1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২০, ১২:৫৯ অপরাহ্ন

ইউরোপের দিনগুলো [পূর্ব প্রকাশিতের পর]

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৯
  • ৬৩৩ বার ভিউ করা হয়েছে

 

‘লর্সবাচ থাল’ রেস্টুরেন্ট থেকে গতকাল ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছিল। এমিনিতে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর যে খুব ঝলমলে তা নয়। তবে শহরজুড়ে মারকারি বাল্ব¦ আর নিয়ন সাইনের যথোপযুক্ত ব্যবহারে এ এক ধরনের স্নিগ্ধ আলোয় মনোরম ভালো লাগা এনে দেয়। রাত যত গভীর হয় আলো তেমনি ফিকে হয়ে আসে। তবে যে আলো বিচ্ছুরিত থাকে তাতে নগরবাসীর কোনো অসুবিধাই হয় না।

আমার যে-বিষয়টি ভালো লাগে খুব, তা হচ্ছে সমগ্র ফ্রাঙ্কফুর্ট নগরের বিল্ডিংয়ের রং। ঝকমকে চটকদার ইচ্ছামাফিক রঙের ব্যবহার মোটেই নেই, বরং যেখানে কি যতদূরেই যাই না কেন বিল্ডিংগুলোর রং জুড়িয়ে দেয় চোখ। রঙের ক্ষেত্রে কফি কালারের প্রাবল্য বেশ বেশি, তাতে রুচিশীল নগরবাসীর পরিচয় বহন করে বৈকি। আমার অন্তত তাই মনে হয়। তার সঙ্গে অন্য যেসব রং দৃশ্যমান, তা হচ্ছে বাদামি, অফহোয়াইট, ক্রিম বা ধবধবে শাদা অথবা হাল্কাছাই রং। কোনো রংই প্রকট হয়ে ওঠে না। আমি ভাবছিলাম এ কি সরকারি নিয়ন্ত্রণ না কি সচেতন নাগরিক রুচির পরিচায়ক।

ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রতিদিনই সারাদিনের সেমিনার শেষে অবকাশ থাকছে একটু চারপাশ ঘুরে দেখার। দ্বিতীয় দিন আমাদের ছিল সেমিনার শেষে নিজেদের মতো করে শহর ঘোরা বা মার্কেটে যাওয়া। আমাদের অভিপ্রায় যেহেতু ইউরোপের আরও সাতটি দেশে যাব, মার্কেটিং করে লাগেজ ভারি করার ইচ্ছে মোটেও নেই। জার্মানির হেলাবা ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর ও রিজিওনাল ম্যানেজার ‘মিস্টার থমাস কার্টেন’ আমার জার্মানি আসার খবর শোনার পরই দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলটা ফাঁকা দেখে দেশে থাকতেই তাঁকে অ্যাডিনার ঠিকানা দিয়েছিলাম। আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং-এ কাজ করার সুবাদে এবং ওই ডিভিশনের প্রধান হওয়ায় বিশ্বের প্রায় প্রধান সব দেশের কোনো-না-কোনো ব্যাঙ্কের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক স্থাপন করতেই হয়। সেজন্যেই ভিনদেশের কত না ব্যাঙ্কারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। এর মধ্য দিয়েই নানা দেশ-কালকেও জানা যায়। থমাস আমার সেই রকমই একজন পেশাগত বন্ধু। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণের এ-মানুষটি যে আদ্যপান্ত ভদ্রলোক তা এক পলকেই বোঝা যায়। বড়োই লাজুক এবং সে-কারণেই বোধ করি অত্যন্ত স্বল্পভাষী।

 

থমাস তার পরিকল্পনা অনুযায়ী মাইন নদীর ধারে  ‘মাইন নিযা’ রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায় আমাদের। ‘মাইন নিযা’ মাইন নদীর ধারে একটি চমৎকার রেস্টুরেন্ট। কাচের বিস্তৃত স্লাইডঘেরা চেয়ার-টেবিলে সুসজ্জিত দীর্ঘক্ষেত্রের ভেতরেও বসার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু আমরা মাইনকে পুরোপুরি উপভোগ করার জন্য খোলা আকাশের তলায় সাদাছাতায় সজ্জিত ব্যালকনিতে গিয়ে বসলাম। থমাস আমাদের ডিনার অফার করলেন, আমরা কি খাবো তা জানতে চাইলেন। তখনো দিনের আলো মিলিয়ে যায়নি, সময় পাঁচটা উত্তীর্ণ হোল মাত্র। আর হ্যাঁ, এ সময়টায় জার্মানিতে সূর্যাস্ত হতে হতে প্রায় রাত আটটা ছুঁয়ে যায়। আমি বললাম, ‘Dinner ! oh no ! it is to early to have our dinner, it is not the dinner time! just we will have the coffee.’.’ অগত্যা সায় দিতেই হলো এই বিকেলের আলোয় রাত্রির আহার সেরে নেবার। মেন্যু এগিয়ে দিলে আমি থমাসকে হালকা কিছু অর্ডার দিতে বললাম। আমার ভেতরে একটু তাড়া কাজ করছিল বৈকি। কমার্জ ব্যাঙ্কের পাশেই ‘ইংলিশ থিয়েটার’-এ আজ ‘ব্রিটিশ নাটক’ নাটক দেখার খুব ইচ্ছা। শো’র সময় সন্ধ্যা ৬-৩০ মি। যাই হোক আমাদের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক আলাপ, আহারদি ও বিভিন্ন বিষয়ে কথপোকথন হয়। থমাসের স্ত্রী থাকেন ২০০ কি মি দূরে একটি মফস্বল শহরে। তিনিও একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেখানে তাঁর বৃদ্ধা মা ও একমাত্র পুত্রও থাকেন। প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার অফিস শেষে থমাস গ্রামের বাড়ি চলে যান। আসেন আবার সোমবার সকালে ফ্রাঙ্কফুর্টে। থমাসের এহেনো জীবনযাপনের গল্প শুনে ভালোই লাগল। আমাদের দেশের বহু মানুষের সঙ্গেই মিলে যায় তাঁর জীবনের এই অংশটুকু কোনো এক সময় কিছুদিনের জন্য আমারও ছিল এমনই জীবনধারা।

