Home বেড়ানো আমেরিকা দর্শন : উত্তর আমেরিকার জমজমাট ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড -ফকির আলমগীর

আমেরিকা দর্শন : উত্তর আমেরিকার জমজমাট ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড -ফকির আলমগীর

1290
0
SHARE

জমকালো আয়োজনের মধ্যে দিয়ে এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে উত্তর আমেরিকার বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ঢালিউড মিউজিক ও ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডের ১৭তম আসর। ১৬ বছর পর এবারই প্রথম এই পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠান দুটি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৭ এপ্রিল ২০১৮ আটলান্টিক সিটি ও ২২ এপ্রিল ২০১৮ নিউ ইয়র্কের জামাইকার ‘ইয়র্ক’ কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তারায় তারায় আলোর নাচন আর জমকালো, চোখ ধাঁধানো অনুষ্ঠান দুটি। আমি সেই ১৯৮৯ সাল থেকে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানসহ একাধিকবার ‘ফোবানা’ সম্মেলনে সংগীত পরিবেশন করলেও ‘ঢালিউড মিউজিক ও ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে এবারই প্রথম বিশেষ আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ করি। উত্তর আমেরিকার বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে নিরন্তরভাবে কর্মরত শো টাইম মিউজিক এবং এর কর্ণধার আলমগীর খান আলমের বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশে ঋষিজের পক্ষ থেকে শিশুপার্কের সামনে বাংলানববর্ষের অনুষ্ঠান করেই আমাকে ছুটে যেতে হয় সুদূর আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। জানতে পেরেছি এবার আমাকে প্রবাসে অনুষ্ঠিত এই জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হবে। সে-কারণেই আমাকে স্বদেশের অনেক ব্যস্ততা রেখেই সেখানে তাদের আন্তরিক ভালোবাসা ও আগ্রহের প্রতি সাড়া দিতে হয়। বলাই বাহুল্য, এর আগে এই মর্যাদাসম্পন্ন আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন উপমহাদেশের অনেক বরেণ্য শিল্পী।

আমি আমার লেখায় অনুষ্ঠানের বিস্তারিত তুলে ধরার আগে ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড কী এবং এর আয়োজকের প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাই। বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতিকে প্রবাসের মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং একে প্রসারিত করার জন্য দীর্ঘ ২১ বছর ধরে যে তরুণটি নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তার নাম আলমগীর খান আলম। প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করা যার পেশা ও নেশা। ১৯৯৪ সালে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে প্রথম পা রেখেছিলেন আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। তারপর নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির ইয়র্ক কলেজ থেকে বিজনেসে ব্যাচেলর পাশ করার পরও চাকরি না পেয়ে পেশা হিসেবে বেছে নেন অনুষ্ঠান আয়োজন ও শো অর্গানাইজকে। ১৯৯৭ সালে কলেজে একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। আর এই অনুষ্ঠানই নিউ ইয়র্কে তার সৌভাগ্যের দরজা খুলে দেয়। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই স্টুডেন্ট আজ নিউ ইয়র্কের এক সফল তরুণ। আয়োজন করেছেন ৪০০শত অনুষ্ঠানের। বাংলাদেশের প্রায় সব স্বনামধন্য শিল্পীকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এনেছেন। এই স্বপ্নবান তরুণ একাধিকবার রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনকে একসঙ্গে গান গাইয়েছেন। তার আমন্ত্রণে এসেছেন ভারতের রানি মুখার্জি, শিল্পাশেঠি, তনুশ্রী, কিম শর্মা, বাপ্পি লাহিড়ী, মিঠুন মুখার্জি, হৈমন্তী শুক্লাসহ আরো অনেক শিল্পী। অত্যন্ত সৎ ও কর্মউদ্যোগী আলমগীর খান আলম প্রবাসী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছে তাই এত প্রিয়। শোবিজ তারকাদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার মধ্যদিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘শোটাইম মিউজিক’ সংগঠন। চিরসবুজ স্বপ্নবাজ এই তরুণের দেশের বাড়ি চাঁদপুরে।

