গেলাম যে, এখানে দুই পেলাম কীভাবে ; আমার ধারণা ছিল আরেকটু বেশি আসবে হয়ত নম্বরটা। তো, আপা পুনরায় খাতা উল্টে-পাল্টে দেখে দুই কেটে এক বানিয়ে দিলেন।

: হাহ্- হাহ্- হাহ্- হাহ্- হাহ্ ! কত’র মধ্যে ?

: কত আবার ? অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় ? ১০০’র মধ্যে।

: হি-হি-হি ! কোন ক্লাসে পড়তে তখন ?

: সপ্তম শ্রেণিতে।

: আহ্-হাহ্-হাহ্ …

শিশির অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গিতে হাসছে। স্বস্তি খেতে বসেছিল তখন। খাবার টেবিলে ভাবি-ভাতিজা-ভাতিজি সবাই হাসছে। স্বস্তির মোটেও অস্বস্তি লাগছে না। বেদনাও মধুর হয়ে যায়, যখন স্মৃতিচারণ করা হয়। গøানি বা পরাজয়কেও ¤øান মনে হয় স্মৃতিচারণের আনন্দের কাছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্বস্তি সবসময় ১০০-তে ১০০ পেত, গণিতে। বীজগণিত কেন যেন ওর মাথায় ঢুকত না। তাছাড়া এই বাঁক পরিবর্তনের বছরগুলোতে ও গণিতের কোনো শিক্ষক পায়নি। না বাড়িতে, না বিদ্যালয়ে। সরকারি বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক প্রায় সারাবছরই অসুস্থ ছিলেন। বাসায়ও এমন কেউ ছিল না যে, স্বস্তিকে বীজগণিত আর উপপাদ্য-সম্পাদ্য বুঝতে সহায়তা করবে। গৃহশিক্ষক রাখার মতো আর্থিক সঙ্গতিও স্বস্তির বাবার ছিল না। স্মৃতি ! হায় ! এক লহমায় সাতপাকে যেন ঘুরিয়ে আনে। সাতকাহন মনে করিয়ে দেয়। হতেও তো পারে যে, অচেনা কণ্ঠ স্বচ্ছরই মতো কেউ আরেকজন। অযথা কেন স্বস্তি নয়-ছয় ভাবছে ? যাদের বিরক্ত করার বা প্রেম প্রেম খেলার মানসিকতা থাকে, তারা সাধারণত গভীর রাতে ফোন করে। এই ছেলে এখনও পর্যন্ত সেরকম কিছু করেছে কি ? না, করেনি। অকারণ সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হওয়া তো ঠিক না ; তাই না ? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে স্বস্তি ফোন কল করেই বসে। ফোনের পর্দায় দেখা যায় নম্বরটি অপেক্ষারত। যাক, বাঁচা গেল ! বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আর পড়তে হলো নাÑ মনে মনে ভাবে। কিন্তু না, মিনিটও পার হয় না, অচেনা কণ্ঠ ফোন করে।

: আপু, আপনি কি ফোন করেছিলেন ?

: হ্যাঁ। দুঃখিত, আপনার খালাতো ভাইয়ের জন্য কোনো গৃহশিক্ষক খুঁজে পেলাম না। এ ক’দিন আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু কেউ রাজি হয়নি। এটা জানাতেইÑ

: হাহ্-হাহ্- হা… বুঝতে পারলাম, আপনি খুব ডেডিকেটেড অ্যান্ড সিরিয়াস। থ্যাঙ্কস, যদিও পাননি ; চেষ্টা যে করেছেন, এজন্য ধন্যবাদ।

: আচ্ছা, ঠিক আছে, রাখি।

: আপু, আরেকটু কথা বলি ?

: কী কথা ?

: নাÑমানে, আপনি কী করেন ? কোথায় থাকেন ? ছেলেমেয়ে আছে কিনা আপনার ? থাকলে, ওরা কত বড়ো হয়েছে ?

: এত কথা ! আপনি না আমাকে চেনেন ? তা হলে জানেন না এসব ?

: আচ্ছাÑ বাদ দিন। আপনার সঙ্গে প্রথম কথা হয়েছিল দুপুরে। তাই, সবসময় দুপুরেই ফোন করতাম। এখন মনে হচ্ছে, শেষ বিকেল বা সন্ধ্যায়ও ফোন করা যাবে। রাতে কি করা যাবে ?

: না। Ñ স্বস্তি খুব কঠিন স্বরে উত্তর দেয়।

: আচ্ছাÑ আচ্ছা, এটুকুতেই চলবে। মাঝে-মধ্যে একটু আধটু কথা বললেই আমি খুশি।

: আপনি কোথায় ?

: বাসায়ই ছিলাম। আপনার সঙ্গে কথা বলবো বলে রাস্তায় চলে এসেছি। হাঁটছি আর কথা বলছি। আচ্ছা আপু, আপনি ফেসবুকে খোঁজ করেছিলেন ?

: বলেছি তো, আমার আগ্রহ কিংবা কৌতূহল কোনোটিই নেই।

: তার মানে আপনি আমাকে আসলে চেনেন। স্বীকার করছেন না।

: দেখুন, আমি মিথ্যা কথা বলি না।

: হাহ্ Ñ হাহ্ Ñ হাহ্ Ñ হাহ্ Ñ হা ; এটাই হলো সবচেয়ে বড়ো মিথ্যা।

: আমি ফোন রাখব।

: না-না-না, প্লিজ স্যরি-স্যরি-স্যরি মজা করলাম। তবে যেদিন আপনি ফ্লেক্সিলোড করছিলেন, সেদিন তো আমি কাছেই ছিলাম। তাছাড়া রাস্তায় এরপরও তো আপনার সাথে আমার চোখাচোখি হয়েছে।

: দেখুন, রাস্তায় হাঁটতে গেলে কতজনের সঙ্গেই তো চোখাচোখি হয়, সকলকেই কি আমরা চিনি বা দেখি ? হঠাৎ চোখে পড়া আর যেচে, ইচ্ছে করে দেখা তো এক কথা নয়। আর আপনি যদি আমাকে দেখে থাকেন, আপনিই বা কেন এগিয়ে এসে পরিচয় দিলেন না ?

: আচ্ছা, ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম যে, আপনি সত্যিই আমাকে চেনেন না। মাঝে-মধ্যে আমি ফোন করলে কথা বললেই চলবে। ব্যস, তাতেই খুশি।

: ফোনটা রাখব আমিÑ বলেই লাইন কেটে দেয় স্বস্তি।

স্বস্তি ভেবেছিল, ছেলেটি আবারও ফোন করবে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ বা সেদিন তো আর নয়ই ; এরপর বেশ কদিন নিখোঁজ হয়ে থাকে ছেলেটা। স্বস্তি একবার ভাবে, বাঁচলাম। আবার মনে হয়Ñ কে এই ছেলে ? আকাশ-পাতাল হাতড়ে, জোর করে সেই সোমবারের কথা আর ঘটনাগুলো মনে করতে চেষ্টা করে ও। কেউ কি ছিল আশেপাশে ? না-তো ! রাস্তা থেকে ও বারান্দায় উঠল। খাতায় নম্বর লিখল। রাস্তায় নেমে এল। দোকানি পিছু ডাকল। অবহেলাভরে দোকানির বলা নম্বর মিলিয়ে দেখল, ঠিক আছে কি না। তারপর শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে শুরু করল। এর মধ্যে কেউ কিÑ কেউ কি, কাউকে কি দেখতে পেয়েছিল ও ?

হঠাৎ মনে পড়ে, দোকানটি ছিল রাস্তার একেবারে মোড়ে। অপরপাশে লন্ড্রির দোকান। এল আকৃতির রাস্তার একেবারে কোণায় শঙ্কর জামে মসজিদ। মসজিদের দিক থেকে  মাঝারি উচ্চতার ভোট্কা টাইপের একটা ছেলেকে মাথা নিচু করে মুঠোফোনের বাটন টিপতে টিপতে দোকানের দিকে আসতে দেখেছিল। যতদূর মনে পড়ে, ছেলেটি সুদর্শন নয়। এছাড়া মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বোধ হয় মসজিদ থেকে বেরিয়েছে। স্বস্তি অন্যমনস্ক থাকায় ছেলেটির পোশাক চোখে পড়েনি। চেহারার স্মৃতিও অস্পষ্ট। স্বস্তি যেন বিষয়টিকে দেখেও দেখেনি, মানে আমলে নেয়নি। সাধারণত নামাজি কারো তো মুঠোফোনে মিছে কথা বলার বা বান্ধবী খোঁজার কথা নয়। যতদূর মনে পড়ছে, ছেলেটি একমনে মুঠোফোনের বাটন টিপছিল। স্বস্তির দিকে তোকায়নি। স্বস্তিও পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। এর বেশি আর কিছু মনে করতে পারে না ও।

তারপর থেকেই অদ্ভুত এক রোগ আঁকড়ে ধরে স্বস্তিকে। আগে স্বস্তি যেকোনো প্রয়োজনে, যেভাবে খুশি সেভাবে স্বচ্ছন্দ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত কাজে। আজকাল আর সেটা পারে না। মনে হয়, কেউ ওকে অলক্ষ্যে দেখছে। যদিও কেন যে দেখছে, তার স্পষ্ট কোনো কারণ স্বস্তি আন্দাজ করতে পারে না। শেষবার যখন কথা হয়েছিল, তখন অচেনা কণ্ঠ জানতে চেয়েছিল, স্বস্তির ছেলেমেয়ে আছে কি না। তার মানে ছেলেটি ধরেই নিয়েছে স্বস্তি স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘর-সংসার করছে। হয়ত এ-কারণেই রাতে ফোন করে না বা এ পর্যন্ত বে-ফাঁস কোনো কথা বলেনি। তাছাড়া আরও তিন-চার বছর আগে থেকেই নতুন কেউ স্বস্তিকে দেখলে আন্টি বা খালা বলে সম্বোধন করে ; ভাবি কিংবা আপা নয়। বাসের কন্ডাক্টরও ‘খালা’ বলে। দোকানিরাও তাই। তা হলে ? তা হলে এটা নিশ্চিত যে, স্বস্তি যে চালশে হয়েছে অর্থাৎ ওর বয়স যে চল্লিশ পেরিয়ে গেছেÑ এটা, দেখামাত্রই যে কেউ বুঝতে পারে। আর এখানেই স্বস্তির যত অস্বস্তি। অচেনা কণ্ঠ ঝেড়ে কাশছে না কেন ? ও নিজেই বা নম্বর দুটো বøক করছে না বা করতে পারছে না কেন ? সমস্যাটা আসলে কোথায় ?

