Home বেড়ানো আমেরিকা দর্শন -ফকির আলমগীর

আমেরিকা দর্শন -ফকির আলমগীর

1224
0
SHARE

নিউ ইয়র্ক নগরের ট্রাফিক এজেন্টদের ঈদ পুনর্মিলনী

নিউ ইয়র্ক নগরের পুলিশ বিভাগের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের ঈদ পুনর্মিলনী ও এই বিভাগে নবাগত বাংলাদেশি এজেন্টদের বরণ অনুষ্ঠানে গান করার সৌভাগ্য হয় আমার। এবার আমেরিকা সফরের মধ্যে দিয়ে আমার নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগে ইতোপূর্বে বাংলাদেশিদের খুব একটা চোখে পড়ত না। এখন বাংলাদেশিরা বিভিন্ন পেশায় নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছে। প্রবাসীদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ এক অনন্য অবস্থানে স্থান পেয়েছে আমেরিকায়। অন্যদিকে পরিশ্রমী জাতি হিসেবে বাংলাদেশিরা সবক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে। যা হোক, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের ঈদ পুনর্মিলনী এবং এই বিভাগে নবাগত বাংলাদেশি এজেন্টদের বরণ অনুষ্ঠান হয়ে গেল ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রবিবার সন্ধ্যায়, সিটির জ্যাকসন হাইটসের বেলিজেনো পার্টি হলে। একদিকে রবিবার অন্যদিকে আমার একই সন্ধ্যায় তিনটি অনুষ্ঠানের প্রেসার। অর্থাৎ জ্যাকসন হাইটসের বেলিজেনো প্রধান হলে বাংলাদেশ কনভেনশনের সমাপ্তি সন্ধ্যা অন্যদিকে কুইন্স-এর ম্যারিয়ট হোটেলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ফান্ড রাইজিং ডিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তার মধ্যে আমি বাংলাপত্রিকার সম্পাদক ও টাইম টেলিভিশনের স্বত্বাধিকারী আবু তাহেরের অনুরোধে এনওয়াইপিডি [ঘণচউ] আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রথম যোগদান করি।

এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ মাসুদ ভূইঞা, প্রধান অতিথি ছিলেন জাতিসঙ্ঘের বাংলাদেশ মিশনে নিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিডবিøউএ লোকাল-১১৮২-এর সভাপতি সৈয়দ রহিম, নির্বাহী সহসভাপতি শুকমডি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহজাহান, বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি লেফটেন্যান্ট মিলাদ খান ও আবদুল জলিল, সিডবিøউএ লোকাল ১১৮২-এর ডেলিগেট সৈয়দ ইসলাম, আজিজুর রহমান ও শাহাদত হোসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে যথারীতি পবিত্র কোরআন তিলওয়াত ও গীতা পাঠ করা হয়। তারপর ফুল দিয়ে অতিথিদের বরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সৈয়দ উতবা। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন নিউ ইয়র্কের জনপ্রিয় উপস্থাপক আশরাফুল হাসান বুলবুল ও সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মো. নিজামউদ্দিন, রাশেল মিয়া, সিরাজ উদ-দৌলা, আহমদ হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মাসুদ বিন মোমেন নিউ ইয়র্কের মূলধারায় বাংলাদেশিদের বিভিন্ন কর্মকাÐের প্রশংসা করে বলেন, শুধু নিউ ইয়র্কের পুলিশ বিভাগেই নয়, নগরের অন্যান্য বিভাগেও বাংলাদেশিরা যোগ্যতা ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেÑ এতে নিজেরা যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও দিনে দিনে উজ্জ্বল হচ্ছে। তিনি দেশের সম্মান ও ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রবাসীদের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। পেশাগত সাহসিকতার জন্য এনওয়াইপিডি কর্মকর্তা এমডি আলীকে সভায় পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠান আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করেন সাইফুল ইসলাম, ফজলে চৌধুরী টিপু, জুয়েল হোসেন, আলমগীর খান ও আবু তাহের। আবু তাহের তার টাইম টিভির মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির সরাসরি সম্প্রচার করেন।

