Home বেড়ানো ইউরোপে ভ্রমণের দিনগুলো

ইউরোপে ভ্রমণের দিনগুলো

425
0
SHARE

ইউরোপের দিনগুলো

বেলায়েত হোসেন

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

কিছুটা ক্লান্তি লাগলেও পদব্রজে বেড়ানোর একটা আলাদা মজা আছে. আর সে যদি বিদেশ-বিভূঁই হয় তা হলে তো কথাই নেই। হেঁটে হেঁটে অজানা অচেনা জগতের আবিষ্কার মনে বড়ো রোমাঞ্চ এনে দেয়। চারপাশের উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু বাদ যাবার কোনো সুযোগ নেই। আদি অপেরা হাউজ পেছনে ফেলে যখন এগোই আমরা সামনের দিকে দেখতে পাই সুউচ্চ এক ইমারত। বিশাল বিশাল সাতজোড়া পিলার সামনের দিকে। দীর্ঘ উচ্চতায় পুরো ইমারতটি দুই কি তিন তলা হবে। বাদামি রঙের বিল্ডিংটির পিলারগুলোর ওপরের স্থান থেকে সরাসরি নিচের দিকে মুখ করে ঝুলছে দু’জোড়া সাদা ও বেগুনি রঙের পতাকা। প্রধান গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় ডান দিকের জোড়-পিলারের নিচের দিকে ছাই রঙের একটি প্লেটে কালো অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা ‘চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ফ্রাঙ্কফুর্ট এম মেইন’। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্টকচেঞ্জও এখানেই। আর আছে নানাসব দোকানাদি। বিল্ডিংটির সামনের বারান্দাজুড়ে রয়েছে দেশের কীর্তিমান নারী পুরুষের মূর্তি। এক ফাঁকে ঘুরে ঘুরে দেখে নিলাম এসব স্ট্যাচুগুলো আমি আর শেলী। বিল্ডিংটির সামনের খোলা চত্বরটিতে রয়েছে পাথরের বৃহৎ আকারের ষাঁড়, গরু, শুকরের ভাস্কর্য।

এসব পেরিয়ে ডানদিকে কিছুটা এগোলেই দেখতে পাই সেই আল্টস্তাদ চত্বর। ফ্রাঙ্কফুর্ট আসার পরদিন আমরা যখন মিস সিসিলির সঙ্গে নগর পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলাম ‘হোপ অন হোপ অফ’ টুরিস্ট বাসে করে, এখানে নিয়ে এসেছিল সে। আজও এখানে প্রচুর মানুষের সমাগম। আমাদের নতুন গাইড মিস রোঞ্জা ঠিক তেমনিভাবেই বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন এই আল্টস্তাদ চত্বরের শত বছর আগের ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলোর। এই দু’দিন আগে যেখানটায় জার্মান তরুণ তরুণীরা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্লেকার্ড হাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল, নানা ¯েøাগানে ছিল সোচ্চার, আজ সেখানটা ফাঁকা। নতুন পর্যটক ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে। বারবার চোখ যাচ্ছিল আমার সেদিকটায় আর একটু বিষণœতার ছোঁয়া আঁকড়ে ধরছিল বৈকি। শেলীকে বললাম, ‘দ্যাখো, পরশুদিন এই জায়গাটা তরুণ তরুণীদের প্রতিবাদে কেমন সোচ্চার ছিল, আর আজ ! মহাকালের ভেলায় এমনিভাবেই সব মিলিয়ে যায়। যেমন আমাদেরও প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে পরক্ষণেই। ক’দিন পর ইউরোপের ইত্যাকার ছবি দেখে বলব, আমরা ওখানটায় গিয়েছিলাম।’ তবে প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কর্মেরই রয়েছে কোথাও না কোথাও বিশেষ গুরুত্ব, সে ব্যক্তিক বা সমাজ বা দেশ-কালের মানদে Ñ যেভাবেই হোক না কেন। এই যে ছেলেমেয়েরা রোদ মাথায় নিয়ে নানা কাজ ফেলে সেদিন সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করে গেল বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, তারও রয়েছে অনেক বড়ো প্রভাব কোথাও না কোথাও। তাদের এ প্রতিবাদ যেমন রাষ্ট্রের প্রশাসনে বা মানবাধিকার সংস্থায় প্রভাব ফেলবে, তেমনি গোটা পৃথিবীর ধর্মীয় কুসংস্কার বা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সকল মহতী উদ্যোগের সঙ্গে একাকার হয়ে থাকবে ইতিহাসে। এখানেই বিশ্বমানবতার ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধন। সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে আধুনিক পৃথিবীর মানুষ একদিন সেই অর্জনের গৌরবে হবে গৌরবান্বিত এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