বিষয়টি নিয়ে স্বস্তি একদিন ওর জুনিয়র এক পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ করে। সহকর্মী নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা স্বস্তিকে শুনিয়ে বলে, ‘জানেন, যখন আমি ইয়াং ছিলাম, তখন প্রতিরাতে অচেনা নম্বরে বন্ধুরা মিলে ফোন করতাম। আমার রুমমেটরা বেশিক্ষণ টিকতে পারত না। কিন্তু ওরা আমাকে ঈর্ষা করত। কারণ, আমি অতি বিনয়ী হবার অভিনয় করে এবং প্রায় কিছুই না বলে, মাঝে-মধ্যে সামান্য প্রশংসাবাক্য আওড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা চালিয়ে যেতাম। আমার বিনয়ের কারণে প্রতিপক্ষ রাগতে ভুলে যেত। একেক রাতে একেকজনকে ফোন করতাম। পরের রাতে আর তাকে চিনতাম না। উল্টো কেউ ফোন করলে গলার স্বর আর বাচনভঙ্গি পরিবর্তন করে বলতামÑ ‘গতকাল ফোনটা সঙ্গে ছিল না তো, অন্য কেউ আমার ফোন ব্যবহার করে কথা বলেছে হয়ত। আপনি যাকে চাচ্ছেন, সে এখানে থাকে না। এজন্য আমি দুঃখিত।’ বলতে বলতে প্রবল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সহকর্মী। স্বস্তি দু’চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে ওর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে আর ভাবে, কোন বোকার স্বর্গে বাস করছে ওর মতো মেয়েরা [স্যরি, মহিলারা] !

অচেনা কণ্ঠকে ‘আগ্রহ বা কৌতূহল নেই’ বললেও তিন সপ্তাহ আগের সোমবারের ঘটনাটা চেষ্টা করে মনে আনার পর থেকে নিজের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা জন্মায় স্বস্তির। অচেনা কণ্ঠ যদি সত্যি সত্যি সেই ছেলেটি হয়ে থাকে, যাকে এক ঝলক দেখে নামাজি বা অধুনা জঙ্গী মনে হয়েছিল স্বস্তির, এবড়ো থেবড়ো দাড়ি আর চেহারার গঠনের কারণে [যদিও পোশাক কী ছিল, খেয়াল করেনি], তার সঙ্গে কী কথা স্বস্তির ; কেনই বা কথা ? আশ্চর্য ! স্বস্তির কি কথা বলার লোকের অভাব পড়েছে ? করবে তো না-ই, ধরবেও না আর ফোন। যাক্গে, মরুকগে ! এক ধরনের ভয়েও আক্রান্ত হয় স্বস্তি। পথে নামলে চোরা চোখে তাকায় মুখোমুখি সবার দিকে। আর তখনই হঠাৎ করে আবিষ্কার করে, আরে ! ছেলে-বুড়ো, উঠতি বয়সী-পড়তি বয়সের, অভিজাত চেহারার কি ভিক্ষুক বা ফেরিওয়ালা সবার মুখেই যে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি ! শতকরা নিরানব্বইজন পুরুষই মুখে দাড়ি নিয়ে ঘুরছে। তাও আবার আয়োজন বা যতœ করে রাখা নয় ; প্রায় সবার দাড়িই শ্রীহীন ! স্বস্তির হঠাৎ করেই মনে পড়ে, বেশ কিছুদিন ধরে ‘তিন খান’ দাড়ি রাখছে। পাশাপাশি অভিষেক বচ্চন, শহীদ কাপুর, সাইফ আলী খানই বা বাদ যাবে কেন ? দেখাদেখি, এদেশের শাকিব খান, আরেফিন শুভ একই পথের পথিক হয়েছে। অর্থাৎ, চেহারায় একটা জংলি ভাব আনাই চলতি ফ্যাশন। তার মানে ক্লিন সেভড নায়কের যুগ শেষ ? আচ্ছাÑ এ কারণেই কি ? …

মাঝে বেশ কিছুদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও, অনেকদিন বাদে আবার যখন ফোন করে অচেনা কণ্ঠ ‘ধরবে নাÑ ধরবে না’ ভেবেও শেষ মুহূর্তে কান পাতে স্বস্তিÑ

: কেমন ছিলেন আপু ?

: ভালো। সৌজন্য রক্ষার্থে বলতে হয় বলেই বলে, আপনি ?

: আমি নতুন টেলেফিল্ম বানাবো তো, স্ক্রিপ্ট রেডি। আমার পছন্দ সালসাবিলকে। ওকে স্ক্রিপ্ট পাঠিয়েও দিয়েছি পড়ে দেখতে। চেনেন তো, না কি… বেশ চটপটে, খোলামেলা গলায় বলে ছেলেটি।

: হ্যাঁ, চিনি।

: মুশকিল হচ্ছে সালসাবিলের ডিমান্ড একটু বেশি। তার পরও ওকেই নেব ভাবছি। দেখা যাক ।…

: আচ্ছা আপু, আপনি এত অসামাজিক কেন ?

: মানে ? বুললাম না।

: এই যে, ফেসবুক ব্যবহার করেন না। বর্তমান সময়ে ফেসবুক ছাড়া চলে নাকি ?

: কে জানে ? আমার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আরামেই আছি।

: আপনি চরম অসামাজিক।

: সামাজিকতা মাপার মানদÐ যদি ‘ফেসবুক ব্যবহার করে কি করে না’Ñ তাই হয়ে থাকে’ তাহলে তা-ই। আমার আপত্তি নেই অসামাজিক হতে। আমি আসলে কুয়োর ব্যাঙ ! কুয়োতেই থাকতে ভালোবাসি।

: হাহ্ Ñ হাহ্ Ñ হা। নিজেকে ‘কুয়োর ব্যাঙ’ বলছেন ? তাহলে যেসব কাজ আপনি করছেনÑ এগুলো কি কুয়োর ব্যাঙেরা         করে ?

: দেখুন, আমি অন্য কোনো কাজ পারি না ; তাই করি না। আমার কাছে এগুলো তাই বাড়তি ‘দেখিয়ে বেড়ানো’র মতো কিছু নয়। এটাই আমার মূল কাজ। আমি আপনমনে আমার কাজটা করে যেতে ভালোবাসি। প্রচারে আগ্রহবোধ হয় না ভেতর থেকেই ; কী করব আমি ?

: বুঝেছি। আপনি আসলে স্বভাবে মা-খালাদের মতোই। পোশাকও তো সেরকমই পরেন। ঠিক আছে, দরকার নেই। যেমন আছেন, তেমনই থাকুন। মাঝে-মধ্যে কথা বললেই চলবে।…

এরপর বলার মতো কোনো কথা নেই বলে স্বস্তি চুপ করে একতরফা কেবল শুনে যায়। এরপর ওদের মধ্যে কথার পুনরাবৃত্তি হয় কেবল।

: আচ্ছা, সেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিন্তু রাস্তায়। আপনার চোখ দেখে কিন্তু মনে হয়েছে আপনি আমাকে চেনেন। সেদিনও শাড়ি পরে ছিলেন।

 

সত্যি কথা বলতে কি, রাস্তায় বেরুলে স্বস্তি এখন আর আগের মতো মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটে না। বরং ইচ্ছে করেই সবার দিকে তাকায়। তাকিয়ে দেখে, কাউকে ‘নতুন চেনা’ মনে হয় কি না। সেদিনের সেই এক ঝলক দেখা চেহারার সঙ্গে মেলে কি না। আপনমনে চলার আনন্দ বিসর্জন দিয়ে স্বস্তি এখন সদা সতর্ক। চেষ্টা করে পরিপাটি হয়ে বেরুতে। কারণে-অকারণে শাড়ি পরে। অচেনা কণ্ঠের কথা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এ টু জেড সকলেই শাড়ি পরা স্বস্তিকে দেখলে প্রশংসাসূচক বাক্য বর্ষণ করে। আগে থেকেই সেই বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে অচেনা কণ্ঠকে মিথ্যুক মনে হয় না। তা ছাড়া, যারা প্রতিদিনের গৃহস্থালি পোশাক হিসেবে শাড়ি পরে ঘরে-বাইরে, তারা পরার জন্যই পরে বলে শাড়ি পরাটাকে উপভোগ করে না। অনেকটা জাতীয় পোশাকের মতই নিত্যদিন গায়ে চড়ায় অভ্যস্ত হাতে অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে। অবহেলাভরে উপেক্ষা করে যায় শাড়ি পরার নান্দনিক দিকটি ফুটিয়ে তুলতে। যেন, শাড়ি আর ইউনিফর্ম পরা একই কথা !… পাগল হয়ে গেছে না কি ? কী-ই সব ভাবছে ও ! আসলে, ছেলেটিকে দেখবার কথা মানে খেয়াল করে দেখার কথা সেদিন একবারও মনে হয়নি বলে, এখন আঁকুপাঁকু করে খুঁজলেও স্মৃতি ধরা দেয় না। দাঁড়িওয়ালা ভোট্কা বা পট্কা মাছ মার্কা চেহারা ছাড়া কিছুতেই আর কিছুই মনে করতে পারে না। সে চেহারার আদলও এতটাই অস্পষ্ট যে, সামনে এসে দাঁড়িয়ে যদি অপরপক্ষ দাবিও করে বসে আমি অমুক, আমিই কথা বলি’Ñ তা-ও, স্বস্তি চিনতে পারবে না। কাজের সূত্রে চর্কিঘূর্ণির মধ্যেও অচেনাকণ্ঠ ভর করে থাকে স্বস্তিকে আর অবসরে তো কথাই  নেই !

: আচ্ছা আপু, আপনি মাঝে-মধ্যে ফোন ধরেন না কেন ?

: হয়ত তখন ফোনের কাছে থাকি না। গোসলখানায়ও থাকতে পারি। আমাদের পোশাকে তো আর আপনাদের মতো পকেট নেই যে, মুঠোফোন সঙ্গে নিয়ে ঘরেও ঘুরব। তাছাড়া, বলার মতো কোনো কথাও তো নেই যে, পাল্টা ফোন করব।

: না-না, ঠিক আছে। আপনাকে ফোন করতে হবে না। শুধু আমি করলে, ধরলেই চলবে।

স্বস্তি চুপ।

: লক্ষ্য করেছেন আপু, আমি প্রায় একই সময়ে ফোন করি ? বলুন তো কেন ?

: বলেছেন একদিন। প্রথম ফোনটা এ-সময়ে ধরেছিলাম, তাই।

: ও, বলেছিলাম ? হ্যাঁ-হ্যাঁ, মানে ধরেই নিয়েছি এ-সময় আপনি ফ্রি থাকেন।

: সোমবার থাকি না। বেতার ভবনে যাই এ-সময়।

: ও হ্যাঁÑ তাই তো, সেদিন ছিল সোমবার ! আচ্ছা, বেতারে আপনি কী করেন ?

: অনেক কিছুই করা হয়। তবে সোমবারে খবর পড়া হয়, এ-সময়ে।

: ও আচ্ছা। আর কী করেন ?