যাহোক এবার নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিতে বসেছিল ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের জমকালো অনুষ্ঠান। ক্যাসিনো সিটি খ্যাত নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিতে অনুষ্ঠিত ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডের ১৭তম আসর ছিল নানান দিক থেকে ব্যতিক্রম। যদিও দিনটি ছিল দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ক্ষুব্ধ, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর ঠান্ডা। তারপরও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে দর্শকের আগ্রহের কমতি ছিল না। ১৭ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে শেরাটন আটলান্টিক সিটি কনভেনশন সেন্টার হোটেলে অনুষ্ঠিত এ-আসরে আমাকে গণসংগীত ও পপসংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে এ ছাড়াও শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পীর সম্মাননা পেয়েছেন রুমানা মোর্শেদ, কনকচাঁপা ও তাহসান খান। তাদের হাতে অ্যাওয়ার্ড তুলে দেন শিফট টেকনোলজির অন্যতম কর্ণধার, শায়লা ইফতেখার ও উৎসব ডটকমের সিইও রায়হান জামান। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীর সম্মাননা পেয়েছেন এসআই টুটুল ও লোকসংগীতে সেলিম চৌধুরী। তাদের হাতে অ্যাওয়ার্ড তুলে দেওয়া হয়। আমি আমার স্নেহধন্য প্রিয় কণ্ঠশিল্পী এস আই টুটুলের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দিই আর এওআই ইন্স্যুরেন্সের প্রেসিডেন্ট শাহনেওয়াজ সিলেটের কৃতিসন্তান জনপ্রিয় লোকশিল্পী সেলিম চৌধুরীর হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এছাড়া যারা প্রবাসে বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশেষ প্রচেষ্টায় তুলে ধরেছেন তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন শিল্পীকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সোনিয়া সুইটি, আফজাল হোসেন ও ফেরদৌসি ইকবুক। তাদের হাতে সম্মানিত অতিথিরা সম্মাননা পুরস্কার তুলে দেন।

এরপর আজীবন সম্মাননা পুরস্কার আমার হাতে তুলে দেন মার্কিন আইটি সেক্টরে উদ্যোমী প্রবাসীদের চাকরি পাইয়ে দিতে অসাধারণ ভূমিকা পালনরত প্রতিষ্ঠান ‘পিপলএনটেকের প্রতিষ্ঠাতা ইন্ডিয়ার আবু হানিফ। শোটাইম মিউজিকের সপ্তদশ ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের এই ব্যতিক্রম অনুষ্ঠানে বিপুল করতালির মধ্যে আমাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। যখন এই আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়, তখন বিশ্বখ্যাত আটলান্টিক সিটির আলোঝলমল মিলনায়তনে উপচেপড়া দর্শক শ্রোতা মুক্তিযোদ্ধা কণ্ঠশিল্পীকে সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে বিপুল করতালিতে হলটি মুখরিত করেন। বিদেশের মাটিতে পাওয়া এই সম্মাননা আমাকে এক গভীর অনুভূতিতে আপ্লুত করে। সেই বিশেষ স্মরণীয় মুহূর্তটির কথা আমার সারাজীবন স্মরণে থাকবে। আমি আমার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রবাসীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। শিল্পীর কী আছে আর ভালোবাসা ছাড়া ; সবকিছু উজাড় করে হাতে একতারা আমি সারাজীবন দর্শকের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা আবার দ্বিগুণ পরিমাণে দর্শকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। দেশ, মাটি আর মানুষ হচ্ছে আমার গানের প্রেরণা। জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। জীবনে হারাবার আর নতুন করে কিছু পাওয়ার আশা করি না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে সারাজীবন সংগ্রামী খেটে খাওয়া মানুষের পাশে থাকতে চাই। সংগীতের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ইতোপূর্বে আমি একুশে পদক, ভারত সরকার প্রদত্ত সংগীতে মহাসম্মান, বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলোশিপসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হলেও এবার বিদেশের মাটিতে পাওয়া আজীবন সম্মাননা পুরস্কার আমাকে অনুপ্রাণিত করবে। উৎসাহিত করবে আরো ভালো কিছু করার জন্য।