মিস রোঞ্জাও সবাইকে নিয়ে সেই গির্জা, প্রতœতাত্তি¡ক জাদুঘরে নিয়ে গেল, আমরা আর ঢুকলাম না আগেই দেখা বলে। আমরা খোলা আল্টস্তাদ চত্বরেই হাঁটাহাঁটি করলাম আর চারদিকের পুরাকীর্তি মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। মজার ব্যাপার হলো এই যে এতটা পথ ঘুরে ঘুরে এখানে আসা, ভেবেছিলাম আমাদের হোটেল থেকে না জানি কতটা দূর। অথচ আর একটু এগিয়ে সামনে যেতেই দেখি আমাদের সেই মাইন নদী দেখা যাচ্ছে এবং তার ওপরের সেই ব্রিজ। দু’মিনিট হেঁটে গেলেই তীরে চলে যাওয়া যায়।  একটুতেই বুঝে নিলাম পুরো দূরত্বের পরিধিটা। এত নিকট দূরত্ব দেখে বেশ ভালোই লাগল। ততক্ষণে রোঞ্জা বেরিয়ে এসে সবাইকে নিয়ে সেই মাইনের পারের দিকেই যাত্রা শুরু করল। আমরা নদীর ধার ঘেঁষে এদিক ওদিক খানিকটা হেঁটে আবার রোঞ্জাকে অনুসরণ করলাম। সে তখন দলবল নিয়ে ব্রিজ পেরুনোর নির্দেশ করল। রোঞ্জা খুব চমৎকার মেয়ে। ধীরস্থির এবং সপ্রতিভ। সে তখন বলে যাচ্ছিল, ওপারটায় ফ্রাঙ্কফুর্টের নানাসব পুরনো স্থপত্যের কথা। নদীর ধার দিয়ে রয়েছে বহুকাল আগের নির্মিত বিশাল বিশাল শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র-বিষয়ক মিউজিয়ামÑ তারও কিঞ্চিৎ বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিল।

প্রাচীন সব রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি আরো ভেতরের দিকে। ততক্ষণে সন্ধ্যার আঁধার ছেয়ে ফেলছে চারদিক। রোঞ্জা আমাদের বোঝাল, এবার আমরা একটা রেস্টুরেন্টে যাব রাতের খাবারের জন্য। প্রাচীন পথ ঘাট অট্টালিকা কিন্তু ঝকঝকে চারদিক, তারই ভেতর দিয়ে নিয়ে গেল একতলা একটি রেস্টুরেন্টে।

রেস্টুরন্টের নাম লর্সবাচ থাল। নামের মর্মোদ্ধারে যতটাই কসরত হোক, রেস্টুরেন্টির জনপ্রিয়তার বহর দেখে বেশ ভালো লাগছিল। আয়তাকার একটি হলঘরে পরিপাটি করে সাজনো সব লম্বাটে টেবিল, তার দুধারে ছোটো ছোটো চেয়ার সাজানো। রোঞ্জা আমাদের আসনগুলো আগেই নির্ধারিত করে রাখতে বলেছিল। আমরা ঢোকামাত্র হোটেলের লোকজন আমাদের অভ্যর্থনা সহকারে ওই আসনে বসার আহŸান জানালেন। তখন অন্যান্য টেবিলগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গল্পগুজবে মশগুল বেশ কিছু লোক। রেস্টুরেন্টের সারা সিলিং জুড়ে ছোটো ছোটো ঝোলান ঝাড়বাতি, সেখান থেকে হলুদাভ আলোর দ্যুতি গড়িয়ে পড়ছে। ফাঁকে ফাঁকে হাল্কা আঁধারির খেলা।