: আবৃত্তি। স্বস্তি ইচ্ছে করেই বলে না, আর কী-কী কাজের সঙ্গে ও জড়িত। ওর বলতে ইচ্ছে করে না। বলে কী লাভ ? এড়াতে পারছে না বলে কথা বলছে বটে কিন্তু নতুন কোনো সম্পর্কে জড়ানোর ইচ্ছে নেই ওর। তাই যতদূর সম্ভব সংক্ষেপে কথা সারে। ছেলেটি পুনরায় অনুরোধ জানায় ফেসবুকে ঢুকে ওর কাজ আর ওর ছবি দেখতে। স্বস্তির নতুন করে মনেও হয়, অচেনা কণ্ঠকে না জানিয়ে পরিচিতজনের মাধ্যমে খুঁজে দেখবে ও। কার সঙ্গে কথা বলছেÑ জানা থাকলে, চিনতে পারলে ওর প্রতিদিনের এই অনাকাক্সিক্ষত অস্বস্তি দূর হবে। অচেনা কণ্ঠ যে নামটি বলেছিলÑ শাহ্রিয়ার, সে নাম দিয়ে ও আত্মীয় আর বন্ধু-বান্ধবের সহায়তায় ফেসবুকে খুঁজে দেখে কয়েকবার। এত এত শাহ্রিয়ারের মাঝে কাউকেই ওর চেনা মনে হয় না। কী এক আজব জ্বালায় জ্বলছে যে ও ! দূর হওয়ার বদলে অস্বস্তি যেন আরও জেঁকে বসে।

মাস কয়েক পরে এক অনুষ্ঠানে গল্প বলতে গিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় স্বস্তির। আর স্বস্তিও গড় গড় করে যেন এক নিশ্বাসে ‘অচেনা কণ্ঠ’র বয়ান দিয়ে যায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই। ওর সাংবাদিক বন্ধুটিও ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী বলেই, কোনো পরামর্শ দেয় না বা সাবধানবাণী শোনায় না। বরং হেসে দিয়ে বলে, সমস্যা কী ? চালিয়ে যাও। ভালো হলেই, ভালো। তুমি তো তোমাকে চেন। ভুল করার বয়স বা দরকার কোনোটাই তোমার নেই। যতদূর জানি, বেশ আছ। আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তোমার ভালো। সেক্ষেত্রে, এটা নিয়ে ভাবনারও দরকার নেই, আবার ঝেড়ে ফেলারও দরকার নেই। চলছেÑচলুক না ; মন্দ কী !

যাহ্ ! কাকে কী বলে স্বস্তি ! বিষয়ের গভীরে গেলেনই না তিনি। সবকিছু এত সহজ হলে তো কোনো কথাই ছিল না। বিড়ম্ব^না তো সেখানেই যে, কোনো কারণ নেই তারপরও নিজ মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পারছে না স্বস্তি। ‘বোঝাপড়া’…? হঠাৎ কোনো একটা গোপন আপন দরজা যেন খুলে যায় মনের।  সে দরজা দিয়ে আলো আসে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতাটা ওর খুব প্রিয়। কোনো একটা ছুঁতো পেলেই নিজেকে বা অপরকে শোনায় কবিতার বিশেষ একটি স্তবক। মনে মনে ও রীতিমতো অপেক্ষা করতে থাকে, এরপর, অচেনা কণ্ঠ ফোন করলেই দরকার হলে সেধে শোনাবে কবিতার তৃতীয় স্তবকটি। তবে স্বস্তি যেচে ফোন করবে না। ওর ভেতরের এই ছটফটানি কিছুতেই প্রকাশ করবে না নিজ থেকে। দেখা যাক, কবিতাটা আবৃত্তি করার পর বরাবরের মতোই ওর অস্থির মনটা স্থির, আর মাথাটা ঠান্ডা হয় কি না। সমস্যাটা হলো, এই মনস্তাত্তি¡ক লড়াই ওকে করতে হচ্ছে একা একাই। খুব স্বাভাবিক কারণে কাউকে বলাও যাচ্ছে না। দুজনকে যা-ওবা বলল, সমস্যা থেকে উদ্ধারের পথ না বাতলে দুজনই উল্টো কাহিনি শুনিয়ে দিল। এখন কী করা যায় ?Ñ অপেক্ষা। সত্যিকার অর্থে অপেক্ষা ছাড়া তো আর কিছু করারও নেই এখন ; তাই না ? যেচে তো আর ছেলেটিকে জিজ্ঞাসাও করা যায় নাÑ আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো, কেন ফোন করেন আপনি ?

অচেনা কণ্ঠ নয়, গতবার মজা পেয়েছে বলেই বোধ হয়, দীর্ঘবিরতির পরিবর্তে স্বল্প বিরতিতে ফোন করে স্বচ্ছ।

: আপু, প্রতিযোগিতা ছিলÑ আবৃত্তিতে প্রথম হয়েছি।

: আমাকে বাঁচিয়ে রাখবি তো তোরাই ; অভিনন্দন !

: মোস্ট ওয়েলকাম। বিতর্ক প্রতিযোগিতা আছেÑ ঢাকায় আসব। রেকর্ডিং আছে বিটিভিতে ; শুক্রবারে। আচ্ছা আপু, এই রেকর্ডিং-এর বাংলা যেন কী ?

: বাণীবদ্ধকরণ।

: বা-ণী-ব-দ্ -ধো-করণ ! বাব্বাহ ! বাংলা এত কঠিন কেন ?

: সহজ করে নিলেই সহজ। দৃশ্য শব্দ-ধারণও বলতে পার টিভি রেকর্ডিং-এর ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ বেতার-এ বলে থাকে ‘শব্দগ্রহণ’। তবে মূল জায়গাটা হচ্ছে, ইচ্ছাশক্তি আর চর্চার অভাব। অভ্যাস নেই বলেই অনায়াসে বলতে পার না।

: আমি এত কিছু করি, আমারই এই অবস্থা ! আর সাধারণ জনগণকে তা হলে কী কী সমস্যায় পড়তে হয়, ভেবে দেখ।

: আচ্ছা ভাবব। এখন বল তো, দেখা হবে কবে আমাদের ?

: তুমি টাঙ্গাইল আর আসছ না কেন ?

: তাতে কী ! তুমি না ঢাকায় আসছ ?

: এ-ত দূর ! জ্যাম ! তাছাড়া, টানা রেকর্ডিং করে তো, সারাদিন লাগে। দল নিয়ে আসব। রাতেই ফিরে যাব।

: তুমি তা হলে দলনেতা ? দায়িত্ববান কর্মী ?

: হ্যাঁ…, আমিই তো সব ঠিক করি। তবে, মা-ও আসবেন সঙ্গে। মা’র কলেজ খোলা বলেই চলে যেতে হবে শুক্রবারেই। বাদ দাও ওসব কথা। আচ্ছা, সেদিনের মতো স্কুলজীবনের মজার কোনো ঘটনা বলো না।

: মজার ঘটনা আমি পাব কোথায় ? তাছাড়া, বলার আর শোনার আগ্রহ কি কৌতূহল সব সময় তো সমান থাকে না ; আবার একই ঘটনা কারও কাছে মজার, কারও কাছে বিব্রতকর, কারও কাছে কষ্টের হতে পারে সময়, মানসিক অবস্থা আর পরিস্থিতিবিশেষেÑ তাই না ?

: তা সত্যি। ঠিক আছে, তা হলে অন্য কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলো স্কুলজীবনের। নইলে আমারটা শোনো।

: আচ্ছা বলছি। কথা বলছিলাম আর মনে মনে খুঁজেছিলাম। পেয়ে গেছি। সম্ভবত সপ্তম শ্রেণিতেই পড়ি তখনÑ না, সম্ভবত না, সত্যি সত্যিই। আমার চার নম্বর বোন বিয়ের পর প্রথম গর্ভধারণ করেছে বলে মা’র বাড়িতে এসেছে ক’দিন বেড়াতে। তোমাকে তো আগেই বলেছি ওঁ আমার প্রথম গুরু, হাতেখড়ি ওঁর কাছেই। পড়াতেও পারত বটে ! বাংল-গণিত-ইংলিশ সব বিষয়েই পারদর্শী ছিল। আরে ওঁর বিয়ে হয়ে গেল বলেই তো আমার পড়াশোনা গোল্লায় গেল।

: হি-হি-হি। তারপর ?

: ও যখন, মানে যেদিন সকালে সাভার থেকে এসেছে, সেদিন দুপুরে আমার ইংলিশ সেকেন্ড পেপার পরীক্ষা। এ-বিষয়েও আমার দখল তেমন একটা নেই, তবে গণিতের মতো নয়। সে-সময় সবই মুখস্থ করতে হতো। এটা ভালো লাগত না মোটেও। চেষ্টা করতাম, যত সামান্যই বুঝে থাকি না কেন, তা দিয়েই পেট কাচিয়ে লিখতে।

: মানে !

: তোমাদের যুগে যা সৃজনশীল মানে সৃষ্টিশীল লেখা, আমাদের যুগে তা-ই ছিল পেট কাচিয়ে লেখা ; আমার বান্ধবীরা তাই বলতো আর কি !

: হি-হি-হি, মূল ঘটনা বলছ না কেন ?

: ভনিতা বা ভূমিকা ছাড়া বললে বুঝবে না তো !  তো  যাই হোক, বইপত্র উল্টে-পাল্টে দেখলাম, যা পারি যেটুকু পারি, সেটুকু দিয়ে পাশমার্ক ওঠাতে পারব। ভালো ফলাফল করতে চাইলে বাকিটুকু নতুন করে মুখস্থ করতে হবেÑ যা অসম্ভব আমার কাছে এই মুহূর্তে। পরীক্ষা মাত্র দু’ঘণ্টা বাকি। অথচ বাসায় নতুন গল্পের বই এসেছে প্রায় সমবয়সী ভাতিজাদের মাধ্যমে। পড়েই, দিয়ে দেবে। আমার পরীক্ষার শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। কী আর করা ! গল্পের বই নিয়ে গোসল করার অসিলায় ঢুকলাম স্নানঘরে। থাকতাম তো বড়ো পরিবারে। ব্যক্তিগত ঘর বলতে তখন কিছুই ছিল না। স্নানঘরও একটাই। ব্যস, একটু পরেই সবাই টের পেয়ে গেল। কোনো একটা ফুঁটো দিয়ে দেখে রাগে অন্ধ হয়ে আমার বোন পাগলের মতো স্নানঘরের দরজা ধাক্কাতে শুরু করল, যেন হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়েই দরজা ভেঙে ফেলবে।

: ইহ্ …!

: ভয়ে আমি একপাশের দরজার ছিটকিনি খুলে দিয়েই অন্য পাশের দরজা খুলে উঠোনের শেষ প্রান্তে গিয়ে লুকোলাম। আমার এটা জানা ছিল, লোকলজ্জার ভয়ে আমার বোন উঠোনের শেষ সীমায় আসবে না। কিন্তু সেদিন আমার কীর্তিতে আমার বোনের মাথা এতই গরম হয়ে গিয়েছিল যে, লোকলজ্জা গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা সব ভুলে দৌড়ে গিয়ে দেয়ালের পাশ থেকে আমাকে ধরে এনে ঘরে ঢুকিয়ে ঝাড়ুর শলা খুলে নিয়ে ইচ্ছামতন পিটিয়ে তারপর স্নানঘরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘গোসল করে সোজা স্কুলে যা। পড়তে হবে না।’

: কী হলো ? চুপ কেন ?