বিশ্বখ্যাত ক্যাসিনো সিটি আটলান্টিক শহর যখন ঠান্ডা বাতাস, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে অনেকটা নীরব ঠিক তখন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা সাজু খাদেমও কলকাতার দৃষ্টিনন্দন জনপ্রিয় অভিনেত্রী পায়েল মুখার্জির প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় রাতের শেরাটন আটলান্টিক সিটি কনভেনশন হল উষ্ণতা আর আলোর নাচনে মুখরিত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে আমাকেই ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’ দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে দিয়ে পতাকা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করতে হয়। গানটি পরিবেশনের পর সবাই জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানিয়ে কণ্ঠযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। তখন সমস্ত হলে এক ভিন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তারপর আমি একে একে ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম’, ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইল্লা আমারে’, ‘স্কুল খুইলাছেরে মওলা’সহ জনপ্রিয় গান গেয়ে দর্শক-শ্রোতাকে মাতিয়ে তুলি। প্রবাসে উদ্যোমী ও আন্তরিক ‘মাটি’ ব্যান্ডের চমৎকার বাদ্যের তালে তালে কখনও মঞ্চে আবার কখনো দর্শকসারিতে নেমে গিয়ে, সবার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের মুগ্ধ করার চেষ্টা করি। অনেক দর্শককে আমার সাথে একাত্ম হয়ে নাচতে দেখেছি। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আমার বাঁশির লোকসুর অনেক প্রবাসীকে নস্টালজিক করে। যে-স্মৃতি বিগত তিন দশক প্রবাসী অনুষ্ঠানে আমাকে কাঁদায়। সেদিনও বাঁশির সুরে আর গানে আমি কেঁদেছিলাম। কারণ প্রবাসী মানুষ যেমন দেশের মায়ায় কাঁদে, সখিনা তেমনি কাঁদি তোমার জন্যে। যাহোক এরপর যথারীতি সাজু খাদেম আর পায়েল মুখার্জির নান্দনিক উপস্থাপনায়, সংগীত পরিবেশন করেন রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, সেলিম চৌধুরী, রানো নেওয়াজ, এস আই টুটুল ও তাহসান খান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ নৃত্য পরিবেশন করেন জনপ্রিয় অভিনেতা সজল, জনপ্রিয় অভিনেত্রী পিয়া বিপাশা ও মডেল রাখি। সেদিন শিল্পী কনকচাঁপা ও সেলিম চৌধুরী চমৎকার সংগীত পরিবেশন করেন। তবে  তরুণ দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাহসান ও এস আই টুটুল। প্রথমে টুটুল তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সুরেলা কণ্ঠে গিটার হাতে ‘মাটি’ ব্যান্ডের সঙ্গে অনেকগুলো গান গেয়ে দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। এরপর মঞ্চে আসেন বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যাশিত গায়ক তাহসান। এর পূর্বে অবশ্য অভিনেতা সজল নূর ও অভিনেত্রী পিয়া বিপাশা জনপ্রিয় গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে উষ্ণতা ছড়ান। তবে গায়ক নায়ক তাহসান কখনো মঞ্চে কখনো দর্শকের মধ্যে প্রবেশ করে গানের তালে তালে ঝড় তোলেন। তরুণ প্রজন্মের দর্শক তাকে কাছে পেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যান। তাহসানও একের পর এক গান করে তাদের মুগ্ধ করেন। তাহসানের মনমুগ্ধকর পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান শেষ হলেও অনুষ্ঠানের কর্ণধার আলমগীর খান আলম এক পর্যায়ে বক্তব্য প্রদান করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ইভেন্ট অর্গানাইজার হিসেবে ফ্লোরিডার মায়ামির ইমরান জনিকে বিশেষ পুরস্কার প্রদান করেন। ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘শোটাইম মিউজিক’র পক্ষ থেকে আলমগীর খান আলম, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের ১৭তম আসরকে দুটি পর্বে ভাগ করার বিষয়টি ব্যাখ্যা কানের এবং দ্বিতীয় পর্ব ২২ এপ্রিল নিউ ইয়র্কের জামাইকার ইয়ার্ক কলেজের অভিজাত মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হওয়ার খবরটি আবারও ঘোষণা করেন এবং বাইশ এপ্রিল চিত্রনায়িকা রোজিনা, তিশা, নাদিয়া, চিত্রপরিচালক দেবাশীষ বিশ্বাসসহ আরো যে-সব তারকা যুক্ত হবেন সে বিষয়টি ঘোষণা করেন। এছাড়া তিনি জানান, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের পরবর্তীআসর যুক্তরাষ্ট্রের গÐি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমÐলে বিশেষ করে দুবাইতে আয়োজন করা হবে। অ্যাওয়ার্ড প্রদান, গান ও নৃত্যের এক জমকালো অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব বেশ সফলতার মধ্যেই শেষ হয়।

ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডের সফল সমাপ্তি

জমকালো আয়োজনে প্রবাসীদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে নিউ ইয়র্কে শেষ পর্ব আয়োজনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত হয় ঢালিউড মিউজিক অ্যান্ড ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডের ১৭তম আসর। ২২ এপ্রিল ২০১৮, রবিবার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্ক সিটির কুইন্সের ইয়র্ক কলেজ অডিটোরিয়ামে দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে অ্যাওয়ার্ড তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জমকালো, চোখ ধাঁধানো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শককে উপহার দেওয়া হয় একটি আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান।

জনপ্রিয় অভিনেতা সাজু খাদেম ও চলচ্চিত্র পরিচালক দেবাশীষ বিশ্বাসের অনবদ্য উপস্থাপনায় সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এই জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদানের পাশাপাশি ছিল মনোমুগ্ধকর নাচ, গান ও ফ্যাশন শো।

কয়েকদিন ধরে একটু ঠান্ডা ও মেঘলা আবহাওয়া থাকলেও এদিন নিউ ইয়র্কের আকাশ ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল, তবে সহনীয় ঠান্ডা ছিল। মেঘমুক্ত চমৎকার আবহাওয়ার জন্যে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বেই বিশাল মিলনায়তন দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাছাড়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের উপস্থিতিও দর্শকের আগ্রহের কারণ ছিল। অনেককেই নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান হিসেবে বলতে শোনা গেছে। অনুষ্ঠানটি ছিল আমার ভাতিজার বাসার কাছাকাছি, কর্মব্যস্ততার জন্যে অন্যসব অনুষ্ঠানে তাদের যাবার অনাগ্রহ থাকলেও এই বিশেষ অনুষ্ঠানে আমার ভাতিজা স্বপন, ওর স্ত্রী লাকি, দুই নাতি শুভ, শ্রাবণ আমার সঙ্গী হয়। এর পূর্বে নিউ ইয়র্কে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন কিংবা জ্যাকসন হাইটস-এর উন্মুক্ত রাস্তায় বিশাল সমাবেশে গান গাইলেও এই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের স্মৃতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সময় অনেক বদলেছে, প্রবাসীদের মধ্যে দেশপ্রেম বেড়েছে সেটা প্রভাবিত করেছে নতুন প্রজন্মকেও, সেটা দেখে ভালো লাগল। নতুন প্রজন্মের একটি বড়ো অংশ এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে।

অনুষ্ঠানে সেরা অভিনেত্রী ও অভিনেতার অ্যাওয়ার্ড পান সজল নূর, সাজু খাদেম, তিশা, নাদিয়া, পিয়া বিপাশা এবং ভারতের পায়েল মুখার্জি। সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন দেবাশীষ বিশ্বাস। এছাড়া সংগীতে বিশেষ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন জনপ্রিয় শিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ও তাহসান। আর ১৭তম আসরের অনুষ্ঠানে পুরস্কার পান এস আই টুটুল ও সেলিম চৌধুরী। এছাড়া দ্বিতীয় আসরে নিউ ইয়র্কের শিল্পী লিনা, মৌ ও সজল রায়কে সংগীতশিল্পী হিসেবে পুরস্কার দেওয়া হয়। তাদের হাতে পুরস্কার প্রদান করেন প্রবাসে সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, ইঞ্জিনিয়ার আবু হানিফ, ব্যবসায়ী নূরুল আজীম, মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ, চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াত, শায়লা ইফতেখার, জাকারিয়া মাসুদ জিকো, সোমা সায়ীদ, নাসরিন আহমেদ।