চারদিকের দেয়ালজুড়ে ছোটো ছোটো অনেক ফটোফ্রেম। তাতে নানান খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের বা প্রকৃতির ছবি। একপাশের শেলফে প্রচুর বই। যার যার খুশিমতো খাবারের পাশাপাশি বই পড়ে চলেছেন। তবে রেস্টুরেন্টটিতে একটু পরিণত বয়সের মানুষজনই বেশি মনে হলো। কমার্জব্যাঙ্কের প্রতিনিধিগণ আগেই খাবারের মেন্যু ঠিক করে রেখেছিলেন। বসামাত্র চলে এল এই রেস্টুরেন্টের ঐতিহ্যবাহী পানীয় অ্যাপেল-ওয়াইন। সঙ্গে থাকল অরেঞ্জ, অ্যাপেল জুস বা কোক কি স্প্রাইট। যার যা প্রয়োজন সে অনুসারে পানাহার পর্ব চলতে পারে সূচনায়। খাবারের মেন্যু লিস্টে লেখা, ‘হেসিয়ান রান্নার ভুবনে আপনাদের স্বাগতম।’ এ বিষয়ে আমাদের ঔৎসুক্য দেখে রোঞ্জা জানাল ‘হেসিয়ান হচ্ছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন অধিবাসীর জার্মানির একটা ফেডারেল স্টেট। কয়েক শতাব্দীর পুরনো রান্নার পদ ধারণ করে আছে এই জায়গটির ঐতিহ্যের বৃহদাংশ। এ বিশেষত্বের জন্যই এখানে এত লোকের সমাগম।।

আমরা যে পাশটিতে বসেছিলাম তার পেছনে খোলা জানালা, তার ওপাশে বাইরে বিশাল এক চত্বর গাছপালায় ঘেরা। সেখানে বেশ কিছু চেয়ার টেবিল পাতা আছে, তাতেও প্রচুর লোকজনের আড্ডা-পানাহার-ভোজন চলছে। একের পর এক খাবার আসছে আমাদের টেবিলে। কিছুটা রোমাঞ্চ লাগছে বৈকি। দ্বিতীয় ধাপে এল পনির, সস, পাকোড়া, পাঁপড় ইত্যাদি ; লাগছে মন্দ নয়। এভাবে বিবিধ খাবার। তবে উল্লেখযোগ্য খাবারের মধ্যে ছিল ১৮১৩ সালে নির্মিত ফ্রাঙ্কফুর্ট স্ট্যান্ডব্যাকারির চকলেট রঙের বিশেষ রুটি ও মাখন। এ ছাড়া প্রধান মেন্যু হিসেবে ছিল মুরগির পাঁজরের মাংস ও সসেস দিয়ে রান্না করা এক প্রকার গ্রিল্ড খাবার। সদ্য পরিবেশন করা খাবারের সতেজ রূপ দেখে আস্বাদনের ইচ্ছা কিছুটা প্রবল হয়ে উঠল সবারই। তারপরও এ-কথা সত্য বাঙালির মসলাদার রসনায় এহেনো ইউরোপীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ ততটা উচ্চমার্গে পৌঁছুতে পারে না। তাই নীরবে হাসিমুখে গলধকরণের পর মন্তব্য করতেই হয়Ñ ‘বাহ্ চমৎকার’ !

লেখক : ব্যাংকার, আবৃত্তিকার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here