: গিয়েছিলে ?

: কোথায় ?

: স্কুলে ?

: হ্যাঁ…। তখন খুব দ্রæত হাঁটতে পারতাম তো। ১২ মিনিটেই পৌঁছে যেতাম প্রায় মাইলখানেক।

: খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করছি, পাশ করেছিলে ?

: টায়ে-টায়ে।

: এইটা আবার কী ?!

: ফেল করতে করতে কোনরকমে পাশের সীমারেখা ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।

: এত কঠিন করে বলো কেন ?

: তুমি বলেই বলি। জানি তো, সবই বোঝ তুমি।

: কত যেন ছিল তোমাদের স্কুলের পাশমার্ক ?

: সরকারি স্কুলে পড়তাম। তার পরও ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হতো আড়াই ঘণ্টায়। চল্লিশে ছিল পাশ। অতি সাবধানী বলে, দড়িটা টান টান রাখতে চাইত আরকি স্কুল কর্তৃপক্ষ। মাধ্যমিকে গিয়ে যেন কারও সমস্যা না হয়।

: একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ?

: করছ-ই তো ; কর।

: যখন তোমাকে মারছিল, তখন তুমি কী করছিলে ?

: নানাকে ডাকছিলাম আর কাঁদছিলাম।

: ও, নানাও তোমাদের সঙ্গেই থাকতো ?

: ধুর ! নানাকে তো চোখেই দেখিনি। আমি জন্মাবার আগেই নানা পরপারে চলে গেছেন।

: তা হলে ? এত মানুষ থাকতে তুমি মৃত নানাকে ডাকতে গেলে কেন ? মাকে পটানোর জন্য ?

: হি-হি-হি-হি, কখনো কখনো বুদ্ধিমানরাও সরল অঙ্ক মেলাতে পারে না।

: তোমার আজ হয়েছে কী ? দার্শনিকের মতো কথা বলছো  কেন ?

: দার্শনিকের সঙ্গে কথা বলছি বলেই, দার্শনিকের মতো কথা বলছি।

: ঠিকই বলেছ। আমার নিজেরও কিছু দর্শন আছে। বলছি, আগে ওই প্রসঙ্গটা শেষ হোক।

: শেষ তো ! কী বাকি আছে আর ?

: কেন, নানাকে ডাকতে কেন বললে না তো ?

: আহ-হাহ্-হাহ্-হাহ্-হা… এই সহজ বিষয়টাও ধরতে পারলে না ? বেতের বাড়ি বা কঞ্চির বাড়ি খেয়ে আমরা বলি নাÑ, ‘না-না, না-না-না, নাÑনা, না, আর করব না’?

তুমুল অট্টহাসিতে ফোনের দু’প্রান্তে দু’জন ফেটে পড়ে আর স্বস্তির মনের মেঘ কেটে যায় কিছুক্ষণের জন্য। ফোন রেখে অনেকদিন পর ও ডায়েরি লিখতে বসে। কিন্তু স্বচ্ছর কথা না লিখে অচেনা কণ্ঠের কথাই আপনমনে লিখে চলে।

: হ্যালো ?

স্বস্তির বদঅভ্যাস আছে, কেউ ফোন করলে সেই ফোন ধরে কখনো ‘হ্যালো’ বলে না। ক্ষেত্রবিশেষে সালাম, শুভ সকাল, জ্বি, হ্যাঁ, বলুন/বলো, বলছিÑ এসব দিয়েই কথা চালিয়ে যায়। অপরপক্ষ বুঝতে না পেরে ‘হ্যাঁলো’ বললে ও উত্তর দেয়Ñ হেলতে পারবো না। শোয়া অবস্থায় থাকলে বলে ‘হেলেই আছি’। অচেনা কণ্ঠের সঙ্গে এই দুষ্টুমিটুকুও করে না ও। অনভ্যাসের কারণে বলেÑ

: জ্বি, হ্যালো ?

: আ…, আজ বিকালে ফোন করলাম। কথা বলা যাবে এখন ?

: বলুন।

: ব্যস্ত নাকি ?

: না শুয়ে থেকে মুঠোফোনে রেডিওর অনুষ্ঠান শুনছিলাম।

: ওহ্-হো, আমি তা হলে, অসময়ে ফোন করলাম। স্যরি।

: নাÑ ঠিক আছে। সমস্যা নেই, বলুন।

: আপনাকে আমি প্রায়ই দেখি।

: কিন্তু দেখা দেন নাÑ আবারও মনে মনে বলে স্বস্তি।

: আপনি আমাকে এখনো দেখেননি ? একই রাস্তা ব্যবহার করেই তো চলাচল করেন আপনি।

: হ্যাঁÑ তা করি। আপনাকে মনে হয় সেই সোমবার এক ঝলক দেখেছিলাম।

: দেখেছিলেন ? কণ্ঠস্বরে খুশি যেন উপচে পড়ে। সেখানে সন্দেহের চিহ্নমাত্র নেই।

: শঙ্কর জামে মসজিদের দিক থেকে কেউ একজন মুঠোফোনের বাটন টিপতে টিপতে সামনের দিকে আসছিল রাস্তা পেরিয়ে …

: ঠিক-ঠিক।

: দাঁড়িওয়ালাÑ

: আরে যাহ্, দাড়ি কবে কেটে ফেলেছি ! বুঝি বা লজ্জা পেল দাড়ি রেখেছে বলে, এমন ভঙ্গিতে অচেনা কণ্ঠ বলে আর স্বস্তি দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ভাবে, তবে এতদিন মনে মনে দাড়িওয়ালা চেহারাগুলোতে ও কাকে খুঁজেছে ! যাও একটা প্রতীক ছিল, সেটাও গেল। এখন অন্ধের মতোই দিশাশূন্য হয়ে বেড়াও হাতড়ে। তিনি তো দেখা দেবেন না ; দেখে বেড়াবেন। ধ্যাৎ, দিই লাইনটা কেটে। তারপর নম্বরটা বøক করে দিইÑ যাক, সব চুকে-বুকে।

স্ব-ভাব যে বুঝতে না রে, সে কি আর এমনি সাধে বিপদে পড়ে ? ভাবে এক, করে আরেকÑ এই হচ্ছে স্বস্তির বর্তমান কাজের ধরন। একেই কি বলে বুড়ো বয়সে ভীমরতিতে ধরা ? তাই ভাবনা অনুযায়ী কিছুই না-করে কথা চালিয়ে যায় ও।

: আপনি থাকেন কোথায় ?

: বলেছি বোধহয়, পুলপাড়ে।

: নিজেদের বাসা ?

: না, আমাদের বাড়ি গোপালগঞ্জে। এখানে ভাড়া বাসায় থাকি। মা আর আমি।

: আপনার শর্টফিল্মের কাজ কতদূর এগুলো ?

: শর্টফিল্ম, টেলেফিল্ম- নাহ্ সালসাবিল সাড়া দিচ্ছে না। ডিমান্ড এত বেশি ওর ! আমার আবার ওকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ। ¯িøম, অভিনয় ভালো করে। বয়সটাও ঠিক আছে। ওকে ভেবেই গল্পটা সাজিয়েছি।

: একটা আবৃত্তি শুনবেন ?

: জ্বি …!

: না মানে আপনি সালসাবিলের প্রসঙ্গে যখন বলছিলেন, তখন হঠাৎ করেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতার একটা স্তবক মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। শুনবেন ?

: মানে, এখন শোনাবেন ? আপনি ?

: হ্যাঁ। তবে আবৃত্তি শেষ হলেই আমি ফোনটা রাখব।

: ওকে।

: মনেরে আজ কহ যে,

ভালো-মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

তোমার মাপে হয়নি সবাই

তুমিও হওনি সবার মাপে,

তুমি মর কারও ঠেলায়

কেউ বা মরে তোমার চাপেÑ

তবু ভেবে দেখতে গেলে

এমনি কীসের টানাটানি ?

তেমন করে হাত বাড়ালে

সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি।

আকাশ তবু সুনীল থাকে,

মধুর ঠেকে ভোরের আলো,

মরণ এলে হঠাৎ দেখি

মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো।

যাহার লাগি চক্ষু বুঁজে

বহিয়ে দিলাম অশ্রæসাগর

তাহারে বাদ দিয়েও দেখি

বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর।

মনেরে তাই কহ যে,

ভালো মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

প্রাণভরে আবৃত্তিটুকু ক’রে শেষ হওয়ামাত্র মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় স্বস্তি। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই একটা মুঠোবার্তা চলে আসেÑ … ধলশব ংধৎধৎধঃ ধসধৎ শধহব ষবমব ঃযধশনব. ঔঁংঃ নবধঁঃরভঁষ ! কণ্ঠস্বর  বলছে, সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ। বাচনভঙ্গিতেও তাই মনে হচ্ছে। অথচ শব্দ-বাক্য চয়নে যথেষ্ট সংযত, সচেতন এবং সংবেদনশীল। স্বস্তির মনে হয়, আজকালকার ছেলেপুলের মতো তো না এই ছেলেটি। শুদ্ধ, স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলছে। কথা বলছে বলুক না, বিরক্ত তো আর করছে না। দেখা যাক কী হয়। ছেলেটির মুঠোবার্তার ভাষায় আচ্ছন্ন হয়ে বারকয়েক খুলে খুলে দেখে মুঠোবার্তাটি। অজানা এক ভালোলাগায় ওর মন ছেয়ে থাকে।

মন আর হৃদয় কি আলাদা কোনো কিছু ু? কী বলে গানে এসব ! সকল কথার মরণ হলে হৃদয় কথা কয়, সেই কথাও মনের কাছে নয়রে গোপন নয়Ñ সৈয়দ আবদুল হাদীর গান বাজছে বেতারযন্ত্রে আর স্বস্তি ভাবছে, কারো কারো চেহারা এমন থাকে যে, একবার দেখলে দ্বিতীয়বার দেখামাত্রই চেনা যায়। আবার কারো চেহারা বেশ কয়েকবার না-দেখলে আলাদা করে মনে থাকে না। এই ছেলেটিও বোধহয় সেরকমই। নইলে প্রায় তিনমাস হতে চলল, এখনো কেন চিনতে পারছে না স্বস্তি ! রাস্তায় চলাচলকারী যেকোনো ছেলেকেই মনে হচ্ছেÑ এ-ই বোধহয় সে-ই। আবার একইসঙ্গে মনে হচ্ছেÑ ধুর ! সেই কোনো এক সোমবারে আবছা দেখা ছেলেটির মতো তো একটাকেও মনে হচ্ছে না ! কেমন যেন এক ঘোরলাগা সময়ে বাস করছে স্বস্তি। যার কোনো পরিণতি নেই, এমন অকারণ কৌতূহল কেন ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে ভেবে শঙ্কা বোধ করে। একা একাই ভাবে, আচ্ছা ভুল করে বা ইচ্ছে করেই ছেলেটি ওকে নিয়ে কোনোরকম স্বপ্ন দেখছে না তো ? অল্পবয়সী, চোখে রং লাগা ছেলে ভুল করতেই পারে, ভুল ভাবনায় তাড়িত হতেই পারে। কিন্তু স্বস্তি এই মধ্যবয়সে যদি পরিবেশ আর সমাজের জন্য অস্বস্তিকর কোনো সম্পর্ক বয়ে নিয়ে বেড়ায় সেটা তো উদ্বেগজন্ক ; ধর্মের কথা না হয় তোলাই রইল।

: কী ভাবছেন ?