পরিশেষে আমি অতিথিদের পছন্দমতো কয়েকটি জনপ্রিয় গান পরিবেশন করি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনামুগ্ধ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের সময় আমি বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা তুলে ধরি। সমগ্র মিলনায়তন জুড়ে তখন দেশপ্রেমের এক অকৃত্রিম ঢেউ খেলে যায়। অতিথিরা হাততালি দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করেন।

ঈদের আনন্দ আমেজে বাংলাদেশ কনভেনশন

ঈদ মানেই আনন্দ। প্রবাসে অনেকের কাছেই ঈদ নিরানন্দ। দেশের মতো আনন্দ এখানে নেই। কারণ আত্মীয়স্বজন, নিকটজন স্বদেশে রেখে প্রবাসে আনন্দ আয়োজনে মন ভরে না, অপূর্ণ রয়েই যায়। তারপরও ঈদ বলে কথা। তাই সবাই যে যার মতো ঈদ-উৎসব পালন করে। তবে উৎসবপ্রিয় বাংলাদেশিদের জন্যে এবারের ঈদুল আজহায় নিউ ইয়র্কে বাড়তি আনন্দ নিয়ে এসেছিল তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ কনভেনশন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঈদের দিনে তাতে কি ? উদ্যোক্তারা নিরাশ করেননি দর্শকশ্রোতাকে। গরু জবাই করে রাতের খাবার খাওয়ালেন সবাইকে। সাথে খাসির মাংস ও সেমাই। আগতরা বিশেষ করে যারা পরিবার পরিজন ছাড়া নিউ ইয়র্কে বাস করেন তাদের জন্য এদিন ছিল বেশ আনন্দময়। আমিও আমার দুই নাতী শ্রাবণ, শুভকে নিয় এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। ওরাও বেশ আনন্দ পেয়েছিল। তিনদিনব্যাপী এ-সম্মেলনে ছিল মেলা, সেমিনার, ট্যালেন্ট শো, ফ্যাশন শো, কাব্যজলসাসহ নানান আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বাংলাদেশ কনভেনশন অব নর্থ আমেরিকার ব্যানারে অনুষ্ঠিত এ-সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শোটাইম মিউজিকের কর্ণধার আলমগীর খান আলম। বহুল আলোচিত ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডখ্যাত আলমগীর খান আলম। উত্তর আমেরিকায় একটি সুপরিচিত নাম। উপমহাদেশের স্টার, সুপারস্টারদের নিয়ে নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে জমকালো অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি নেই। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীনকে একই মঞ্চে তনি বারবার গান গাইয়েছেন। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ফোবানা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের উপস্থিত করানোর ক্ষেত্রে তার অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রশংসা কুড়িয়েছে। উদ্যোমী, সৎ এবং বিশ্বাসযোগ্য চিরসবুজ আলমগীর খান আলম সবার কাছে বেশ প্রিয়। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে তিনি একই মঞ্চে যেমন তুলতে পারেন তেমনি সব দল মতের লোকেরা তাকে পছন্দ করেন। স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাÐে তিনি সব সময় ব্যস্ত। একের পর এক অনুষ্ঠান আয়োজনে তিনি সফল।