নিউ ইয়র্কে বাঙালি কমিউনিটির হিরো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ডেমোক্রেট প্রার্থী সিজান চৌধুরী। এছাড়া উপস্থিত সকলকে অভিনন্দন ও হোস্ট আলমকে প্রশংসা করে বক্তব্য দেন কুইন্স ডেমোক্র্যাটিক পার্টির লিডার অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী। সাজু খাদেম ও দেবাশীষ বিশ্বাসের নান্দনিক উপস্থাপনা, আমার দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে শুরু হয় জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আমি গানের পূর্বে লোকসুরে বাঁশি বাজাই সঙ্গে তবলাও পারকার্সনে সহযোগিতা করেন রাকেশ। বাঁশির সুর মূর্ছনায় সমস্ত মিলনায়তন যখন ফেলে আসা শৈশব আর বৈশাখিমেলার কথা ভেবে নস্টালজিক তখন আমি একে একে গাইতে থাকি ‘রমনার বটমূলে’, ‘কালো কালো মানুষের দেশে’, ‘ও সখিনা গেছস কিনা’ কিংবা আমার গাওয়া কালজয়ী গান ‘মায়ের একধার দুধের দাম’। গান গেয়ে গেয়ে যখন মঞ্চ থেকে বিদায় নিচ্ছি তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছি বাংলাদেশের পতাকা। সারা হল তখন করতালিতে মুখরিত। আমি তাদের বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। আর দোয়া চাই এমনি করে আমি যেন সারাজীবন গান শোনাতে পারি।

আমার পরিবেশনার পরই একে এক মঞ্চে আসেন কণ্ঠশিল্পী রোমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ও সেলিম চৌধুরী। তারা দুজনেই পর পর কয়েকটি জনপ্রিয় সংগীত পরিবেশন করে উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করেন, এরপর চলে নৃত্য পরিবেশনা ও ফ্যাশন শো। জমজমাট ফ্যাশন শোতে অংশ নেয় মাজেদ ডিজায়ার। এছাড়া বেশ কয়েকজন ক্ষুদে নৃত্যশিল্পীর নৃত্য পরিবেশনা দর্শকের নজর কাড়ে চন্দ্রা ব্যানার্জি ও তার দলের নৃত্য পরিবেশনও ছিল চমৎকার। তবে জনপ্রিয় অভিনেতা সজল নূর, নাদিয়া, পিয়া বিপাশার আকর্ষণীয় ও জমজমাট নৃত্য পরিবেশন ছিল অনুষ্ঠানের একটি বড়ো চমক। তারা একাধিক নৃত্যে দর্শক মাতিয়ে তোলেন। এছাড়া দেবাশীষ বিশ্বাস সাজু খাদেমের চমৎকার উপস্থাপনাও ছিল অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ আকর্ষণ, তবে শেষ পরিবেশন ছিল তরুণ প্রজন্মের হার্টথ্রব গায়ক নায়ক তাহসান খানের। যেন বসন্ত ছুঁয়েছে দর্শকদের। একের পর এক গান পরিবেশন করে দর্শক শ্রোতাদের মাতোয়ারা করে তোলেন তিনি। আলো ঝলমলে মঞ্চে গানের এই যুবরাজ একে একে গেয়ে চলেন, ‘আমি সেই সুতো হবো’, ‘তুমি ছুঁয়ে দিলে মন’, ‘সামনে তুমি দাঁড়িয়ে’, ‘তোমার প্রেমে পাগল আমি’, ‘চাঁদের আলোয় তুমি কখনও আমার হবে না’ ইত্যাদি তার গাওয়া জনপ্রিয় গান। সারা মিলনায়তন তখন উষ্ণ উত্তেজনায় কাঁপছে। ভক্তরা তার সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ মিলান আর নৃত্যে চারিদিক মাতিয়ে তোলেন, এ এক অসাধারণ দৃশ্য। এছাড়া দর্শক নাটক ও চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা তিশাকে সামনে পেয়ে মুগ্ধ হন। মঞ্চে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি, নান্দনিক আলাপচারিতা আলোর দ্যুতি ছড়ায়। এছাড়া ভারতের পায়েল মুখার্জির ‘রিমিক্স কাওয়ালি’ ও মেহেরজান গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। মিলনায়তনে উপচেপড়া দর্শক সেই সান্ধ্যরাত থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান উপভোগ করে। তাদের আরেকটি আগ্রহের বিষয় ছিল প্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে সেলফি তোলা। স্পন্সর, আমন্ত্রিত অতিথি, নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিক ; বিভিন্ন সংগঠনের সংগঠক, সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতি ঢালিউড মিউজিক অ্যান্ড ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডের ১৭তম আসরের সফল সমাপ্তি হয়। হ

লেখক : গণসংগীতশিল্পী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here