: আপনার কথাই।

: আমার কথা ! কী সৌভাগ্য আমার ! আপনার ভাবনার জগত তাহলে দখল করতে পেরেছি আমি ?Ñ আপনমনে একতরফা ভাবতে গিয়েও স্বস্তি বলার মতো আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। স্বচ্ছ ফোন করলে ও কত কথাই না বলে। মনের চোরাগলিপথ নিমেষে উন্মুক্ত করে দেয়। কোনোরকম বাধো বাধো ঠেকে না। অথচ অচেনা কণ্ঠের সঙ্গে দুটো সংলাপের পরই আর এগুতে পারে না। কী বলবে ? আসলেই তো বলার কিছুই নেই। এরকম দোদুল্যমান মানসিক অবস্থায় একতরফা জোর করে কোনো সিদ্ধান্তেও তো পৌঁছা দুষ্কর। এটা ঠিক, ছেলেটার সৌজন্যবোধ, বিনয় ওকে মুগ্ধ করে। ওর ভালো লাগে। আবার ‘কেন ভালো লাগছে’, এটা ভেবে চরম অস্বস্তিবোধ হয়। নিজের কাÐজ্ঞানহীনতায় নিজের ওপর এক সময় বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, নাহ্, আর ফোন ধরবে না ; করবে তো না-ই।

এত অন্তর্দ্ব›েদ্ব জ্বলেও নিজে থেকে ফোন স্বস্তি কেবল একদিনই করেছিল, গৃহশিক্ষক খুঁজে পাচ্ছে না জানাতে। তারপর নজরুলের ভাষায় ‘আপন অতলতায় ডুব দিয়েছে।’ আর ভাবছে, এ কেমন ভ্রান্তি আমার ! একেই কি বলে নিশিতে পাওয়া ? কারণহীন একটা বিষয়ের দিকে ঝুঁকে থাকা।

এই উটকো ঝামেলার মধ্যেই আরেকটা বিষয় যুক্ত হয়, যা স্বস্তির মানসিক টানপোড়েন আরো বাড়িয়ে দেয়। বছর দুয়েক আগে কোনো এক সোমবার খবর পড়তে যাওয়ার পথে একজনকে দুধের পাত্র নিয়ে যেতে দেখে, স্বস্তি চলার গতি থামিয়ে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরদিন এক কেজি দুধ দিতে বলে। ঠিক হয়, ৭০ টাকা কেজি দরে দু’একদিন নিয়ে খেয়ে দেখা হবে। বাসার সবাই সন্তোষ প্রকাশ ক’রে, একমত হলে সামনের মাস থেকে নিয়মিত দুধ নেয়া হবে ; নইলে এই ভাংতি মাসের পাওনা টাকা মিটিয়ে দিয়েই নিষেধ করে দেওয়া হবে। না, নিষেধ করতে হয়নি। দুধ নেওয়া সেই থেকে চলছে। কোনো ঝামেলা ছাড়াই দুবছর পেরিয়েছে। স্বস্তির দেখাদেখি পাশের বাসার দুটো পরিবারও ওর কাছ থেকে দুধ নিচ্ছে। দুধের মূল্যবৃদ্ধিও হয়নি। হঠাৎ করেই দুবছর পর একদিন দুধ নেওয়ার সময় গোয়ালার কথা শুনে আর আচরণে মজা পেয়ে হাসতে হাসতে ভাবি তেতলায় ফেরে। বিষয় কী ? বিষয় হচ্ছে, ভাবির ননদকে নাকি টেলিভিশনে দেখ যায় ! গোয়ালা দেখেছেন। ওঁদের সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে এটা ওর জন্য বোধহয় খুব গৌরবের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দুবছর যাঁর কাজকর্ম ছিল রোবোটিক, দুবছর পর চেনা মানুষের  অচেনারূপে আবিষ্কার করে সেই গোয়ালার আচরণ যায় বদলে। ওঁ একটু আলগা খাতির করতে চেষ্টা করেন। দুধ নিতে স্বস্তি নিচতলায় নামলে সালাম দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। দুধ চাহিদার চেয়ে বেশি দিয়ে দিতে চান। বলেন, বাড়তি দুধের দাম দিতে হবে না। দই বানিয়ে এনে খাওয়ানো।

ঈদের সময় সবাই যেখানে বকশিশ আশা করে, দুধের দাম বাড়িয়ে দেয়। সেখানে ম্যাডাম (!)কে টিভিতে দেখা যায় বলে গোয়ালা যেন একতরফাই আত্মহারা ; ওর কোনো চাহিদাই  নেই ; একদিন জিজ্ঞাসা করে বসেন, ‘ম্যাডাম, স্যার কী        করেন ?’ উত্তর দিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে স্বস্তি। ওঁর আন্তরিকতার বিপরীতে নিজে আন্তরিক হবে, ব্যাপারটাকে সহজভাবে নেবে, নাকি রূঢ় আচরণ করবে ? অন্য সময় হলে হয়ত গোয়ালার এই আন্তরিকতা ওর ভালোই লাগত, নিজমনে গর্ববোধ করত। কিন্তু অচেনা কণ্ঠের সঙ্গে বিব্রতকর সম্পর্কের কারণে এখন অন্য যেকারো যেকোনো ধরনের আচরণই ওর কাছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দুলতে থাকে। ত্বরিতগতিতে ভেবে নিয়ে মুখে কিছু না বলে তাই ডানে-বামে মাথা নাড়ায় স্বস্তি। ব্যস, মুহূর্তেই স্বগত সংলাপ যেন বিধাতার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেন গোয়ালাÑ ‘আমরা দিন-রাইত খাইট্টা মরি আর উনারা বাড়িওয়ালা হইয়া বইসা বইসা খায় ; কাজ করতে হয় না। কী আরাম !’ পেট ফেটে যেন হাসি বেরুতে চায় স্বস্তির। তিন লাফে তিনতলায় উঠে এসে গোয়ালার মন্তব্য ভাবিকে জানাতেই, বাড়িশুদ্ধ সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। আর এরপর থেকেই দুধ নিতে স্বস্তিকে নিচে যেতে নিষেধ করেন বড়োভাই। নিজে যান বা ছেলেকে পাঠান ; যদিও স্বস্তিই রাখছে দুধ। এই সরল লোকটাকে খুঁজে বের করার কৃতিত্বও ওর।

কোনো পক্ষের কোনো উত্তেজনাই আসলে বেশিদিন থাকে না, প্রশমিত হয় ; হতে বাধ্য। সময় মলমের কাজ করে। গোয়ালার কৌতূহল তুঙ্গে উঠে একসময় থিতু হয়। শুধু অচেনা কণ্ঠের ব্যাপারটাই বিস্ময়বোধক চিহ্ন হয়ে স্বস্তির জীবনযাপন দুর্বিষহ করে তোলে। ফোনালাপের সময় অচেনা কণ্ঠ কখনোই বলেনি যে, স্বস্তিকে টিভিতে দেখেছে বা দেখে। দেখে থাকলে নিশ্চয়ই বলত। স্বস্তিও কেন যেন নিজ থেকে নিজের সম্পর্কে কিছু জানাতে আগ্রহ বোধ করেনি। কোনো এক বছর ঈদের অনুষ্ঠানমালায় হালের ক্রেজ জাররাফ হকের নাটক দেখে ওর মনে হয়েছিলÑ এ কী দেখাচ্ছে ? আর ওরাই বা কেন দেখছে ? আগা-মাথা, শুরু বা শেষ কিছুই নেই। বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার জোড়াতালিমার্কা নাটক। তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে হাসাচ্ছে ; ব্যস এটুকুই। দর্শককে হাসানোর একক কৃতিত্ব মনে হচ্ছে জাররাফ হকেরই। নাটক শেষ, তো বিনোদনও শেষ। একবিন্দু ভাবায় না দর্শককে। রেশ থেকে যায় না মনে। স্বস্তির মনে হয়, ওর বাস্তব জীবনেও এখন যেন সেরকম নাটক চলছে। নিজেই দেখছে আবার নিজেই তাতে অভিনয় করছে, শুধু উপভোগ করতে পারছে না, আনন্দের সঙ্গে অনুভব করতে পারছে না ; পার্থক্য এটুকুই।

 

চন্দ্রগ্রস্ত স্বস্তির একসময় মনেও হয়, তুচ্ছ একটা ঘটনাকে লকেট করে গলায় ঝুলিয়ে রেখে নিজের জীবনকে ও নিজেই বিষিয়ে তুলছে না তো ? নিজেই নিজেকে বলে, সহজভাবে নাও বিষয়টিকে। হয় কেজুয়ালি হ্যান্ডেল কর, নয় ভুলে যাও সবচেয়ে ভালো হয়, ফোন আর ধরো না। কিছুদিন চুপচাপ থেকে দেখ, অপরপক্ষ কী করে ?

এবার বোধহয় কিছুটা কাজ হয়। স্বাভাবিক কাজকর্মে ডুবে থেকে স্বস্তি কিছুটা স্বস্তিবোধ করে। আপনমনে কাজ করে যায় ও, চলতি সম্পর্কগুলোকেই রক্ষা করে, গুরুত্ব দিয়ে। এই যেমন, সেধে সেধে জানাতে চায়, ‘বাজারে যাচ্ছি, কারো কিছু লাগবে কিনা ?… ও, গ্যাস-বিল দেওয়া হয়নি ? আমি তো যাবই, দিয়ে দেব।’ ভাতিজা-ভাতিজিকে বলে, ‘একটা নতুন পাঠাগার হয়েছে। চলো, তোমাদের দেখিয়ে আনি।’ সেমাই দিয়ে নাড়– বানাতে শিখেছে। শখ করে প্রায়ই বানায়। পরিচিত সবাইকে খাওয়ায়। গড়গড়িয়ে চলে যায় দিন ; শঙ্কাহীন।

প্রায় ছয় বছর পরে হঠাৎ করে একদিন ভোরে ফোন করে সহজ। ওর কথা স্বস্তি প্রায় ভুলেই ছিল। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে স্বস্তি একটা মঞ্চনাটকের দলে কাজ করত। ‘হানাদার’ নাটকে মা-র ভূমিকায় অভিনয় করার পর থেকে ওকে বেশ ক’জন ‘জননী’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। সহজ তাদেরই একজন। বিভোর আর সহজ মা-এর ছেলে হিসেবে পাল্টাপাল্টি করে অভিনয় করত। বিভোর কালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে। সহজ মাঝে-মধ্যে ভুঁস করে ভেসে ওঠে।

: কী রে, মা-জননী, আছিস কেমন ? তুই তো আর আমাদের খোঁজ-খবর রাখিস না। আমাদেরই প্রাণের টানে তোর খোঁজখবর নিতে হয়।

: এই তার নমুনা ! ছ’বছর পর ! আবার গলা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে ! আরে, ছেলেই তো মা’র খোঁজ করবে। মা কেমন আছে, জানার দায়িত্ব কার ? ছেলের না ? তুই তো দায়িত্ব-কর্তব্য কিছুই পালন করিস না। ফোন করেই খালাশ।

: নাহ্, তুই আর মানুষ হলি নারে। সবকিছুই বদলায়। তুই একইরকম আছিস।

: এই, মার সঙ্গে এ কী ধরনের কথা, অ্যাঁ ? আদব-কায়দা কি সব শিকেয় তুলে রেখেছিস ?