প্রবাসে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রবাসে বাংলাদেশিদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জ্যাকসন হাইটস বেলোজিনো হলে ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ সেপ্টেম্বর এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় বেলোজিনো পার্টি হলে বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, ঢাকার সাবেক ডিপুটি মেয়র আব্দুস সালাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিনশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, শহীদ হাসান, আমি ও সম্মেলনের আহবায়ক আলমগীর খান আলমসহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গিয়াস আহমেদ, শাহনেওয়াজ, কাজী শফিকুল ইসলাম, মনিকা রায়, আহসান হাবিব, বিলাল আহমেদ চৌধুরী, লিলি আক্তার প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্যে আলমগীর খান আলম বলেন, এটি একটি ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান। ফোবানা বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রবাসে ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে তুলতে ঈদের দিনেই সম্মেলনের উদ্বোধন করা হলো। সেখানে বাংলাদেশ ও প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনাসহ মেলা ও বিভিন্ন আনন্দ আয়োজনে প্রবাসীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এই প্রচেষ্টা। অনুষ্ঠানে বক্তব্য বলেন, রাজনীতিবিদ আবদুস সালাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সিরাজউদ্দৌলা, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন, মূলধারার রাজনীতিবিদ গিয়াস আহমেদ, প্রবাসের রাজনীতিবিদ মাহবুব আলী বুলু, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. শাহনেওয়াজ ও বিলাল চৌধুরী, বাংলাদেশ সোসাইটির স্কুল ও শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের আলাদা একটি সৌন্দর্য ছিল, বক্তারা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও একই মঞ্চে তারা প্রায় সবাই বলেন, প্রথমে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে এই সম্মেলন সমৃদ্ধ করবে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশকে জানার আগ্রহ বাড়বে। বক্তারা দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে আরো সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। সম্মেলনের একটি বিশেষ পর্ব আগত অতিথিদের কাঁদিয়েছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপর যুক্তরাষ্ট্র সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের উদ্যোগে হৃদয়ে একাত্তর শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের পক্ষ থেকে রাশেদ আহমেদ ও লাবলু আনসার এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা রথীন্দ্রনাথ রায়, শহীদ হাসান এবং আমি। অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয় সদ্য প্রয়াত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিংবদন্তি কণ্ঠযোদ্ধা আবদুল জব্বারের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। প্রথমেই আমরা মঞ্চের সামনে স্থাপিত আবদুল জব্বারের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই। একইসঙ্গে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি প্রয়াত শব্দসৈনিক জনপ্রিয় সুরকার লাকী আকন্দ, কণ্ঠযোদ্ধা মঞ্জুর আহমেদ, শব্দসৈনিক গীতিকার সুব্রত সেনগুপ্ত, শব্দসৈনিক বেহালাবাদক বাবুল দত্তকে।

আকর্ষণীয় র‌্যাফেল ড্র, কাব্যজলসা, ফ্যাশন শো, ট্যালেন্ট শোসহ সম্মেলন প্রাঙ্গণে খাবার, জামাকাপড়, বইসহ বিভিন্ন পণ্যের স্টল আগত অতিথিদের আকৃষ্ট করে। সম্মেলনের সমাপনী দিবসে প্রধান অতিথি জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি এই ভয়ঙ্কর সমস্যা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত রাখার জন্য সকলকে একযোগে কাজ করার আহŸান জানান। তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশ কনভেনশনের মাধ্যমে প্রবাস প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রাখার এ উদ্যোগের নেপথ্য সংগঠকদের অভিনন্দন জানিয়ে তাদের বাংলাদেশের বিশেষ দূত হিসেবে অভিহিত করেন। সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে উপস্থাপনা করেন মনিকা রায়, সাদিয়া খন্দকার, শিবলী সাদিক, সেলিম ইব্রাহীম। সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন রথীন্দ্রনাথ রায়, শহীদ হাসান, রিজিয়া পারভীন, মুক্ত সারওয়ার, বিউটি দাস, শাহ মাহবুব, সাইরা রেজা, শাহরিন সুলতানা, জাকারিয়া মহিউদ্দিন, মীরা সিনহা, বীণা বর্মণ, রানু নেওয়াজসহ নিবন্ধের লেখক। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে নিবন্ধের লেখক এবং রিজিয়া পারভীন দর্শকশ্রোতাকে গানে গানে মাতিয়ে তোলেন। নানা বয়েসী ছেলেমেয়েরা ঈদ-উৎসবে অংশগ্রহণ করায় বর্ণাঢ্য এক আমেজ ছড়িয়ে ছিল জ্যাকসন হাইটস এলাকায়। হ [চলবে]

লেখক : গণসংগীতশিল্পী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here