নাটক দেখা আর হোল না আমার। পায়ে হাঁটা পথেই ইংলিশ থিয়েটার-এ গিয়ে যখন পৌঁছোই তখন সাতটা বাজে। যথারীতি আধঘণ্টা আগে শুরু হয়ে গেছে শো। আমি টিকিট কাউন্টারে বললাম, আমি আধঘণ্টা পরও দেখতে চাই, অসুবিধা নেই । তারা জানালো, শো শুরু হয়ে গেলে প্রবেশের সুযোগ নেই, ওতে অভিনেতাদের যেমন ডিস্টার্ব হয়, তেমনি দর্শকেরও। তাই শো শুরু হয়ে যাবার পর তারা কোনো টিকিটই বিক্রি করেন না, চাইলে আমি আগামীকালের টিকিট ক্রয় করতে পারি। থমাস আমায় দুঃখ প্রকাশ করছিল যেন তার জন্যই দেরি

হয়ে গেল।

আমি আশ্বস্ত করলাম থমাসকে বিদায় দিয়ে সামনের ট্রাম স্টেশন থেকে আমি আর শেলী উঠে পড়ি ট্রামে রাতের নগর পরিভ্রমণের উদ্দেশে।

পরদিন সকালে সেমিনারে যাওয়া মাত্রই কমার্জ ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিগণ আমাদের নিয়ে গেল ‘গ্রোব গাল্লুস্ত্রাবে’ সড়কে তাদের মূলভবন দেখাবার জন্য। তিপ্পান্নতলা ভবনে ঢুকতে আছে বিবিধরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢোকার পর খেয়াল করলেই দেখা যায়, ডানদিকের দেয়ালে আছে রঙের কম্পজিশনের খেলা। নিচ থেকে বিস্তৃত দেওয়াল উঠে গেছে ওপরে। গভীরভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, খানিক পরপরই আলোছায়ার ভেতর চলছে রঙের খেলা, যাতে বিধূত আছে জার্মানির কোনো এক ইতিহাস। ভবনের সব লেভেলেই আছে কর্মবান্ধব পরিবেশ, তারও বর্ণনা দিলেন সমন্বয়কারী, ঘুরিয়ে নিয়ে বিল্ডিঙের ওপর-নিচ দেখালেন।

ওপরে ওঠার জন্য লিফটে যাওয়ার সময় চোখ যায় আমার ডানদিকের এক ভাস্কর্যের প্রতি। বিশ্বাস করা কঠিন যে, এটি একটি ভাস্কর্য ! আমি দল থেকে পিছিয়ে ওই ভাস্কর্যের কাছে যাই। দলছুট হবার সময় জেনে নি তারা ক’তলায় যাচ্ছে। যাতে পরে যোগ দিতে পারি। ভাস্কর্যটির স্বরূপ হচ্ছে, একজন কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়ছেন, আর একজন পেছনে হাত দিয়ে নুয়ে পড়ে দেখছেন। আমি কাছে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি এ মহা মনোযোগধারী যুগলমূর্তি। একটি করপোরেট ভবনে এমন একটি শিল্পকর্র্ম আমায় উৎসাহিত করে বৈকি !

তিপ্পান্ন তলার ওপর থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট নগরীকে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। বিশাল নীল আকাশের তলায় মাইন নদীর ধারে সবুজ গাছপালায় আচ্ছাদিত ঝকঝকে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর। মনে হয় আমাদের প্রিয় শহর ঢাকার কথা, যার দুইধারে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষার কথা। থির হয়ে থাকা মাইন নদীর ধারের এ-শহর যদি এমন রূপবান হয়, তো সদা প্রবহমান বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষা পারের ঢাকা কেমন অপ্সরী হয়ে উঠতে পারে ! প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা।

ফেরার সময় কমার্জ ব্যাঙ্কের তিপ্পান্নতলা এই ভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তোলা হয় সেমিনারে যোগ দিতে আসা বিভিন্ন দেশের ব্যাঙ্কারদের নিয়ে একটি দলবদ্ধ ছবি, যা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে। হ [চলবে]

লেখক : ব্যাংকার, আবৃত্তিকার

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY Justin Shirajul