: তা তো রেখেছিই। সঙ্গে আরেকটা জিনিসও। মনে আছে, আমি বিয়ে করব শুনে তুই সদ্য কিনে আনা ক্লিপের পাতা দিয়েছিলি বউকে দিতে ? সেটাও রেখেছি, সযতনে।

: বলিস কী ? আজব পাবলিক তো তুই ! স্মৃতির তোরঙ্গে সব তুলে রাখলে কি হবে ? ব্যবহার করতে দে। তোর বউটা বলবে কী রে ? ভাববেই-বা কী ? কৃপণ শাশুড়ি আম্মা যাও বা একটা সামান্য জিনিস উপহার হিসেবে পাঠাল, হাড় কেপ্পন ছেলে দেখি সেটাও যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছে। বলি, তোর মতলব কী রে ?

: মতলব ? সে তো আছে চাঁদপুরে। আরে-মতলব-টতলব কিছু না। তুই তো আসিসও না, দেখিসও না। নাতনি দুটোও বড়ো হয়ে যাচ্ছে। কয়দিন পর ওদের কেপ্পন দাদিমার সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে না ? তাই, নমুনা সংরক্ষণ করে রাখছি আর কি।

: কোনটা বলব, তোর মুখে ফুল-চন্দন পড়–ক নাকি আল্লাহ তোকে বেহেস্ত্-নসিব করুক ?

: এই খবরদা ! ফুল-চন্দন আগেই পড়ছে। আর ঘটনা কী ? মা হইয়া তুই তোর আগেই ছেলেরে জান্নাতবাসী করতে চাস ? কেমন মা তুই ?

: পৃথিবীর কোথায় আছে যে, ছেলে তার মায়ের সঙ্গে এরকম ভাষায় কথা বলে ? ভাষা ঠিক কর আগে। আর বুঝলাম না তো, এতক্ষণ ধরে বাত্চিত্ হচ্ছে, বৌমা আর নাতনিরা কই? ওদের আওয়াজ তো পাই না !

: ফজরের নামাজ পইড়া হাঁটতে বাইর হইছি। তোর বৌমা মেয়ে দুইটারে নিয়া স্কুলে দিয়া আসবে। আল্লাহর মর্জি, দুইটাই ভিকারুন্নেসায় পড়ে। দোয়া করিস।

: ও, জাতে মাতাল তালে ঠিক ! শোন, দোয়া করতেও হয় না, চাইতেও হয় না। মানুষরে খুশি করলে দোয়া আপনা থেইকাই বৃষ্টির মতো ঝরঝরাইয়া পড়ে। এই যেমন ছয় বছর পর ফোন কইরা তুই আমারে খুশি করছস। তাই আমি সন্তুষ্টচিত্তে কহিতেছি যে, আপনি এবং আমি উভয়েই বাংলাদেশের রোড অ্যাক্সিডেন্টরে পাশ কাটাইয়া, ভূমিকম্পে চাপা না পইড়া, বায়ু দূষণেরে তুড়ি মাইরা উড়াইয়া দিয়া, কর্কটের খামচি না খাইয়া দীর্ঘজীবী হইব, যাহাতে আগামী ছয় বছর পরে আবার তুই আমারে ফোন করতে পারস আর আমি সেই ফোন ধরতে পারি।

: আ-মি-ন ! যোগ্য পোলার যোগ্য মা রে তুই… মনের অর্গল খুলে কথা বলে স্বস্তি। ঠাট্টা-মশকরা শেষ হলে দুজন দুজনের খোঁজ-খবর নেয়। এরকম দীর্ঘ বিরতিতে কেউ ফোন করলে বা বেড়াতে এলে কূল উপচানো আনন্দে ভাসতে থাকে স্বস্তি। পরবর্তী কাজ আর কথাতেও তার রেশ লেগে থাকে। অথই আনন্দের ভেলায় ভাসছিল বলেই কি না জানে না, অচেনা কণ্ঠ ফোন করামাত্রই ধ’রে, মধুমাখা স্বরে কথা বলেÑ

: জ্বি, বলুন ?

: কেমন ছিলেন ?

: ভালো।

: আচ্ছা আপু, আপনার পুরো নামটা যেন কী ?

: সে কি, আমার নামটাও জানেন না, অথচ বলছেন ‘চেনেন’, কথা বলছেন এতদিন ধরে !

: নাÑমানে, আপনার শাড়ি পরা মানে, পরা শাড়ি দেখতে দেখতে আপনাকে দেখা, মানে চেনা হয়ে গেছে।

: থাক। আর মানে-মানে করতে হবে না। আমার নাম সহিষ্ণু অন্তর্লীন স্বস্তি।

: বাঙালির বাঙলা নাম। বাহ্ ! প্রথম শুনলাম।

: কী-ই ?

: এরকম নাম। আচ্ছা আপু, এত সুন্দর করে শাড়ি আপনি কীভাবে পরেন ? কী স্বচ্ছন্দে হেঁটে যান শাড়ি পরে ! দিন শেষে নষ্টও হয় না।

: এক কথা কতদিন, কতবার বলবেন ? শাড়ি পরার প্রশংসা করা ছাড়া কি আর কোনো কথা নেই ?

: স্যরি-স্যরি-স্যরি-স্যরি, দুঃখিত।

: আবারও তো এককথাÑ একশব্দ চারবার বললেন।

: ওহ্-না-মানে-আমি, আমি খুব খুশি আজ। আপনি আজ সহজভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছেন।… কী হলো, আবার চুপ কেন ?

: কী বলব ?

: কী বলবেনÑ আচ্ছা… ভাইয়া কী করেন ?

: কোন ভাইয়া ? আমার ভাইয়া ?

: না, আমার ভাইয়া, মানে দুলাভাইÑ

: কিছুই করেন না।

: কিছুই করেন না ! দুষ্টুমি করছেন নাকি বলতে চাচ্ছেন না ? থাক, না বললে নাই।

: না-মানে আপনার দুলাভাই নেই তো, তাই ওকথা বলেছিলাম।

: কোথায় গেছে ? মানেÑ কোনো স্যাড নিউজ ?

: কোথাও যাননি। আসলে,… আমি বিয়ে করিনি।

: বিয়ে ক-রে-ন-নি ! বিয়ে করেননি মানে… সত্যি ?

: সত্যি না তো কি মিথ্যা ?

: আমি কী জানি !

: জ্বিÑ সত্যি। সত্যিই বিয়ে করিনি।

: কেন করেননি ? কাউকে পছন্দ হয়নি ? কেউ কি আপনাকে কষ্ট দিয়েছে ?

: আরে নাহ্ ! ওসব কিছু না। আমাকে টানেনি ; তাই করিনি। খুব সহজ কারণ।

: কী টানেনি ?

: এই যে বিয়েÑসংসার জীবন ; এসব আর কী।

: ‘একা’ লাগে না কখনো ?

: আসলে হয়েছে কি, জন্মের পর থেকেই চারপাশে এত মানুষ পেয়েছি যে, উল্টো মনে হয়েছেÑ কখন একটু একা হতে পারব ? বড়ো পরিবারে বড়ো হয়েছি তো, একাকীত্ব বোধ করার সময়-সুযোগই হয়নি !

: তা-র-প-রও, নিজের একান্ত আপজন বলে কাউকে ভাবতে ইচ্ছে হয়নি ?

: আমি বোধহয় একটু উল্টোপাল্টা আছি ; সবার মতো নই।

: কী রকম ?

: ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজি তারে আমি আপনায়’Ñ অন্য কোথাও নয়।

: ওÑ ঠিক বুঝলাম না যদিও ; থাক সে প্রসঙ্গ।

: শুধু প্রসঙ্গ নয়, আজকের মতো কথাও থাক। অন্য একটা কল ঢুকেছে ফোনে। আমি ওটা ধরছি।

সদানন্দ দা’ নেপথ্য কণ্ঠস্বর নেওয়ার ব্যাপারে ফোন করে প্রথমে স্বস্তির আগ্রহ আর সময় মাপলেন। ছোট ছোট সংলাপ আর গান মিলিয়ে দশ-বারো জনকে লাগবে। ওকে পরিচিত দুচারজনকে নিয়ে আসতে বললেন ছেলেমেয়ে মিলিয়ে। ওর ফোন ছেড়েই স্বস্তি ব্যস্ত হয়ে পড়ল নেপথ্য কণ্ঠ খুঁজতে। এ-বিষয়ে মেয়েরা বেশ অগ্রসর। নেপথ্য কণ্ঠস্বরের কাজে দক্ষ অনেকেই কিন্তু ছেলের সংখ্যা বলতে গেলে হাতে গোণা। সম্মানজনক সম্মানী সবসময় পাওয়া যায় না বলেও হয়তো গণআগ্রহের সৃষ্টি হয় না। এখানেও সম্মানী তথৈবচই হবে। তাই, এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে, যার কাছে সম্মানীটা মুখ্য নয়। কাকে বলা যায়Ñ ভাবতে ভাবতেই অশেষের কথা মনে পড়ে।

কুমিল্লায় আবৃত্তি কর্মশালায় গিয়ে পরিচয়। বছর দুয়েকের ব্যবধানে দুবার যেতে হয়েছিল। ছেলেটির ওপর ভার ছিল স্বস্তিকে স্বস্তিতে রাখার। সার্বক্ষণিক পাশে থেকে খুব যতœ করে স্বস্তিকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে বিআরটিসির এসি বাসে তুলে দেওয়া পর্যন্ত সব দায়িত্বই খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিল অশেষ। ওর নামটা প্রথম শোনার পর কানে কেমন যেন অচেনা-অচেনা ঠেকছিল, তাই স্বস্তি কথার শুরুতেই সন্দেহের তীর ছুঁড়ে দিয়েছিল Ñ

: নিজ পছন্দে বানানো নাম নয় তো ? অশেষÑ এরকম নাম আবার মানুষের হয় নাকি ? মানুষ তো আর অবিনশ্বর নয় যে ফুরোবে নাÑ ক্ষয় হবে নাÑ মাটিতে মিশে যাবে না কোনোদিন ?

: মানুষের নাম যদি অবিনাশ, অনন্ত, অসীম, চিরন্তন হতে পারে ; তা হলে অশেষ হতে পারবে না কেন ? আমি যদি রবীন্দ্রনাথের-নজরুলের মতো করে স্বপ্ন দেখি ? যদি আমি চাই, মহাপৃথিবীর অংশ হয়ে গেলেওÑ আমারে দেব না ভুলিতে ?

: সেভাবে ভাবতে পারলে, তোমার কর্মফল তোমায় ‘অশেষ’ বানালেও বানাতে পারে। ছেলেটি কুমিল্লা বেতারে কাজ করত। একসময় এনওসি নিয়ে ঢাকায় আসে। পুরুষ কণ্ঠস্বরের অভাব বলেই নিজ যোগ্যতায় দ্রæত জায়গা করে নেয়। অশেষ ঢাকা বেতারে আসার পর প্রথমদিকে প্রতি সোমবারের খবর পড়তে বসে স্বস্তি অনুভব করত, কাচের ওপাশে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। ইচ্ছে করেই তাকাত না। সজীব অনুষ্ঠানে অনেক সময় অকারণে কথা জড়িয়ে যায়Ñআটকে যায়, কাচের ওপাশে পরিচিত কেউ থাকলে। স্বস্তি এ-ধরনের ভুল করতে চায় না বলেই তাকাত না। খবর পাঠ শেষে ব্যুথ থেকে বেরুলে কোনো একটা ছুঁতো ধরে ছল করেই বোধহয় প্রশংসার ফুলঝুড়ি ফোটাতো অশেষ। গোড়াতে তাই পাত্তা দেয়নি। একসময় আবিষ্কার করে, ছেলেটি গতানুগতিকতায় গা ভাসানো স্বভাবের নয় বরং চেষ্টা করে মূলানুগ হতে। ও আসলে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে আগ্রহী বলেই স্বস্তি খবর পাঠ করছে টের পেলেই পাশের ঘোষকদের ব্যুথ থেকে ছুটে এসে একান্তে দাঁড়িয়ে, শোনে। দ্বিধা থাকলে জিজ্ঞাসা করে দ্বিধা কাটায়।

কুমিল্লার মানুষ সাধারণত ‘আপনি’ সম্বোধনে অভ্যস্ত। অশেষের গায়ে ঢাকার বাতাস লেগেছে বলেই ‘ম্যাডাম-আপনি’ আপনা থেকেই ‘আপু তুমি’তে পরিণত হয়। কবে যে হয়েছেÑ স্বস্তি জানেও না। এ ব্যাপারে ওর কোনো শুচিবাই নেই বলে বিষয়টিকে দেখেও দেখে না। হ্যাঁ, ওকে নেয়া যেতে পারে। কাজে ফাঁকি দেয় যারা, অশেষ সেই দলে পড়ে না। ওকে ফোন করে নিশ্চিত হয় স্বস্তি। আগামীকাল স্টুডিওতে যাবে অশেষ।

পরদিন ছিল শুক্রবার। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটানা কাজ চলে খাবারের বিরতি ছাড়া। স্বস্তির বাসাই কেবল হাঁটাপথের দূরত্বে। বাকি সবাই দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে। কণ্ঠস্বর দেওয়ার কাজ শেষ হলেও শুদ্ধিকরণ আর সম্পদনার স্বার্থে স্বস্তি তাই আরো ঘণ্টা দেড়েক সময় কাটায় স্টুডিওতে। যখন ফিরছে বাসায়, শঙ্কর জামে মসজিদ পার হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মুঠোফোন বেজে ওঠে। ব্যাগ হাতড়ে ফোন বের করে আধো-আলো আধো-অন্ধকারে রিডিং গøাস ছাড়াই দেখতে পায় ‘অচেনা কণ্ঠ’ ফোন করেছে। কী ব্যাপার ! হঠাৎ সরাসরি রাত সাড়ে ১১টার পরে ফোন ! ও, ভাইয়া নেই জেনে গেছে বলে ভেবে বসে আছে যে, গভীর রাতে তা হলে ফোন করা যাবে ? বিড়াল প্রথম রাতেই মারতে হয়। আজ ফোনটা ধরলে বা কেটে দিলে অচেনা কণ্ঠ টের পেয়ে যাবে যে, স্বস্তি রাত-জাগা পাখি। হ্যাঁ, স্বস্তির ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায়ই রাত দেড়টা-দুটো বাজে। কিন্তু ওর ওইটুকু সময় বরাদ্দ রেডিওতে প্রচারিত নাটক, আবৃত্তি বা সরাসরি আলাপন-গান শোনার জন্য। সে-সময় কেউ ফোন করলে রীতিমতো বিরক্ত হয়। তাই, মুঠোফোনটা হাতে ধরে রেখেই স্বস্তি পথ চলে। একবার রিং হয়ে বন্ধ হয়ে যাবার পর অচেনা কণ্ঠ দ্বিতীয়বার ফোন না-করায় আশ্বস্ত হয়। যাক, মাত্রা ছাড়ায়নি তা হলে। এটা বাটনে চাপ লেগে ভুল করে চলে আসা ফোনও তো হতে পারে। যেটাই হোক, এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের ভাবনার কিছু নেই।

কাজ, কাজ আর কাজ। পাÐুলিপি তৈরি করা-শ্রæতি অভিনয়ের পাত্র-পাত্রী নির্বাচন-মহড়া করানোÑ

বাণীবদ্ধকরণ-সম্পাদনা করা আবহসংগীত খুঁজে এনে সংযোজন করাÑ এসব কাজের মধ্য দিয়ে কোথা দিয়ে যে উড়ে যায় দশ-বারো দিন ; বলতে পারবে না স্বস্তি। ব্যস্ততাই যে সুস্থতাÑ অনুভব করে স্বস্তি। বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিতব্য দলগত নাটকের অতিথি প্রযোজক হিসেবে কাজ শেষ হয়ে গেলে ‘অচেনা কণ্ঠকে’ মনে পড়ে ওর অবসরে। কাল বাদে পরশু নাটকটি প্রচার করা হবে। নাটক শোনার অনুরোধ জানিয়ে সবাইকে ‘মুঠোফোনে’ পাঠানোর সময় দ্ব›েদ্ব ভোগে স্বস্তি ; অচেনা কণ্ঠকে পাঠাবে-কি-পাঠাবে না। একবার ভাবে, দরকার কী ? সেই রাতের পর আর ফোন করেনি অচেনা কণ্ঠ। স্বস্তিও তাকে নিয়ে ভাববার অবকাশ পায়নি। আবার মনে হয়, মুঠোবার্তা পেলে আর নাটকটা শুনলে অচেনা কণ্ঠ আন্দাজ করতে পারত স্বস্তির কাজের পরিধি সম্পর্কে। স্বস্তি সম্পর্কে ও যদি কোনোরকম ভুল ভাবনায় ডুব দিয়ে থাকে, তা হলে ভেসে উঠতে পারত। ভাবনার দোলায় দুলতে দুলতে এক পর্যায়ে ওকেও মুঠোবার্তা পাঠায়। পরদিন সকালেই অন্য একটি ধারাবাহিক নাটকের শব্দগ্রহণ হবে বলে বেরিয়ে পড়ে। দিন শেষে পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরেই সোজা ঘুমের দেশে। সকালে বেশ একটা উৎসবের আমেজ নিয়ে ওর ঘুম ভাঙে। অতিথি প্রযোজক হওয়ার পর এটা ওর দ্বিতীয় নাটক। তুমুল আগ্রহে বয়সে প্রবীণ যাঁরা, ওঁদের ফোন করে জানায় আর নাটক শুনে মন্তব্য করতে অনুরোধ করে। ভুল থাকলে, কী করলে শুদ্ধ হতোÑ জানাতে বলে। সদ্য পরিচয় হওয়া একজন দৃষ্টিহীন অথচ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে ফোন করে নাটকটা শুনতে বলে। ওর ধারণা, যিনি শুধু কানে শুনে জীবনকে এগিয়ে নিতে পেরেছেন এতটা, তিনি নিশ্চয়ই সবচেয়ে সৎপরামর্শ দিতে পারবেন বা দেবেন।

কৌতূহলের তুঙ্গে পৌঁছে নাটকটা শুনতে গিয়ে নায়িকার প্রথম সংলাপেই ধাক্কা খায় স্বস্তি। ক্যাটকেটে লাগছে শুনতে। অনেক বেশি টনটনে। কোথাও কোথাও চিৎকার মনে হচ্ছে। যদিও শেষ অংশে চোখে জল এনে দেয়ার মতো অভিনয় করেছে মেয়েটি। অনেক কঠিন অভিনয়ে সাবলীলভাবে উৎরে গেছে। কিন্তু খুব সাধারণ বাক্য বলার সময় হোঁচট খেয়েছে। স্বস্তি যখন ‘নায়িকার অভিনয় কে কর’বে এ-বিষয়ে ভাবছিল, জনে জনে যাচাই করছিল, তখন ও সবাইকেই শেষের অংশের সংলাপগুলো বলতে বলেছে। বলতেই হয়, এই মেয়েটি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ সফল হয়নি সেই অন্তর্দহন বুক ঠেলে বেরিয়ে আসা কান্নাসহ ফুটিয়ে তুলতে। সম্পাদনার সময়ও সমস্যাটা বোঝা যায়নি। অথচ এখন ওর নিজের কানেই ধাক্কা লেগেছে প্রচারকালীন শুনতে গিয়ে। নায়কের কণ্ঠস্বর এতটাই মোলাযেম-নরম যে, নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি সংলাপে নায়িকা ঝগড়া করছে বলে মনে হচ্ছে। ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গিয়ে স্বস্তি প্রথমে দৃষ্টিজয়ী ব্যক্তিত্বকে ফোন করে। প্রবীণ ভদ্রলোকের মন্তব্যও স্বস্তির অনুভূতির সঙ্গে মিলে যায় শতভাগ। অথচ স্বস্তি কিন্তু নির্দিষ্ট করে কিছ্ ুজানতে চায়নি বা নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ তুলে কোনো কথা আগ বাড়িয়ে বলেনি। মনটা ওর পাতিলের তলার মতো হয়ে যায়। অভিজ্ঞ যাঁরা নাটক শুনে মুঠোবার্তা পাঠান, তাঁরাও সকলেই একই কথা বলেনÑ নায়িকা নির্বাচন ঠিক হয়নি। আহারে ওরা কী করে জানবে, কতজনকে শেষ দৃশ্যের জন্য যাচাই করার পর নির্দিষ্ট গ্রæপের এই মেয়েটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে ! শেষ দৃশ্যের প্রশংসা করতে তো আবার কেউ কার্পণ্য করেনি। এ কাজে স্বস্তি নতুন মানুষ। ও কী করে বুঝবে, যে জটিল অভিনয় সুচারুরূপে করতে পারে, সে সাধারণ অভিনয়ে মার খেয়ে যাবে ? এ-কথা প্রকাশ করায় দু’একজন মন্তব্য করলেনÑ আপনি নিজে কেন করলেন না নায়িকার অভিনয় ? যিনি নির্দেশক, তিনিই যদি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন, তবে সেটা খুব লোভী বা সর্বভুক বা হীনমানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয় স্বস্তির কাছে। তাই ও দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও ওই কাজ কক্ষণো করে না। দরকার হলে নতুন কাউকে শিখিয়ে, তৈরি করে নেয়।

ভর সন্ধ্যায় ভার হয়ে থাকা মনের মতোই আকাশটাকে দেখাচ্ছিল। এর মধ্যেই অচেনা কণ্ঠের ফোনডাক আসে। বিষাদমাখা স্বরে রুটিনমাফিক বলে স্বস্তিÑ

: জ্বি, বলুন।

: শুনলাম।

: জ্বি ?

: নাটকটা শুনলাম

: ওÑ, ধন্যবাদ।

: আপনি কি নায়িকা ছিলেন ?

: না, আমি প্রযোজক। Ñ মুখে বলে। মনে মনে বলে, তাহলে ব্যাটা তুই মুঠোবার্তা কী দেখেছিস আর কী শুনেছিস নাটক যে, এতদিন ধরে কথা বলেও আমার কণ্ঠস্বর চিনিস না !

: প্রযোজক ?

: হ্যাঁ। বেতারে প্রযোজক বলতে আসলে নির্দেশক বা তত্ত¡াবধায়ককে বোঝায়। এক অর্থে পরিচালকও বলতে পারেন।

: ও আচ্ছা। তার মানে, তাকে টাকা খরচ করে নাটক বানাতে হয় না ?

: না। উল্টো, বেতার কর্তৃপক্ষ প্রযোজককে সম্মানী দেয়।

: বাহ্ ! তার মানে আপনার মনে তো আজ খুশির ঢেউ ; তাই না ?

স্বস্তির কেমন যেন সন্দেহ হয়। কী বলছে অচেনা কণ্ঠ এসব ! অন্যান্য শ্রোতার বক্তব্য আর ওর নিজের অনুভূতির সঙ্গে তো মিলছে না কিছুই !

: জানেন, গতকালও দেখেছি আপনাকে ?

: কখনÑ কোথায় ?

: সন্ধ্যার পর যখন বাসায় ফিরছিলেন। খুব সুইট লাগছিল আপনাকে। হতভম্ব স্বস্তি সঙ্গে সঙ্গে ফোন- লাইন কেটে দেয়। আর এই প্রথমবারের মতো অচেনা কণ্ঠ পুনরায় ফোন করে। স্বস্তি ফোনটা না-ধরে ওকে কালো তালিকাভুক্ত করে। স্তব্ধ হয়ে ভাবে, বলে কী, ছেলেটা ! শেষ পর্যন্ত কি থলের বেড়াল তা হলে বেরিয়েই পড়ল ?

গতকাল ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত-ক্লান্ত স্বস্তিকে দেখতে মাটিকাটা শ্রমিকের মতোই দেখাচ্ছিল। ও বোঝেনি যে, ফিরতে রাত হবে। তাড়াহুড়া থাকায় সালোয়ার-কামিজেই কোনোরকমে দৌড়েছে। বাসায় ফিরে দেয়াল-আয়নায় নিজেকে দেখে উলঝলুল মনে হয়েছে। আর অচেনা কণ্ঠ বলে কিনা…! তা হলে, শেষ পর্যন্ত এই ছিল ওর মনে ? অশেষ, সহজ, স্বচ্ছ-র মতো সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মেশার মতো মানসিকতা গড়ে ওঠেনি এখনো ওর। এতদিনে নিজের অস্বস্তির একটা সত্যিকারের কারণ আবিষ্কার করে স্বস্তি। এ-কারণেই কি নিজের দিক থেকেও স্বস্তি পারেনি সহজ হতে ; অচেনা কণ্ঠকে সহজভাবে নিতে ? কথোপকথনে সবসময় এক ধরনের জড়তায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত যে ও নিজেও ; সেটার নেপথ্য কারণ তা হলে এটাই ?

স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় উত্তপ্ত মাথা আরো গরম হয়, যখন দেখে একগাদা মুঠোবার্তা আর বাতিল ডাকে ওর ফোনের পর্দা কাঁপছে। রাগে অন্ধ হয়ে প্রথমে রিংটোন, তারপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাত পার করে স্বস্তি। সেদিন আর ঘুমও হয় না ওর। পরদিনও ধারাবাহিক নাটকের শব্দগ্রহণ থাকায় ভোরের দিকে একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেও।

ছিটকা ঘুম শেষে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে স্বস্তি মুঠোফোন সচল করে। সাতটা বাজে। বাসা থেকে সাড়ে আটটায় বেরুলেই চলবে। পর্দায় পরিচিত স্থায়ী ছবি আর শব্দাবলি ভেসে উঠলে ঠান্ডা মাথায় এবার ও মুঠোবার্তাগুলো পড়তে শুরু করে। অচেনা কণ্ঠ প্রথমে লিখেছেÑ ‘এভাবে হাতে পায়ে ধরে নাটক শোনানোর মানে কী ?… এত রাতে বাড়ি ফেরেন, তারপরও কি সুড়সুড়ি যায় না ?’! আ-চ্ছা, সেই রাতে তা হলে স্বস্তিকে রাস্তায় দেখতে পেয়েই অচেনা কণ্ঠ ফোন করেছিল। স্বস্তি যে ইচ্ছে করেই কথা বলেনি, সেটাও তা হলে তাঁর চোখে পড়েছে। কারণ, সাধারণত এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকার অভ্যাস স্বস্তির নেই। ছ’মাসে বছরে দু’-একদিন এরকম হয়।

‘ঠান্ডা কথার ভান ধইরেন না। লাভ নাই। আপনার ভাব হয় না। মানে ভাব নেওয়ার বয়স নাই। ওইসব ভান আমি খুব ভালো বুঝি। আপনি আমাকে নাকি কখনো দেখেন নাই ! খঙখ! আপনি ওইদিন আমাকে দেখেই নম্বর ঋষবীরষড়ধফ করেছিলেন… সময় থাকতে বিয়ে করেন। না হলে পরে পাগলও জুটবে না।’

‘আপনি যদি একটু সুন্দরী হইতেন, তাহলে একটা কথা ছিল। কিন্তু আপনি তো সুন্দরী না… চলে আর কী ; ড়হব ঃরসব ঁংব গøাসের মতো। ংড়, আপনি তো ভাব নিলে সেই ভাব ধরবে নাÑ এটাই সত্য ; আর সত্যরে লন সহজে। আশা করি এই জীবনে এই প্রথম আপনি এইরকম সত্য শোনলেন। আর একটু সামাজিক হওয়ার ঃৎু  করেন।’

বাড়া ভাতে ছাই পড়লে এরকম উষ্মা প্রকাশই স্বাভাবিক। ভুলটা স্বস্তিরই ছিল। ও কেন নিজের মতো করে সবাইকে ভাবে বা দেখে। তারপরও অচেনা কণ্ঠের শেষ আহŸান রক্ষা করতেই যেন শেষবারের মতো একটা মুঠোবার্তা পাঠায়।

‘মনেরে আজ কহ যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক ; সত্যেরে লও সহজে। দুঃখিত, এই ভুল আর কখনো হবে না। আপনার মুঠেফোন নম্বরটি মুছে ফেলছি। তবুও, যেই হোন না কেন ; আপনার মতো করেই ভালো থাকুন।’

শেষ মুঠোবার্তাটি পাঠিয়ে স্বস্তি মনে করে, ওর মানসিক মুক্তি হলো। অথচ ঘটে উল্টো ঘটনা। পরবর্তী ক’দিন বাসা থেকে বেরুলে আর বাসায় ফেরার সময় আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকে স্বস্তি। ঢাকা শহরসহ সারাদেশে অসংখ্য খুনের ঘটনা সংবাদপত্রে পড়ে, টিভিতে সরেজমিন প্রতিবেদন দেখে ওর মনে আতঙ্ক ভর করে। ওর কেবলই মনে হতে থাকে অচেনা কণ্ঠ যদি ওকে ছুরি মারে, ওকে উদ্দেশ্য করে অ্যাসিড ছোঁড়ে, যদি ওকে খুন করার উদ্দেশ্যে কোথাও ঘাপটি মেরে থাকে। ওতো অচেনা কণ্ঠকে চেনে না। জখম করে পালিয়ে গেলেও তো চিনতে পারবে না। কী যে অস্থিরতা !  কী যে ভয়াবহ আতঙ্কে ওর দিন কাটে ! বিশেষ করে শঙ্কর মসজিদের কাছাকাছি অচেনা কাউকে ডান থেকে বামে বা বাম থেকে ডানে সরে আসতে দেখলেই, কিংবা হঠাৎ করে অপরিচিত কেউ ওর সামনে পড়লেই স্বস্তি একটা হার্টবিট হারায়। ওর চেহারাটা তখন হয় দেখার মতো। একবার তো প্রায় চিৎকার দিয়েই উঠতে নিয়েছিল, একটা ছেলেকে মসজিদের সামনের রাস্তার ওপাড় থেকে দুলাফে ওর সামনে আসতে দেখে, শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়েছে। ছেলেটিও ওকে পাশ কাটিয়ে পাশের দোকানে ঢুকে গেছে তৃতীয় লাফে।

মানসিক যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ হয়েই তখন স্বস্তি ভাবেÑ পারতপক্ষে ও আর কখনো শাড়ি পরবে না। সাজতো না ও আগেভাগেই। এরপর গুছিয়ে চলার আগ্রহও হারিয়ে ফেলে। যেন-তেনভাবে শরীরটাকে বয়ে নিয়ে যায়।

এরকম ছন্নছাড়া আতঙ্কগ্রস্ত জীবন যাপনের মধ্যেই একদিন বেলা যখন একটু হেলে পড়েছে, তখন মুঠোফোনে অচেনা একটি নম্বর স্বস্তির কপালে নতুন চিন্তার ভাঁজ ফেলে। ভয়ে ভয়ে ফোনটা ধ’রে ‘জ্বি’ বলতেই আঞ্চলিক টানে গ্রাম্য উচ্চারণে কেউ একজন বলে ওঠে- আপনের নম্বরটা হঠাৎ করে কুড়িয়ে পেয়েছি। একটা দরখাস্তের নিচে। নামও লেখা আছে।

: আপনে কি সহিষ্ণু অন্তর্লীন ?

: জি ¡!

: বুঝতে পারতেছি না, আপনে কি হিন্দু ?

: বাঙালি মুসলিম।

: ওÑ আচ্ছা। একটু কথা বলি ?

: কী কথা ?

: আপনে কি গান করেন. রেডুতে ?

– এ আবার কোন নতুন ঝামেলা ? ধ্যাৎ ! Ñমনে মনে ভেবেই উত্তর না দিয়ে স্বস্তি পুরনো স্বভাবে ফিরে যায়। ফোনের লাইন কেটেই নম্বরটা বøক করে দেয়। হ

লেখক : আবৃত্তিকর্মী

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY LatestNews